Monday, March 28, 2016

সবার জন্যে স্বাধীনতা

আবুল মোমেন

১.
বাংলাদেদেশের অনিবার্যতা পাকিস্তানের ভ্রান্তির মধ্যেই নিহিত ছিল। দুই প্রদেশের ভৌগোলিক দূরত্ব একটি বড় কারণ নিশ্চয়। তবে মূল কারণ জিন্নাহসহ শাসকশ্রেণির পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদশের্র ধারণার মধ্যে নিহিত। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদর্শ নির্মিত হবে ভারতবিরোধী প্রত্যয় থেকে। পাকিস্তান বনাম ভারত এই বৈপরীত্যের রূপ দিতে গিয়ে পাকিস্তান এমন সব বিপরীত-জোটক তৈরি করেছে যার প্রণোদনা হল বিদ্বেষ ও বৈরিতা। যেমন - পাকিস্তানের বিপরীত দেশ ভারত, মুসলমানের বিপরীত জাতি হিন্দু, মুসলমানদের ভাষা উর্দু আর হিন্দি ও বাংলা হল হিন্দুর ভাষা, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু কবি নজরুল তাঁর বিপরীতে মুসলিম কবি। এভাবে পাকিস্তান-ভারত, হিন্দু-মুসলমান, উর্দু-বাংলা, রবীন্দ্র-নজরুল বৈপরিত্বের ধারণার মধ্যে একদিকে সমকক্ষতার জেদ তো অন্যদিকে পারস্পরিক বৈরিতার ইন্ধন কাজ করে। এটি হীনম্মন্য মনোভাবের প্রকাশও বটে। মানুষের নানান আবেগের মধ্যে ধর্মভিত্তিক আবেগ সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং একই কারণে সহজেই তা অন্ধ শক্তিতে রূপ নিতে পারে। পাকিস্তান দেশ ও জাতির যে সাংস্কৃতিক পরিচয় দাঁড় করাতে চেয়েছিল তার ভিত্তিতে প্রতিপক্ষের নেতিকরণ ও তার প্রতি সার্বিক বৈরিতার প্রকাশ ঘটেছিল, কোনো গঠনমূলক ইতিবাচক দর্শন কাজ করে নি। এমন দর্শনহীন ঋণাত্মক আদর্শের বিকাশ ঘটে না, তার ভিত্তিতে জাতিগঠন, দেশগঠন অসম্ভব, পাকিস্তানের বাংলাদেশ-বিপর্যয় বা সত্তর বছর ধরে চলমান অব্যবস্থার কারণ এটিই।
বাঙালির পক্ষে এর মধ্যে বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল না, যেমন পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। বাঙালির ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল শক্তিশালী। ব্রিটিশ আমল থেকে এ ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় এর ভিত্তি ছিল দৃঢ়, বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক। তার ওপর বাংলা ভাষায় দ্রুত অত্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হওয়ায় এবং সেই সাহিত্য মাতৃভূমির বন্দনায়, স্বাধীনতার উদ্দীপনায় বরাবর অত্যন্ত মানসম্পন্ন ও কার্যকর রসদ জুগিয়ে গেছে যার আবেদন আজও সমানভাবে বজায় রয়েছে। ফলে বাঙালির ওপর পাকিস্তানের উর্দুভাষা কিংবা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা চাপিয়ে দেওয়া এবং একতরফা অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আর তারই ফলে মুক্তিযুদ্ধ যেমন তেমনি স্বাধীনতাও হয়ে পড়েছিল অনিবার্য।
২.
পাকিস্তানে পাঞ্জাবি মুসলমানের একাধিপত্য বজায় ছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে মূল্যায়ন করতে বসে মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে যেন তারই অনুকরণে বাঙালি মুসলমানের একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। এইখানে আমাদের পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শে পরাভব ঘটে। ১৯৪৭ এ যখন দেশভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয় তখন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭১ সনে স্বাধীনতার সময় তা ছিল ২২ ভাগের মত। আর বাংলাদেশের বিগত ৪৫ বছরের ইতিহাসে দেশের হিন্দু জনসংখ্যা কমে মাত্র ৯ ভাগে এসে দাঁড়িয়েছে। কেন হিন্দুরা দেশ ছাড়ছে এ নিয়ে প্রতিবেশী মুসলমান যথেষ্ট সচেতন নয়, বরং অধিকাংশের ধারণা বিভ্রান্তিকর। তারা এর মধ্যে এক ধরনের ভারতপ্রীতির হিন্দু মানসিকতাকেই কেবল দেখতে পায়। তার অস্তিত্ব হয়ত আছে, কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাই এই মনোভাব তৈরিতে ও তা জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে। ১৯৬৫-র শত্রুসম্পত্তি আইনের অভিশাপ কেন স্বাধীন দেশেও বয়ে বেড়াতে হবে - এর জবাব স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি দেয় নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও দেয় নি। আমরা সংখ্যালঘুর সম্পত্তির জবর দখলের নানা চিত্র উত্তরোত্তর বাড়তে দেখছি। সংখ্যালঘু এদেশে স্বস্তিতে বসবাস করতে পারছে কিনা সেটা যতক্ষণ না সংখ্যাগুরুর বিবেচ্য বিষয় হবে ততক্ষণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আর তা ঘটে নি বলে বাংলাদেশের মুসলমানের জন্যে একাত্তরের স্বাধীনতা যে সুফল এনেছে তা দেশের সবধরনের সংখ্যালঘুর জন্যে সেই মানে আনে নি। এটি আমাদের ব্যর্থতা, যা দ্রুত শোধরানো দরকার।
দেশে যেসব আদিবাসী সংখ্যালঘু আছেন - প্রায় ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদের পক্ষে ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা তো কঠিন বটেই, কিন্তু ভিটেমাটি, জমি ও স্থাবর সম্পত্তিও রক্ষা  করা তো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাদের এমন মনে হওয়ার উপলক্ষ বারবার তৈরি হয়েছে যে তারা জাতিপরিচয়ের কারণে এদেশে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন খবর বেরুচ্ছে।
এই বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। একই সাথে আমরা অস্বীকার করব না, গত কিছুকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, দারিদ্রবিমোচন ইত্যাদিতে উন্নয়ন বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকাও প্রশংসনীয়। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতগুলো, বিশেষত অভিবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স এবং তৈরি পোশাক খাতের আয় টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কেবল কৃষির ভিত্তি অনেকটা মজবুত হয়েছে। তৈরি পোশাক ও অভিবাসী এই খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশের জীবন এখনও আয় ও অধিকারের দিক থেকে মানবেতরই রয়ে গেছে। তাদের দক্ষতা, আয়বৃদ্ধি ও জীবনমান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ আমরা নিতে পারি নি।
৩.
জাতিসঙ্ঘ আগামী ২০৩০ সনে অর্জনের জন্যে যে ১৭টি খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে তা অর্জন আমাদের জন্যে সত্যিই কঠিন হবে কেননা এটি আর পরিমাণগত উন্নয়নের বিষয় থাকছে না, এবারে গুণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে হবে। গুণ ও মান সাধারণত সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অবস্থার, কাজের ও ফলাফলের বিচারে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, বোঝা যায়।
আমরা সবসময় দ্রুত সাফল্য চেয়েছি। জাতিগতভাবে আমরা লম্বা দৌড়ের জন্যে মানসিক-শারীরিক কোনোভাবেই তৈরি নই। বাস্তবতা বলে মুক্তিযুদ্ধ নয়মাসের বেশি স্থায়ী হলে, ধরা যাক যদি তা কয়েক বছর গড়াত, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির ঐক্য ধরে রাখা যেত না। কেননা আমাদের সেই প্রস্তুতি ছিল না। স্বাধীনতা কীভাবে কখন হত বলা মুশকিল।
গণতন্ত্র সকল নাগরিকের জন্যে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে চাই দুটি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন - সর্বস্তরে যথার্থ মানসম্পন্ন শিক্ষায় উন্নত নাগরিক এবং দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রয়োজন তা সরকারে  জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতার ব্যবস্থাধীন করা। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো কাজই শুরু করি নি। আমজনগণের এতে কোনো আপত্তি নেই, বস্তুত এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তবে এর ফলাফল পেলে এতে তাদের নিশ্চয় আগ্রহ থাকবে। কিন্তু যারা ক্ষমতাসীন এবং যারা ক্ষমতাকে ঘিরে শাসকশ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছেন তারা এমন ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তরিক নন। বড় দুই দলে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে বলে মনে হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্যে স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও নাগরিকসমাজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মত যথেষ্ট শক্তি অর্জন করে নি। সঠিক শিক্ষার অভাবে তাদের নৈতিক দুর্বলতাই এক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে। তার ওপর আরেক দুর্ভাগ্যের বিষয় হল বাংলাদেশের উপযোগী দল হয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে ছাড়বে কিনা তা অস্পষ্ট, খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাদের আওয়ামী লীগ বিরোধিতা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার মূলধারার বিপরীতে অবস্থান নেয়, উল্টো বহুলাংশে পাকিস্তানের সঙ্গেই মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ তো বিভ্রান্ত হবেই। আর এর ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে এক ধরনের একচ্ছত্র ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে গণতন্ত্রের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তো অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ - সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
সরকার বিএনপি-জামায়াতকে রীতিমত পুলিশি (র‌্যাবসহ) ব্যবস্থায় দমন করলেও ব্যাপক কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন হয় না,  কারণ তাদের আদর্শিক অবস্থানের অস্পষ্টতা, কিংবা বলা যায় ভ্রান্তি।
আমাদের শেষ ভরসা মানুষ। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে সামনেই এগুতে চায়, তরুণসমাজ সব বাধা ঠেলে এগিয়েই যাবে। আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে? ধর্মবর্ণ বৈষম্যহীন আইনের শাসনের? গণতন্ত্রের? এসবও যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে যাচ্ছে? এটাই আমাদের আজ বড় দুর্বলতা, দুর্ভাবনার বিষয়।


***

Sunday, March 13, 2016

দেশের স্বাধীনতা মানুষের মুক্তি

আবুল মোমেন

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও এ যুদ্ধে বিজয় বাঙালি সম্পর্কে প্রচলিত নিন্দার ভালো জবাব হয়েছিল। আমরা বীরত্ব ও ত্যাগের মন্ত্রে সেদিন সত্যিই জেগে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর যেন গোটা জাতিই খেই হারিয়ে ফেললাম। দুটি সামরিক শাসন আমাদের কেবল পিছনের দিকে নিয়ে গেছে। একই ধারা বজায় রাখলেন বেগম জিয়া। বাঙালি হয়ত ফিরল না পুরোনো অভ্যাসে, কিন্তু ব্যাপক মানুষের ইতিহাস জ্ঞান, জাতীয় চেতনার গোলমাল হয়ে গেল। আমরা হয়ে পড়লাম বিভ্রান্ত দিগ্ভ্রান্ত জাতি। 
আমরা জানি, বাঙালি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হল - জাতটা হুজুগে, আবেগপ্রবণ এবং কোমল স্বভাবের। এছাড়াও তার অনেক নিন্দা আছে, তা রবীন্দ্রনাথ সবিস্তারে বলেছেন বিদ্যাসাগর চরিত্রের বিপরীতে বাঙালির বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে। তাঁর মতে বাঙালি প্রচুর কথা বলে কিন্তু সে তুলনায় কাজ করে না, পরের নিন্দায় তুখোড় কিন্তু নিজের ভুল দেখতে পায় না, কোনো কাজ সাড়ম্বরে শুরু করলেও শেষ করে না। অর্থাৎ বাঙালি বাগাড়ম্বরপ্রিয়, অলস, পরশ্রীকাতর, অধৈর্য। প্রথম যে তিনটি ধারণার কথা বলা হল তার শেষেরটি অর্থাৎ কোমল স্বভাব এখন বোধহয় বাঙালিতে দুর্লভ। এমনকি বাঙালি মা সম্পর্কেও এ বিশেষণ প্রয়োগ করতে আজ কুণ্ঠা হবে।
শেষের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে সবই রয়েছে কেবল আলস্য কেটেছে বলে মনে হয়। কিন্তু ধৈর্যহীন আবেগপ্রবণ মানুষ গুছিয়ে পরিকল্পনা করে কি কাজ করছে? বরং বাঙালির মধ্যে ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানোর আবেগে বাঁধভাঙা জোয়ার আসায় সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। তার বহর ও গভীরতা কতটা তা বোঝার জন্যে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট। প্রথমত মায়ের হাতে আপন সন্তান খুন হওয়া। আবার সন্তানের হাতে আপন বাবা-মা খুন হওয়া। এমন ঘটনা কিন্তু আগেও হয়েছিল পরকিয়ায় মত্ত মা ও তার প্রেমিকার হাতে কিংবা নেশাগ্রস্ত ছেলের হাতে। এসব দেখে শুনেও আমরা সময় মতো গা করি নি, ঠিক মতো ব্যবস্থা নিই নি। দ্বিতীয়ত, একটি কোম্পানি কর্তৃক ( অর্থাৎ তিন/চারজন মিলে) একটি ব্যাংকের একটি শাখা থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাট করে দেওয়ার ঘটনা। দিনের পর দিন এরকম পুকুর চুরি চালিয়ে যাওয়া - এই দক্ষতা এবং সাহসের সত্যিই তুলনা হয় না।
আজ তুচ্ছ কারণে, প্রায় অকারণে, খুনোখুনির ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব মারাত্মক অপরাধ জঙ্গিরা ঘটাচ্ছে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেশাগ্রস্তরাও নয়। ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষা এবং ইন্দ্রিয়জ কামনা চরিতার্থ করার লোভ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। ছোটবেলায় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের একটি লেখা আমাদের পাঠ্য ছিল - তাতে আছে মানুষের ভিতরের সু ও কু প্রবৃত্তির দ্বন্দ্বের কথা। কোন প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হব তা বিচার করার ক্ষমতা মানুষকে অর্জন করতে হয়। কেননা মানুষমাত্রেরই লোভ, হিংসা, কাম, ক্রোধ এমন সব নেতিবাচক প্রবণতা থাকে। তাকে শিক্ষার মাধ্যমে, চর্চার ভিতর দিয়ে প্রশমিত রাখতে হয়, যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়, অন্যের ক্ষতির কারণ না হই আমরা। কিন্তু আজকের পরীক্ষানির্ভর মুখস্থবিদ্যার শিক্ষায় চর্চার সুযোগ কোথায়, প্রয়োজনই বা বোঝে কে? জীবনের শুরুতে চরিত্র গঠনের সময়ে যদি চারিত্রিক গুণের বীজ না পড়ে তা হলে সে গুণগুলো কী করে একজন মানুষের মধ্যে বিকশিত হবে?
তাই আমরা একদিকে ফলাফলের ভিত্তিতে মেধায় ও উচ্চশিক্ষায় সফল মানুষে দেশ ছেয়ে যেতে দেখছি আর অন্যদিকে সেই সাথে নৈতিক বলে উন্নত চরিত্রের মানুষের আকালও দেখছি সর্বত্র। ঘুষের প্রলোভন জয় করা, অবৈধ উপার্জনের লোভ সামলানো, ফটকা বাজারে মুনাফা করে লাল হওয়ার খায়েশ রোধ করার ইচ্ছা এবং সাধ্য কারুর নেই। ফলে এ সমাজ নৈতিকতার কোনো ভিৎ দাঁড় করাতে পারছে না।
ক্রমেই পরিস্থিতি এমন হচ্ছে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, একটা অবিশ্বাস ও ভয়ের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। নারীর পক্ষে পুরুষকে, শিশুর পক্ষে বড়দের, সংখ্যালঘুর পক্ষে সংখ্যাগুরুর, সাধারণের পক্ষে পুলিশকে, রোগির পক্ষে ডাক্তারকে এবং সর্বশেষ সন্তানের পক্ষে আপন মাকে, মা-বাবার পক্ষে আপন সন্তানকে বিশ্বাস করার মত বাস্তবতা থাকছে না। একি ভাবা যায়?
আমরা সব ঘটনাকেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটাতে চাই। উদাহরণ টানি উন্নত দেশের। আমি কেবল অপরাধের কথা বলছি না। মানসিকতার সংকটের কথা বলছি। পরিবারের অভ্যন্তরে পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট থেকে সৃষ্ট দু’তিনটি ঘটনাকে সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলব না। কিন্তু সন্তানের সাথে বাবা-মার সম্পর্ক কি চর্চার মাধ্যমে গভীরতা পাচ্ছে, অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে? নিতান্ত শিশুবয়সে কিছু সময় দিলেও, একটু বড় হওয়ার পর তো কেউ আর সন্তানকে সময় দিতে চান না। অসহায় গিনিপিগ শিশুরা কেবল স্কুল-কোচিং, পড়া-পরীক্ষার বৃত্তের মধ্যে জীবন কাটাতে থাকে। তা বলে অধিকাংশ খুনি হবে না নিশ্চয়, কিন্তু অধিকাংশের শৈশবকে খুন করা হচ্ছে বলে কেউই সুস্থ স্বাভাবিক মানবিক সত্তা নিয়ে বিকশিত হতে পারবে না। এ পরিণতির অনেকটা দায় বাবা-মা এড়াতে পারবেন না।
বড়দের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক না হওয়ায় বয়সন্ধিকালে শিশুরা যেসব  সমস্যায় ভোগে এবং যেসব আকাক্সক্ষা তার মধ্যে জাগে সেসবের কোনো সঠিক ব্যাখ্যা কিংবা সমাধান তাদের জানা হয় না। এ সময় তারা থাকে খুবই নাজুক, তাদের মনোজগৎ যথার্থ যত্ন ও সময়োচিত সাহচর্যের, পরামর্শ-উপদেশের অভাবে ভেঙে পড়তে পারে, আর নয়তো তারা মেজাজী, অসহিষ্ণু, অধৈর্য এবং মারমুখী হয়ে উঠতে পারে। এরই প্রতিফলন দেখি বড় হওয়ার পরে তাদের জীবনে, নিত্যদিনের সামাজিক অভিজ্ঞতায়।
এমন সমাজে যারা দুর্বল তারা সকলের হাতে অত্যাচারিত হয়। আর সবল অর্থাৎ ক্ষমতাবান উত্তরোত্তর তার প্রতিপত্তি একচেটিয়া করে নিতে থাকে। এভাবে সমাজে অপরাধ বাড়তে থাকে।
আমাদের সমাজ নারীবান্ধব নয়, শিশুবান্ধব নয়, সংখ্যালঘুদের প্রতি সদয় নয়, এমনকি নয় পরিবেশবান্ধব। সমাজে ভোগ ও দখলদারির মনোবৃত্তি বেড়েই চলেছে - সম্পত্তি দখল ও ভোগে মানুষের বাসনা কোনো বাঁধ মানছে না। আমরা লক্ষ্য  করি বেপরোয়া এই মনোভাব বাড়বাড়ন্ত বলে ক্ষমতাবানের বা ক্ষমতাসীন পরিচয়ে অত্যাচারের মাত্রা সমাজের সহ্য করার বা শুষে নেওয়ার ক্ষমতা অতিক্রম করে গেছে। সমাজ নিজেও নানান অন্যায় ও অপরাধের সাথে আপোস করে এর প্রতিকারে আর সক্ষম নয়। তাই মোটামুটি দুদকসহ সকল প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ একযোগে পতনের গভীর খাদের দিকে চলেছে। ব্যক্তির বিবেক বা নীতিবোধ খড়কুটোর মত উড়ে যাচ্ছে সম্মিলিত অপরাধশক্তির কাছে। 
উন্নয়নের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে মানুষ ও সমাজের এই ডুবে মরার বাস্তবতা যদি দেখতে না পাই আমরা তাহলে সে হবে মস্ত আফশোসের ব্যাপার। কারণ এমন বাস্তবতায় কোনোভাবেই আমরা আর টিকতে পারব না। বরং এই বাস্তবতায় নতুন নতুন ঝকঝকে ফ্লাইওভার, সেত,ু সড়ক, ভবনগুলো আমাদের উপহাস করবে। বিজয়ের বাগাড়ম্বর দিয়ে আত্মঘাতী সর্বনাশা পথে চলার পরিণতি ঠেকানো যাবে না। বরং এ অভ্যাস না ছাড়লে দেশের স্বাধীনতা থাকলেও মানুষের মুক্তি অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ঘোষণায় তো স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তির কথাও ছিল। বিজয়ের মাসে এ ভাবনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠা এক মর্মান্তিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

***

Monday, February 22, 2016

একুশের বিকাশ কোন্ পথে ঘটছে?

আবুল মোমেন

১.
একুশে উদযাপনের ধরণ ও তাৎপর্য উভয়ই যেন বদলে গেছে। গোড়ায় লক্ষ্যটা কেন্দ্রীভূত ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার আদায়ে। সেই সংগ্রামের চেতনার উৎস ছিল এই দিনটি যা তখনও শহীদ দিবস হিসেবেই অভিহিত হত। কিছুদিনের মধ্যে ভাষা থেকে সাহিত্য এবং সাহিত্য থেকে সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ল এ চেতনার প্রভাব। কারণ সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন জরুরি হয়ে দেখা দিলে একুশেই হল সেই চেতনার প্রতীক। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সম্মিলনে জনমনে জোরদার হল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। বলাই বাহুল্য, এই চেতনারও অনুপ্রেরণা এলো একুশে ফেব্র“য়ারি থেকেই। ফলে কালক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সকল উদ্দীপনার উৎস হল একুশ যার প্রতীক ছিল শহীদ মিনার। এভাবে একুশে ফেব্র“য়ারি হয়ে উঠল আমাদের জাতীয় দিবস এবং জাতীয় জীবনে তাৎপর্যবাহী দিন আর শহীদ মিনার তারই প্রতীক।
গোড়া থেকেই একুশে পালনের মূল অনুষঙ্গ ছিল দেশপ্রেম ও উদ্দীপনার গান আর জাতীয় চেতনা লালন ও বিকাশের উপযোগী সাহিত্য। এক সময় একুশের স্মরণিকা প্রকাশ আর প্রভাতফেরী ও বৈকালিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন ছিল আবশ্যিক কাজ। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা একুশের চেতনারই সম্প্রসারণ। এ প্রতিষ্ঠান তাই বরাবর দিনটি সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে এসেছে। স্বাধীনতার পরে এর পরিসর ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। ক্রমে একুশের সাথে বইমেলা এবং বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার যোগ ঘটে গেল। এখন একুশের মাস জুড়ে বাংলা একাডেমির বইমেলা, সেমিনার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রভাব দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। এটিই জাতীয়ভাবে একুশের মুখ্য অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সারা দেশে পড়েছে, প্রায় সব জেলাশহরে আজ ছোট আঙ্গিকে হলেও বইমেলা আয়োজিত হচ্ছে, সর্বত্র কিছু কিছু প্রকাশনাও হয়ে চলেছে।
আজকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রকাশনা শিল্পের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে একে প্রকাশনা শিল্পের বিপ্লবও বলা যাবে। প্রতিদিন বাংলা একাডেমির বই মেলায় কত যে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়, আজকাল সারা মাসে অন্তত হাজার পাঁচেক নতুন বই প্রকাশিত হয়। দেশে প্রকাশনার সংখ্যাও বেড়েছে, কেবল বাংলা একাডেমির মেলাতেই পাঁচ শতাধিক সংস্থা তাদের বই নিয়ে অংশ নিচ্ছে, এর মধ্যে শ’খানেকের ব্যবসাও খারাপ নয়। প্রকাশকবৃন্দ প্রায় সারা বছরই এই মেলাকে কেন্দ্র করেই তাঁদের প্রকাশনার পরিকল্পনা করেন। আমাদের প্রকাশনা-শিল্প মূলত একুশে-কেন্দ্রিক।
বাংলা একাডেমির পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় ও আঞ্চলিক নানা সংগঠন ব্যাপক আয়োজনে একুশে উদযাপন করে থাকে। বিভিন্ন  নগরে কর্পোরেশন কিংবা নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সম্প্রদায়গুলো একুশে উদযাপনে সোৎসাহে অংশ নিচ্ছে, নিজেদের স্বতন্ত্র আয়োজনও করছে। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ দিন আর নিছক ছুটি থাকে না, তারাও নানা অনুষ্ঠান করে শহীদ মিনারে ফুল দেয়। এমনকি সাহেবিয়ানায় অভ্যস্ত ক্লাবগুলো কিংবা ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সাড়ম্বরে একুশে উদযাপনে মেতে উঠছে!
২.
ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী নানা আয়োজনে উদযাপনের মাধ্যমে একুশে আজ যেন জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। একুশেকে কেন্দ্র করে দেশের প্রকাশনা শিল্পের বিস্তার যেমন ঘটেছে তেমনি এর ব্যবসায়িক দিকটি মূলত একুশের  ওপর নির্ভরশীল। একুশে এখন মূলত উৎসব এবং বাণিজ্যের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হচ্ছে। প্রকাশকরা বলছেন এ বছর ব্যবসায় ভালো হয়েছে কিংবা বলেন ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও বাদ নেই, এখানেও ব্যবসায়ের প্রভাব বাড়ছে। এছাড়া বুটিক, তৈরি পোশাক, খাবারদাবারসহ আনুষঙ্গিক আরও ব্যবসায়ের আওতা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে।
নিশ্চিন্তে বলা যায়, যেহেতু বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে, লক্ষ্মীর স্পর্শে ধন্য হয়েছে একুশে তাই এর বাড়বাড়ন্ত অব্যাহত থাকবে। আশার কথা, এই বাণিজ্যের মূল ভিত্তি এখনও সারস্বতসাধনা। লক্ষ্মী-সরস্বতীর যুগল সম্মিলনে একুশের অগ্রযাত্রা ভালোভাবে চলবে এ আশাবাদকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
হয়ত প্রশ্ন উঠতে পারে লক্ষ্মী না সরস্বতী কার প্রভাব বাড়ছে বেশি? তাছাড়া একুশে কেবল সরস্বতীর সাধনার বিষয়ও ছিল না, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সাথে এতে সংগ্রাম ও সৃষ্টির ব্যাপারটা হয়ে উঠেছিল মুখ্য। 
৩.
একুশে উদযাপনের ব্যাপ্তি এখন বিশ্বময়, অন্তত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটির স্বীকৃতি আসার পর থেকে। কিন্তু এ দেশে মাতৃভাষা বাংলা তো আজ কাক্সিক্ষত আদৃত ভাষা নয়। সবাই তো ছুটছেন ইংরেজির পেছনে, ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের রমরমা বাড়ছে, ব্যবসাসফল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাচর্চার বাহন ইংরেজি, সেদিকেই ঝুঁকছে বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী। কম্প্যুটার আর মোবাইলেও ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত ইংরেজির চর্চা হচ্ছে। একসময় রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল এ জাতি, আজ তাদের উত্তরসুরীরা স্বেচ্ছায় সাগ্রহে বাংলা লিখছে সেভাবে কিংবা তারই সাঁটভাষ্যে আলাপচারিতা চালাচ্ছে। রেস্তোঁরা, ক্যাম্পাস, মিলনায়তন, বাজার, পথঘাটে কান পাতলে তরুণ ও কিশোর, এমনকি শিশুদের কণ্ঠে ইংরেজি অথবা বাংলিশ কথোকথন কানে আসবে। যেটুকু বাংলা বলছে তাও আঞ্চলিক কিংবা আঞ্চলিকের খিচুড়ি ভাষা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মধ্যেই রয়েছে একুশের মেলায় প্রকাশিত বইয়ের গর্বিত লেখক, একুশে উপলক্ষে পুরস্কৃত কবি, টকশো মাতানো কথাকার, সেমিনারের চিন্তাশীল বক্তার সন্তান বা পৌত্র-দৌহিত্র, পৌত্রী-দোহিত্রীরাই যারা ইংরেজি-বাংলিশে বাৎচিৎ করে কান ঝালাপালা  করছে।
যদি প্রকাশিত বইগুলো ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়ি বা পড়ার চেষ্টা করি তাহলে প্রথম ঘা খেতে হবে অধিকাংশ লেখকের ভাষাগত দুর্বলতায়, তারপর অতৃপ্তির কারণ হবে লেখায় চিন্তার মৌলিকত্বের অভাব। মাতৃভাষার ব্যবহারে এক ধরনের অরাজক অবস্থা চলছে, অপরিণত বুদ্ধির ছাপ যত্রতত্র। 
এদেশে সাহিত্যচর্চার দিকে ঝোঁক বেড়েছে, বই প্রকাশের হিড়িক পড়েছে, কবিতা ও উপন্যাসের কমতি নেই। নব্য লেখকদের অনেকেরই প্রথম লেখাই বই আকারে বেরুচ্ছে, কোনো কোনো নব্য লেখক একসাথে এক ডজন বইও প্রকাশ করছেন। একুশে উপলক্ষে যত বই বেরুচ্ছে তার অর্ধেকের বেশি লেখক নিজের টাকায় বের করেন। এতে নৈরাজ্যের নদে কূলপ্লাবী জোয়ার বইছে। দুটি কারণে এই নৈরাজ্য ঘটে চলেছে - দেশে লেখক বাড়লেও প্রকৃত সম্পাদক ও সমালোচক তৈরি হচ্ছে না। কিংবা লেখকদের দাপটে সম্পাদক ও সমালোচকরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এঁরা তো হলেন ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবক ও পাহারাদার। এ সমাজ সবক্ষেত্রেই মুক্তকচ্ছ থাকতে চাইছে, নব্যধনী যেমন আইন-আদালতের তোয়াক্কা করে না, সবই নিজের কব্জায় রাখতে চায়, তেমনি নব্য লেখককূলও প্রশংসা-স্বীকৃতির দায় নিজেদেরই আওতায় রাখতে চান। এ প্রভাব ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার-স্বীকৃতি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে আজ বাংলা ভাষা  ও সাহিত্যের খাঁটি অভিভাবক এবং যোগ্য পাহারাদার নেই। ভাষার প্রতি সুবিচার করতে পারছি না আমরা, ভাষা চর্চায় কোনো নীতি মানছি না। যখন আমাদের পূর্বসুরীরা ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তখন কেবল বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব ছিল, কিন্তু কি শিক্ষা কি গণমাধ্যম কি সমাজজীবন সবখানে বাংলারই রাজ্যপাট ছিল রমরমা। আজ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে বাংলার, এমনকি একুশের কপালে বৈশ্বিকে স্বীকৃতিও জুটেছে, কিন্তু এ ভাষা শিক্ষাসহ সমাজ-জীবনের সবখানে দুয়োরানি হয়ে আছে।
ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়ে ওঠায় একুশে উদযাপন নিয়ে আর ভয় নেই, কোনো শক্তিই এই টাকার টঙকারের প্রতি বধির হবে না। কিন্তু সরস্বতীর কী হবে? সারস্বতসাধনাই যদি সংকটে থাকে তাহলে একুশের আর থাকে কি?

###

Wednesday, February 10, 2016

এবার চাই সাংস্কৃতিক জাগরণ

আবুল মোমেন
বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে এমন কতকগুলো গ্রন্থি আছে যা মোচন করা কঠিন, এবং মোচন ব্যতীত এগুনোও কঠিন। অবিভক্ত ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান-পর্বে বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তার একদিকে ছিল ভারতভিত্তিক ভাবনা অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনা। ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে তখনকার মত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার রাজনীতি জয়ী হয়েছিল। আবার যখন পাকিস্তানি অপশাসন ও উৎপীড়নে অতিষ্ঠ পূর্ব বাংলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল সেই জাগরণকে তখনকার বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিমণ্ডলের সুস্থ ও শক্তিশালী বামপ্রগতিশীল চিন্তার প্রভাবে অসাম্প্রদায়িক পথে পরিচালিত করা গিয়েছিল। জাতীয়তাবাদী জাগরণ অনেকটাই ভাবাবেগের ওপর নির্ভর করে রীতিমত বিপ্লবী পরিণতি ঘটাতে সক্ষম, কিন্তু রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবসম্মত কার্যক্রম। এর নীতি-আদর্শিক ভিত্তিগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট ও দৃঢ় করে নিতে হয়। আমার ধারণা ভাবাবেগের ওপর নির্ভর করে আমরা স্বাধীনতার মত অনেক বড় অর্জন সাধনে সক্ষম হয়েছি বটে, কিন্তু বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার আদর্শিক নীতিগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে পারি নি।
পূর্ববঙ্গবাসীর জন্যে পাকিস্তান থেকে পৃথক হওয়া অবধারিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তারা কী ধরনের রাষ্ট্র গঠন করবে সে বিষয়ে ভাসা ভাসা কথা কিংবা আপ্তবাক্য উচ্চারণের বেশি যথার্থ যুক্তি বিচার দিয়ে বিশ্লেষণ করে বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ ঘটে নি। এ অবস্থায় অসাম্প্রদায়িক অবস্থান সম্পর্কে সহজেই ভারতপন্থী বা হিন্দুঘেঁষা রাজনীতির অপবাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, আবার দেশের সিংহভাগ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একেবারে কট্টর ইসলামপন্থী পশ্চাৎপদ অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তাও মাথাচাড়া দিচ্ছে। একটি আধুনিক বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সাফল্যের জন্যে জনগণের মনে সঠিক লক্ষ্যাদর্শের বীজ বপন করা জরুরি।
একটা বিষয় সহজেই লক্ষ্য করা যায়, ভাষা আন্দোলন থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় জাগরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই। এই নীতি-আদর্শের সাথে যুক্ত বিভিন্ন উপাদানকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয় নি বলে এর একটা দুর্বলতা থেকে গেছে বলে মনে হয়। কিন্তু এ থেকেও আমরা বাংলাদেশের কেমন লক্ষ্যাদর্শ হওয়া উচিত তার একটা উত্তর খুঁজতে পারি। যদি আমরা এ অঞ্চলের ইতিহাসের দিকে নজর দিই তাহলে দেখব বাঙালি কোনো কালে শাস্ত্রপন্থী কট্টর জনগোষ্ঠী ছিল না, একটা কৃষিজীবী সমাজ যেভাবে মাটি-জল ও প্রকৃতির সাথে মিশে মানুষে মানুষে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনে থেকে সফল হয় এখানে পরিবেশ তেমনটাই ছিল। এখানকার প্রকৃতি পরিবর্তমান হলেও মানুষের জন্যে অত্যন্ত উদার ও সম্পন্ন ছিল। এ মানুষ প্রকৃতিলগ্ন, ভাববাদী এবং মানবিক। বাঙালির একান্ত অধ্যাত্ম সাধনা - যেমন হিন্দুর গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন, মুসলিমদের বিভিন্ন ধারার সুফি সাধনা, বৌদ্ধদের তান্ত্রিক ধারাসমূহ, এবং এ অঞ্চলের নিজস্ব আউলবাউল সহজিয়া সাধনা - বিচার করলে তাতেও পাওয়া যাবে এর প্রকৃতিলগ্নতা , ভাববাদ ও মানবিক আবেদন ইত্যাদি। ষোড়শ শতকের বৈষ্ণব কবির সবার উপরে মানুষ সত্য এ ঘোষণার ঔদার্য দেখে যেমন তেমনি সপ্তদশ শতকের মুসলিম কবির মাতৃভাষা-প্রেমের আগুন দেখেও চমকে যেতে হয়। এই ইহজাগতিক মানবিক উদার ঐতিহ্যের ধারা থেকেই বাংলাদেশে একটি অসম্প্রদায়িকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রণোদনা পাওয়া সম্ভব। বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত প্রবণতা এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে মানবিক উদার হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ছাড়াও আমরা যদি পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক গতিধারা লক্ষ্য করি তাহলেও দেখব বায়ান্ন, চুয়ান্ন, বাষট্টি (ছাত্র আন্দোলন), ছেষট্টি, ঊনসত্তর (গণ-অভ্যূত্থান), সত্তর (নির্বাচন) ও সবশেষে একাত্তরের রাজনৈতিক প্রেরণা ছিল এই একইভাবে একটি অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেভাবেই স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়েছিল।
বায়ান্ন থেকে উপরিকাঠামোয় বা বহিরঙ্গে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাগরণের ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটেছে যে ইতিহাসে জমে ওঠা বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ইস্যুর গ্রন্থিমোচন করার অবকাশ যেন পাওয়া যায়নি। কিংবা সে রকম প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আমাদের নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবীসমাজ দেখাতে পারে নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে তার একেবারে ওপরে আছে ক্ষমতা ও বিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এটা লুটেরা ধনী ও সাধারণ লুটেরা শ্রেণীর দ্বারা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের প্রক্রিয়া। কিন্তু তা প্রশ্রয় পেয়েছে যখন স্বাধীন বাংলাদেশকে তার অর্জিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এবং উদার মানবিকতার ধারা থেকে সরিয়ে এনে ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদে রূপান্তরের চেষ্টা শুরু হয় তখন থেকে। মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে ব্যর্থ করার এই চেষ্টা যে বিফল হয় নি তারও দুটি কারণ আছে। একদিকে রয়েছে স্বাধীনতার অর্জনকে যথার্থভাবে উপলব্ধি ও ব্যবহারে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা, বামপ্রগতিশীল শিবিরের বিভক্তি অবক্ষয়, পশ্চিমের উদার গণতান্ত্রিক দেশসহ বিশ্বব্যাপী রক্ষণশীলতার উত্থান, বাজার অর্থনীতির সুবাদে ভোগবাদী মানসিকতার প্রবল জোয়ার, সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম জাতি সম্পর্কে পশ্চিমের ভ্রান্তনীতি মিলে ক্রমে ক্রমে পঁচাত্তরের পরে সূচিত রূপান্তরণের রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এই বাহ্য ঘটনাবলীর পাশাপাশি বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তায় অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তির ফলে সৃষ্ট অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে।
এই দুর্বলতা রেখে দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব হলেও গণতান্ত্রিক বিকাশে কোনো জাতি এগুতে পারে না। এর ফলে ক্ষমতা ও বিত্তকে কেন্দ্র করেই মূল রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে, মানুষের অধিকার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শক্ত ভিত্তি ইত্যাদি চর্চা ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বাইরে থেকে যাচ্ছে। এভাবে দেশে কাঠামোগত ও ভোগবিচারে উন্নয়ন ঘটলেও মানবিক বিকাশ ও প্রকৃত মুক্তির পথ সংকুচিত হয়ে আসে।

আমরা ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধ করেছি - যুগপৎ স্বাধীনতা ও মুক্তি চেয়েছি। স্বাধীনতা দেশের হয়, তা হয়েছে, মুক্তি লাভ করে মানুষ, তা এখনও অধরা থেকে গেছে। স্বাধীনতাকে সব মানুষের জন্যে অর্থবহ করতে হলে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরি, তা আবার মানুষের জন্যে প্রকৃত মুক্তির পথও অনেকটা সুগম করে দেয়। কিন্তু তারপরেও আরও কাজ বাকি থাকে। মানুষকে চিন্তা করার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। এটা কঠিন কাজ। রাষ্ট্র আইন করে বা শাস্তির বিধান দিয়েও তা বাস্তবে ঘটাতে পারবে না। এর জন্যে চাই সমাজ সংস্কারের আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ। শেখ হাসিনা যদি সত্যিই তাঁর পিতার এবং লক্ষ লক্ষ শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ কায়েম করতে চান তবে তাঁকে আজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কাজটিই করতে হবে। সে কাজ শুরু করার জন্যে একুশে ফেব্রুয়ারি যথার্থ উপলক্ষ হতে পারে।

Tuesday, January 26, 2016

শিক্ষাচিন্তায় বনের গাছ দেশের নদী

আবুল মোমেন

ইদানীং দেশে সাফল্য চর্চার ও সাফল্যের আপন ঢোলটি বাজানোর প্রতিযোগিতা চলছে। গণমাধ্যম হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে সাফল্যের কাহিনি, এর নায়ক এবং নায়িকাদের।
না, এতে দোষের কিছু নেই। কেবল প্রশ্ন হল, কে কোন্ মানদণ্ডে সফল, মানদ- কীভাবে কারা স্থির করছেন? শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের সাম্প্রতিক সাফল্যের কথা জোর গলায় সবাই বলে যাচ্ছি, কিন্তু তলিয়ে দেখলে সত্যিই কি সাফল্যেরই চিত্র ফুটে ওঠে? গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে। কেননা শিক্ষা তো শিক্ষাই। পিএসসিতে জিপিএ৫ কত লক্ষ জন পেল তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ঐ স্তরের অর্জন-লক্ষ্যগুলো তাদের ঠিকঠাক মতো অর্জিত হয়েছে কিনা। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করে এমন একাধিক সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সনে প্রাথমিক সমাপনীতে ৪২% ছাত্র ইংরেজিতে ঈ-উ মান পেয়েছে, অংকে অর্ধেকের বেশি ছাত্রের অবস্থা খারাপ, মাতৃভাষাতেও অর্জন-মান ভালো নয়। মাদ্রাসার ছাত্ররা আরবিসহ তিন ভাষাতেই অদক্ষতা নিয়ে পাশ করেছে। তারও চেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল যেসব ছাত্র নানাবিধ কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, নোটবই, গাইডবই নির্ভর করে পড়েছে অর্থাৎ কেবল স্কুলের ওপর নির্ভর করে থাকে নি, তারাই ফলাফল ভালো করেছে। এর অর্থ একদিকে বিনিয়োগে সমর্থ পরিবারের ছেলেমেয়েরা ভালো করছে আর অন্যদিকে স্কুলগুলো ছাত্রদের দক্ষ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
কিন্তু পিএসসি নিয়ে আসল উদ্বেগ হল শিশুবয়সে জিপিএ৫ অর্থাৎ সাফল্যের দৌড়ে লিপ্ত হয়ে পড়ায় ছেলেমেয়রা - প্রধান শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী - প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে গেছে, এতে প্রকৃত শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অথচ পরীক্ষায় পাশ করা সহজ হয়ে যাচ্ছে, শিক্ষায় পারিবারিক ব্যয় বাড়ছে এবং পুরো শিক্ষাই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, মুখস্থ ও নোটবই-কোচিং-নির্ভরতা বেড়ে চলেছে। বস্তুতপক্ষে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই, একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত, সম্পূর্ণ পরীক্ষা-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। তাতে ছাত্ররা আদতে সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরই শেখে। ফলে কোনো বিষয়েই তাদের পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জিত হয় না। এটি পরীক্ষায় পাশ করা এবং জিপিএ৫ পাওয়ার পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানার্জনের পথ হতে পারে না। এভাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি সম্ভব নয়।
এই ব্যবস্থার ভিতর দিয়েও কিছু মেধাবী ছাত্র বেরিয়ে আসতে পারে, তারা দেশে-বিদেশে স্বদেশের মুখ উজ্জ্বল করে। আমরা গৌরবের সাথে তাদের সাফল্য উদযাপন করতে থাকি। অমর্ত্য সেন তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থ দ্য কান্ট্রি অব ফার্স্ট বয়েজ-এ একে নাম দিয়েছেন ফার্স্ট বয় সিনড্রোম। এ প্রবণতার ফলে শিক্ষায় আম ছাত্রদের অন্তত প্রাথমিকের সকল অর্জন-লক্ষ্য পূরণ এবং শিক্ষায় সবার জন্যে সমান সুযোগ সৃষ্টির মত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। অথচ জাতিসঙ্ঘ, ইউনেস্কো এবং ইউনিসেফের সদস্য-রাষ্ট্র হিসেবে এবং শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এসব দিকে নজর দেওয়ার কথা ছিল। সেই সনদ অনুযায়ী (আর্টিকেল ৩১) আমরা তো তাদের খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, শিল্পচর্চা ও অন্যান্য বিনোদনমূলক ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমরা বরং শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের সেসব অধিকার একে একে হরণ করে নিচ্ছি। এসবই পিএসসি-জেএসসি এবং জিপিএ-৫ এর দৌরাত্ম্যের নিষ্ঠুর ফলাফল। আমরা দৃশ্যমান সাফল্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে তার পেছনে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্যপ্রায় কিন্তু নিতান্ত বাস্তব সংকটগুলো দেখতে পাই না বা দেখতে চাই না। কিন্তু তার প্রতিফল তো দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়ঙ্কর। কারো শৈশব যদি ভয়ঙ্কর চাপের মধ্য দিয়ে কাটে এবং যে সাফল্যের জন্যে সে চাপটা নেয় তা যথাযথভাবে অর্জিত না হলে তার মনের অবস্থা কী হতে পারে আমরা কি সেটা ভাবি? অধিকাংশের জন্যে এটাই তো পরিণতি। যে শিশু না খেলে না গেয়ে না এঁকে তার কল্পনাকে না ছুটিয়ে, অবসরকে ইচ্ছামতো একটু না কাটিয়ে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আর পরীক্ষা দিয়ে কাটায় তার মনে কত ক্ষোভ কত বেদনা কত হীনম্মন্যতার বীজ জমা হয় তা আমরা খেয়াল করি না। কেবল বলি সমাজে এত অস্থিরতা কেন, সবাই কেন স্বার্থপর হয়ে উঠছে, হয়ে পড়ছে হিংসুটে ঝগড়াটে, স্বার্থপর এবং নিষ্ঠুর? কেনইবা বাড়ছে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ?
আমাদের সমাজে গবেষণার গুরুত্ব নেই বললেই চলে। ফলে বর্তমান কাজের পরিণতি বুঝতে পারি দূর ভবিষ্যতে যখন ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। ফলে তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখাতে পারলেও আখেরে খুব লাভ হয় না আমাদের।
বিনামূূল্যে সবার জন্যে প্রাথমিক শিক্ষা দিতে আমরা সাংবিধানিকভাবেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি কীভাবে পালন করব তা তো কেবল ঘোষণার বিষয় নয়, কর্ম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং দেশের বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতেই নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষা মূলত একটি সামাজিক কাজ। অর্থনৈতিকভাবে বহুধাবিভক্ত এ সমাজে নানা রকম বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকারও দীর্ঘকাল ধরে তার সাথে তাল মিলিয়েই চলেছে। ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারও বৈষম্য ও বিভক্তিকে জিইয়ে রাখছে। প্রাথমিক পর্যন্ত অন্তত একধারায় শিক্ষা প্রচলনের অঙ্গীকার পূরণে সরকার হাল ছেড়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়। মাধ্যমিকেও সরকারই বৈষম্য পুষছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের (ব্যানবেইজ) জরিপেই দেখা যাচ্ছে ক্যাডেট কলেজে ছাত্রপিছু সরকারের বার্ষিক ব্যয় যা বেসরকারি স্কুলে তা কুড়ি ভাগের এক ভাগও নয়। এতটা বৈষম্য রেখে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া কি সম্ভব! আজ পর্যন্ত কিছুতেই আমরা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জাতীয় আয়ের অভীষ্ট ৬ শতাংশে পৌঁছুতে পারলাম না। তা রয়েছে ৩ শতাংশের কাছাকাছি। এ সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছিলেন আজ ছয় বছর পরেও তার মৌলিক সুপারিশ পূরণে এগুনো যায় নি।
সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত সব ছাত্রকে প্রতি বছর বিনামূল্যে বই দিচ্ছেন। এটা একটি চমকপ্রদ অর্জন নিঃসন্দেহে। কিন্তু এর কয়েকটি দিক নিয়ে সত্যিই ভাবা দরকার। সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ তথা শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে হলে তাদের পড়াশুনা কেবল পাঠ্য বইয়ের মধ্যে সীমিত করে রাখলে চলবে না। কিন্তু আশৈশব পড়াশুনার যে পরীক্ষাকেন্দ্রিক পদ্ধতির ভিতর দিয়ে তারা বেড়ে ওঠে তাতে  আমাদের বাস্তবতা হল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কেউই আর পাঠ্যবইও পড়ে না, অন্য বই পড়া দূরের কথা। তারা কেবল প্রশ্নের উত্তর শেখে। বস্তুতপক্ষে এই প্রক্রিয়ায় কারো পাঠাভ্যাস তৈরি হয় না। অমর্ত্য সেন তাঁর পূর্বোক্ত বইয়ের  নাম প্রবন্ধে দেখিয়েছেন উনিশশতকের মাঝামাঝি (১৮৭২) জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন শুরু হয় তখন তাদের দেশে বইয়ের প্রকাশনায় বিপ্লব ঘটে যায়।  দেখা যাচ্ছে ১৯১৩ নাগাদ, যখন জাপান যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনের চেয়ে অনেক দরিদ্র, তখনই ব্রিটেনের চেয়ে অনেক বেশি এবং আমেরিকার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বই ছাপছে। যদিও তাদের জনসংখ্যা তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও কম।
ফলে এ প্রসঙ্গে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য হল, যেহেতু একদিকে সরকারের সামর্থ্য সীমিত আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে এবং সচেতনতা বাড়ার ফলে সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগে আগ্রহ বেড়েছে তাই সকলকে বিনামূল্যে বই দেওয়ার অর্থ হয় না। নয়ত এবারের মত বইয়ের মুদ্রণ-বাঁধাইয়ের মান খারাপ হওয়া ঠেকানো যাবে না। এ বছর অনেক বই শিশুরা পুরো বছর টেকাতে পারবে না, কোনো কোনো বই পড়া দুষ্কর। বরং স্কুলভিত্তিক জরিপ চালিয়ে শুধুমাত্র অভাবী পরিবারের সন্তানদেরই বিনামূল্যের বই দেওয়া উচিত। আর সামর্থ্যরে ভিত্তিতে বইয়ের মূল্য প্রদানে সরকার অভিভাবকদের বিভিন্ন মাত্রায় রেয়াত দিতে পারেন। তাতে যে সাশ্রয় হবে সে টাকা শিশু-কিশোরদের উপযোগী বইয়ের প্রকাশনায় ভতুর্কি দেওয়া যায়, স্কুলে স্কুলে পাঠাগার গঠনে বিনিয়োগ করা যায়।
বই নিয়ে তৃতীয় কথাটি হল - প্রতি বছর নতুন বই দিতেই হবে? আমাদের বহুকালের সংস্কৃতি হল বৃহত্তর পরিবারের বড় জনের বই ছোটরা পড়বে, এমনকি স্কুল উদ্যোগী হয়ে বই সংরক্ষণ করে তা বিতরণও করতে পারে। এ জন্যে বইয়ের কাগজ ও ছাপা-বাঁধাইয়ের মান উন্নত হতে হবে। তবে এ ব্যয় বছর বছর সকলকে বিনামূল্যে সব বই দেওয়ার চেয়ে অনেক কম হবে, কিন্তু উপকার হবে ঢের বেশি। শুধু যে বছর পাঠক্রমে পরিবর্তন আসবে সে বছর সবার জন্যে নতুন বই ছাপালেই চলবে।
এতে চতুর্থ বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এ বিষয়ে অধ্যাপক কায়কোবাদ প্রথম আলোয় তাঁর সাম্প্রতিক একটি লেখায় আলোকপাত করেছেন। আমি আরেকটু যোগ করছি। সম্প্রতি একটি জার্মান গবেষণাপত্রে পড়েছিলাম সহনীয় মাত্রার পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারও নিষিদ্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে শুধু কাগজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে বছরে বন কাটার পরিমাণ যে হারে বাড়বে তাতে কয়েক বছরেই বিশ্ব বনশূন্য হয়ে যাবে। শুধু তা নয়, কাগজ তৈরি করতে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার হয় তা বর্জ্য হয়ে পানিতে মেশে এবং ফলে নদী ও জলাশয় দূষণের মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকবে। তাই জোর দিতে হবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যবহারের ওপর আর মানুষকে শেখাতে হবে ব্যবহৃত ব্যাগ যথাস্থানে পরিত্যাগের বিষয়টি। সম্প্রতি বিবিসিতে ফিচার ছবি দেখেছিলাম ভারতে কীভাবে ব্যবহৃত পলিথন সংগৃহীত হয় এবং তা পুনরায় ব্যবহার করে মগ, জগ ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরি হয়।
সাফল্যের ঝলক দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে চিন্তাকে বিরাম দিয়ে লাভ নেই, আমাদের চাই টেকসই সাফল্য,  ফার্স্টবয় সিনড্রোমে (এ ক্ষেত্রে জিপিএ৫ সিনড্রোম) না ভুগে বিবেচনায় নিতে হবে সবার স্বার্থ, সবার সাফল্যকে। বিবেচনায় নিতে হবে দূর ভবিষ্যতের পরিণতিও। তবেই শিক্ষাচিন্তায় কেন বনের গাছের কথা, দেশের নদীর কথাও প্রাসঙ্গিক তা আমাদের বিবেচনায় আসবে।

***




Thursday, January 14, 2016

২০১৫ থেকে ২০১৬ : উত্তরণের সোপান

আবুল মোমেন

সদ্য শেষ হওয়া বছরটা কেমন গেল?
২০১৫ শুরু হয়েছিল দুর্যোগ ও অনিশ্চয়তা নিয়ে। পেট্রোল বোমা ও হরতালের আতঙ্কের মধ্যে। দগ্ধ মানুষ আর মৃত্যুর বিভীষিকা সাথে করে।
এ পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, অমানবিক এবং দুঃস্বপ্নের মত। এর পেছনে ছিল রাজনীতি, ক্ষমতার রাজনীতির অন্ধ প্রতিহিংসা। কোনো আন্দোলন ছিল না। সংগঠন বা কর্মীরা তৈরি ছিল না। কর্মসূচিগুলো যে-রাজনীতিকে ধারণ করেছে তা জনগণকে কেবল উপেক্ষা করেনি, প্রতিপক্ষ বানিয়ে ছেড়েছিল।
এভাবে বিএনপি বছরটা শুরু করেছিল দলের জন্যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। আর তাদের জন্যে বছরটা শেষ করলেন খোদ বেগম জিয়া ও তাঁর সংখ্যালঘু শাগরেদ গয়েশ্বরচন্দ্র মিলে দলের ভাবমূর্তি ও রাজনীতি উভয়ই প্রায় শেষ করে দিয়ে। যখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে ও রায় কর্যকর হচ্ছে তখন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং শহীদদের, বিশেষত বুদ্ধিজীবীদের-বুদ্ধিসুদ্ধি নিয়েই উপহাস করেছেন। এরপরে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশে কীভাবে রাজনীতি করবে? তাদের বক্তব্যের সারবস্তু ও মর্ম মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশকে অসম্মান ও অস্বীকৃতির সামিল, যা পাকিস্তান আজও করে আসছে। তারা কি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর ব্রত নিয়ে রাজনীতি করছেন? আমাদের তো তাহলে সাবধান হতে হয়, দেশবাসীকেও সাবধান করে দিতে হয়।
এ ধরনের রাজনীতি স্বাধীন বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র বলেই গণ্য হবে। সাধারণ মানুষই এর জবাব দিচ্ছে, দিয়ে যাচ্ছে। না, তারা রাজনীতি করছে না। বরং রাজনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা - তিন ক্ষেত্রে অগ্রগতিতে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দেশের সব শিশু এখন স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, দেশে এখন স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা সাড়ে চারকোটি - যা ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। সেই সকল ছাত্রকে সরকার বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে সকল পাঠ্যবই দিচ্ছে, যার সংখ্যা তেত্রিশ কোটির বেশি। ভাবা যায়! স্কুলের মেয়ে-শিশুদের উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, বিনামূল্যে দুই প্রস্ত করে স্কুল-পোশাকও দিচ্ছে সরকার। এও অভাবনীয়। নবজাতক মৃত্যু, মাতৃমৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এসে গেছে, গড় আয়ু ভারতের চেয়ে বেশি। আর একাত্তরের স্বাধীনতার সময় সাড়ে সাতকোটি জনসংখ্যার খাদ্যের সংস্থান যে দেশ করতে পারত না সে দেশ আজ দ্বিগুণ মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত দেশ। ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম আর মাছে পঞ্চম, কিন্তু গত এক বছরে এ দুই খাতে অর্থাৎ ফল ও মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় যে-রাজনীতি তার বাড়া ভাতে ছাই দিতে আসবে তাকে সে দুয়ো দেবেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বাতিল করে বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নানা শর্তের চাপের মধ্যে রাখলেও তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি আয়ে তার প্রভাব পড়ে নি। উদ্যমী বাঙালরা এসব মারপ্যাঁচ ও ব্যবসায়িক চালকে অকেজো করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ এখন ৩০ বিলিয়ন ছুঁয়েছে।
এসবই তো বাংলাদেশেই সম্ভব হয়েছে। যেমন করে হয়েছে জিয়াউর রহমানের মেজর থেকে জেনারেল হওয়া, রাষ্ট্রপতি হওয়া! এ সবই তো বাংলাদেশেরই অবদান। তার সূত্র ধরেই তো বেগম জিয়ার উত্থান বা রাজনীতি, প্রধানমন্ত্রী কি বিরোধী নেত্রী হওয়া। তিনি যদি খোদ মুক্তিযুদ্ধকে, যা কিনা বাংলাদেশের জন্মক্ষেত্র, আঁতুড়, তাকে খাট করেন, তার ধাত্রীদের মধ্যে শহীদদের অস্বীকার করেন, দেশের জনককে না মানেন তাহলে কীভাবে এদেশে সুস্থ রাজনীতি করবেন?
ত্রিশ লক্ষ নাম জানা ও অজানা শহীদদের প্রতি অসম্মান দেখিয়ে আর দেশের বুদ্ধিজীবীদের বিদ্রƒপের পাত্র মনে করলে কীভাবে এদেশের নেতা হবেন তিনি? তাঁর চিন্তাজগতে বাংলাদেশ কি আদতে একটি জাল দেশ? প্রকৃত দেশ তাহলে কোনটি, কাদের প্রকৃত নেতা তিনি? পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশনের স্বপ্ন দেখেন নাকি তিনি?
যাঁরা প্রকৃত রাজনীতিবিদ তাঁদের বোঝার কথা ২০১৫ সাল বাংলাদেশ-নদীটির স্বখাতে স্বমহিমায় পুনর্বাসিত হওয়ার বছর। ১৯৭১-এর মত এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং ঠিক ১৯৭১-এর মতই এতে যুক্ত হয়েছে এবং বিপুলভাবে অবদান রেখেছে দেশের আপামর জনগণ। এই জনগণের মধ্যে ঠিক ১৯৭১-এর মতই সাধারণ কৃষক-মজুরদের ভূমিকা প্রধান। তারা সেদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিল আর দেশের কল্যাণে প্রাণ দিতে কসুর করে নি। এখনও তারাই অর্থনীতির রণক্ষেত্রে যোদ্ধার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যারা বরাবর বৈরী প্রকৃতি, ভাঙনপ্রবণ নদী ও অস্থির ভূমির সাথে লড়াই সংগ্রাম করে জীবন কাটিয়েছে তাদের জন্যে জীবনসংগ্রাম তো বটেই, যে কোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণেও অভিনবত্ব নেই। তাদের জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জই অসাধ্য নয়। একাত্তরে যেমন আমেরিকার সপ্তম নৌ বহরের রক্তচক্ষুকে তারা হেলায় উপেক্ষা করে জয়ী হয়েছে আজ অর্থনীতির সংগ্রামে তারা জিএসপি প্রত্যাহারের চোখ রাঙানোকেও পরোয়া করে নি। তারা এগিয়ে গেছে। না, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার অভিযাত্রাকে আর থামানো যাবে না।
তাহলে কি মামলা খারিজ? জামায়াত, পাকিস্তান , খানিকটা যুক্তরাষ্ট্র, আইএস-জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গি, এমনকি খালেদা জিয়া ও তাঁর দল কি হাল ছেড়ে দেবে? পথে আসবে?
সেটা দেখার বিষয়। ইতিহাস কখনও একমুখী পথে চলে না, রাজনীতিতেও শেষ কথা নেই। ফলে গা-ছাড়া ভাব একদমই পরিহার করতে হবে, আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগার কোনোই অবকাশ নেই। বরং আরও দৃঢ়তার সাথে সামনের পথ চলতে হবে। সেদিক থেকে ২০১৬ সাল হবে দৃঢ় সংকল্পের বছর। সকল বাধা ঠেলে সামনে এগুনোর বছর। আর মনে রাখতে হবে একাত্তরে বিজয়ের পরে যেসব কারণে প্রতিপক্ষ, প্রতিক্রিয়ার শক্তি প্রত্যাঘাত হানতে পেরেছিল, আমাদের অর্জনগুলো ধ্বংসে প্রবৃত্ত হয়ে সফল হয়েছিল সেসব কথা। প্রথমত, জাতির মধ্যে আজ যে আশা, আংশীদারিত্ব এবং ঐক্য বোধ তৈরি হয়েছে তাকে বজায় রাখতে হবে ও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, মিত্রদের ও সমমনাদের চিনতে হবে এবং কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থত, কোনো অবস্থাতেই সব অর্জনের কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের ঘরে জমা করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। পঞ্চমত, অবশ্যই দুর্নীতি, দলীয়করণ, অদক্ষতার হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে।
মানুষ আশা নিয়ে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেন আস্থাশীল আজ। তাদের সে বারতা তাঁকে এবং তাঁদের দলের ও সচেতন নাগরিকদের সকলকে বুঝতে হবে।
সেই সাথে বেগম জিয়া এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের ইতিহাসের এই প্রকৃত ধারা বুঝতে হবে। বাংলাদেশের, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের, রাজনীতিই তাঁদের করতে হবে। মানুষের আশা সেই রাজনীতিই তাঁরা শুরু করবেন - দেরিতে হলেও।
***



উন্নয়ন হলেও সুখ অধরা থাকছে

আবুল মোমেন

বাংলাদেশ এগুচ্ছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উন্নয়নের বিবেচনায় অনেক বিশেষজ্ঞের কাছেই বাংলাদেশ এক বিস্ময়। এই বিস্ময়কর চমকপ্রদ অগ্রগতির জন্যে জনগণের সঙ্গে সরকার, বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন।
এরপরে কি আর কথা থাকবে না? ইংরেজ বাঘা বুদ্ধিজীবী বার্ট্রা- রাসেল-এর ‘বাহ্যরূপ ও বাস্তবতা’ - এপিয়ারেন্স অ্যা- রিয়ালিটি-যুক্তিজালের গোলকধাঁধায় না ঢুকেও বলা যায় - বোধহয় থাকবে। ছোট্ট দেশ, সার্কের সদস্য রাষ্ট্র ভূটানের রাজা তা-বড় অর্থনীতিবিদ ও দুঁদে উন্নয়ন বিশারদদের  সূচকগুলোতেই কিন্তু সন্তুষ্ট থাকেন নি। তিনি নতুন ভাবনার জোগান দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের হদিশ নেওয়ার প্রচলিত মাপকাঠি জিডিপি জিএনপি - অর্থাৎ মোট দেশীয় উৎপাদন মোট জাতীয় উৎপাদন ইত্যাদিতে উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র উঠে আসে বলে মনে করেন না তিনি। রাজা ওয়াংচুক মনে করেন প্রথমত, মানুষের উন্নয়নের চাহিদা কেবলমাত্র বস্তুগত বিষয়ে সীমিত থাকতে পারে না, দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের চাহিদার রূপ ও মান দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তাঁর মতে সব মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক - সুখ। তাই তিনি বলেছেন, কোনো দেশের উন্নয়ন বোঝার মাপকাঠি হবে জিএনএইচ - গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস, মোট জাতীয় সুখের পরিমাপ। শুনেছি জাতিসঙ্ঘ জিএনএইচের স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভূটানের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হাসিখুশি মানুষদের অল্পদেখার অভিজ্ঞতায় বেশ সুখি আর সমাজটাকেও শান্তিপূর্ণই মনে হয়েছে। ওদের বিষয়ে বেশি বলার অধিকার আমার নেই। তবে আমরা সবাই জানি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই অল্পে তুষ্ট, আশুতোষ। পশ্চিমা একটি জরিপেও দেখা গেছে সুখের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ওপরেই আছে। এর অর্থ এদেশের জনগণ বা সাধারণ মানুষ মোটামুটি সুখেই আছে।
এই জরিপের ফল কি সত্য? বাস্তব চিত্র কি এতে উঠে এসেছে? আবারও আমরা রাসেলের গূূঢ় তর্কের মুখোমুখি হই - বাহ্যরূপ আর বাস্তবতায় কি ফারাক আছে? জানি জরিপ আর পরিসংখ্যান অনেক সময় বোকা বানায় আমাদের, ডাহা মিথ্যাও বলতে পারে। তাছাড়া সুখ বা শান্তির মত বিমূর্ত এবং নিতান্ত মনোজগতের বিষয়ে পরিমাণগত ধারণা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে উন্নয়নের প্রচলিত অধিকাংশ সূচকেই বাংলাদেশের চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হলেও, এবং সেসব অর্জনকে একটুও খাটো না করে বাস্তবতার আলোকেই বলা যায়, বাংলাদেশের বহু মানুষ সুখেও নেই শান্তিতেও নেই।
দেশে অনেক ধরনের বৈষম্য বিরাজ করছে এবং তাতে এক পক্ষ অন্য পক্ষের আধিপত্যের কারণে বঞ্চিত বা বঞ্চিত-শোষিত উভয়ই হচ্ছে। অনেক উন্নয়ন হলেও বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো সামন্ত ধাঁচের, ধর্মসংস্কারশাসিত এবং মোটা দাগে রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক। এমন সমাজে নারী সর্বস্তরেই - কর্মক্ষেত্র থেকে সংসার, শৈশব থেকে বার্ধক্য, সধবা থেকে বিধবা ইত্যাদি - বৈষম্যের শিকার, স্বভাবতই অনেকেই নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার এবং প্রায় ঢালাওভাবে পুরুষতন্ত্রের যৌন পীড়নের আতঙ্কে কাটাতে বাধ্য হয়। তার সুখ বড় ঠুনকো, ভাসা-ভাসা, অনেক সময় মেকি এবং ছেলে-ভুলানো ছলনার বেশি নয়।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহুকাল ধরেই - সেই পাকিস্তান আমল থেকেই - বৈষম্যের শিকার। কখনও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় প্রকার বৈষম্যের শিকার তারা। দীর্ঘকাল ধরে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় কেবল বৈষম্যের কারণেই নয়, বঞ্চনা-লাঞ্ছনা-নিপীড়নের ফলে ভয়ার্ত জীবন কাটাচ্ছে। তারা যে অসুখি তার কিছু স্পষ্ট পরিসংখ্যানগত হিসেবও হাজির করা যায়। ১৯৪৭ সনে দেশ ভাগের সময় তৎকালীন পূর্ববঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যা ছিল এদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ। পাকিস্তানে ছিল রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতা, ১৯৬৫-র পরে যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি কেবল বেড়েছে। ১৯৭১- এ স্বাধীনতার পরে এই সংখ্যা নেমে যায় ২২-২৩ শতাংশে। দ্বিজাতিতত্ত্বকে অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-আদিবাসী মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে যে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হল তাতেও সংখ্যালঘুর বিড়ম্বনা থেমে থাকে নি। অনেকেরই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়েছে, জনসংখ্যা ক্রমাগতই কমে বর্তমানে দশ শতাংশের নিচে। সুখে থাকলে কেউ দেশ ছেড়ে যায়?
আমাদের পাহাড়ের প্রতিবেশী তেরটি আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস্তবতা কী? ১৯৪৭ সনে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালির সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে সমতলের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজ দেশে পরবাসী ওরা। তারপরে তাদের দিক থেকে স্বায়ত্বশাসন, বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সরকারের দিক থেকে সামরিক অভিযানসহ জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ১৯৯৭ সনে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্ণ হলেও কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে পাহাড়ীদের মনে সুখে আসে নি। বস্তুত কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ থেকেই তাদের জীবনে সুখ কমতে শুরু করেছে, বাংলাদেশ আমলে তা হ্রাসের হারই বেড়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে জিয়াউর রহমানের বাঙালি অভিবাসন নীতির ফলে তা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে, যা শান্তিচুক্তিও ঠেকাতে পারে নি।
ইদানিং সংবাদপত্রে প্রায়ই পড়ি সমতলের আদিবাসীদের চরম ভোগান্তির নানা খবর। মাত্রই গত ২৪ ডিসেম্বর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে পড়লাম সিলেটের উরাং জাতির রাজাসহ সবার দুরবস্থার কথা। তাদের জমিজমা ভূমিদস্যুদের হাতে গ্রাস হতে হতে এখন বিশ শতাংশও নেই। স্বয়ং রাজা ও তাঁর পরিবার দারিদ্র্যের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছেন। একই অবস্থা সাঁওতাল-গারোসহ সমতলের ৪৩টি আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর। তারা ভিটোহারা, জমিহারা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর নারীরা অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে  এবং কোনো বিচারই পাচ্ছে না। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি দেশের আদিবাসী বলুন কি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলুন, তারা কেউ সুখে নেই।
খ্রিস্টান ও বৌদ্ধরা এতদিন এভাবে ভাবে নি, কিন্তু রামুর ঘটনা এবং যাজক ও গীর্জার ওপর হামলার পর তাদেরও মনে শান্তি ও সুখে টান পড়তে শুরু করেছে।
দেশের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আহমদিয়া সম্প্রদায় বেশ কয়েক বছর ধরে কট্টর সুন্নিদের হুমকি ও হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। বড়দিনে তাদের একটি মসজিদে বোমা-হামলা হয়েছে। একইভাবে দেশের আরেক ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায় শিয়াদের একটি মসজিদেও হামলা হয়েছে, মুয়াজ্জিন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন মুসল্লি আহত হয়েছেন। আমরা কি কেউ খবর নিয়েছি দেশে আরও যেসব মুসলিম ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আছেন, যেমন বাহাই, বোরা, ইসমাইলিয়া এঁরা কেমন আছেন? বাস্তবের আলামত বলে, তাদের মনে সুখ থাকার কথা নয়।
যদি আমরা শিশু রাজন, রাকিব, রবিউলদের কথা মনে করি তবে শিউরে উঠে কবুল করতে হবে এ সমাজ শিশুবান্ধব নয়। তাছাড়া শিক্ষা জীবন যেভাবে পরীক্ষা ও জিপিএ ৫-এর দাপটে কেবল কোচিং, মুখস্থ ও পরীক্ষার শৃঙ্খলে পরিণত হয়েছে তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনের সুখ নষ্ট করেছে। আর অপহরণ-মুক্তিপণ-নেশা-সাইবার অপরাধ-যানজটের মিলিত ফল হলো শিশুদের জীবনে নেই অবকাশ, নেই স্বাধীনতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে এদেশের শিশুরা শৈশবহারা, অসুখি। কিশোর-কিশোরীরাও একই বাস্তবের শৃঙ্খলে ও চাপে সুখি কৈশোর থেকে বঞ্চিত।
হয়ত বাস্তববাদী ভাবছেন - সুখ শান্তি মানসিক ব্যাপার, তা ব্যক্তিগত সাধনায় অর্জন করতে হয়। না আমরা জানি এ বাস্তব নয়, বাস্তবের বাহ্যরূপ মাত্র। কথাটা আমরা তুলেছি তুচ্ছ মানুষের নগণ্য জীবনের সামান্য চাহিদার আলোকেই। এ সমাজে যারা জীবনে ভোগের কিছুই না চেয়ে আপন আনন্দে সাধনমার্গে বিচরণ করতে চান সেই বাউল-ফকির পীর-মুর্শিদ সহজিয়া সাধকরাও কি সুখে আছেন? তাঁদের দাঁড়ি-চুল কেটে লাঞ্ছিত করা হয় নি? হুমকির মুখে রাখা হয় নি?
মুক্তচিন্তার মানুষরা জানেন তাঁদের পথটি দুর্গম। তবুও কেউ কি ভাবতে পারে এই একবিংশ শতাব্দীতে, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও, তাদের চিন্তা নয় জীবনই আশংকার মধ্যে থাকবে!
তদুপরি দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী, দু'বারের প্রধামন্ত্রী এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীই যদি দেশের জন্মযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেন, জাতির জনককে হেয় করেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের অবমাননা করেন তখন সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষের মনে সুখ থাকে কীভাবে?
দুটি সামান্য নগণ্য কথা বলে শেষ করতে চাই।
প্রথমত, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের যে চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে তাকে অস্বীকার করি না, বর্তমান সরকার যে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন উন্নয়নের পথে তাও অস্বীকার করার কারণ নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকরের কৃতিত্ব ভুলবার নয়, এবং এই কর্মযজ্ঞে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে যোগ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন তা-ও মানতে দ্বিধা নেই। এসব সাফল্যে অনেকের মত আমিও স্বস্তি পাই, আনন্দিত হই। এদেশের মানুষের, বিশেষত তরুণদের, প্রাণশক্তির ওপরও আমি ভীষণভাবে ভরসা করি। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাদেরই পক্ষে যে দেশের অর্থাৎ সমাজ ও সমাজমানসের প্রকৃত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব সে বিশ্বাস আমার আছে। ফলে আমি নিরাশাবাদী নই, এখনও আশাবাদী, তবে উদ্বিগ্ন আশাবাদী। আমাদের বুঝতে হবে সুখ, শান্তি সরকার একা এনে দিতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, সমাজকে প্রাচীন সংস্কারে বন্দি রেখে, নারীকে পুরুষতন্ত্রের দাপটে রেখে, শিক্ষাকে পরীক্ষার শৃঙ্খলে বেঁধে, গণতন্ত্রকে ক্ষমতার দুর্গে আটকে, চিন্তার গতিপথে অন্ধবিশ্বাসের অর্গল এঁটে সমাজমানসের রূপান্তর করা যায় না। মনের গহীনে আলো প্রবেশ না করলে অন্ধকার কাটবে কীভাবে? এমনটা চলতে থাকলে সে সমাজে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। আশংকার কথা, এদেশে মুক্তচিন্তার মানুষ তৈরিতে ভাঁটা চলছে, বিপরীত ¯স্রোত বরং বেশ জোরদার বলেই মনে হয়। সমাজের আলোকন (এনলাইটেনমেন্ট) ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ কাজ সরকারের নয়, সমাজের অগ্রসর মুক্তিচিন্তার মানুষের। তবে এই আলোকনের সাথে সাথে তাকে টেকসই ও তার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যে কাঠামোগত সংস্কার, পরিবর্তন, নবায়ন প্রয়োজন তা সরকারের দায়িত্ব। সে কাজ অনেকটা হচ্ছে বটে কিন্তু আলোকন ব্যতীত কেবল কাঠামোগত উন্নয়নে মানবিক সমাজ নির্মাণ হবে না। এসব কাজ আরব্ধ রেখে উন্নয়নের বাহ্যরূপে চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটলেও প্রকৃত সুখ অধরাই থেকে যাবে। সে রকম আলামত এ সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে - সেটাই ভয়ের বিষয়।


***