Sunday, November 13, 2016

সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নিয়ে আগাম ভাবনা

আবুল মোমেন

চট্টগ্রাম শহরের জনসংখ্যার হিসেব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এক মত হতে দেখা যায়  না - ৪৫ থেকে ৬০ লাখ পর্যন্ত শোনা যায়। আমরা ধরে নিতে পারি ৫০ লাখ। একটা তথ্য দিয়ে কথাটা শুরু করি।
দু’মাস আগে গিয়েছিলাম পাশের ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায়। জনসংখ্যা ৬ লাখ। আমরা চট্টগ্রামের সঙ্গীত সংগঠন রক্তকরবীর অনুষ্ঠান করলাম রবীন্দ্রভবনের দুই নম্বর মিলনায়তনে। এই আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলে আসনসংখ্যা ৬শর বেশি। ভবনের প্রধান হলের ধারণ ক্ষমতা এগারশর বেশি। রাস্তার বিপরীত দিকে আছে সুকান্ত একাডেমি। তাতে ৩৫০ আসনের আধুনিক মিলনায়তন ছাড়াও লাইব্রেরি, গ্যালারি রয়েছে। পাঁচ বছর আগে ওখানে সেমিনার করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবাষির্কী উপলক্ষে। এর বাইরে আছে নজরুল কলাক্ষেত্র - এই আধুনিক মিলনায়তনটিতে আসন সংখ্যা নয়শ। টাউন হলও বেশ ভালো। পুরোনো রাজবাড়িতে জাদুঘরের পাশাপাশি সংস্কার করে আধুনিক মিলনায়তনও তৈরি হয়েছে।
একটি শহরের নাগরিক জীবনে সুস্থ আনন্দ ও বিনোদনের জন্যে আধুনিক মিলনায়তন অপরিহার্য। মিলনায়তনের সংখ্যা, সুযোগ-সুবিধা ও তার মান দেখে বোঝা যায় নগরটি সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত জীবন্ত।
আগরতলার চেয়ে জনসংখ্যার বিচারে প্রায় আট গুণ বড় চট্টগ্রাম শহরে একটি মাত্র আধুনিক মিলনায়তন আছে, থিয়েটার ইন্সটিটিউট, যার আসনসংখ্যা মাত্র ২৮০। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির কিছু সংস্কার ও আধুনিকায়ন হয়েছে। কিন্তু আসন সংখ্যা সেই ৩০০-৩৫০।
এককালে যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনের রেওয়াজ ছিল না তখন চট্টগ্রামে অন্তত ৪টি মিলনায়তন বেশ চালু ছিল - মুসলিম হল, ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউট, ওয়াপদা মিলনায়তন, জেমসেন হল। এছাড়া সেন্ট প্লাসিডস্ ও সেন্ট মেরিজ স্কুলের মিলনায়তনও বিভিন্ন সময়ে নাটকসহ সাংস্কৃতিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এসব মিলনায়তনে তখন নিয়মিত নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হত। বর্তমানে দুটি মাত্র মিলনায়তন চালু থাকলেও তাতে কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান থাকে না। অন্যান্য হল, মুসলিম হল, জেমসেন হল, ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউটের ব্যবহার আর তেমন হয় না। বলা যায় নগরে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ভাঁটা চলছে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তনগুলোতেও আগের মত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হয় না। শুনেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মোজাম্মেল স্মৃতি মিলনায়তনটি অব্যবহার্য পড়ে থাকতে থাকতে তার মেঝেতে ঘাস গজিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হলটি পরিত্যক্তই হয়েছে কি?
সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের এই ভাঁটার কালে এখানকার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। অধিকাংশ নাটকের দল নামসর্বস্ব - কালেভদ্রে মঞ্চে নাটক করে।
চট্টগ্রাম বেতার ও টেলিভিশনও মান বজায় রেখে চলতে পারছে না। এই বাস্তবতায় মেধাবী তরুণ শিল্পীরা সকলেই ঢাকামুখী হয়ে পড়েছে। এর ফলে ঢাকার বাইরে সারাদেশের সবকটি জেলা শহরই সাংস্কৃতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু, প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দর নগরী হিসেবে গড়পড়তা সবার মধ্যে থাকার কথা নয়, এটা চট্টগ্রামের দুর্ভাগ্য।
আজকে জঙ্গিবাদের উত্থানের ফলে সকলেই উপলব্ধি করছেন যে দেশের সব জেলায় সর্বত্র সাংস্কৃতিক উজ্জীবন প্রয়োজন। সে হিসেবে দেশের দ্বিতীয় প্রধান নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের দিকে সবার মনোযোগ দেওয়া দরকার।
আশার কথা সরকার অর্থাৎ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মুসলিম হল ও শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হলে ভালো হয়। এখানে একটি অন্তত হাজার আসনের মূল মিলনায়তন, একটি চারশ আসনের নিরীক্ষামূলক নাটকের হল, একটি তিনশ আসনের সেমিনার হল, একটি একশ আসনের লেকচার হল, একটি প্রদর্শনী কক্ষ, একটি নগর জাদুঘর, একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কক্ষ, একটি সংস্কৃতি বিষয়ক লাইব্রেরি এবং একটি সাংস্কৃতিক আর্কাইভ থাকলে ভালো হয়। তাছাড়া বেশ কিছু মহড়া কক্ষ, সভাকক্ষ থাকতে পারে। সম্ভব হলে জনা বিশেকের সাংস্কৃতিক দল থাকার উপযোগী ডরমিটরি, চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তি থাকার মত অতিথি কক্ষ থাকা দরকার। আর থাকবে ভালো মানের কেন্টিন।
আমরা আশা করব চট্টগ্রামকে বুঝ দেওয়ার মত কোনো সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স-এর কথা সরকার ভাবছেন না। একটি বিকাশমান আধুনিক নগরীর চাহিদা বিবেচনা করেই এটি তৈরি হওয়া দরকার।
প্রধান মিলনায়তন ও নাট্য মিলনায়তন এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে ব্যালে নৃত্যসহ বিদেশি সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠান ও অত্যাধুনিক নিরীক্ষামূলক নাটক এতে মঞ্চায়ন করা সম্ভব হয়।
এটিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম যেন সাংস্কৃতিকভাবে জেগে ওঠে সেটাই চট্টগ্রামের মানুষের মাথায় রাখা দরকার। কেবল স্থাপনা বা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কিছুই হবে না যদি না স্থানীয় মানুষ মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে কমপ্লেক্সকে চাঙ্গা রাখতে পারেন, নাগরিকদের সুস্থ বিনোদন দিতে পারেন।
এটি পরকিল্পনার জন্যে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। মূল একজন পরিচালক ছাড়াও নাটক ও সঙ্গীত বিভাগের দু’জন উপ-পরিচালক থাকতে পারেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় অফিস স্টাফ তো থাকবেনই। 
শেষ কথা হল কেবল ভবন তৈরি করলে চলবে না, এখানে বছরব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও থাকতে হবে। নয়ত অনেক অর্থের বিনিয়োগ অনর্থক হয়ে যাবে। কারণ নিজস্ব আয় দিয়ে উন্নত মানের সংস্কৃতি চর্চা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই তা হয় না এর জন্য সবসময়ই ভর্তুকির প্রয়োজন হয়। এ বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

****


Wednesday, November 9, 2016

শিক্ষাকে বলি দিয়ে শিক্ষার বিস্তার?

আবুল মোমেন

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা থাকছে - শিক্ষামন্ত্রীর কথায় অন্তত তাই মনে হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের চাপাচাপিতে সরকার  একবার এ পরীক্ষাটি বন্ধ করার কথা বলেও আবার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে তা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বছরের জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা মাত্রই শেষ হয়েছে। এর পরে নিশ্চয় উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
সরকারকে শিক্ষায় ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্র, মহানগর-মফস্বল-গ্রাম-চরাঞ্চল-পার্বত্য এলাকাবাসী ইত্যাদি সকল পর্যায়ের নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির বিষয় মাথায় রাখতে হয়। শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় একবার আমাকে বলেছিলেন পরীক্ষাকে সরকার একটি উৎসবে রূপ দিতে পেরেছে এবং  দেখা যায় গ্রামাঞ্চল-চরাঞ্চলের শিশুরাও অভিভবকদের সাথে হেঁটে, ভ্যান বা রিকশায় দল বেঁধে সেজেগুজে পরীক্ষার হলে যায়। এই উৎসবের আমেজ তাদের উৎসাহ বাড়ায়, ভয় দূর করে এবং সব মিলে শিক্ষা বিস্তারে সহায়ক হয়। তাছাড়া এখনও অনেক ছেলেমেয়ে, বিশেষত মেয়েশিশু, প্রাথমিকেই ঝরে যায়। পরীক্ষা এবং সনদপত্র তাদের অন্তত এটুকু পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রমে ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
তাঁর কথায় যে সত্যতা নেই তা নয়। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পরিবর্তে তারা একটি পাব্লিক পরীক্ষা দিচ্ছে এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের চেষ্টায় তাতে উৎসবমুখর পরিবেশও সৃষ্টি করা গেছে। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়?
শিক্ষায় সনদপত্র একটি নগদপ্রাপ্তি, এর কিছু মূল্য হয়ত জীবনে কখনও মিলতেও পারে - যদিও ইদানীং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকুরি কেবল প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা পাশের সনদ দিয়ে জোটে না। তার জন্যে নিদেনপক্ষে জেএসসি সনদপত্র  লাগবে। দিনে দিনে সেটারও মূল্য থাকবে না। বাস্তবতা হল এখন ডিগ্রি পাস করেও অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকুরি করছেন। চাকুরির বাজার সম্প্রসারিত হলেও বাস্তবতা এরকমই থাকবে।
শিক্ষার মূল কাজ তো সনদপত্র অর্জন নয়, প্রাথমিক বা নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে তা তো নয়ই। এমনিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হল এর পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। পরীক্ষাকে ঘিরেই পড়াশুনার আয়োজন চলতে থাকায় ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক ত্রয়ী মিলে পরীক্ষা-উপযোগী বা পরীক্ষাবান্ধব একটা ব্যবস্থা দাঁড় করিয়েছে। পিএসসি ও জেএসসি এই প্রবণতাকে জোরদার করেছে।
পরীক্ষার ভিত্তিতে পড়াশুনা চলতে থাকলে তার ফলাফল কী হয় সেটা আমরা বাস্তবেই হাতে হাতে পাচ্ছি। আমি দেশের বিভিন্ন পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ভর্তি পরীক্ষার ভয়াবহ ফলের ওপর জোর দেব না। এটি একটি  চরম বাণিজ্যিক এবং অমানবিক ব্যবস্থা, এটি ভর্তিচ্ছুক ছাত্রের  মেধা ও যোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকর মাধ্যম নয়। এতে গোড়া থেকেই বাদ দেওয়ার কৌশল গুরুত্ব পায়, অবজেক্টিভ প্রশ্নের এক ঘণ্টার পরীক্ষায় উচ্চ শিক্ষার প্রস্তুতি বোঝাও মুশকিল।
তবে মাঠ পর্যায়ে জরীপের মাধ্যমে প্রাথমিকের অর্জন মান যাচাইয়ের যে কাজ ক্যাম্পে ও সরকারের উদ্যোগে হয়েছে তার ওপর নির্ভর করা যায়। এতে দেখা গেছে অর্জন মান সন্তোষজনক, ছাত্রদের বড় অংশ - শতকরা ২৫ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ - মাতৃভাষা ও গণিতে দুর্বল, ইংরেজিতে তো বটেই। আমরা বাস্তবক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখেছি সরকারি প্রাথমিকে অর্জন মানের অবস্থা শোচনীয় - ভাষা, গণিত এবং সাধারণ জ্ঞানে বয়সের তুলনায় মান অনেক কম।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার মত। ইদানীং দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোক্তারা বিশেষজ্ঞ ছাড়াও ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক হিসাবরক্ষকের মত মাঝারি স্তরে বিদেশিদের নিয়োগের দিকে ঝুঁকেছে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তান থেকেও অনেকেই এ ধরনের চাকুরিতে আসছেন। অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে।
শিক্ষার মান আসলেই যে কমেছে তা বোঝা যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানের অবনতিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চ শিক্ষার মুখ্য প্রতিষ্ঠান। বিশ্বে এর অবস্থান পাঁচশ-র মধ্যেও নেই। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা - সম্ভবত একমাত্র বুয়েট ব্যতীত - আরও তলানিতে রয়েছে। গবেষণার সংখ্যা ও মান, গবেষণা পত্রিকার স্বীকৃতি ধরলেও আশাব্যঞ্জক কিছু পাওয়া যায় না।
এসব তথ্য ও বক্তব্যের অর্থ অবশ্য এ নয় যে আমাদের ছাত্রদের মেধা ও মান খারাপ। না তা নয়। তা যে নয় তার প্রমাণ আমাদের তরুণরা দেশে ও বিদেশে অহরহ দিচ্ছে। কিন্তু দেশের প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ক্রমেই সেই সুযোগ কমে আসছে।
মূলধারার উচ্চ শিক্ষা যেভাবে চলছে তাতে ছাত্রদের বড় অংশ নিজের পছন্দের বিষয় পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে তারা গোড়া থেকেই অনিচ্ছুক ও উদাসীন ছাত্র। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে কোনোভাবে এম. এ. পাশ করে সর্বোচ্চ ডিগ্রির সনদ অর্জন। তাদের লেখাপড়া সীমাবদ্ধ থাকে আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য পাঁচ-ছ’টি প্রশ্ন জানা, তার উত্তর মুখস্থ করার মধ্যে। এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে উচ্চ শিক্ষার যে উদ্দেশ্য - পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা, বিশ্লেষণ করতে শেখা এবং নতুন ধারণা ও ভাবনা উপস্থাপন - তার কোনো অবকাশ এখানে থাকে না। পরীক্ষার বাইরে ছাত্রের তেমন কিছু করার নেই, জ্ঞান বা মনন চর্চার বিভিন্ন উপায়ের সাথে তাদের পরিচয় ঘটে না। ফলে আড্ডা, নেশা, অপরাজনীতি, মেয়েদের পেছেনে লাগা ইত্যাদি বিচিত্র ক্ষয়িষ্ণু কাজে তাদের তরুণ্য বয়ে যায়। এটি জাতীয় অপচয়।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয় - যা তিনি নিজের শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন - আমাদের শিক্ষার প্রায় সবটাই লোকসানি মাল। সরকার এবং বিশ্বব্যাংক-এডিবিসহ বিদেশি অনেক সংস্থা শিক্ষাখাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বেশ অনেক বছর ধরে। তাতে স্কুলের ঘরবাড়ির উন্নতি হয়েছে, বিনামূল্যে উন্নত মুদ্রণের ভালো বই দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, ছাত্রীদের উপবৃত্তি  ও স্কুল পোশাক দেওয়া হচ্ছে, সীমিত আকারে দুপুরের খাবার চালু হয়েছে, বাথরুম-পানি সরবরাহের উন্নতি হচ্ছে, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত আগের চেয়ে ভালো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও বেড়েছে। কিন্তু এসব উন্নয়নের ফলাফল শিক্ষায় দৃশ্যমান হচ্ছেনা। আমি বলব, নিচের পর্যায় থেকেই শিক্ষাকে পরীক্ষা-কেন্দ্রিক করে রাখার ফলেই এই বিপুল আয়োজন, শ্রম  এবং ব্যয়ের যথার্থ সুফল আমরা পাচ্ছি না।
পরীক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যে ব্যবস্থা তা চালু রেখে শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর প্রবণতা, কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য এবং নোটবইয়ের রমরমা ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। কারণ ছাত্রদের অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার দায়িত্ব নেন না, হয়ত বাস্তব কারণ আছে তার। প্রথমত, আমাদের প্রাথমিকের ছাত্রদের বড় অংশই শিক্ষাবঞ্চিত বা স্বল্পশিক্ষিত বাবা-মায়ের সন্তান যারা সন্তানের শিক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করতে পারেন না। তদুপরি শিক্ষিত-শিক্ষা বঞ্চিত সকল বাবা-মা বাড়তি উপার্জনের চাপে থাকেন নয়ত কর্মক্লান্ত হয়ে ফিরে আর সন্তানকে সময় দিতে চান না। গৃহ-শিক্ষক বা কোচ নিজের কৃতিত্ব প্রকাশের একমাত্র উপায় হিসেবে পান পরীক্ষার ফলাফলকে যা তাঁর যোগ্যতা-দক্ষতার জ্বলজ্বলে প্রমাণ হাজির করতে পারে। এ প্রক্রিয়া একদম প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু হয়ে উচ্চতর স্তরেও চলতে থাকে।
এটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, এভাবে ছাত্রদের মৌলিক চিন্তার ক্ষমতা, সবরকম সৃজনশীলতা নষ্ট তো হয়ই উপরন্তু তাদের আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা দক্ষতারও ঘাটতি থেকে যায়।
কেন ঘাটতি থাকে তা বোঝাও কঠিন নয়। পরীক্ষার পড়া হয় প্রশ্নের ভিত্তিতে - সম্পূর্ণ একটি গল্প, অধ্যায় বা ধারণার সাথে পরিচয় এতে গুরুত্ব পায় না, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঐ পরীক্ষাটিতে নির্দিষ্ট গল্প বা অধ্যায় থেকে কোন প্রশ্নটি আসতে পারে সেটি। দক্ষ কোচরা বিভিন্ন বছরের প্রশ্ন ঘেঁটে সেটি বের করেন এবং সেই প্রশ্নের তাঁদের তৈরি উত্তরটি ছাত্রকে শেখান। পরীক্ষার ভালো ফলেই যেহেতু মোক্ষ তাই এ ধরনের ‘সফল’ শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারের ওপর অভিভাবকদের আস্থা বাড়ছে এবং তা এখন স্কুলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরাও এতে আর্থিকভাবে লাভবান হন, ফলে তাঁরাও তাই চান। শিক্ষা বলতে ক্রমে পরীক্ষাই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছে - কোচিং সেন্টারগুলো এবং তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ‘সফল’ স্কুলগুলোও অনবরত বছর জুড়ে মডেল টেস্ট নিতে থাকে। এভাবে ছাত্ররা পরীক্ষা-দক্ষ হয়ে ওঠে।  যত অন্ধ আনুগত্যে ছাত্ররা এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে ততই তারা নিজের, বাবা-মার, স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে। যদিও - আবারও রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - শিক্ষার হদ্দমুদ্দ সারা হয় ততদিনে।
পরীক্ষাকে যতই উৎসবের রূপ দেওয়া হোক না কেন নিরন্তর পরীক্ষার ড্রিলের ভিতর দিয়ে জীবনের প্রস্তুতিপর্ব পার করে একজন তরুণ শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে - সে শৈশব থেকেই একজন পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী নয়। বরং যখন তার শিক্ষাজীবন শেষ হয় তখন দেখা যায় তার জ্ঞান ভাণ্ডারে তেমন সঞ্চয় জমে নি। কারণ চাপের মধ্যে সে মুখস্থ বা বারংবার অভ্যাস করে যে বিদ্যা আয়ত্ব করেছে তার সাথে আত্মবিকাশ-আত্মপ্রকাশের তেমন সম্পর্ক না হওয়ায় পরীক্ষার পর শেখা বিষয়গুলো তাদের কিছুই মনে থাকে না। আজকাল দেখা যায় প্রথম শ্রেণির পড়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে আসতে আসতে অনেকটাই ভুলে যায় শিশুরা। জ্ঞান যে একদিকে পুঞ্জিভূত হয় আর অন্যদিকে তার ব্যবহারে জানা-বোঝা তথা আলোকনের একটি প্রক্রিয়ায় মানুষটা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তা আর হতে পারে না। ছাত্রদের থুড়ি পরীক্ষার্থীদের জানার, পড়ার, বোঝার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে অধিকাংশ মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরে কোনো বই পড়ার তাগিদ বোধ করেন না। অনেকে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, অনেকে আবার বিষয়, ভাবনা বা ধারণার জটিলতায় খেই হারান, বিশ্লেষণের ঘূর্ণিপাকে অনেকেরই পড়ার আগ্রহ তলিয়ে যায়। আমাদের শিক্ষা তার ব্যবস্থার গুণে ছাত্রের পড়ার আগ্রহ অংকুরেই নষ্ট করে দেয়।
এভাবে সরকারের ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মেধাভিত্তিক সমাজ তৈরি করা সম্ভব হবে না। এভাবে বিপুল অর্থ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের শৈশব থেকে তারুণ্য এবং প্রতিভা ও মেধার অপচয় হতে দেওয়া কি ঠিক? শিক্ষার বিস্তার চলছে ঠিকই, তবে তার মূল্য শুধছি শিক্ষাকেই বলি দিয়ে।


****

Tuesday, November 1, 2016

চরিত্রহীন সমাজের বিকৃতি

আবুল মোমেন


দিনাজপুরের নিতান্ত শিশু পাঁচ বছরের পূজার ওপর যে বর্বর অত্যাচার হয়েছে তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকেই ঘা দিয়েছে। এক নিষ্পাপ শিশুর ওপর এমন মর্মান্তিক আঘাত এদেশে আরও অনেক হয়েছে। প্রতিবারই সচেতন মানুষ শিহরিত হয়েছেন, এবং দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তবে সময় সবকিছুকেই ভুলিয়ে দেয়, আর আমাদের মত সমস্যাসঙ্কুল সমাজে মানুষের স্মৃতি, বিবেক, দায়িত্ববোধ সবই সংকট ও সময়ের প্রহারে প্রখরতা হারিয়ে দ্রুত অসাড় হয়ে যায়। আবার কোনো বীভৎস ক্রুঢ়তা তাকে জাগিয়ে তোলে। বলা বাহুল্য সেও অল্প সময়ের জন্যে, কিংবা বলা যায় নতুনভাবে ঘুমিয়ে পড়াতেই এই জেগে ওঠার একমাত্র সার্থকতা।
শিশুটির ওপর বিকৃত যৌন আক্রমনের জন্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাইফুল ইসলাম তাদের প্রতিবেশী, তিন সন্তানের জনক যাদের দু’জন কন্যা সন্তান এবং তাকে অবোধ শিশুটি নিশ্চিন্তে ‘বড় আব্বু’ বলে সম্বোধন করত। এ ঘটনায় নাড়া খেয়ে আমাদের দায়িত্ব সচেতনতা যদি কেবল দোষীদের পাকড়াও করার, কঠোর শাস্তি প্রদানের দাবি আর সাধারণভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয়, তারুণ্যের দিশাহীনতা, সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি লক্ষ্যহীন অসার বুলিতে শেষ হয় তবে সমাজের অবক্ষয় ও অসাড়তারই প্রমাণ মেলে।
এই অবস্থার জন্যে ঢালাওভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যর্থতাকে দায়ী করা যায়। কিন্তু এতো শ্লোগান বিশেষ, যা সবাই বলছে, এবং শিখে নিয়ে সবাই বলতে সক্ষম। যে অপরাধকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, যে স্বয়ং অপরাধকর্মে লিপ্ত হয় সকলেই এসব শ্লোগান রপ্ত করে নিয়ে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নষ্ট করে দেয়। এভাবে অসচেতন ও সংবেদনাহীন সমাজ মূল্য ও নৈতিকতা-নিরপেক্ষ তথা চরিত্রহীন হয়ে পড়ে।
একটা বীভৎস অপরাধের পরিচয় পেয়ে শিউরে উঠেও এ সংকটকে গভীরভাবে বুঝে নিতে হয়। সংকটটা এখানেই যে ব্যক্তির পতন ঠেকানোর জন্যে এখানে কোনো সামাজিক প্রতিরোধ নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সামাজিক প্রতিরোধ দানা বাঁধতে পারত, যেমন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি সকলই যে ভিতরে ভিতরে চরিত্রহীন হয়ে পড়েছে। সবার ওপরে কি থাকবে রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে বাসা-বাঁধা দুর্নীতিগ্রস্ততা? কিন্তু কথা হল এই দূষিত বাস্তবতা আপনা আপনি আমাদের কল্পনার অভীষ্ট আদর্শ অবস্থায় তো আর পৌঁছাবে না, এর জন্যে সমস্যাকে অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করাই প্রাথমিক দায়িত্ব। তবেই নিরাময়ের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। সে কাজ ক্ষুদ্র পরিসরেও শুরু হতে পারে। কিন্তু শুরু হওয়াটা জরুরি।
আমাদের সমাজে দুর্বল স্থান অনেক। দারিদ্র বা অশিক্ষা হয়ত কমবে। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে প্রধান তিনটি দুর্বলতা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না। প্রথমত এ সমাজ নৈতিকভাবে দুর্বল ও আপসপ্রবণ, দ্বিতীয়ত এ সমাজ আইন ও নিয়মের প্রতি কেবল উদাসীন নয় তা অমান্য করার মধ্যে গৌরব বোধ করে এবং তৃতীয়ত এ সমাজে সুস্থ স্বাভাবিক যৌন চেতনা, রুচি ও জীবনের চর্চা হয় নি। সে অর্থে সমাজ ভিতরে ভিতরে চরিত্রহীন হয়ে পড়েছে।
এই চরিত্র-খোয়ানো সমাজ স্বাভবতই দিনকে দিন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে - অপরাধীকে লালন করে এবং অপরাধ দমন ও নির্মূলের সকল উদ্যাগকে অকেজো করে দিয়ে। এই অবস্থায় পুরুষশাসিত সমাজে অপ্রতিহত হয়েছে পুরুষের প্রাধান্য, কোণঠাসা হয়েছে নারী। সংখ্যালঘু নারী আর কন্যাশিশু এ সমাজে খুবই দুর্বল। তাহলে সংখ্যালঘু সমাজের কন্যাশিশুর অবস্থান সমাজে সবচেয়ে দুর্বল। ইসলামে নারীর সমানাধিকার স্বীকৃত এ নিয়ে বাদানুবাদে না গিয়েও সহজেই দেখিয়ে দেখা যায় এ সমাজে কীভাবে ধর্মের নামে এবং ঐতিহাসিক প্রথার দোহাই দিয়ে পুরুষই সমাজের একচ্ছত্র কর্তা হয়ে বসেছে। আইনের বিধানকে কাজে লাগিয়ে লড়াই করার সুযোগও কম, কারণ পুরুষতন্ত্র নারীকে দমনে সর্বশক্তি কাজে লাগাবে। তার হাতে ধর্ষণ ছাড়াও আরও অত্যাচারের শক্তি মওজুদ আছে।
কিন্তু দিনাজপুরের ‘বড় আব্বুর’ কীর্তি কোনো ব্যাখ্যাতেই মেলানো যায় না। পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ - কোন পর্যায়ের অপরাধ তা এ সমাজকেই বুঝতে হবে। কিন্তু এমন ঘটনা নতুনও  তো নয়। শিশুদের ধর্ষণ ও তারপরে হত্যার ঘটনা বহু বহু ঘটেছে এদেশে। এটা বিকৃতি, চরম বিকৃতি এবং মানুষের নৃশংস পশু হয়ে ওঠার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
মানতেই হবে এ সমাজমানস গভীরভাবে রোগাক্রান্ত, এটি অসুস্থ সমাজ। যে সমাজে অবোধ কন্যাশিশুও নিরাপদ নয় সেটি কীভাবে মানুষের সমাজ বলে দাবি করবে? এটি নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এ ঘটনা এ সমাজের পুরুষতন্ত্রের বিকৃত যৌনক্ষুধার গভীরতাকেই তুলে ধরে। এমন সমাজের বৈষয়িক উন্নতি হলেও মানবিক অধ:পতন ঠেকানো মুশকিল হবে।
আমরা আবারো বলব, সঠিক শিক্ষা চাই, সামাজিক শিষ্টাচারসহ সুস্থ সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও পরিবেশ চাই। মানবিক সমাজের সুস্থ সংস্কৃতির ধারায় শিশু পরম আদরের পাত্রী। তার অবমাননা, নিষ্ঠুর পীড়ন আমাদের সকল উচ্চাভিলাষী কথা আর উন্নয়নের বুলিকে উপহাস করে। অহঙ্কারী আহাম্মক সমাজকে চপেটাঘাত বসিয়ে দেয়। বোধোদয় হবে কি আমাদের?

***


Thursday, August 11, 2016

বিবেক হারালে মানুষের থাকে কি?

আবুল মোমেন

কুমিল্লার নাট্যকর্মী কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তাতে আশা জেগেছিল যে অপরাধী বা অপরাধীরা যতই শক্তিশালী হোক তারা ধরা পড়বে এবং বিচার ও শাস্তি এড়াতে পারবে না। ঘটনার সাড়ে চারমাস পরে তনুর মায়ের উপলব্ধি হল কন্যার ওপর অত্যাচারকারী ঘাতকেরা রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী। নয়ত, কুমিল্লা সেনানিবাসের মত ‘নিরাপদ’ স্থানে সংঘটিত এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডের কুলকিনারা আজও হবে না কেন?
কত বছর হয় কিশোর ত্বকী হত্যার? হায়, আমাদের স্মৃতিতে ত্বকীর নিষ্পাপ মুখটি জ্বলজ্বল করলেও তার হত্যাকাণ্ডের বিচার থেমে থাকার অপরাধ আমরা ভুলে যাচ্ছি। সেবারেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যাপক লেখালেখির মাধ্যমে দেশব্যাপী প্রতিবাদ হয়েছিল। মনে হয়েছিল এক লড়াকু পিতা তাঁর সন্তান হত্যার বিচার পাবেন। ঘটনা গড়িয়েছে নিজস্ব গতিতে, এবং একসময় সন্তান হত্যার বিচারপ্রার্থী পিতাকেই ঘটনা পরম্পরায় মামলার সম্মুখীন হয়ে জেলেও যেতে হয়েছে!
এদেশে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে? দেশে বিচার যে নেই তা নয়, অনেক মামলার বিচার হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, অনেকের বিরুদ্ধে রায় কার্যকরও হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়ে রায় কার্যকর হয়েছে। আরো হচ্ছে। এসব জঘন্য অপরাধের বিচার বহুদিন বন্ধ ছিল, অনেক ক্ষেত্রে মামলাও করা যায় নি, অপরাধীদের জন্যে দায়মুক্তির আইনও ছিল। সেসব বাধা পেরিয়ে আমরা এসব অপরাধের বিচার পেয়েছি, পাচ্ছি।
আমাদের উচ্চ আদালত অনেক ক্ষেত্রেই স্বত:প্রণোদিত হয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে মামলা করেছে, বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা রাষ্ট্রের অন্যান্য শাখা ও বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে। তেমনি এক নির্দেশনার ভিত্তিতে পুলিশ নারায়ণগঞ্জের এক হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অবমাননার বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের অবমাননার দৃশ্যটি কেউ ধারণ করেছিল এবং তা সেই সূত্র থেকে সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেলে প্রদর্শিত হয়েছে, ভিডিও ক্লিপটি ছড়িয়ে পড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। দেশবাসী দেখেছে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে স্থানীয় এমপি কীভাবে একজন প্রধান শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করিয়ে হেনস্থা করছেন। এ ঘটনা সারা  দেশে আলোড়ন তুলেছিল, ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে শিক্ষকের চাকুরি রক্ষা করলেন, তাঁর মর্যাদা পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখলেন।
ঐ সময় আত্মপক্ষ সমর্থন করে এমপি সেলিম ওসমান বলেছিলেন শিক্ষকের ওপর উত্তেজিত জনগণ এতই মারমুখী হয়ে উঠেছিল যে তাঁকে এরকম একটা শাস্তি দিয়ে তিনিই কোনো মতে প্রাণে রক্ষা করেছেন, উপস্থিত জনতাকেও শান্ত করেছিলেন। কিন্তু এখন আদালতের নির্দেশে তদন্ত চালিয়ে পুলিশ এ ঘটনায় এমপির কোনো সংশ্লিষ্টতাই খুঁজে পায় নি!
তাহলে দেশে সেই কাল এসে গেল যখন নিজের চোখ ও কানকেও অবিশ্বাস করতে হবে! চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের উপায়ও থাকল না! ক্ষমতাবানের ক্ষমতা কতদূর হতে পারে তার দৃষ্টান্ত কিছু কিছু মানুষ আগেও পেয়েছে। কিন্তু মানুষের চোখে দেখা তথ্যকে এবং বিশ্বাসকে এভাবে দলে থেঁৎলে দেওয়ার নমুনা আর দ্বিতীয়টি নেই। বিচিত্র নয় যে ঘটনার শিকার সংখ্যালঘু মানুষটির ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করে তাঁর কাছ থেকেও এ বাবদে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে! কথা উঠতে পারে ভুক্তভোগী নিজেই ঘটনা অস্বীকার করলে অন্যে আর কী করবে?
কিন্তু এমনটা হওয়া উচিত হবে না। আমরা দেশ ও এর ভবিষ্যতের স্বার্থে আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকব পুনরায় স্বত:প্রণোদিত হয়ে দুর্বলের পাশে দাঁড়াবার আশা নিয়ে। যে ঘটনা মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, মানুষের বিবেক ও মর্যাদাবোধকে নাড়া দিয়েছিল, সমাজের অত্যন্ত মান্য ব্যক্তিরাও শিক্ষকের অপমানকে নিজেদের গায়ে নিয়েছিলেন। এর সাথে যেমন সত্যের টিকে থাকবার একটা ব্যাপার আছে তেমনি রয়েছে জাতির বিবেকের টেকা না টেকার প্রশ্ন।
ঘটনাটি ঘটে নি এ কথা তো বলা যাবে না, কেউ না কেউ সেদিন কাজটা করিয়েছিল, এমপি সেলিম ওসমানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন - এসবই তো সত্য, এসবই ঘটনা। ঘটনা অস্বীকার করা যাচ্ছে না, তাই কি বলা হচ্ছে কেউ কিছু বোঝার আগে আকস্মিকভাবে ঘটে গেছে? এই আকস্মিকতার তত্ত্ব কার মাথা থেকে এসেছে? কারো মাথা থেকে তো নিশ্চয় এসেছে এবং তিনি নিশ্চয় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। আমরাও প্রভাবশালীর ক্ষমতার দৌড় কতদূর, সেটাই বুঝতে আইছি।  ফলত ঘটনা এখানে শেষ হয় না, নতুন মোড় নিয়ে নতুনভাবে শুরু হয়। আমরা তাই এ বিষয়ে আদালতের পরবর্তী ভূমিকার দিকে তাকিয়ে থাকব।
বিষয়টা গুরুতর। কেবল এটি নয়, তনু, ত্বকী, মিতুর হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনাগুলো রহস্যে আবৃত হয়ে থাকলে মানুষের মনে হবে আইনের জন্যেও অনেক স্থান, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি দুর্ভেদ্য। এতে বিচার বিভাগের ক্ষমতা সম্পর্কে জনধারণায় চিড় ধরে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হল, এতে জাতির বিবেক এবং সত্যবোধ ক্ষয় পেতে থাকে। সত্য ও মিথ্যাকে একাকার হতে দিলে, করা সম্ভব হলে সে সমাজে অপরাধ ঠেকানো মুশকিল, জঙ্গিবাদের প্রবণতার কাছেও তা দুর্বল থাকবে। আর বিবেক অস্বীকৃত হলে, বিবেককে অকার্যকর করে দিলে অর্থাৎ বিবেকের মৃত্যু ঘটলে সেটি আর মানুষের সমাজ থাকে কি?
মানুষ খুন হচ্ছে আকছার, বেঁচে থাকা মানুষের সম্মানও খুন হচ্ছে, এরপর বাড়তে বাড়তে পুরো জাতির বিবেক খুন হয়ে যাবে, মানুষের সত্যবোধ লুণ্ঠিত হবে। হয়তবা এসবও হচ্ছে, আমাদের ভোঁতা চেতনা অসাড় হয়ে যাচ্ছে বলে বুঝতে পারছি না। আমরা কথায় কথায় চরিত্র গঠনের কথা বলি, নৈতিক শিক্ষার কথা বলি। চরিত্র কিংবা নীতিবোধ পুঁথিগত শিক্ষা থেকে আসে না, বই পড়ে বিষয়টা জানা হয়, জানা হয় যে সদা সত্য কথা বলিবে। কিন্তু সেই নীতিবোধ চরিত্রে ধারণ করা যায় দৃষ্টান্ত থেকে। তাই রোল মডেলের কথা ওঠে, সমাজে দৃষ্টান্ত দেওয়ার মত মানুষের আকালের কথা বলে আমরা আফশোস করি। সমাজে প্রতিনিয়ত কপটতার আশ্রয় নিয়ে মিথ্যার জয় ঘটছে, ভ-ামি ও চাতুর্য সাফল্যের পথ তৈরি করছে, এমনকি অন্যায় ও অপরাধই জয়ী হচ্ছে বারংবার।
তার মধ্যেও সমাজ কেন টেকে? টিকে থাকে ছিটেফোঁটা দৃষ্টান্তের ওপর। যুদ্ধাপরাধীদের দম্ভ ও আস্ফালন শুনতে শুনতে মানুষ একসময় বিশ্বাস হারিয়েছিল যে এদের বিচার কোনো দিন এদেশে হতে পারবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল, এবং মানুষের হৃতবিশ্বাস ফিরে এলো। ইয়াসমিন হত্যার বিচার পেয়েও মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছিল।
সমাজমানস কোনো কোনো ঘটনায় ত্বরিত এবং প্রবল প্রতিক্রিয়া জানায়। কারণ ঘটনা তার সংবেদনশীলতার জায়গায় প্রবল ধাক্কা দেয়,  তার বিবেককে নাড়া দেয়। সেসব ঘটনায় পারস্পরিক যোগাযোগ ছাড়াই সারাদেশে একযোগে মানুষ একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে। মানুষের এই প্রতিক্রিয়া, এই সংহতির মধ্য দিয়ে জাতির বিবেক কথা বলে। এ হল জাতীয় বিবেকের সত্যাশ্রয়ী ভূমিকা।
খুব সাম্প্রতিক কালে ত্বকী ও তনুর হত্যাকা- সাড়া দেশকে নাড়া দিয়েছিল। এ ছিল দুটি কিশোর-কিশোরীর অন্যায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতির বিবেকের তীব্র হাহাকার ও ক্ষোভের প্রকাশ। আর সম্প্রতি শিক্ষক শ্যামলকান্তি ভক্তের অন্যায় অবমাননায় জাতির বিবেক শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্নে এক হয়ে প্রতিকার চেয়েছিল। এসব ঘটনা কেবল ভুক্তভোগী ব্যক্তির বা তাদের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ঘটনা নয়। এতো জমিজমার খুনের মামলা নয়, দাম্পত্যকলহের উত্তেজনার ফলে ঘটা খুনের মামলাও নয়। সব হত্যাই অপরাধ, তবুও অনেক ক্ষেত্রে দোষ-দায় নিয়ে সওয়াল চলে, কিন্তু তনু-ত্বকীর হত্যাকাণ্ড, যেমন রাশেদ-রাকিব-সাগর হত্যায়, তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই।
নিরাপরাধ শিশু-কিশোরদের হত্যা তাই মানুষকে এতো পীড়িত করে, তার বিবেক প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। একইভাবে একজন প্রধান শিক্ষকের প্রকাশ্যে অবমাননা জাতি মেনে নিতে পারে নি। তা যদি জাতিকে মানতে বাধ্য করা হয় তবে সেটা হবে জাতির গালে চপেটাঘাত, তার বিবেক ও সত্যবোধকে হত্যা করার সামিল। বিবেক ও সত্য এমন বিষয় যে তা কোথাও চলবে আবার কোথাও অচল হয়ে থাকবে এমন সুবিধাবাদ বা আপোসের নীতি চলতে পারে নি।
আমাদের জানতে হবে যে এ জাতির সত্যবোধ কি আছে নাকি নেই। জানতে হবে এটি কি বিবেকবোধসম্পন্ন জাতি নাকি নয়।
ইতিহাস বলে, সব কাল একরকমভাবে যায় না। কোনো কোনো কাল আসে যখন আপাত উন্নতি ও বৈভবের নিচে মনুষ্যত্বের কঙ্কাল তৈরি হতে থাকে। সেটা সময়মত বোঝা যায় না, বাহ্য চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত মানুষ বিবেকের হাহাকার ও কাতরোক্তি শুনতে পায় না।
বিবেক হারালে ধনী হোক, জ্ঞানী হোক, সে তো আর মানুষ থাকে না। জাতিও কি তবে মানুষের জাতি থাকে?

***

Saturday, July 2, 2016

ইইউ নিয়ে গণভোটের পূর্বাপর



আবুল মোমেন

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মূল কুশীলব এবং মূল রঙ্গমঞ্চ ছিল ইউরোপ। যুদ্ধের পুরো ধকল গেছে তাদের ওপর দিয়ে - ল-ন-বার্লিন-লেনিনগ্রাদের (বর্তমানে পুনরায় সেন্ট পিটার্সবার্গ) মত শহরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ইউরোপে লোকক্ষয় হয়েছিল ছয় কোটি, শুধু তাদের বিপ্লবের সূতিকাগার লেনিনগ্রাদ রক্ষা করতেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের এক কোটি মানুষ প্রাণ দিয়েছিল।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকেই ইউরোপ আবার জেগে উঠেছে যদিও যুদ্ধে জয়ী মিত্রশক্তির চার দেশের তিনটি, ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়া ইউরোপেই অবস্থিত। কিন্তু বিজয়ী হলেও তাদেরও ক্ষয়ক্ষতি পরাজিত অক্ষশক্তির প্রধান দুই দেশ জার্মেনি ও ইতালির চেয়ে কম হয় নি। ফলে যুদ্ধোত্তর ইউরোপ জুড়ে ভবিষ্যতে যে কোনো যুদ্ধকে এড়ানোর এবং শান্তিকালকে দীর্ঘায়িত, এমনকি স্থায়ী করার মনোভাব জোরদার হয়ে উঠেছিল। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে মিত্রশক্তির সবচেয়ে ধনবান এবং যুদ্ধে প্রায় অক্ষত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন নেতৃত্ব দিচ্ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-বিরোধী ¯œায়ুযুদ্ধের। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ছিল মূলত  স্নায়ুযুদ্ধের কাল। এ সময় মার্কিন-সোভিয়েত পরস্পর রণসজ্জা যেমন বেড়েছে তেমনি লোক দেখানো দাঁতাত বা সমরাস্ত্র সম্বরণের আলোচনা ও চুক্তিও হয়েছে একাধিক।
আবার এসবের মধ্যেই শান্তির পক্ষে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক কাজও হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থনে গড়ে উঠেছিল বিশ্বশান্তি পরিষদ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনেও তাদের জোর সমর্থন ছিল। অন্যদিকে ক্রমে জার্মেনি-ফ্রান্সে সমাজতন্ত্রীরা শক্তি সঞ্চয় করেছে, জার্মেনিতে গ্রিন পার্টি জোরদার হয়ে শান্তির পক্ষে বাস্তব কাজে হাত লাগানো শুরু করে। যুদ্ধপরবর্তীকালে স্ক্যাণ্ডিনেভীয় দেশগুলোতে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা জোরদার হতে থাকে এবং ইউরোপে শান্তি স্থাপনে তা সহায়ক হয়।
১৯৫৭ সনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গোড়াপত্তন হয় ইউরোপীয় ঐক্যের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মূলত ফ্রান্স-জর্মন উদ্যোগের ভিত্তিতে। এই ছোট পদক্ষেপে প্রাথমিকভাবে পশ্চিম ইউরোপের ছয়দেশ ফ্রান্স, জার্মেনি, ইটালি, হল্যা-, লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়াম  মিলে  ইউরোপীয় অর্থনৈতিক বাজার (ই ই এম) চালু করে ১৯৭৩ সনে। এটি পরে ইউরোপীয় সাধারণ বাজার বা ইউরোপিয়ান কমন মার্কেট (ইসিএম) নামে পরিচিত হয়। এর পরিসর বাড়ানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে ইউরোপের অন্যতম বড় অর্থনীতি ও শক্তিধর দেশ ব্রিটেনকে এর অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে উদ্যোক্তাদের দিক থেকে জোর প্রয়াস চলতে থাকে। ব্রিটেনের যোগদান সহজ হয় নি, তাদের কিছু নেতার বহু বছরের প্রয়াসের ফল এটি। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনসহ ইইউর সংখ্যা হয়েছিল ২৮। ব্রিটেনের গণভোটের পরে একটি কমে তা       হবে ২৭।
ব্রিটেনবাসী এবং সে দেশের বড় দুই দল টোরি ও লেবার পার্টি প্রথম থেকেই এ বিষয়ে ছিল দ্বিধান্বিত। ১৯৭৩ সনে, আজকের মতই, রক্ষণশীল টোরি দলের উদারপন্থী প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইইসিতে যোগ দেন। পরের বছর ক্ষমতায় এসে লেবার দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন পূর্বসুরীর প্রতিশ্রতি রক্ষা করতে গণভোটের ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং ফলাফল অর্থাৎ রায় এসেছিল ইসিএমে যোগ দেওয়ার পক্ষে, তাও পক্ষে ভোট পড়েছিল ৬৭ শতাংশ। বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ায় লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের পক্ষে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন কঠিন হয় নি।
তবে ব্রিটেনবাসী এবং তাদের রাজনৈতিক দলগুলো কখনো এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে একপক্ষে আসতে পারে নি। দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিলই। এর বড় কারণ ব্রিটেনবাসী ঐতিহ্যগতভাবে নিজেদের ইউরোপের মূল ভূখ-ের অংশ ভাবে নি। সপ্তদশ শতাব্দীতে ওয়েস্টফালিয়ার চুক্তি হওয়ার পরে ইউরোপীয় দেশগুলোর নৌবাণিজ্যের অধিকার পারস্পরিক সমঝোতায় যখন প্রসারিত হল তখন ব্রিটেন শ্রেয়তর নৌশক্তির জোরে নিজের অগ্রবর্তিতা ধরে রেখেছিল। নৌশক্তি ও সামরিক শক্তির জোরে  তাদের বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো বিশ্বের নানা প্রান্তে বাণিজ্যের পাশাপাশি নিজস্ব উপনিবেশ স্থাপনে ও উপনিবেশ থেকে লুণ্ঠনে ইউরোপের অন্য দেশগুলোকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল। ফলে দেখা যায় রেনেসাঁস ও এনলাইটেনমেন্ট মূলত পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ জুড়ে হলেও ইউরোপে প্রথম শিল্প বিপ্লব হয়েছে ইংল্যাণ্ড। কারণ এর জন্যে প্রয়োজন পুঁজি, কাঁচামাল এবং শস্তা শ্রমিকের প্রাচুর্য ও অব্যাহত সরবরাহ। তা তারা পেয়েছিল নতুন উপনিবেশগুলো থেকে এবং অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় দেশের চেয়ে যা ছিল পরিমাণে বিপুল ।
সেই থেকে ব্রিটেনবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত আভিজাত্যের গরিমা বা উচ্চম্মন্যতার রেশ বয়োজ্যেষ্ঠদের মন থেকে এখনও কাটে নি। এক ইউরোপের ধারণায় তাদের সেই ভাবাবেগে চোট লেগেছিল। তা পরিষ্কার বোঝা যায় গণভোটের ফলাফলে - যেখানে তরুণদের ৭৫ শতাংশ ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে সেখানে ৬৫ বছরের উর্দ্ধে মানুষের ভোট পক্ষে পড়েছে মাত্র ৩৮ ভাগ।
এদিকে সত্তরের দশক থেকে ইউরোপে শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে জার্মেনি। সেই সূত্রে ইউরোপের ভরকেন্দ্র ল-ন ছেড়ে ক্রমে বন ও বর্তমানে বার্লিনে থিতু হয়েছে। বর্তমান ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের প্রধান নেতা নিশ্চিতভাবেই জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। এটা ব্রিটেনের প্রবীণ নাগরিকদের জন্যে স্বস্তির বিষয় ছিল না। তারাই এক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার ফাঁদে পা দিয়েছেন এবং ২৩ জুনকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণায় আগ্রহী হয়েছেন। তবে এটাও মনে রাখতে হবে ১৯৯০ এ সমাজতন্ত্রের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনৈতিক বিপর্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এ সময় এসব দেশের বহু মানুষ উন্নত পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে থাকে, যাদের একটি বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছে ব্রিটেনে। এই শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের নিয়েও ব্রিটেনবাসী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তাদের অর্থনীতি এমনিতেই চাপে আছে, এতে আরও চাপ তৈরি হচ্ছে, নাগরিকদের ওপর করের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে, দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের ব্যয়ও বাড়তির দিকে। সবচেয়ে বড় কথা স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতের অনেক ভর্তুকি কমে যাচ্ছিল অথবা উঠিয়ে নেয়া হচ্ছিল। এসবকে কাজে লাগিয়েছে ব্রেক্সিট বা ব্রিটেনের ইইউ থেকে এক্সিট বা বেরিয়ে আসার পক্ষপাতীরা। তারা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে অত্যন্ত বাড়াবাড়ি রকমের উগ্র জাতীয়তাবাদের আশ্রয় নিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর রঙ চড়িয়ে ইইউর নেতিকরণ করেছে। তাতে এর সম্ভাব্য পরিণাম নিয়ে ভাবার কোনো সময় পায় নি অনেক মানুষ। বিপরীতে ইইউর পক্ষের বা ব্রেক্সিট বিরোধীরাও প্রতিপক্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে এর পরিণতি কতটা ভয়ানক হতে পারে তার ওপর জোর দিয়েছে। যেন উভয় পক্ষ বিপরীত দিক থেকে মানুষকে ভয় দেখানোর পথ ধরেছিল। মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনার ওপর আস্থা রেখে একটু বড় পরিসরে দীর্ঘমেয়াদী ভাবনার পথ খুলতে পারে নি কোনো পক্ষই। তাতে মানুষ বুঝে-শুনে ভেবে-চিন্তে যেন ভোট দিতে পারে নি। মানুষের এই দোদুল্যমান মনের অবস্থা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ভোটের পরেই। এর মধ্যে পুনরায় গণভোটের আয়োজনের পক্ষে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ৩০ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে এক লক্ষ মানুষের মতামত পেলেই তা মানার ঐতিহ্য রয়েছে ব্রিটেনের। অনেকেই ব্রেক্সিট-পরবর্তী তাৎক্ষণিক বাস্তব প্রতিক্রিয়ার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব দেখে এখন আফসোস করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন সম্ভবত তাঁর দুই মহান পূর্বসুরী হিথ ও উইলসনের মত বিজয়ী হয়ে ইতিহাসে অমর হওয়ার সুযোগ হারিয়ে নিজের পরাজয়কেই মহিমান্বিত করতে চাইছেন। গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধে তুলে ধরে তিনি পরাজয়ের দায় কাঁদে নিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন এবং দ্বিতীয়ত, গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার জন্যে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এবারের গণভোটের ফলাফল ১৯৭৩ এর মত হয় নি। জাতি স্পষ্ট রায় দেয় নি - ৫২ ও ৪৮ শতাংশের ব্যবধান জাতির বিভক্তিকেই প্রকাশ করে যা ১৯৭৫ এ ছিল ৬৭ ও ৩৩ শতাংশ। এবারের ফলাফলে ল-ন ও ইংল্যা-ের জনমতের সাথে যুক্তরাজ্যভুক্ত ওয়েলসের জনমতের মিল থাকলেও স্কটল্যা- ও উত্তর আয়ারল্যা-বাসীর মতামতের মিল ঘটে নি। এ দুটি রাজ্যেই শক্তিশালী গ্রুপ এবং জনমত রয়েছে যথাক্রমে স্বাধীনতা ও মূল আয়ারল্যাণ্ডের সাথে একীভূত হওয়ার পক্ষে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন দুই অঞ্চলেই সেই প্রবণতা এখন বাড়বে। স্কটিশ প্রথম মন্ত্রী স্টারজিয়ন তো বলেই দিয়েছেন স্কটল্যাণ্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আরেকটি গণভোটের দাবি উত্থাপিত হয়েই থাকল। উত্তর আয়ারল্যণ্ডও স্বাধীনতা ও অন্তর্ভুক্তির কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এমনকি এই গণভোটের রেশ ধরে ইউরোপের অন্যান্য দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে যা পরিণামে ইইউ থেকে আরও কিছু দেশের বেরিয়ে যাওয়ার বাস্তবতা তৈরি করবে। ইউরোপ জুড়ে অভিবাসীদের জন্যে বিরূপ বাস্তবতাও তৈরি হবে ভবিষ্যতে।
তবে তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে যদি সত্যিই যুক্তরাজ্যের পরিণতি অঙ্গহানির দিকে গড়ায় তাহলে ব্রিটেনের কি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদ থাকবে বা থাকা উচিৎ? বিশ্বের ধনী দেশের ক্লাব জি-৭ এর সদস্য পদেও কী কোনো পরিবর্তন হবে? এসব কিছুই হয়ত এক্ষুণি ঘটবে না, কিন্তু ব্রিটেনের অর্থনৈতিক শক্তি, ভূরাজনৈতিক প্রভাব ইউরোপে এবং এর ফলাফল হিসেবে বিশ্বে কমতে পারে। ব্রিটিশ অর্থনীতি এই ধাক্কা সামলে উঠতে যত সময় নেবে ততই নেতিবাচক ফলাফলগুলো ত্বরান্বিত হবে। ব্রিটেনের বড় দুই দলের অভ্যন্তরেই ঝড় বইছে, যা প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে বিরোধী লেবার পার্টিতে।
এর মধ্যে লেবার দলের এমপি টিউলিপ সিদ্দিকি ঠিকই বলেছেন, এখন গণভোটকে কেন্দ্র করে জাতির মধ্যে সৃষ্ট বিভাজন ও তিক্ততা সারানোর কাজেই ব্রিটেনবাসীকে মন দিতে হবে। কারণ ব্রিটেনের নিজের স্বার্থ ছাড়াও বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থার স্বার্থে ব্রিটেনকে প্রভাবশালী অবস্থান ও ভূমিকা বজায় রাখতে হবে।
***

Monday, April 25, 2016

শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা দশকের ঘোষণা চাই

আবুল মোমেন

প্রাথমিকে ভর্তির হার প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে - নানা পরিসংখ্যান বলছে তা ৯৭-৯৮ ভাগ হবে। তবে প্রাথমিকের শেষ পর্যায়ে পৌঁছুতে পৌঁছুতে ২০ ভাগের মত ছাত্রের ঝরে-পড়া উদ্বেগজনকই বলতে হবে। স্কুলের দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব ছাত্রই বছরের প্রথম দিন বিনামূল্যে বই পাচ্ছে। মেয়েদের জন্যে বিশেষ সুবিধাগুলো তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে। নি:সন্দেহে এ এক বিরাট অগ্রগতি। শিক্ষামন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলেই এর জন্যে ধন্যবাদার্হ।
এখন আমাদের করণীয় হল শিক্ষার মান বাড়ানো এবং ঝরে পড়ার হার কমিয়ে আনা। সরকারি জরিপেই দেখা যাচ্ছে প্রাথমিকে অর্জনলক্ষ্য পূরণের হার বেশ হতাশাজনক, কারণ এ পর্যায়ে আদতে সকলেরই প্রায় সমমাত্রায় অগ্রগতি হওয়া দরকার। তবে আশার কথা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সচেতন। এর জন্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নানা রকম ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করেছেন। এই সূত্রে দু’একটি ভাবনা সংশ্লিষ্টদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই।
আমাদের স্কুলশিক্ষা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই বস্তুত মুখস্থবিদ্যার কারবার। এটা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আদায়ে কার্যকর বলে প্রমাণিতও হয়েছে। ইদানীংকালে, বিশেষত গত দুই দশকে, সম্পূর্ণ স্কুলশিক্ষাই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আমাদের দেশে বরাবর প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকায় তাদের প্রয়োজনে গৃহশিক্ষক, বাড়তি কোচিং এবং নোটবইয়ের প্রচলন হয়েছে। ক্রমে এটা স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে। আর একালে পরীক্ষার ফলাফলই শিক্ষাজীবনের সাফল্যের একমাত্র মানদ- হয়ে দাঁড়ানোয় এ নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে স্কুল-বহির্ভূত উৎস থেকে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক পাঠগ্রহণের এক বিশাল বাণিজ্যের পথ খুলে গেছে। অনিশ্চিত ফলাফলকে সন্তানের জন্যে নিশ্চিত করতে সম্পন্ন অভিভাবকরা বড় অঙ্কে প্রয়োজনাতিরিক্ত বিনিয়োগে পিছপা হচ্ছেন না। শিক্ষার এই পণ্যায়নের সুবিধা অন্যান্যরাও নিচ্ছেন - শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক তো বটেই এমনকি প্রশ্নকর্তা, মডারেটর বা মুদ্রাকর, পরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রশাসক বা ক্ষুদে কর্মী কেউই বাদ যায় নি।
আজকে কোনো ছাত্রই বলতে পারবে না যে কোন স্কুল ও বাড়িতে পড়েই তারা পরীক্ষা দিয়ে থাকে। যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের গোড়া থেকেই পরীক্ষার্থীতে রূপান্তর করে নেয় তার অংশীদার থেকে সফল হয়ে কোচিং-গাইডবই-নোটবই সংস্কৃতির বাইরে থাকার উপায় নেই বা সাহস কেউ দেখাতে যায় না। একইভাবে বলা যায় এমন কোনো সফল স্কুল-শিক্ষক মেলা কঠিন হবে যিনি কোচিং বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট নন। আজকে পাব্লিক পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফলাফলের জন্যে দেশের বিখ্যাত বেসরকারি স্কুলে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সেখানে পড়াশুনা মানে নানামাত্রিক পরীক্ষা - শ্রেণিপরীক্ষা, বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা, সাময়িক পরীক্ষা, সাপ্তাহিক পরীক্ষা, ত্রৈমাসিক পরীক্ষা, ষান্মাসিক পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। কোচিং সেন্টারেও চলে নিরন্তর মডেল টেস্ট। অর্থাৎ এভাবে ছাত্রদের পরীক্ষায় দক্ষ করে তোলা হয়। আর ঐতিহ্যবাহী সব সরকারি স্কুলে খোঁজ নিলে দেখা যাবে স্কুলে পঠনপাঠন নেই, কক্ষের এবং আসবাবের অপ্রতুলতার পাশাপাশি একজন শিক্ষকের অনুপাতে শ্রেণিতে ছাত্রসংখ্যাও অনেক বেশি বলে যথাযথভাবে পড়ানোর উপায়ও নেই। তাছাড়া সবাই জানে পড়াশুনা হবে কোচিং সেন্টারে। ফলে স্কুলে পড়াশুনা তো বাহুল্য। বেসরকারি স্কুল ছাত্র উপস্থিতিসহ শৃঙ্খলা ঠিক রাখে মূলত ছাত্রদের ওপর নানা রকম পরীক্ষার প্রবল চাপ চাপিয়ে দিয়ে। এভাবে কোচিং, গাইড ও নোটবই এবং পরীক্ষার নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার মধ্যে আমাদের শিক্ষা বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই শিক্ষার লক্ষ্য ছিল সংকীর্ণ - অল্পবিস্তর লেখাপড়া জানা, কিন্তু জ্ঞানের শক্তি এতই যে তারই ফাঁক গলে বিদ্যাসাগরসহ অনেক জ্ঞানীগুণী আমরা পেয়েছি। দুর্ভাগ্য এখন লক্ষ্য আরও সংকীর্ণ - কেবল ডিগ্রি, জিপিএ-৫ অর্জন, জ্ঞানচর্চার সাথে কোনো সংযোগ নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং-গাইড-নোটবইয়ের ত্র্যহস্পর্শ দূর করার জন্যে আন্তরিকভাবেই তৎপর হয়েছেন বলে মনে করি। কোচিং নোটবই ও গাইড বইয়ের বাণিজ্য বন্ধ করার জন্যে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন সরকার। শুধু বলব, অতীতেও এ নিয়ে কঠোর শাস্তির বিধানসহ আইন ছিল, হয়ত তা এখনও বলবৎ রয়েছে, কিন্তু এটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই আমাদের স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণভাবে কোচিং-নোট-গাইড বাণিজ্যের হাতে জিম্মি হয়ে গেছে। আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে হয়ত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে কিন্তু তাতে আমাদের মূল লক্ষ্য মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রচলন নিশ্চিত করা যাবে না। বরং শিক্ষার সংকীর্ণ লক্ষ্য বহাল থাকলে আইনকে ফাঁকি দিয়ে, আইন প্রয়োগকারীদের আয়ত্বে এনে তলে তলে অব্যবস্থা চলতে থাকবে। তাই বলব, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নের কাজ এবং স্কুল ও পাঠ্যবই ভিন্ন অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। এও মনে রাখতে হবে আমাদেরই ঔদাসীন্যে ও সমায়েচিত পদক্ষেপের অভাবে এই অব্যবস্থা আজ শিক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ধারণা, পরিস্থতি ও বাস্তবতা ভালোভাবে অনুধাবন করেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত কুড়ি বছরের মধ্যে এসএসসি পাশ করা এমন কোনো মেধাবী ছাত্রছাত্রী পাওয়া যাবে না যারা এক বা একাধিক কোচিং-এ যায় নি, এক বা একাধিক নোট-গাইডবই ব্যবহার করে নি, এদের মধ্যে খুবই দুষ্প্রাপ্য হবে কোনো ছাত্রছাত্রী পাওয়া যারা নিজেরা নিজের নোট তৈরি করেছে। এই সূত্রে প্রায় ঢালাওভাবে বলা যায় সব অভিভাবক, শিক্ষকও কোনো-না-কোনোভাবে এতে অংশ নিয়েছেন; তাঁরা এর সুবিধাভোগী। ফলে আজ এটা একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটি যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয় তা বোঝা যায় যখন দেখি এদেশে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কদর নেই, সাধারণভাবে প্রয়োজনও নেই, এমনকি সমাজের ক্ষমতাবান উচ্চমহলের কাছে স্বাধীন বুদ্ধিজীবী তথা সুশীলসমাজ উপহাসের পাত্র হন। বিশুদ্ধ জ্ঞান ও সে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে সমাজের অবজ্ঞা অস্পষ্ট নয়। এই মনোভাবের প্রভাব পড়েছে সমাজের সর্বমহলে, উচ্চশিক্ষার স্তরেও। সেখানেও ছাত্ররা কেবল আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর শেখে, টেক্সট বই পড়ে না, এমনকি সাহিত্যও নয়। আর মুষ্টিমেয় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া উচ্চশিক্ষার অধ্যাপকরা ছাত্রজীবনের পরে পড়াশুনার পাঠ সম্পূর্ণ চুকিয়ে দিয়েছেন। যারা সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় আছেন, যেমন সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক তাঁদের মধ্যে আজ আর নানা বিষয়ে জ্ঞানাহরণের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না।
তাহলে আমরা যে কথায় কথায় বলি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলব সেটা কীভাবে হবে? জ্ঞানের প্রতি পিঠ ফিরিয়ে সেটা কি সম্ভব?
আমার মনে হয় শিক্ষা ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে পারলে ব্যত্যয়গুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে। কারণ ত্র্যহস্পর্শের দুষ্টচক্র আজ শিক্ষার বিকল্প এবং প্রধান নিয়ন্তা হয়ে উঠলেও তা বস্তুত আমাদের অব্যবস্থারই উপজাত, অনেকসময় প্রতিক্রিয়াজাত। তাই সঠিক অবস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ। কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তা বিস্তারিত বলার জায়গা পত্রিকার কলাম নয়। তবে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া যায়।
২০১৬-২০২৫ এই দশ বছরকে শিক্ষাদশক ঘোষণা এবং শিক্ষাকে এ সময় জাতীয় অগ্রাধিকার খাত গণ্য করা যায়। বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এর জন্যে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এক দশকের উপযুক্ত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। প্রথম পাঁচ বছরের লক্ষ্য হবে  প্রাথমিক শিক্ষাকে ঠিক করা। প্রথমে একে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষকসহ জনবল, পাঠাগার ও মাঠসহ অন্যান্য সুবিধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজের বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গদের - যেমন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, উৎসাহী পেশাজীবী, সংস্কৃতি সংগঠক প্রমুখকে - স্ব স্ব এলাকার স্কুল তদারকিতে যুক্ত করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে কেবল প্রশ্নের উত্তর শিখে কেউ শিক্ষিত হয় না, এমনকি শুধু পাঠ্যবইমাত্র পড়েও শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যাবে না। জ্ঞানের পরিধি আরও ব্যাপ্ত, গভীর হতে হবে যাতে শিক্ষিত ব্যক্তির ভাবনা-চিন্তার ক্ষমতা তীক্ষ্মতা পায়, কার্যকর হয়। আবার কেবল বইপড়েও মনের সব দরজা খোলে না, আরও সব উপচার যোগ করা চাই - সুর, অভিনয়, আবৃত্তি, সৃজনশীল রচনা, খেলাধূল ইত্যাদি। এসব বিষয় এক মানুষকে তার দেশ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে সংযুক্ত করে দেশপ্রেম খাঁটি হয়, সাংস্কৃতিক বোধ সঠিক হয়। সবার জন্যে  অংশগ্রহণের সুযোগ ও পরিবেশ থাকতে হবে। দশকের পরবর্তী পাঁচ বছরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে হবে একইভাবে। 
এভাবে যদি আমরা মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিশু ও তরুণকে মানসম্পন্ন উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি তবেই আমাদের মূল যে সম্পদ মানুষ - তা সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদে রূপান্তরিত হবে। বিদেশের বাজারেও আমাদের মানুষের দাম বাড়বে। 
শিক্ষা নিয়ে আজকাল সকলেই ভাবছেন, বিশেষত ভালো শিক্ষার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এটা আশার কথা। তবে সেই সাথে এও বলব, শিক্ষা নিয়ে এদেশে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আসছে। অধিকাংশ সময় তা ভালো ফল দেয় নি। আমরা দেখছি, শিশু এবং শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষ যোগবিহীন, অভিজ্ঞতাহীন নানা বিশেষজ্ঞ নানাভাবে নীতিনির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করেন। তাতে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক উদ্ভট ঘটনা ঘটছে। ছাত্ররা এতে ভুগছে, জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, প্রাথমিক শিক্ষাই ভবিষ্যতের মানুষটির ভিত্তি তৈরি করবে, ফলে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে ধীরে ধীরে এগুনোই ভালো।
***

Monday, March 28, 2016

সবার জন্যে স্বাধীনতা

আবুল মোমেন

১.
বাংলাদেদেশের অনিবার্যতা পাকিস্তানের ভ্রান্তির মধ্যেই নিহিত ছিল। দুই প্রদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব একটি বড় কারণ নিশ্চয়। তবে মূল কারণ জিন্নাহসহ শাসকশ্রেণির পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদশের্র ধারণার মধ্যে নিহিত। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদর্শ নির্মিত হবে ভারতবিরোধী প্রত্যয় থেকে। পাকিস্তান বনাম ভারত এই বৈপরীত্যের রূপ দিতে গিয়ে পাকিস্তান এমন সব বিপরীত-জোটক তৈরি করেছে যার প্রণোদনা হল বিদ্বেষ ও বৈরিতা। যেমন - পাকিস্তানের বিপরীত দেশ ভারত, মুসলমানের বিপরীত জাতি হিন্দু, মুসলমানদের ভাষা উর্দু আর হিন্দি ও বাংলা হল হিন্দুর ভাষা, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি নজরুল তাঁর বিপরীতে মুসলিম কবি। এভাবে পাকিস্তান-ভারত, হিন্দু-মুসলমান, উর্দু-বাংলা, রবীন্দ্র-নজরুল বৈপরিত্বের ধারণার মধ্যে একদিকে সমকক্ষতার জেদ তো অন্যদিকে পারস্পরিক বৈরিতার ইন্ধন কাজ করে। এটি হীনম্মন্য মনোভাবের প্রকাশও বটে। মানুষের নানান আবেগের মধ্যে ধর্মভিত্তিক আবেগ সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং একই কারণে সহজেই তা অন্ধ শক্তিতে রূপ নিতে পারে। পাকিস্তান দেশ ও জাতির যে সাংস্কৃতিক পরিচয় দাঁড় করাতে চেয়েছিল তার ভিত্তিতে প্রতিপক্ষের নেতিকরণ ও তার প্রতি সার্বিক বৈরিতার প্রকাশ ঘটেছিল, কোনো গঠনমূলক ইতিবাচক দর্শন কাজ করে নি। এমন দর্শনহীন ঋণাত্মক আদর্শের বিকাশ ঘটে না, তার ভিত্তিতে জাতিগঠন, দেশগঠন অসম্ভব, পাকিস্তানের বাংলাদেশ-বিপর্যয় বা সত্তর বছর ধরে চলমান অব্যবস্থার কারণ এটিই।
বাঙালির পক্ষে এর মধ্যে বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল না, যেমন পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। বাঙালির ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল শক্তিশালী। ব্রিটিশ আমল থেকে এ ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় এর ভিত্তি ছিল দৃঢ়, বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক। তার ওপর বাংলা ভাষায় দ্রুত অত্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হওয়ায় এবং সেই সাহিত্য মাতৃভূমির বন্দনায়, স্বাধীনতার উদ্দীপনায় বরাবর অত্যন্ত মানসম্পন্ন ও কার্যকর রসদ জুগিয়ে গেছে যার আবেদন আজও সমানভাবে বজায় রয়েছে। ফলে বাঙালির ওপর পাকিস্তানের উর্দুভাষা কিংবা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা চাপিয়ে দেওয়া এবং একতরফা অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আর তারই ফলে মুক্তিযুদ্ধ যেমন তেমনি স্বাধীনতাও হয়ে পড়েছিল অনিবার্য।
২.
পাকিস্তানে পাঞ্জাবি মুসলমানের একাধিপত্য বজায় ছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে মূল্যায়ন করতে বসে মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে যেন তারই অনুকরণে বাঙালি মুসলমানের একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। এইখানে আমাদের পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শে পরাভব ঘটে। ১৯৪৭ এ যখন দেশভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয় তখন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭১ সনে স্বাধীনতার সময় তা ছিল ২২ ভাগের মত। আর বাংলাদেশের বিগত ৪৫ বছরের ইতিহাসে দেশের হিন্দু জনসংখ্যা কমে মাত্র ৯ ভাগে এসে দাঁড়িয়েছে। কেন হিন্দুরা দেশ ছাড়ছে এ নিয়ে প্রতিবেশী মুসলমান যথেষ্ট সচেতন নয়, বরং অধিকাংশের ধারণা বিভ্রান্তিকর। তারা এর মধ্যে এক ধরনের ভারতপ্রীতির হিন্দু মানসিকতাকেই কেবল দেখতে পায়। তার অস্তিত্ব হয়ত আছে, কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাই এই মনোভাব তৈরিতে ও তা জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে। ১৯৬৫-র শত্রুসম্পত্তি আইনের অভিশাপ কেন স্বাধীন দেশেও বয়ে বেড়াতে হবে - এর জবাব স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি দেয় নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও দেয় নি। আমরা সংখ্যালঘুর সম্পত্তির জবর দখলের নানা চিত্র উত্তরোত্তর বাড়তে দেখছি। সংখ্যালঘু এদেশে স্বস্তিতে বসবাস করতে পারছে কিনা সেটা যতক্ষণ না সংখ্যাগুরুর বিবেচ্য বিষয় হবে ততক্ষণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আর তা ঘটে নি বলে বাংলাদেশের মুসলমানের জন্যে একাত্তরের স্বাধীনতা যে সুফল এনেছে তা দেশের সবধরনের সংখ্যালঘুর জন্যে সেই মানে আনে নি। এটি আমাদের ব্যর্থতা, যা দ্রুত শোধরানো দরকার।
দেশে যেসব আদিবাসী সংখ্যালঘু আছেন - প্রায় ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদের পক্ষে ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা তো কঠিন বটেই, কিন্তু ভিটেমাটি, জমি ও স্থাবর সম্পত্তিও রক্ষা  করা তো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাদের এমন মনে হওয়ার উপলক্ষ বারবার তৈরি হয়েছে যে তারা জাতিপরিচয়ের কারণে এদেশে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন খবর বেরুচ্ছে।
এই বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। একই সাথে আমরা অস্বীকার করব না, গত কিছুকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, দারিদ্রবিমোচন ইত্যাদিতে উন্নয়ন বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকাও প্রশংসনীয়। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতগুলো, বিশেষত অভিবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স এবং তৈরি পোশাক খাতের আয় টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কেবল কৃষির ভিত্তি অনেকটা মজবুত হয়েছে। তৈরি পোশাক ও অভিবাসী এই খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশের জীবন এখনও আয় ও অধিকারের দিক থেকে মানবেতরই রয়ে গেছে। তাদের দক্ষতা, আয়বৃদ্ধি ও জীবনমান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ আমরা নিতে পারি নি।
৩.
জাতিসঙ্ঘ আগামী ২০৩০ সনে অর্জনের জন্যে যে ১৭টি খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে তা অর্জন আমাদের জন্যে সত্যিই কঠিন হবে কেননা এটি আর পরিমাণগত উন্নয়নের বিষয় থাকছে না, এবারে গুণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে হবে। গুণ ও মান সাধারণত সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অবস্থার, কাজের ও ফলাফলের বিচারে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, বোঝা যায়।
আমরা সবসময় দ্রুত সাফল্য চেয়েছি। জাতিগতভাবে আমরা লম্বা দৌড়ের জন্যে মানসিক-শারীরিক কোনোভাবেই তৈরি নই। বাস্তবতা বলে মুক্তিযুদ্ধ নয়মাসের বেশি স্থায়ী হলে, ধরা যাক যদি তা কয়েক বছর গড়াত, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির ঐক্য ধরে রাখা যেত না। কেননা আমাদের সেই প্রস্তুতি ছিল না। স্বাধীনতা কীভাবে কখন হত বলা মুশকিল।
গণতন্ত্র সকল নাগরিকের জন্যে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে চাই দুটি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন - সর্বস্তরে যথার্থ মানসম্পন্ন শিক্ষায় উন্নত নাগরিক এবং দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রয়োজন তা সরকারে  জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতার ব্যবস্থাধীন করা। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো কাজই শুরু করি নি। আমজনগণের এতে কোনো আপত্তি নেই, বস্তুত এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তবে এর ফলাফল পেলে এতে তাদের নিশ্চয় আগ্রহ থাকবে। কিন্তু যারা ক্ষমতাসীন এবং যারা ক্ষমতাকে ঘিরে শাসকশ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছেন তারা এমন ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তরিক নন। বড় দুই দলে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে বলে মনে হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্যে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও নাগরিকসমাজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মত যথেষ্ট শক্তি অর্জন করে নি। সঠিক শিক্ষার অভাবে তাদের নৈতিক দুর্বলতাই এক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে। তার ওপর আরেক দুর্ভাগ্যের বিষয় হল বাংলাদেশের উপযোগী দল হয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে ছাড়বে কিনা তা অস্পষ্ট, খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাদের আওয়ামী লীগ বিরোধিতা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার মূলধারার বিপরীতে অবস্থান নেয়, উল্টো বহুলাংশে পাকিস্তানের সঙ্গেই মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ তো বিভ্রান্ত হবেই। আর এর ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে এক ধরনের একচ্ছত্র ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে গণতন্ত্রের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তো অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ - সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
সরকার বিএনপি-জামায়াতকে রীতিমত পুলিশি (র‌্যাবসহ) ব্যবস্থায় দমন করলেও ব্যাপক কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন হয় না,  কারণ তাদের আদর্শিক অবস্থানের অস্পষ্টতা, কিংবা বলা যায় ভ্রান্তি।
আমাদের শেষ ভরসা মানুষ। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে সামনেই এগুতে চায়, তরুণসমাজ সব বাধা ঠেলে এগিয়েই যাবে। আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে? ধর্মবর্ণ বৈষম্যহীন আইনের শাসনের? গণতন্ত্রের? এসবও যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে যাচ্ছে? এটাই আমাদের আজ বড় দুর্বলতা, দুর্ভাবনার বিষয়।


***