Sunday, July 12, 2015

ঈদ-রোজার বিবর্তন ও বাজার অর্থনীতি

আবুল মোমেন

টিভি প্রতিবেদক যখন জিজ্ঞেস করল - কেমন ছিল ছোটবেলার ঈদ, আর এখনই বা কেমন দেখছেন উৎসব?
ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই ওর সামনে বসেছিলাম। কিন্তু ওর প্রশ্নটা ধাক্কা দিল মনের জানালায় - খুলে গেল স্মৃতির ঝাঁপি। আর সেসব তুলে আনতে গিয়ে একালের পরিবর্তন আর তার কার্যকারণ, ধরণ ইত্যাদি চিন্তার জটিল গ্রন্থিও খুলতে থাকল। সেসবই পাঠকের সাথে ভাগ করে নেওয়া যায়।
সেকালে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধশতকেরও বেশি আগেকার কথা, রোজা ছিল ঘরোয়া পরিসরে পালনের বিষয়। তাই ইফতার হত বাড়িতে বাড়িতে। ইফতার পার্টির কোনো স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। বাবা তো শহরের গণমান্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সূত্রে অন্তত জানতে পারতাম। না, তেমন কিছু ছিল না। কালেভদ্রে সরকারি কোনো আয়োজন হয়ত হত, তার সাথে সংসারের মানুষের কোনো যোগ ছিল না।
সেকালেও ইফতারে ছোলা-পেঁয়াজি-বেগুনি ছিল, কোনো দোকানের জিলাপির সুনাম থাকলে সেটি হয়ত আসত। তবে বয়েসি খানদানি রোজদারদের পছন্দ ছিল চিড়া-কলা-দই মাখা। একটু ঠাণ্ড হলে ভালো। সেহেরিতে একটা মূল পদ আর সাথে ডালের বেশি নয়। মূল পদটি প্রায়ই কখনও মাংস কখনও ডিম। কেউ কেউ অবশ্য দুধভাত খেতেন, তাতে প্রায়ই কলা থাকত, তবে আমের দিনে আমই কলার জায়গা নিত।
প্রতিবেশী আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সাথে ইফতারের আদানপ্রদানটুকু ছিল ঘরের বাইরে রোজার সংযোগ। মাঝে মধ্যে আত্মীয়-বন্ধু দু’চারজনকে ইফতারের আমন্ত্রণ জানানো হত। তাদেরই ডাকা হত যারা এলে ঘরোয়া আমেজ ক্ষুণ্ন হয় না। সবাই জানত রোজায় আড়ম্বর মানায় না। প্রায়ই পরিচিত গরীব আর ভিখিরিদের ডেকে ইফতার দেওয়া হত। এসব ও যাকাত দেয়া হত নীরবে, নিবৃত্তে। বিবাহিত কন্যা ও বৈবাহিকদের বাড়িতে ইফতারের তত্ত্ব পাঠানো হত।
ঈদ ছিল সামাজিক উৎসব। ছোটদের মধ্যে নতুন জামা নিয়ে চাঞ্চল্য ছিল, বেড়ানোর উৎসাহ আর পরিকল্পনা তাতে উত্তেজনা ছড়াত। কিন্তু তা কখনও ঘরের বা বৃহত্তর স্বজনের পরিধি ছাপিয়ে যেত না। সচরাচর একজনের একটার বেশি জামা হত না, ছোটদের আর মেয়েদেরগুলো বাড়ির সেলাইয়ে-পাকা বুবু-খালা-চাচিরাই তৈরি করে দিতেন। ছোটদের কাজ ছিল তাদের কাছে ঘুরঘুর করা, হাবভাবে তাগাদার আর্জি ফুটিয়ে তোলা। ছেলেরা আর বড়রা যেত পাড়ার দর্জির কাছে। ঈদের সকালে প্রতিবেশীদের সাথে সেমাই বিনিময় হত, আমরা প্রতিবেশী ও আত্মীয়বাড়ি বেড়াতাম, আর দুপুরে নিজের বাসায় ভালো খেতাম। পোলাও-মুরগিই হত মূল পদ। তখন খাবারে বা পোশাকে বাড়াবাড়ি মানুষ তেমন জানতই না। পোশাক বা খাবারের জলুসে নয়, বিচার যদি হত তা হত আতিথ্যের, আন্তরিকতার। কাজীবাড়ির চাচি কেমন মায়া করে খাওয়াতেন সে গল্প বাড়ি এসে মাকে বলতাম। স্বাদু খাবারের স্বাদ বাড়ত ছোটনানির স্বতস্ফূর্ত স্নেহের ফল্গুতে।
আমি গৎ বাঁধা ভাবনার মানুষ নই। সেকাল ভালো আর একাল খারাপ - এমন ভাবতে এবং ফতোয়া দিতে অভ্যস্ত নই। জানি যার যার শৈশব-স্মৃতি তার কাছে মধু-মাখা, ভোলার নয়, সেইসব স্মৃতি সততই সুখের। এও আমরা জানি কালে-কালে মানবজীবনে পরিবর্তন ঘটবেই। কথা হল তার কতটা ভালো হচ্ছে, কতটা কীভাবে আমরা নিজেদের মত করে সংস্কার করে নিতে পারতাম। সেদিক থেকে একটু তুলনা এবং ভাবনা চলতে পারে বলেই মনে হয়।
এখন বাজার অর্থনীতির রমরমা, বাজার মানুষের ব্যক্তিগত, এমনকি পবিত্রতম জায়গাতেও ঢুকে পড়ছে। বাজারের সহযোগীর বা উপজাতের ভূমিকা নিচ্ছে গণমাধ্যম। রোজা এলে এখন উপবাসের গুরুত্ব ছাপিয়ে ইফতারের প্রলোভনের পসরা সবটা জাঁকিয়ে বসে। এমনিতেই গণমাধ্যমে ইদানীং জনপ্রিয়তায় শীর্ষ অনুষ্ঠানের একটি হল রান্না অর্থাৎ মুখরোচক খাবার। রসনা ও ভোজনবিলাস মানুষের আদিম রিপু। তবে রোজার নৈতিক অবস্থান হল মানুষের অসংযত রিপুকে সংযত করা। কিন্তু বাজার ও গণমাধ্যমের যোগসাজশে রমজানের সারাটা মাস জুড়ে চেষ্টা চলে মানুষের ভোগের রিপুকে অসংযত করে তোলার - পত্রিকায় প্রতিদিন আর ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বিপুল আয়োজনে প্রায় সারাক্ষণ এই চেষ্টাই চলতে থাকে।
একজন মানুষ কত খেতে পারে, আর তার কতটা খাওয়া উচিত তার একটা সীমা নিশ্চয় আছে, থাকা উচিত। সারাদিনের উপবাসের পরে কোন ধরনের খাবার খাওয়া উচিত এসব যদি বিবেচনায় আসেও তা আসে কিন্তু প্রলোভনের ফাঁদটা ঢাকার জন্যে, কারণ মূল বিবেচ্য বিষয় কী করে মানুষকে বেশি বেশি খেতে প্রলুব্ধ করা যায়। কাউকে প্রলোভন দেখানো - বিশেষত সংযম শিক্ষা ও পালনের মাসে - উচিত কিনা তা একবার ভেবে দেখা যায় না?
দেখা যাচ্ছে মানুষ নিজের মান রক্ষার মানদ- হিসেবে ধরে নেয় ইফতার আইটেমের সংখ্যা এবং দামের ওপর, ফলে প্রায়ই দেখতে পাই - মাসটা উপবাস ও সংযমের হলেও এটি কাটাতে বাড়তি বাজেট লাগে। ইদানীং ঢাকায় রোস্তোরায় সেহেরি খাওয়ারও ফ্যাশান চালু হয়েছে। মাঝরাতে বা শেষরাতে অভিজাত পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেহেরি অভিযানে বেরুচ্ছে। বৈচিত্রের সাথে একটু বাড়তি রোমাঞ্চও যোগ হল, অবশ্যই উচ্চ মূল্যে এবং মাত্রাতিরিক্ত ক্যালরি অর্জনের বিনিময়ে - খারাপ কী!
আজকাল ঈদের কেনাকাটা রোজার অনেক আগে থেকেই শুরু করে মানুষ। বাজারই রুচি, ফ্যাশন তথা কেনাকাটার নির্ধারক। বাড়িতে আবার কেউ জামা সেলাই করে নাকি? সেসবে পারদর্শী বুবু-খালা-চাচিরা বর্তমানে বিলুপ্ত প্রজাতি। অথবা তাঁরাই হয়ত এখন একালের বুটিক মালিক-কাম-ডিজাইনার। এখনকার নীতিকথাও গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনই নির্ধারণ করে দিয়েছে - আগে ছিলাম বোকা এখন হইছি বুদ্ধিমান। বৈষয়িক উন্নতির পিছনে নিরন্তর বুদ্ধি খাটাতে থাকলে তাতে নিশ্চয় শান পড়ে, এবং বাজারের আঁটঘাঁট বোঝা হয়ে যায়। বুদ্ধির প্যাঁচ এবং চালাকির মারে কেউই পিছিয়ে থাকে না আর। কিন্তু এভাবে চললে বুদ্ধিরই বাড়বাড়ন্ত হবে, আর তার জের ধরে মানুষটার চাতুর্য, শঠতাও বাড়বেই। বিপরীতে কোন জিনিসটা পিছিয়ে যাবে? পিছিয়ে পড়বে বিবেচনা, প্রকৃত বুদ্ধি, যা শুধু ব্যবসাকে নয়, তার পেছনের মানুষটাকেও সমৃদ্ধ করে। কিন্তু বাজারের খপ্পরে পড়ে মূলধন তথা বিনিয়োগের সর্বোচ্চ মুনাফা আদায়ের মন্ত্রে মশগুল মানুষ চালাক-চতুর হওয়ার দৌড়েই এগুতে চায়। সেদিন কোনো চ্যানেলের ঈদ-বাজার পরিক্রমার বিশেষ অনুষ্ঠানে একজন সবাইকে টেক্কা দিলেন দামে, তাঁর দোকানের শাড়ির সর্বনিম্ন মূল্য দেড়লক্ষ টাকা, আর পাঞ্জাবির তিন কি চার হাজার টাকা!
ফলে টিভি প্রতিবেদক যখন আমাকে প্রশ্ন করল আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য কিছু দেখেন কিনা ঈদের আয়োজনে, তখন প্রথমে একটু তাত্ত্বিক কথা বলে পরে আসল কথাটা পাড়লাম। তাত্ত্বিক কথাটা সামান্য। একালে যোগাযোগে সত্যিই একটা বিপ্লব ঘটেছে - তা সড়কে-উড়ালে যেমন তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণেও, মানুষের চলাচলও অনেক বেড়ে গেছে। বললাম শিল্প বিপ্লবোত্তর আধুনিকতার একটি বৈশিষ্ট্য হল সর্বজনীনতা (universality) এবং সামান্যিকরণ (generalisation)- অর্থাৎ সবকিছু সবার কাছে পৌঁছায় আর সবার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাযুজ্য তৈরি হওয়ার প্রবণতা জোরদার হতে থাকে। এটা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং বৈশিষ্ট্য রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি স্বরূপ। কিন্তু এটাই ট্রেণ্ড বা চলতি-হাওয়া। ব্যক্তিগত  অভিজ্ঞতা আর গণমাধ্যমের প্রচারণায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বিশেষত্বেও পরিবর্তন ঘটছে। ফলে ঈদের আয়োজনে বা ইফতারের আয়োজনে সবাই কাছাকাছি চলে আসছে, ব্যক্তির বিশেষত্ব কমছে। মূল কারণ বাজারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। আদতে বাজারই বলে দিচ্ছে এ বছরের ঈদের আয়োজনে কোন কোন আইটেমের কদর বাড়বে। একই কথা খাটে ইফতারের ক্ষেত্রেও। তাই প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে জানাতে হল - এখন পার্থক্য ঘটে ট্যাঁকের শক্তির ওপর। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের অধিকাংশ মানুষের ঈদ শপিং-এর ঠিকানা ঢাকায় গাউছিয়া আর চট্টগ্রামে টেরিবাজার, রেয়াজুদ্দিন বাজার। যেগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ও মিডিয়া ব্যক্তিরা চেঁচিয়ে মরেন সেখানে হাত দেওয়ার সাধ্যি নেই তাদের। আর দেশে এখনও সংখ্যায় কম নয় দরিদ্র মানুষ - জনসংখ্যার ৩০ ভাগ - যারা নিজের উপার্জনে রোজা বা ঈদের বিশেষ সংস্থান করতে পারে না। তাদেরই ২৭ জন এবারে প্রাণ দিলেন জর্দা-খেকোদের কল্যাণে হঠাৎ-নবাবের বাড়ির দরজায় তাঁরই বড়লোকি অবিমৃষ্যকারিতায়।
শেষ কথা : উপলক্ষের মূল শিক্ষা আর মৌলিক মানবিক নীতিবোধ বাদ দিয়ে কোনো উৎসব, ব্যবসা, উপলক্ষকে মানবিক রাখা মুশকিল। মনে মনে জানি, মুশকিল বললে কম বলা হয়, আদতে অসম্ভব।

***




Saturday, July 11, 2015

দুই প্রজন্মের আওয়ামী লীগ

আবুল মোমেন
১.
আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সনে। মাত্র দু’বছর আগে জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ সব স্তরের বাঙালি মুসলিমকে পরাধীনতা আর সামাজিক পশ্চাৎপদতার গ্লানি থেকে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর করেই ধর্মীয় জাতীয়তার রাজনীতিতে টেনে পাকিস্তান এনেছিলেন। তরুণ শেখ মুজিবও ছিলেন মুসলিম লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তান বাঙালির জন্যে নতুন পরাধীনতা ও নতুনতর পশ্চাৎপদতা সৃষ্টি করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই উত্তর-পশ্চিমের দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণের জাতগুলো অপেক্ষাকৃত কৃশকায় শ্যামবর্ণের বাঙালিকে - কি মুসলমান, কি হিন্দু-হীন জাতি হিসেবে অবজ্ঞা করে এসেছে। তাছাড়া উপমহাদেশে ইসলামের অ্যাকাডেমিক চর্চা হয়েছে উর্দুতে এবং ব্রিটিশ শাসকেরা উত্তর-পূর্বের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলের শিক্ষার মাধ্যম করে দিয়েছিল উর্দুভাষা। ফলে মুসলমানদের জন্যে সৃষ্ট দেশের শ্রেয়তর নাগরিকের দাবিতে মুসলিম লীগের অবাঙালি প্রভাবাধীন নেতৃত্ব বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গকে উপনিবেশের দৃষ্টিতেই দেখেছে। তাদের জন্যে কাজটা সহজ হয়েছে বাঙালি অভিজাতদের মজ্জাগত হীনম্মন্যতা ও পরশ্রীকাতরতার কল্যাণে। হীনম্মন্য অভিজাতরা ক্ষমতাধরদের তোষামোদ ও চাটুকারিতায় ভোলাতে চেয়েছেন, এবং আত্মসম্মানের বিনিময়ে নিজেদের জন্যে ক্ষমতার কিছু প্রসাদ জুটিয়ে নিয়েছেন। আবার মজ্জাগত পরশ্রীকাতরতার কারণে তারা পরস্পর কলহে লিপ্ত থেকেছেন, ফলে এই ক্ষয়িষ্ণু বাঙালি নেতারা কেন্দ্রে কখনও ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন নি।
আমরা জানি ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলার নিম্নবর্গের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে, রাজা ও রাজন্যদের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির দু’বছরের মাথায় গঠিত দল আওয়ামী লীগকে বলা যায় সর্বসাধারণের রাজনৈতিক মঞ্চ। মওলানা ভাসানী এ দলের সভপতি হিসেবে যথার্থই ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ-ত্যাগী অভিজাতদের নিয়ে দল প্রায়ই সমস্যায় পড়েছে। দলে সাধারণদের মুখপাত্র ছিলেন তরুণ সংগঠক মুজিব। পালযুগে কৈবর্ত বিদ্রোহে যেমন বিদ্রোহী জেলেদের নেতা ছিলেন দিব্যক, ব্রিটিশ যুগে বিদ্রোহী চাষীদের নেতা ছিলেন নূর আল দীন বা তিতুমীর তেমনি এ সময়ে মুুজিব যেন বাংলার বঞ্চিত নিপীড়িত সাধারণের নেতা হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করলেন। সাধারণের এই নেতা এক পর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছেন দলের অভিজাত নেতাদের নিয়ে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ক্ষুব্ধ নেতা লিখেছেন, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়। (পৃ. ২৭৩)
২.
দুটি কারণে আওয়ামী লীগ এদেশের উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে এই শ্রেণি পাকিস্তানের শাসকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন প্রত্যাশা করছিল এবং সব শ্রেণির অন্তর্ভুক্তিমূলক বঞ্চনামুক্ত সমাজের স্বপ্ন তাঁদের অধিকাংশকে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত করেছিল। এই সচেতন দেশপ্রেমিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি জাতীয়তাবাদী জাগরণের জন্যে উন্মুখ ছিল। ততদিনে পরিণত দূরদর্শী শেখ মুজিব এদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল প্রবক্তা এবং প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। জননায়ক শেখ মুবিজকে ঘিরে গণজোয়ার এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একসময় বামপন্থী দলগুলোর জন্য হয় তাঁর সহযাত্রী হওয়া নয়ত বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য গতির উপায় থাকল না।
সেদিনে পরিস্থিতিই গণতান্ত্রিক দলে এবং গণতন্ত্র-প্রত্যাশী সমাজে একক নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারই অনুষঙ্গ হয়ে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। চুয়ান্নর নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে এখানে মুসলিম লীগের সংগঠন ভেঙে পড়েছিল, তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতার প্রসাদ দিয়ে টিকিয়ে রাখছিল মাত্র। ফলে বিরোধী দল হলেও তখন থেকেই আওয়ামী লীগ এদেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের সবটা জুড়েই তৎপর ছিল। এটা রাষ্ট্রীয় না হলেও দলের সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। আর পূর্ববঙ্গে পুরো ষাটের দশক জুড়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংকুচিত ও সমাজের ক্ষমতা প্রসারিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ তখন থেকেই এদেশের বড় দল, ক্ষমতাধর দল। দীর্ঘদিন এই অবস্থানে অভ্যস্ত দলের নেতা-কর্মীরা স্বভাবতই ক্ষমতাধরের মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছে। যার যার পরিসরে কর্তৃত্ব, মুরুব্বিয়ানা এবং সেই সূত্রে সাঙ্গপাঙ্গসহ নিজস্ব কায়েমি স্বার্থের ক্ষমতাবলয় তৈরির প্রবণতা দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। এ প্রবণতাকে ঠেকানোর অস্ত্র যে-রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো তাকে অকার্যকর করে রাখার বিষয়ে এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগসাজশ ঘটবেই। এর বিষময় ফল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর থেকেই ভোগ করছে। হয়ত এখন তা আরও বেড়ে গেছে। আমরা সরাসরি আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে হয়ত বলতে পারি, দেশকে এই অগণতান্ত্রিকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত কারার দায়িত্ব আপনাদেরকেই নিতে হবে। মনে হয় না এতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব অখুশিও হবেন। কারণ এতে তো মান্যতাই প্রকাশ পায়, যাচ্ঞা করার মত আর কোনো বিকল্প আজও তৈরি না হওয়া তো তাদের জন্যে শ্লাঘারই বিষয়।
৩.
গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের জন্যে যারা প্রাণপাত করছি তারা কেন এই ক্ষমতাধর দলের বিকল্পের - যদি শূন্যতা নাও বলি - সংকট নিয়ে কথা বলছি না ? ১৯৪৮ এর জানুয়ারি থেকে - অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসের মাথায় - রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে নতুন জাতির ভ্রুণ তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের ভিতর দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার কাক্সিক্ষত পরিণতি কি বিএনপি নিশ্চিত করতে পারে? বিএনপি আন্দোলনের প্রশ্নে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। কিন্তু কেবল যুদ্ধাপরাধ নয় এ দল তো আদতে গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না, ধর্ম ও লিঙ্গ-সমতাও তো মানে না যা গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত? সে দলকে সঙ্গে রেখে কী করে বায়ান্ন থেকে একাত্তরের লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ হবে? যদি বিএনপির শক্তিশালী সক্রিয় সংগঠন থাকত তাহলে জামায়াতকে ক্ষমতার অংশীদার করা নিয়ে ততটা আশংকা থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হল বিপুল সমর্থক আছে বিএনপির, আর সংগঠন রয়েছে জামায়াতের। ফলে ক্ষমতার ফায়দা তারাই অনেক বেশি উশুল করবে। আর আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে যেসব জঙ্গি গোষ্ঠী আজ মানবতাবিরোধী মারাত্মক সন্ত্রাস চালাচ্ছে তার শাখা-প্রশাখা এই মুসলিমপ্রধান দেশেও তো ছড়াচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তারা প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হবে, কারণ জোটের অগ্রাধিকার পাবে আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার পাল্টা প্রতিশোধ।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত করতে অবশ্যই আওয়ামী লীগের বিকল্প দল চাই। সে দল আওয়ামী লীগের চেয়েও এগিয়ে রাজনীতি করতে পারে যদি তারা একদিকে রাজনীতিতে সমাজের নিম্নবর্গের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্যদিকে ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়ার বিপর্যয়কে মাথায় রেখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তার আদর্শকে ধারণ করে। বলে রাখা দরকার, বিগত ৬৬ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে দলটি অত্যন্ত সজীব, এবং বাস্তবতা অনুধাবনে দক্ষ, এমনকি প্রয়োজনে সৃজনশীল হতেও সক্ষম। এভাবে দলটি ষাটের দশকেই বামপন্থীদের প্রায় অকেজো করে ফেলেছিল, এখন ইসলামপন্থী রাজনীতির ঘরে হানা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর এই দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্যাদার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। আওয়ামী লীগ তার চেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক দলের জায়গা প্রায় পুরোপুরি দখল করে এখন তার চেয়ে পশ্চাৎপদ দলের জায়গায়ও দখল বাড়াচ্ছে। তা তাকে করতেই হচ্ছে কারণ সেদিকে সমর্থক-ভোটারের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়। পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি আর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোরতার মাধ্যমে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও ধরে রেখেছে। এটাই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অকৃতকার্য হয়েও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নিশ্চিত থাকার কারণ।
ফল হল এই, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্রয়ে-আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতা ভোগ করে যাওয়ার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। মধ্যপন্থী দল হওয়ার সামর্থ্য রেখেও নিজের শক্তিতে নিজের স্বতন্ত্র জায়গাটি ধরে একা দাঁড়ানোর সাহস নেই বিএনপির। ফলে আপাতত পাল্টা প্রশ্ন হল একা হাসিনা কি দলে ভিড়ে থাকা উচ্চাভিলাষী, ভাগ্যান্বেষী তরুণ বা পাতিনেতাদের সামলাতে পারবেন? মনে হয় না এটা সম্ভব। এদের হাতে দিনে দিনে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং তাতে তিনি তো ভুগবেনই, ডুববে দেশ। এতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী ক্ষমতা, অধিকতর ক্ষমতার নিশ্ছিদ্র সুরক্ষায় বন্দী হয়ে যাবেন, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যদের স্বাধীনতাও হ্রাস পাবে, গণতন্ত্র আরও সংকুচিত  হবে। তাছাড়া তলে তলে রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকবে।
তাহলে বাংলাদেশ কি আপাতত আওয়ামী লীগপন্থী ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনীতিতে বিভক্ত হয়েই থাকবে? মনে হয় নাগরিক সমাজ এক্ষেত্রে কিছু করতে পারে। এক. আওয়ামী লীগের ওপর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও দল-পরিচালনার প্রক্রিয়া প্রবর্তনের জন্যে চাপ তৈরি করতে পারে। দুই. রাজনীতিকে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্ত্র ও কালোটাকা থেকে মুক্ত রাখার জন্যেও চাপ তৈরি করা যায়। তিন. ইসলামের প্রকৃত মানবিক সহনশীল রূপটি তুলে ধরে মুসলিমসমাজেও যে বহুমতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যুগপৎ ইসলাম ও সুশাসন ভালোভাবেই বিকশিত হতে পারে তার পক্ষে জনমত তৈরি করতে পারে। চার. পুরোনো সমাজব্যবস্থা ও ধ্যানধারণার অচলায়তন ভেঙে সমাজের নবায়ন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানবিক বিকাশমান সমাজ কায়েমে কাজ করতে পারে। ইতিহাসের আলোকে গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের ধারা এবং ধর্মান্ধ রক্ষণশীল সমাজের সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা করে দেখা উচিত।
কোনো সমাজ যথার্থভাবে গণতন্ত্রের উপযোগী হয়ে উঠলেই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। এমনকি সে কাজ শেখ হাসিনাও করতে পারেন যদি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বেড়াজাল তিনি ভাঙতে চান।
***


Saturday, July 4, 2015

৬৬ বছরের আওয়ামী লীগ

আবুল মোমেন

দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সম্প্রতি দলের ৬৬ বছর পূর্তি উদযাপন করল। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠনে শেখ হাসিনা বলেছেন দেশে দুটি রাজনৈতিক ধারাই আছে - আওয়ামী লীগ ও এন্টি আওয়ামী লীগ। এ কথা তিনি আগেও বলেছেন, নাগরিকসমাজেরও কেউ কেউ একই কথা বলে থাকেন। কথাটা ভুল বা মিথ্যা নয় বলেই মনে হয়।
মুসলিম লীগের বিকল্প হিসেবেই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের চিন্তা মাথায় এসেছিল মওলানা ভাসানি, শামসুল হক, শেখ মুজিবের। সেজন্যেই তাঁরা মুসলিম লীগ নামটির আগে বিশেষণ হিসেবে আওয়াম বা সাধারণ জনের কথাটা যুক্ত করেছিলেন। মুসলিম লীগে ভীড় করেছিলেন ভারতবর্ষের মুসলমান অভিজাতরা। বাঙালি মুসলিম সমাজে তখন বংশগত অভিজাত পরিবার কম। এখানে কৃষক পরিবারের শিক্ষিত সন্তানরাই মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে অভিজাত্য গৌরব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলে জনবিচ্ছিন্ন ছিল মুসলিম লীগ। তাই অবিভক্ত ভারতে বাংলা-ভিন্ন পাকিস্তানে যুক্ত হওয়া অন্য কোনো প্রদেশে মুসলিম লীগ বিজয়ী হতে পারে নি।
মুসলিম লীগ সমাজ থেকে উঠে আসা দল নয়। মুসলমানদের সেরকম সংগঠনও ছিল, যেমন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ, তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া, মুসলিম সাহিত্য সমাজ, রেনেসাঁ সোসাইটি ইত্যাদি। কিন্তু এদের শেষের দুটি অরাজনৈতিক সংগঠন, অন্য দুটির রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রধান এজেণ্ড ছিল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম। ফলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার হিন্দু মুসলিম উভয় স্বাধীনতাকামীর বিপক্ষে দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই সৃষ্টি করেছিল মুসলিম লীগ। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট দল ক্ষমতা বা ক্ষমতার প্রসাদ ভিন্ন টিকে থাকতে পারে না। তদুপরি পড়ে পাওয়া ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে কামড়া-কামড়ি হওয়াই স্বাভাবিক। এ হল অভিজাতদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। তাতে রাজনীতিতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, স্বার্থের চক্রান্ত, আপোসকামিতা, লেজুড়বৃত্তি, রাজনীতিকদের ডিগবাজি খাওয়া ইত্যাদি নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই এসব খেলা শুরু হয়ে যায়। তাতে অন্তত তরুণ শেখ মুজিব বুঝেছিলেন এসব নেতাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার রাজনীতি হবে না। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে খেদের সাথে এই উপলব্ধির কথা তিনি লিখেছেন - ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ (পৃ. ২৭৩) তাঁর এ উপলব্ধি অবশ্য আরও পরের, চুয়ান্ন সনে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে কেন্দ্রীয় সরকার এদেশে ৯২/ক ধারা জারি করার পর নেতাদের ভীরুতা, আপোসকামিতার পরিপ্রেক্ষিতে।
কিন্তু সংবেদনশীল, সাহসী, জনদরদী এই রাজনৈতিক কর্মী গোড়া থেকেই নেতৃত্বের এই দোদল্যমানতা ও স্বার্থকামিতা খেয়াল করেছেন। ফলে মুসলিম লীগের বিকল্প দল গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্যে। সেভাবে দলটি আওয়াম মুসলমান বা আমমুসলমান অর্থাৎ মুসলিম জনগণের দল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরে ভাষা আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্টের অভিজ্ঞতায় তিনি উপলব্ধি করেন পূর্ব বাংলাকে ঘিরেই তাঁর রাজনীতি আবর্তিত হবে। ফলে তার রাজনীতির জন্য মুসলমান পরিচয় নয় বাঙালি পরিচয়ই হল প্রধান বিষয়। এভাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ পড়ল। এ দলটি হয়ে উঠল ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে আম বাঙালির দল। রাজনীতির হাল ধরেই শেখ মুজিব একজন রাজনৈতিক কর্মী থেকে জাতির নায়ক ও পিতা হয়েছেন। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের বিকল্প দল থেকে বাঙালিমাত্রের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল।
তবে ইতিহাসের পথ অনেক দূর পাড়ি দিয়েও বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয়ের সংকট আজও কাটাতে পারে নি। এই মুসলিম আইডেন্টিটি আর তার সাথে ক্ষমতার ষড়যন্ত্র বরাবর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকিয়েছে। নানা নামে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ বা এই মুসলিম আইডেন্টিটির রাজনীতি পাকিস্তান আমল জুড়ে এ কাজ করেছে।
বাংলাদেশেও এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় নি। ১৯৭৫ এর পরে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের মত ঠিক এই কাজটি করেছেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের গর্ভেই যেমন  আইউবের কনভেনশন লীগের জন্ম তেমনিভাবে জন্ম জিয়ার বিএনপির। আইউব যেমন দল গঠনের আগে রাজনীতিবিদদের জন্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে এবডো (ইলেকশন বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার) জারি করেছিলেন জিয়াও তাঁর দল গুছানোর সময় নেওয়ার জন্যে সরাসরি রাজনীতিই নিষিদ্ধ করেছিলেন। উভয় সরকার-প্রধানই প্রগতিশীল শক্তির জন্যে জেলজুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, উভয় জেনারেলেরই মূল টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগকে শায়েস্তা করা। একজন বিশেষভাবে জীবিত শেখ মুজিবকে নানাভাবে বিনাশের চেষ্টা করেছেন। আরেকজন নিহত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন থেকে গেলেন, আর অনুপস্থিত নেতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রতিবারই আওয়ামী লীগ সকল বাধা ডিঙিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়েছে, পরিস্থিতি সামলেছে।
বর্তমান বাস্তবতায়ও আমরা দেখছি ক্ষমতায় বসে জেনারেলরা যে দুটি দল তৈরি করেছেন তাদের পক্ষে কোনো কালে নিজস্ব রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংগঠন দাঁড় করানো সম্ভব হয় নি। মুসলিম লীগ যেমন ১৯৫৪ সনে প্রদেশে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জায়মান বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সামনে দাঁড়াতে পারেনি কখনও, বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত বিএনপিও সরকারি চাপে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েছে। এ বিপর্যয় দলটি কাটাতে পারবে কিনা বলা মুশকিল। আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে সরকারের লেজুড় হয়েই টিকে থাকতে হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে এটি একদিকে একটি প্রতারক ফাঁদ আর অন্যদিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। প্রতারক এ জন্যে যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার এ দলগুলো দুর্বল হওয়ার অর্থ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পথ নিরঙ্কুশ হওয়া নয়। কারণ রাজনীতির এত চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং সর্বস্তরে বিশ্বায়ন-আধুনিকায়নের প্রভাব পড়া সত্ত্বেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এখনও আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি কাটাতে পারে নি এবং তাই এদেশের রাজনীতিতে ইসলাম ও ধর্মান্ধতার ভূমিকা থেকে যাচ্ছে। ফলে এর মধ্যে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থেকে যায়। আর এর বিপজ্জনক দিক হল, যদি প্রতিপক্ষ-শক্তি দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ে, তবে ক্ষমতাসীন দলের হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা পুঞ্জিভূত হয় এবং তাতে তাদের ফ্যাসিবাদী রূপ ধারনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বলা বাহুল্য, এতে গণতন্ত্র সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, দেশের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে যায়। তাই যেকোনো অবস্থাতেই দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে আজ অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তাঁদেরই গণতন্ত্র রক্ষা ও এর বিকাশে সক্রিয় এবং সোচ্চার হতে হবে।

***

Thursday, June 25, 2015

ক্রিকেট কীর্তির সূত্র ধরে

আবুল মোমেন

ক্রিকেটে বাংলাদেশ আর তলানির দেশ নেই। বড় দলের তকমা লাগবে এবার। কেমন হেসেখেলে দুটি ম্যাচে হারিয়ে দিল ভারতকে। সামনে ধবল ধোলাই বা বাংলাওয়াশের হাতছানি। যেভাবে খেলছে দল তাতে সে সম্ভাবনাটাই বেশি বলে মনে হচ্ছে সবার। সত্যি বলতে কি এই বদলে-যাওয়া বাংলাদেশকে দেখে ভারতীয় দলের খেলোয়াড় এবং টিম ম্যানেজমেন্ট রীমিত থ’ হয়ে গেছে। ওদের ম্যানেজার রবি শাস্ত্রী বাকপটু মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু পরাজয়ের পর থেকে মিডিয়াতে তাঁর টুঁ শব্দটিও শোনা যাচ্ছে না।
ভারতের সাথে এবারের ক্রিকেট লড়াইটার যেন বাড়তি উত্তেজনার পটভূমি রয়েছে। তা সবার জানাও আছে। সেই বিশ্বকাপে আম্পায়ারের অবিচারের ক্ষতটা সারানো দরকার ছিল বাংলাদেশের। ক্ষতটিকে আবার কাঁচা করেছে ভারতীয় বৈদ্যুতিন মাধ্যমের একটি বিজ্ঞাপনও। তবে যারা ক্রিকেটের অন্দরের খবর রাখেন তাদের মনে বিশেষ ক্ষোভ ছিল অন্য একটি কারণে। বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে বারো বছরের  বেশি হতে চলল, অথচ এখনও ভারতের মাটিতে কোনো সিরিজ খেলার আমন্ত্রণ পায় নি। বর্তমানে ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ায়ও রীতিমত দুটো সিরিজ খেলা হয়ে গেছে। ভারতই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট খেলেছে ঢাকার মাটিতে। বাংলাদেশের টেস্ট খেলুড়ে দেশের স্বীকৃতির সময় ভারতীয় ক্রিকেট জগতের বড় সংগঠক জগমোহন ডালমিয়া আইসিসির সভাপতি। শোনা যায় এ স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল অনুকূল। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরও সমর্থন পেয়েছিল বাংলাদেশ। এ কথা আমরা অবশ্যই মনে রাখি, মনে রাখব।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশ যেন আর পাচ্ছে না। এ যেন বড় প্রতিবেশীর সাথে ছোট প্রতিবেশীর সম্পর্কের টানাপোড়েনের সেই পুরোনো ইতিহাস। এমনটা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা যায়। বাংলাদেশের সাথে ভারতের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এতটাই বাস্তব, পুরোনো এবং চলমান যে তাকে কারুরই অস্বীকার করবার উপায় নেই। পাকিস্তান এই সম্পর্ককে অস্বীকারের ধারা বজায় রাখতে গিয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ অবধি দেশটি স্থিতিশীল হল না। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও সুষ্ঠু কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়ায় নি, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান মারাত্মক, পুরোনো সামন্তব্যবস্থা এখনও চলমান। তদুপরি ধর্মীয় মৌলবাদ ও সশস্ত্র জঙ্গিবাদ সমাজজীবনকে পঙ্গু করে রেখেছে। এখনও ক্রিকেটে স্বীকৃত কোনো দল পাকিস্তানে খেলতে যাচ্ছে না।
সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নানান চুক্তির জন্যেই কেবল এ কথা বলছি না। এবারই প্রথম অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দু’দেশের সীমার বাইরে আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তৃত করেছেন দু’দেশের নেতৃত্ব। এতে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যাতে ভারত বাস্তব কারণেই বড় শরিক, কিন্তু অন্যান্য প্রতিবেশীরাও সঙ্গে থাকছে।
ভারত-পাকিস্তান চিরবৈরিতার কারণেই প্রতিষ্ঠার পরে তিন দশকের বেশি অতিবাহিত হলেও সার্ককে কার্যকর করা গেল না। প্রয়োজন পড়ছিল একে পাশ কাটিয়ে হলেও বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভূটানের মধ্যে অন্তত বাণিজ্যিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত করা। ভূটান ও নেপাল ল্যাণ্ডলকড্ বা ভূমিবদ্ধ দেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যও তাই। তাদের জন্যে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হবে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেলে। এবারে সেই পথের জট খুলতে শুরু করেছে।
চীনও আমাদের কাছের দেশ - ভৌগোলিক এবং ব্যবসায়িক ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে। বহুদিন ধরেই চীন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পূর্বাঞ্চলীয় কুংমিং প্রদেশ পর্যন্ত একটা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। ফলে চীন চায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্র বন্দর বানানোয় শরিক হয়ে সাগর ঘিরে সৃষ্ট নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় ভালোভাবে শরিক হতে। বঙ্গোপসাগরে চীনের এই সবল উপস্থিতির সম্ভাবনা আবার জাপান এবং ভারতকে কিছুটা শংকিত করে তুলেছে। আ মাদের বন্ধুপ্রতিম তিনটি শক্তিশালী দেশের মধ্যেকার এই টানাপোড়েনের মধ্যমণি বাংলাদেশ। এখানে বাংলাদেশের জন্যে জটিল আবার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার অবকাশ তৈরি হয়েছে। এবারে বাংলাদেশকে কূটনীতিতে সত্যিকারের পরিপক্কতা দেখাতে হবে, অনেকটা যে পরিপক্কতা আমাদের ক্রিকেটাররা দেখাল খেলার মাঠে। তারা দক্ষতা, একাগ্রতা, বিচক্ষণতা মিলিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও কেমন করে জয়ী হতে হয়।
পাকিস্তান একসময় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বরফ গলানোর কাজ করেছিল। চীন-ভারত শীতল সম্পর্কও বেশ পুরোনো। তবে নয়াভারত গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদী চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও গতিশীল করে নিতে চান। বাংলাদেশ উভয় দেশেরই বন্ধুত্ব কামনা করে, জাপানকেও পাশে পেতে চায়। তাদের মধ্যেকার স্বার্থের দ্বন্দ্বে আমরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হই সেদিকটা দেখাই আমাদের বড় কাজ। এ কাজ খানিকটা সহজ হবে যদি আমাদের আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিসর আরও বাড়িয়ে নিতে পারি আমরা। তাতে ভারত-চীন, ভারত-জাপান সম্পর্কও সহজ হবে এবং কার্যকর থাকবে। বাংলাদেশ এ উদ্যোগের মূল লিয়াজোঁর ভূমিকা পালন করতে পারে ।
ভারত ছাড়া মিয়ানমারই অপর একটি দেশ যার সাথে আমাদের সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। তাদের সাথে সমুদ্র সীমার বিবাদ আন্তর্জাতিক আদালতে মিটলেও দেখা যাচ্ছে দু’দেশের সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হচ্ছে না। পথের বাধা হয়ে আছে রোহিঙ্গা সমস্যা। সেনাশাসিত মিয়ানমারে এমন এক বৌদ্ধ উগ্রবাদের জন্ম হয়েছে যা সেদেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্যে মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সরকারি বাহিনির ভূমিকাও একই। হিংসাত্মক আক্রমণের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। প্রাচীন বার্মার আরাকান অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানের বসতি বহুকালের পুরোনো ব্যাপার। মধ্যযুগে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়েছে - আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মাগন ঠাকুররা এ সভারই সদস্য ছিলেন। ফলে বোঝা যায় এখানে বাঙালি এবং মুসলমানদের বসতি কয়েকশ বছরের পুরোনো ব্যাপার। চট্টগ্রামের শঙ্খনদীর দক্ষিণাংশের সাথে সামাজিক যোগাযোগও পুরোনো। এসব অস্বীকার করে কেবল ধর্মের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ও অনিশ্চিত জীবনের পথে ঠেলে দেওয়া কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। বিষয়টা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। এটি এখন আন্তর্জাতিক মহল ও কোরামেও আলোচিত বিষয় নয়ত বাংলাদেশের জন্যে এটি একটি বিষফোঁড়া হয়ে থাকবে। এখনই সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করে মিয়ানমারের সঙ্গেও সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের নতুন যুগের সূচনা করার।
মিয়ানমার ক্রিকেট খেলে না, তবে ফুটবল খেলে এবং ভালোই খেলে। ক্রিকেটের মত আমাদের ফুটবলেরও উন্নতি ঘটিয়ে মিয়ানমারের সাথে ফুটবল-কূটনীতি শুরু করা যায়। ভারতের সাথে ক্রিকেট নিয়ে আপাতত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গাটা বড় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সাথে তাদের জয়ের অভ্যস্ত ধারায় কেবল ছেদ পড়ে নি, রীতিমত ভবিষ্যতের জন্যেও বেশ বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার হুঁশিয়ারি দিল বাংলাদেশ। তবে সবারই মনে রাখতে হবে খেলার মাঠে ছোটবড় সবার সম্ভাবনাই সমান। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না জমলে খেলার মজাই তো নষ্ট হয়। বাংলাদেশ এখন সেই মানে পৌঁছেছে যেখানে তাদের সাথে খেলাটা যেকোনো দলের জন্যেই চ্যালেঞ্জিং, ফলাফল আগেভাগে বলা সম্ভব নয়।
ক্রিকেট ময়দানে ভারত এখন থেকে বাংলাদেশকে কেবল যোগ্য প্রতিযোগীই ভাববে না, সমীহও করবে। এই বারতার ইতিবাচক দিকটিই যেন আমরা দেখি। আর যেন রাষ্ট্রের অন্যান্য সব ক্ষেত্রেও সবার সমীহ অর্জনের মতো করে নিজেদের তৈরি করি। মনে রাখতে হবে ক্রিকেটের মধ্যেই দু’দেশের সকল হিসেবনিকেশ সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের পরিচিতি যেমন অনেক ব্যাপ্ত, বৈচিত্র্যময় তেমনি দুই দেশের সম্পর্কের পরিসরও অনেক বড়, অনেক বিচিত্র বন্ধন ও সম্ভাবনায়ও জড়ানো।

***

Saturday, April 11, 2015

ফাঁসি, চিঠি ও জামায়াতের রাজনীতি

আবুল মোমেন

জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চান নি। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কামারুজ্জামান চাইবেন কিনা তা নিয়ে অনেক পানি গড়াল। অবশেষে তিনি চান নি। সেটাই স্বাভাবিক।
দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা যদি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাহলে আবেদনপত্রে তাঁকে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। জামায়াত দল হিসেবে এখনও তা করে নি। ফলে একজন শীর্ষ ও পরিচিত নেতা ক্ষমা চাইলে দলের নীতি বিরুদ্ধ কাজ হবে।
পাঠক এ লেখা যখন পড়বেন হয়ত তখন কামারুজ্জামানের দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়ে গেছে। আর না হলে কবে হবে তা সরকারই ভালো জানেন। অযথা জল্পনা করে আমাদের লাভ নেই। বরং আলোচনা হওয়া উচিত দলের নেতাদের উদ্দেশ্যে জেল থেকে লেখা তাঁর সাড়ে চার বছর আগের চিঠিটি নিয়ে। ২৬ নভেম্বর ২০১০ সনে লেখা সেই চিঠিতে কামারুজ্জামান একাত্তরের ভূমিকার কারণে দল হিসেবে জামায়াতের গায়ে ও বর্তমান নেতাদের গায়ে অপরাধের দাগ বহন করতে হচ্ছে বলে তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে বলেছেন; পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে দলের সাংগঠনিক রূপ ও রাজনীতির সামঞ্জস্য সাধনের কথাও বলেছেন। একাত্তরের ভূমিকার জন্যে সরাসরি ভুল স্বীকার না করলেও তিনি লিখেছিলেন - ‘একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতার পথে বড় বাধা।’ প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে আজকের বাস্তবতায় বলতে হবে যে তাঁর মূল্যায়ন ঠিকই ছিল,  দল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী অনেকটাই ফলেছে। তাঁর চিঠির সাথে সহমত হয়ে তখন জামায়াত নেতা ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক পত্রিকায় কলামও লিখেছিলেন। এরপরেই কিনা জানি না, তিনি এখন নিষ্ক্রিয়। দলীয় নেতাদের চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের কঠিন সময়ে এই অভিজ্ঞ আইনজীবী অনুপস্থিত রয়েছেন।
পত্রিকার খবরে জানা যাচ্ছে তখন জামায়াত ও ছাত্র শিবিরের নেতাদের মধ্যে কামারুজ্জামানের পরামর্শ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে এবং অনেকেই তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় জামায়াত নেতৃত্ব ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যেমন তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবনে ভুল করেছেন। একাত্তরের পরাজয়কে তাঁরা সাময়িক পরাজয় মনে করেছিলেন এবং সে কারণে প্রাক ’৭৫ পর্বে দেশের অভ্যন্তরে নানা কৌশলে আত্মরক্ষার ও দেশের বাইরে পাকিস্তানের সহযোগিতায় মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে একাত্তরের ভূমিকার সম্প্রসারণ করে যাচ্ছিলেন। এর পরপরই পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনে তাঁদের জন্যে সত্যিই সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। নিজের ক্ষমতা সংহত করতে গিয়ে জেনারেল জিয়া নির্ভরযোগ্য সাংগঠনিক সমর্থন পেয়েছেন জামায়াতের কাছ থেকে। এর চার বছর পরে ১৯৭৯ সনে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর দলের নেতা-কর্মী ও ছাত্র-তরুণদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশেও অনুরূপ ইসলামি বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন জামায়াত নেতৃত্ব। আবার ঐ একই সময়ে পেট্রোডলারের জোয়ারে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
জামায়াত নেতারা এসব দেশের শাসকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভারতের সাহায্যে এবং ভারত প্রভাবাধীন দেশটিতে এখন ইসলাম ও ইসলামি শক্তি বিপন্ন, দুর্বল। একে সচল করার জন্যে কাজ করতে হবে। তারা এই দেনদরবারে সফল হয়েছিলেন। প্রচুর অর্থ তারা তখন নিয়মিত পেয়েছেন। কিন্তু বড় কথা হল জামায়াত নেতারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতাকে সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা মনোযোগ দিয়েছিল ছাত্র সংগঠনকে শক্তিশালী করা, প্রাপ্ত অর্থের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং সমাজব্যাপী ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধির দিকে। মানতেই হবে তাদের সেসব লক্ষ্য পূরণে তারা বহুলাংশে সফল হয়েছে। আজকে জামায়াত হয়ত রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত, কিন্তু সমাজে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব এখন যেন তাদেরও ডিঙিয়ে চরম রূপ ধারণ করছে। যে কারণে ইসলামি রাজনীতিতে এখন সহজেই জামায়াতকে ছাপিয়ে জঙ্গি মনোভাবের দলগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে।
জামায়াতের এই সাফল্য মেনে নিয়েও বলতে হবে দলটি দেশের ও জাতির নিয়তি সম্পূর্ণ ধরতে পারে নি। যে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে পারবে না। করবে না। এটা তার ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। এর সাথে অধিকাংশ পরিবারের আত্মিক ও প্রত্যক্ষ যোগ আছে। সে সংযোগের সাথে রয়েছে বীরত্ব ও সর্বোচ্চ ত্যাগের ব্যঞ্জনা। আর স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এবং গৌরব কে ম্লান করতে চাইবে? বিষয়টি ঠিক এভাবে ব্যাখ্যা না করলেও কামারুজ্জামান সমস্যাটা ঠিকই ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন তাঁরা ভেবেছিলেন একসময় ‘মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাবে।’ উল্লিখিত চিঠিতে স্বীকারও করেছেন যে তাঁরা তা করতে পারেন নি।
১৯৭১ সনে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধতা করেছিল তারা সেদিন ইসলাম ও পাকিস্তানকে এক করে দেখার চোখ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধকেও দেখেছিলেন এবং তাই ইসলাম ও বাংলাদেশকে পরস্পর বিরুদ্ধ হিসেবেই বিচার করেছেন। স্বাধীনতার পরের ঘটনাবলিতে, অন্তত ১৯৭৬ সন পর্যন্ত, তারা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখে গেছে। জানি না, হয়ত আজও অনেকেই দেখছেন।
বর্তমান সংবিধানের আলোকে কেউ যদি বাংলাদেশকে ইসলামি রাষ্ট্র আখ্যা দেন তাহলে তাঁকে ভুল বলার দায় নিতে হবে কি? সংবিধানে গণতন্ত্রের কথা থাকলেও তা তো ধর্মনিরপেক্ষ নয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো আছেই, আবার সংবিধানের শীর্ষে বিসমিল্লাহও রয়েছে। কিন্তু কথা হল, যে নামেই ডাকা হোক বাংলাদেশ তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফসল। জামায়াতে ইসলামি তো মুসলিম লীগ বা কৃষক শ্রমিক পার্টির মত কেবল পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়া আর মন্ত্রিসভায় অংশ নেওয়ার মধ্যে তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখে নি। তারাই আলবদর, আলশামসের মত ঘাতক বাহিনীগুলো গঠন ও পরিচালনা করেছিল। এ বাহিনীগুলো তো সত্যিই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল একাত্তরে। সে-ও তো একটি-দুটি, একশ-দু’শ নয় - ত্রিশ লক্ষ। এ ইতিহাস জামায়াত মুছবে কি করে? জনাব মতিউর রহমান নিজামি যে আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন বা কামারুজ্জামান এবং অন্যান্য নেতারা বিভিন্ন পদে থেকে স্বাধীনতা বিরোধী কাজ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছেন সে কথা অস্বীকার করবেন কী করে? বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের অধ্যায়টি এড়িয়ে তো বাংলাদেশের ইতিহাস হবে না।
স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির অর্জন কম হয় নি। সেটা রাষ্ট্রে ও সমাজে অনুভূত হয়, দৃশ্যমান। কিন্তু আমার বিবেচনায় এক অবস্থানে গোঁ ধরে থেকে এর বেশি অর্জন একাত্তরের ফসল বাংলাদেশ আর সম্ভব নয়। যদি নেতৃত্ব অহং নিয়ে ভোগেন, পুরোনো চিন্তা আঁকড়ে থাকেন তবে এবার থেকে জামায়াত পিছিয়ে পড়তে থাকবে। সেটা বিপুল অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তিও ঠেকাতে পারবে না। কারণ আজ বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিবিপ্লব, বাজার অর্থনীতি মিলে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশও এক কালান্তরের সম্মুখীন। কালান্তরের এই বাণী বিএনপিও ঠিক ধরতে পারে নি বলে মনে হয়। প্রচণ্ড কর্তৃত্ববাদী শাসন সত্ত্বেও শেখ হাসিনা তা অনুধাবন করেছেন বলে মনে হয়। জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে না হলেও ক্ষমতার মানদণ্ডে তিনি যদি এ পরীক্ষায় উৎরে যেতে পারেন তবে বিএনপি-জামায়াত ও এই ধারার সবার রাজনীতিই তামাদি হওয়ার আশংকায় পড়বে।

***

Wednesday, April 8, 2015

মেয়র প্রার্থীদের মূল পরীক্ষা

আবুল মোমেন

জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের বড় সমস্যা। অপরিকল্পিত উন্নয়নই এ কাণ্ড ঘটিয়েছে। পাহাড়ী উপত্যকা-অধিত্যকার এ জনপদে প্রাকৃতিক পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই কার্যকর ছিল। শহুরে মানুষের অবিমৃষ্যকারিতার ফল এ পরিণতি। প্রতি বর্ষা মৌসুমে শহরের নতুন নতুন এলাকার বাসিন্দা এসে জানান - ‘গত বছরও এত অল্প বৃষ্টিতে ঘরে পানি ওঠেনি, এবার দেখুন, বর্ষার আগে সামান্য বৃষ্টিতেই পানির সাথে বসবাস করতে হচ্ছে।’
এবছরও এর ব্যতিক্রম হয় নি। চৈত্রের বৃষ্টিতেই অশনি সংকেত। শংকিত মানুষ ভাবছেন পুরো বর্ষা তো পরে রইলো, তখন না জানি কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অভিযোগের আঙুল নিশ্চয় সদ্য সাবেক মেয়রের দিকে যাবে। তিনি কি আত্মপক্ষ সমর্থনে সরকারের দিকে আঙুল তুলবেন? তুলতেই পারেন, ভিন্ন দলের মেয়র বলে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ পান নি সে অভিযোগ তো আছেই। টাকা ছাড়া খাল খনন, পাড় বাঁধাই, অবৈধ স্থাপনা ও দখলমুক্তি, এমনকি উচ্ছেদ-পুনর্বাসনই বা কি করে হবে!
কে দায়ি তা জানার আগ্রহ ভুক্তভোগী নগরবাসী আদতে হারিয়ে ফেলেছে। কোন্ মেয়র কার চেয়ে বেশি কাজ করেছেন, কে মেয়র হিসেবে ভালো হবেন এসব ভাবনা হয়ত নির্বাচনকে ঘিরে হয়, কিন্তু এ নিয়ে এখন আর খুব আগ্রহ নেই ভোটারের। যে বিষয়টি সবার ভাবা দরকার তা হল - চট্টগ্রামের মানুষ চট্টগ্রাম ছেড়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে ধনেমানে-প্রতিভা-ক্ষমতায় সম্পন্ন মানুষজন দেশের সব জেলা-শহর ছেড়ে ঢাকায় ডেরা বাঁধছেন। কারণ সব ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রিভূত হয়ে পড়েছে। জাতীয়ভাবে যেমন ব্রেনড্রেন একটা সমস্যা তেমনি স্থানীয় পর্যায়েও তা প্রকট হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম পিছিয়ে পড়েছে। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামে ব্যাংক-বীমার সদর দপ্তর ছিল। আর ব্রিটিশ আমল থেকে অধিকাংশ বিদেশি কোম্পানি, সওদাগরি অফিস এখানেই ছিল, দেশি-বিদেশি কলকারখানাও এখানেই বেশি ছিল। বাঘা ডাক্তার-উকিলও ছিলেন পর্যাপ্ত। শিক্ষক ছিলেন নমস্য ব্যক্তিরা। আবার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও আগুয়ান ছিল চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার আগেও ঢাকা-চট্টগ্রামে পার্থক্যের হার বড় জোর ৫৫-৪৫ হতো। কিন্তু এখন? ৮০-২০ বললেও মানতে চাইবেন না অনেকে।
রাজধানীর উন্নতি নিয়ে কারও গাত্রদাহ নেই, এটা রাজধানীর প্রাপ্য। কিন্তু বাণিজ্যিক রাজধানীর উন্নয়ন কেন ঠেকে থাকবে? এখানে কেন বঞ্চনা, বিলম্ব, কালক্ষেপণ?
দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে জীবনযাপনের উন্নত ব্যবস্থা তৈরি হবে না? এখানকার ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের কেন ছোটখাট সিদ্ধান্তের জন্যে ঘন ঘন, বারবার ঢাকায় ছুটতে হবে?
তাছাড়া সব সুযোগসুবিধা এক জায়গায় গড়ে-ওঠায় ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপেই তো ঢাকা মহানগরী স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজধানীকে অচল, অস্বাস্থ্যকর এবং বিপজ্জনক বসতিতে পরিণত করে কার লাভ? এর শেষই বা কোথায়?
বর্তমান বাস্তবতায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন এককভাবে মেয়রের কাজ নয়। এমনকি কেবল রাজনীতিবিদদের দিকে আঙুল তুললেও হবে না। একা ব্যবসায়ীরাও কিছু করতে পারবেন না। নগরবাসীকে একাট্টা হতে হবে। হ্যাঁ, জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিক - তিনি যে দলেরই হোন না কেন - এবং মেয়র - তিনি যে দল থেকেই নির্বাচিত হন না কেন - নেতৃত্ব দেবেন। আমি জনগণের নাগরিকসমাজের নেতৃত্বের কথাই বলছি। কেবল দলীয় নেতৃত্বে শক্তিশালী অবস্থান কিংবা অর্থবিত্তে ক্ষমতাবান হওয়ার কথা বলছি না। আজকাল রাজনীতিকরা সকলেই বড্ড দলীয় মানুষ হয়ে পড়েছেন। ভুলে যাচ্ছেন যে স্থানীয় পর্যায়ে ভালো কিছু করতে হলে দলবাজীতে কাজ হবে না। এতকাল হয় নি, বস্তুত কখনও হয় নি। নূর আহমদ চেয়ারম্যান কিংবদন্তী এমনি হন নি, সবার হয়ে চিরকালীন মঙ্গলের কাজ করেই হয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে দলমত সব মানুষ মিলেই সমাজ তৈরি করে তাতে সুখেদু:খে বসবাস করেন। জলাবদ্ধতার সমস্যা আওয়ামী লীগ-বিএনপির জন্য বা হিন্দু-মুসলমানের জন্য দুইরকম নয়। সবাই একইভাবে ভুগবেন। ভাঙা সড়কের হাড়ভাঙা নাচুনি সব্বার জন্যেই একইভাবে কষ্টকর।
আমাদের একজন মেয়র চাই যিনি ব্যক্তিগতভাবে দল করলেও পদ ও দায়িত্বের মর্যাদা রক্ষা করে সবার নেতা হতে পারবেন। আগামী তিন সপ্তাহ মেয়র পদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সে পরীক্ষাটাই দিতে হবে বলে আমি মনে করি।

                                                                               ***

Wednesday, March 18, 2015

সৃজনশীলতার পক্ষে আরেক ধাপ

আবুল মোমেন

গতকালের পত্রিকায় বলেছিলাম রাজনীতিতে সৃজনশীলতা প্রয়োজন। দেশের আন্দোলনরত প্রধান বিরোধী দলের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেছিলাম। কারণ দেশ অচল না হলেও এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে জনগণ তাদের আন্দোলনের ফলে।  আর আন্দোলনের ডাক দিয়ে খোদ বিএনপি নিজেই জটিল আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না অল্প কয়েকজনের জেদের প্রতিফলন ঘটছে এই কাগুজে আন্দোলনে।
আমরা বিরোধী মতামতের প্রতি সরকারের অনুদার কর্তৃত্ববাদী ও দমনমূলক ভূমিকা সমর্থন করি না, সমালোচনা করি। কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের আন্দোলনের সাথে দেশব্যাপী যেভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারা ও অন্যান্য নাশকতা চালানো হচ্ছে তাকে কিছুতেই সমর্থন জানানো যায় না। তদুপরি এর ফলে সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এতে নেতা-কর্মীরা এবং দল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। আন্দোলনের অনুষঙ্গ এই ভয়ঙ্কর তৎপরতা চলতে দিয়ে সরকারকে আলোচনায় বসতে বলা যায় হয়ত, কিন্তু সরকারের পক্ষে তা শোনা কি সম্ভব?
পরিস্থিতি যা তাতে বিএনপিকেই কর্মী-নেতাসহ দলকে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার ধাপে ধাপে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে পেরেছে বিএনপি নির্বাচনের পর থেকে একের পর এক সরকারকে ওয়াক ওভার দেওয়ার ফলে। এখনও নেপথ্যে থেকে যেভাবে কাগুজে আন্দোলন চালাচ্ছে তাও এক ধরনের ওয়াক ওভার।  সরকার ও বাহিনীগুলো তৎপরতা চালানোর যথেষ্ট জায়গা পাচ্ছে। আর যদি বিএনপি-জামায়াত এ পর্যায়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় নামে তাহলে তার তাপ লাগছে এবং ভোগান্তি পোহাচ্ছে জনগণ। অর্থাৎ সে আন্দোলন যতটা না সরকারের বিরুদ্ধে তারচেয়ে বেশি কার্যকর হবে জনগণের বিরুদ্ধে। তাতে জনগণ নিশ্চয় বিএনপির ওপর অসন্তুষ্ট হবে, ক্ষুব্ধ হবে।
এখন বিএনপির জন্যে বাংলা প্রবাদ ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ই খাটবে। তবে তাদের নিশ্চেষ্ট বসে থেকে অপেক্ষা করলে চলবে না। দল গুছানো এবং সঠিক কার্যক্রম নির্ণয়ই প্রথম কাজ। তারেক রহমান নেতৃত্বে দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন না। আপাতত ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগঠন এবং এদেশের রাজনীতি বোঝেন এমন নেতাদের ওপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাঁরাই বসে করণীয় সম্পর্কে দলের নেত্রীকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া এবং তাঁদের মতামতকে দলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তারপর সর্বস্তরে দলকে গুছিয়ে তুলতে হবে মূলত এলাকার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে। এরপর জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে হবে। সরকারের সঙ্গে বৈঠকে যেতে পারলে বিএনপি লাভবান হবে। বৈঠক সফল হলে লাভ তো হবেই, আর তখন ব্যর্থ হলে তার দায় সরকারের ওপর পড়বে। ফলে বৈঠকে বিএনপির হারানোর কিছু নেই।
একঘেয়ে কাগুজে আন্দোলনের কারণে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে, দেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং এর দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপছে। এ ধরনের ভ্রান্ত এবং নেতিবাচক কাজ দলের স্বার্থেই বিএনপির বন্ধ করা উচিত।


***