Thursday, June 25, 2015

ক্রিকেট কীর্তির সূত্র ধরে

আবুল মোমেন

ক্রিকেটে বাংলাদেশ আর তলানির দেশ নেই। বড় দলের তকমা লাগবে এবার। কেমন হেসেখেলে দুটি ম্যাচে হারিয়ে দিল ভারতকে। সামনে ধবল ধোলাই বা বাংলাওয়াশের হাতছানি। যেভাবে খেলছে দল তাতে সে সম্ভাবনাটাই বেশি বলে মনে হচ্ছে সবার। সত্যি বলতে কি এই বদলে-যাওয়া বাংলাদেশকে দেখে ভারতীয় দলের খেলোয়াড় এবং টিম ম্যানেজমেন্ট রীমিত থ’ হয়ে গেছে। ওদের ম্যানেজার রবি শাস্ত্রী বাকপটু মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু পরাজয়ের পর থেকে মিডিয়াতে তাঁর টুঁ শব্দটিও শোনা যাচ্ছে না।
ভারতের সাথে এবারের ক্রিকেট লড়াইটার যেন বাড়তি উত্তেজনার পটভূমি রয়েছে। তা সবার জানাও আছে। সেই বিশ্বকাপে আম্পায়ারের অবিচারের ক্ষতটা সারানো দরকার ছিল বাংলাদেশের। ক্ষতটিকে আবার কাঁচা করেছে ভারতীয় বৈদ্যুতিন মাধ্যমের একটি বিজ্ঞাপনও। তবে যারা ক্রিকেটের অন্দরের খবর রাখেন তাদের মনে বিশেষ ক্ষোভ ছিল অন্য একটি কারণে। বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পেয়েছে বারো বছরের  বেশি হতে চলল, অথচ এখনও ভারতের মাটিতে কোনো সিরিজ খেলার আমন্ত্রণ পায় নি। বর্তমানে ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ায়ও রীতিমত দুটো সিরিজ খেলা হয়ে গেছে। ভারতই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট খেলেছে ঢাকার মাটিতে। বাংলাদেশের টেস্ট খেলুড়ে দেশের স্বীকৃতির সময় ভারতীয় ক্রিকেট জগতের বড় সংগঠক জগমোহন ডালমিয়া আইসিসির সভাপতি। শোনা যায় এ স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল অনুকূল। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরও সমর্থন পেয়েছিল বাংলাদেশ। এ কথা আমরা অবশ্যই মনে রাখি, মনে রাখব।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা বাংলাদেশ যেন আর পাচ্ছে না। এ যেন বড় প্রতিবেশীর সাথে ছোট প্রতিবেশীর সম্পর্কের টানাপোড়েনের সেই পুরোনো ইতিহাস। এমনটা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও দেখা যায়। বাংলাদেশের সাথে ভারতের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এতটাই বাস্তব, পুরোনো এবং চলমান যে তাকে কারুরই অস্বীকার করবার উপায় নেই। পাকিস্তান এই সম্পর্ককে অস্বীকারের ধারা বজায় রাখতে গিয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ অবধি দেশটি স্থিতিশীল হল না। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও সুষ্ঠু কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়ায় নি, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান মারাত্মক, পুরোনো সামন্তব্যবস্থা এখনও চলমান। তদুপরি ধর্মীয় মৌলবাদ ও সশস্ত্র জঙ্গিবাদ সমাজজীবনকে পঙ্গু করে রেখেছে। এখনও ক্রিকেটে স্বীকৃত কোনো দল পাকিস্তানে খেলতে যাচ্ছে না।
সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত নানান চুক্তির জন্যেই কেবল এ কথা বলছি না। এবারই প্রথম অর্থনৈতিক সম্পর্ককে দু’দেশের সীমার বাইরে আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তৃত করেছেন দু’দেশের নেতৃত্ব। এতে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যাতে ভারত বাস্তব কারণেই বড় শরিক, কিন্তু অন্যান্য প্রতিবেশীরাও সঙ্গে থাকছে।
ভারত-পাকিস্তান চিরবৈরিতার কারণেই প্রতিষ্ঠার পরে তিন দশকের বেশি অতিবাহিত হলেও সার্ককে কার্যকর করা গেল না। প্রয়োজন পড়ছিল একে পাশ কাটিয়ে হলেও বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভূটানের মধ্যে অন্তত বাণিজ্যিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত করা। ভূটান ও নেপাল ল্যাণ্ডলকড্ বা ভূমিবদ্ধ দেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যও তাই। তাদের জন্যে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হবে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেলে। এবারে সেই পথের জট খুলতে শুরু করেছে।
চীনও আমাদের কাছের দেশ - ভৌগোলিক এবং ব্যবসায়িক ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে। বহুদিন ধরেই চীন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পূর্বাঞ্চলীয় কুংমিং প্রদেশ পর্যন্ত একটা যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। ফলে চীন চায় বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্র বন্দর বানানোয় শরিক হয়ে সাগর ঘিরে সৃষ্ট নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় ভালোভাবে শরিক হতে। বঙ্গোপসাগরে চীনের এই সবল উপস্থিতির সম্ভাবনা আবার জাপান এবং ভারতকে কিছুটা শংকিত করে তুলেছে। আ মাদের বন্ধুপ্রতিম তিনটি শক্তিশালী দেশের মধ্যেকার এই টানাপোড়েনের মধ্যমণি বাংলাদেশ। এখানে বাংলাদেশের জন্যে জটিল আবার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার অবকাশ তৈরি হয়েছে। এবারে বাংলাদেশকে কূটনীতিতে সত্যিকারের পরিপক্কতা দেখাতে হবে, অনেকটা যে পরিপক্কতা আমাদের ক্রিকেটাররা দেখাল খেলার মাঠে। তারা দক্ষতা, একাগ্রতা, বিচক্ষণতা মিলিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও কেমন করে জয়ী হতে হয়।
পাকিস্তান একসময় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বরফ গলানোর কাজ করেছিল। চীন-ভারত শীতল সম্পর্কও বেশ পুরোনো। তবে নয়াভারত গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদী চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও গতিশীল করে নিতে চান। বাংলাদেশ উভয় দেশেরই বন্ধুত্ব কামনা করে, জাপানকেও পাশে পেতে চায়। তাদের মধ্যেকার স্বার্থের দ্বন্দ্বে আমরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হই সেদিকটা দেখাই আমাদের বড় কাজ। এ কাজ খানিকটা সহজ হবে যদি আমাদের আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিসর আরও বাড়িয়ে নিতে পারি আমরা। তাতে ভারত-চীন, ভারত-জাপান সম্পর্কও সহজ হবে এবং কার্যকর থাকবে। বাংলাদেশ এ উদ্যোগের মূল লিয়াজোঁর ভূমিকা পালন করতে পারে ।
ভারত ছাড়া মিয়ানমারই অপর একটি দেশ যার সাথে আমাদের সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। তাদের সাথে সমুদ্র সীমার বিবাদ আন্তর্জাতিক আদালতে মিটলেও দেখা যাচ্ছে দু’দেশের সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হচ্ছে না। পথের বাধা হয়ে আছে রোহিঙ্গা সমস্যা। সেনাশাসিত মিয়ানমারে এমন এক বৌদ্ধ উগ্রবাদের জন্ম হয়েছে যা সেদেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্যে মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সরকারি বাহিনির ভূমিকাও একই। হিংসাত্মক আক্রমণের শিকার হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। প্রাচীন বার্মার আরাকান অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানের বসতি বহুকালের পুরোনো ব্যাপার। মধ্যযুগে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়েছে - আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মাগন ঠাকুররা এ সভারই সদস্য ছিলেন। ফলে বোঝা যায় এখানে বাঙালি এবং মুসলমানদের বসতি কয়েকশ বছরের পুরোনো ব্যাপার। চট্টগ্রামের শঙ্খনদীর দক্ষিণাংশের সাথে সামাজিক যোগাযোগও পুরোনো। এসব অস্বীকার করে কেবল ধর্মের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ও অনিশ্চিত জীবনের পথে ঠেলে দেওয়া কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। বিষয়টা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। এটি এখন আন্তর্জাতিক মহল ও কোরামেও আলোচিত বিষয় নয়ত বাংলাদেশের জন্যে এটি একটি বিষফোঁড়া হয়ে থাকবে। এখনই সময় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করে মিয়ানমারের সঙ্গেও সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের নতুন যুগের সূচনা করার।
মিয়ানমার ক্রিকেট খেলে না, তবে ফুটবল খেলে এবং ভালোই খেলে। ক্রিকেটের মত আমাদের ফুটবলেরও উন্নতি ঘটিয়ে মিয়ানমারের সাথে ফুটবল-কূটনীতি শুরু করা যায়। ভারতের সাথে ক্রিকেট নিয়ে আপাতত প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গাটা বড় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সাথে তাদের জয়ের অভ্যস্ত ধারায় কেবল ছেদ পড়ে নি, রীতিমত ভবিষ্যতের জন্যেও বেশ বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার হুঁশিয়ারি দিল বাংলাদেশ। তবে সবারই মনে রাখতে হবে খেলার মাঠে ছোটবড় সবার সম্ভাবনাই সমান। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না জমলে খেলার মজাই তো নষ্ট হয়। বাংলাদেশ এখন সেই মানে পৌঁছেছে যেখানে তাদের সাথে খেলাটা যেকোনো দলের জন্যেই চ্যালেঞ্জিং, ফলাফল আগেভাগে বলা সম্ভব নয়।
ক্রিকেট ময়দানে ভারত এখন থেকে বাংলাদেশকে কেবল যোগ্য প্রতিযোগীই ভাববে না, সমীহও করবে। এই বারতার ইতিবাচক দিকটিই যেন আমরা দেখি। আর যেন রাষ্ট্রের অন্যান্য সব ক্ষেত্রেও সবার সমীহ অর্জনের মতো করে নিজেদের তৈরি করি। মনে রাখতে হবে ক্রিকেটের মধ্যেই দু’দেশের সকল হিসেবনিকেশ সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের পরিচিতি যেমন অনেক ব্যাপ্ত, বৈচিত্র্যময় তেমনি দুই দেশের সম্পর্কের পরিসরও অনেক বড়, অনেক বিচিত্র বন্ধন ও সম্ভাবনায়ও জড়ানো।

***

Saturday, April 11, 2015

ফাঁসি, চিঠি ও জামায়াতের রাজনীতি

আবুল মোমেন

জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চান নি। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কামারুজ্জামান চাইবেন কিনা তা নিয়ে অনেক পানি গড়াল। অবশেষে তিনি চান নি। সেটাই স্বাভাবিক।
দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা যদি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাহলে আবেদনপত্রে তাঁকে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। জামায়াত দল হিসেবে এখনও তা করে নি। ফলে একজন শীর্ষ ও পরিচিত নেতা ক্ষমা চাইলে দলের নীতি বিরুদ্ধ কাজ হবে।
পাঠক এ লেখা যখন পড়বেন হয়ত তখন কামারুজ্জামানের দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়ে গেছে। আর না হলে কবে হবে তা সরকারই ভালো জানেন। অযথা জল্পনা করে আমাদের লাভ নেই। বরং আলোচনা হওয়া উচিত দলের নেতাদের উদ্দেশ্যে জেল থেকে লেখা তাঁর সাড়ে চার বছর আগের চিঠিটি নিয়ে। ২৬ নভেম্বর ২০১০ সনে লেখা সেই চিঠিতে কামারুজ্জামান একাত্তরের ভূমিকার কারণে দল হিসেবে জামায়াতের গায়ে ও বর্তমান নেতাদের গায়ে অপরাধের দাগ বহন করতে হচ্ছে বলে তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে বলেছেন; পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে দলের সাংগঠনিক রূপ ও রাজনীতির সামঞ্জস্য সাধনের কথাও বলেছেন। একাত্তরের ভূমিকার জন্যে সরাসরি ভুল স্বীকার না করলেও তিনি লিখেছিলেন - ‘একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতার পথে বড় বাধা।’ প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে আজকের বাস্তবতায় বলতে হবে যে তাঁর মূল্যায়ন ঠিকই ছিল,  দল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী অনেকটাই ফলেছে। তাঁর চিঠির সাথে সহমত হয়ে তখন জামায়াত নেতা ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক পত্রিকায় কলামও লিখেছিলেন। এরপরেই কিনা জানি না, তিনি এখন নিষ্ক্রিয়। দলীয় নেতাদের চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের কঠিন সময়ে এই অভিজ্ঞ আইনজীবী অনুপস্থিত রয়েছেন।
পত্রিকার খবরে জানা যাচ্ছে তখন জামায়াত ও ছাত্র শিবিরের নেতাদের মধ্যে কামারুজ্জামানের পরামর্শ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে এবং অনেকেই তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় জামায়াত নেতৃত্ব ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যেমন তেমনি স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবনে ভুল করেছেন। একাত্তরের পরাজয়কে তাঁরা সাময়িক পরাজয় মনে করেছিলেন এবং সে কারণে প্রাক ’৭৫ পর্বে দেশের অভ্যন্তরে নানা কৌশলে আত্মরক্ষার ও দেশের বাইরে পাকিস্তানের সহযোগিতায় মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে একাত্তরের ভূমিকার সম্প্রসারণ করে যাচ্ছিলেন। এর পরপরই পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনে তাঁদের জন্যে সত্যিই সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। নিজের ক্ষমতা সংহত করতে গিয়ে জেনারেল জিয়া নির্ভরযোগ্য সাংগঠনিক সমর্থন পেয়েছেন জামায়াতের কাছ থেকে। এর চার বছর পরে ১৯৭৯ সনে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর দলের নেতা-কর্মী ও ছাত্র-তরুণদের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এ দেশেও অনুরূপ ইসলামি বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন জামায়াত নেতৃত্ব। আবার ঐ একই সময়ে পেট্রোডলারের জোয়ারে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল।
জামায়াত নেতারা এসব দেশের শাসকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ভারতের সাহায্যে এবং ভারত প্রভাবাধীন দেশটিতে এখন ইসলাম ও ইসলামি শক্তি বিপন্ন, দুর্বল। একে সচল করার জন্যে কাজ করতে হবে। তারা এই দেনদরবারে সফল হয়েছিলেন। প্রচুর অর্থ তারা তখন নিয়মিত পেয়েছেন। কিন্তু বড় কথা হল জামায়াত নেতারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতাকে সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা মনোযোগ দিয়েছিল ছাত্র সংগঠনকে শক্তিশালী করা, প্রাপ্ত অর্থের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং সমাজব্যাপী ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধির দিকে। মানতেই হবে তাদের সেসব লক্ষ্য পূরণে তারা বহুলাংশে সফল হয়েছে। আজকে জামায়াত হয়ত রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত, কিন্তু সমাজে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব এখন যেন তাদেরও ডিঙিয়ে চরম রূপ ধারণ করছে। যে কারণে ইসলামি রাজনীতিতে এখন সহজেই জামায়াতকে ছাপিয়ে জঙ্গি মনোভাবের দলগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে।
জামায়াতের এই সাফল্য মেনে নিয়েও বলতে হবে দলটি দেশের ও জাতির নিয়তি সম্পূর্ণ ধরতে পারে নি। যে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে পারবে না। করবে না। এটা তার ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। এর সাথে অধিকাংশ পরিবারের আত্মিক ও প্রত্যক্ষ যোগ আছে। সে সংযোগের সাথে রয়েছে বীরত্ব ও সর্বোচ্চ ত্যাগের ব্যঞ্জনা। আর স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা এবং গৌরব কে ম্লান করতে চাইবে? বিষয়টি ঠিক এভাবে ব্যাখ্যা না করলেও কামারুজ্জামান সমস্যাটা ঠিকই ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন তাঁরা ভেবেছিলেন একসময় ‘মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাবে।’ উল্লিখিত চিঠিতে স্বীকারও করেছেন যে তাঁরা তা করতে পারেন নি।
১৯৭১ সনে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধতা করেছিল তারা সেদিন ইসলাম ও পাকিস্তানকে এক করে দেখার চোখ দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধকেও দেখেছিলেন এবং তাই ইসলাম ও বাংলাদেশকে পরস্পর বিরুদ্ধ হিসেবেই বিচার করেছেন। স্বাধীনতার পরের ঘটনাবলিতে, অন্তত ১৯৭৬ সন পর্যন্ত, তারা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখে গেছে। জানি না, হয়ত আজও অনেকেই দেখছেন।
বর্তমান সংবিধানের আলোকে কেউ যদি বাংলাদেশকে ইসলামি রাষ্ট্র আখ্যা দেন তাহলে তাঁকে ভুল বলার দায় নিতে হবে কি? সংবিধানে গণতন্ত্রের কথা থাকলেও তা তো ধর্মনিরপেক্ষ নয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো আছেই, আবার সংবিধানের শীর্ষে বিসমিল্লাহও রয়েছে। কিন্তু কথা হল, যে নামেই ডাকা হোক বাংলাদেশ তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফসল। জামায়াতে ইসলামি তো মুসলিম লীগ বা কৃষক শ্রমিক পার্টির মত কেবল পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়া আর মন্ত্রিসভায় অংশ নেওয়ার মধ্যে তাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখে নি। তারাই আলবদর, আলশামসের মত ঘাতক বাহিনীগুলো গঠন ও পরিচালনা করেছিল। এ বাহিনীগুলো তো সত্যিই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল একাত্তরে। সে-ও তো একটি-দুটি, একশ-দু’শ নয় - ত্রিশ লক্ষ। এ ইতিহাস জামায়াত মুছবে কি করে? জনাব মতিউর রহমান নিজামি যে আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন বা কামারুজ্জামান এবং অন্যান্য নেতারা বিভিন্ন পদে থেকে স্বাধীনতা বিরোধী কাজ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছেন সে কথা অস্বীকার করবেন কী করে? বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের অধ্যায়টি এড়িয়ে তো বাংলাদেশের ইতিহাস হবে না।
স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির অর্জন কম হয় নি। সেটা রাষ্ট্রে ও সমাজে অনুভূত হয়, দৃশ্যমান। কিন্তু আমার বিবেচনায় এক অবস্থানে গোঁ ধরে থেকে এর বেশি অর্জন একাত্তরের ফসল বাংলাদেশ আর সম্ভব নয়। যদি নেতৃত্ব অহং নিয়ে ভোগেন, পুরোনো চিন্তা আঁকড়ে থাকেন তবে এবার থেকে জামায়াত পিছিয়ে পড়তে থাকবে। সেটা বিপুল অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তিও ঠেকাতে পারবে না। কারণ আজ বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিবিপ্লব, বাজার অর্থনীতি মিলে সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশও এক কালান্তরের সম্মুখীন। কালান্তরের এই বাণী বিএনপিও ঠিক ধরতে পারে নি বলে মনে হয়। প্রচণ্ড কর্তৃত্ববাদী শাসন সত্ত্বেও শেখ হাসিনা তা অনুধাবন করেছেন বলে মনে হয়। জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে না হলেও ক্ষমতার মানদণ্ডে তিনি যদি এ পরীক্ষায় উৎরে যেতে পারেন তবে বিএনপি-জামায়াত ও এই ধারার সবার রাজনীতিই তামাদি হওয়ার আশংকায় পড়বে।

***

Wednesday, April 8, 2015

মেয়র প্রার্থীদের মূল পরীক্ষা

আবুল মোমেন

জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের বড় সমস্যা। অপরিকল্পিত উন্নয়নই এ কাণ্ড ঘটিয়েছে। পাহাড়ী উপত্যকা-অধিত্যকার এ জনপদে প্রাকৃতিক পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুবই কার্যকর ছিল। শহুরে মানুষের অবিমৃষ্যকারিতার ফল এ পরিণতি। প্রতি বর্ষা মৌসুমে শহরের নতুন নতুন এলাকার বাসিন্দা এসে জানান - ‘গত বছরও এত অল্প বৃষ্টিতে ঘরে পানি ওঠেনি, এবার দেখুন, বর্ষার আগে সামান্য বৃষ্টিতেই পানির সাথে বসবাস করতে হচ্ছে।’
এবছরও এর ব্যতিক্রম হয় নি। চৈত্রের বৃষ্টিতেই অশনি সংকেত। শংকিত মানুষ ভাবছেন পুরো বর্ষা তো পরে রইলো, তখন না জানি কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অভিযোগের আঙুল নিশ্চয় সদ্য সাবেক মেয়রের দিকে যাবে। তিনি কি আত্মপক্ষ সমর্থনে সরকারের দিকে আঙুল তুলবেন? তুলতেই পারেন, ভিন্ন দলের মেয়র বলে তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ পান নি সে অভিযোগ তো আছেই। টাকা ছাড়া খাল খনন, পাড় বাঁধাই, অবৈধ স্থাপনা ও দখলমুক্তি, এমনকি উচ্ছেদ-পুনর্বাসনই বা কি করে হবে!
কে দায়ি তা জানার আগ্রহ ভুক্তভোগী নগরবাসী আদতে হারিয়ে ফেলেছে। কোন্ মেয়র কার চেয়ে বেশি কাজ করেছেন, কে মেয়র হিসেবে ভালো হবেন এসব ভাবনা হয়ত নির্বাচনকে ঘিরে হয়, কিন্তু এ নিয়ে এখন আর খুব আগ্রহ নেই ভোটারের। যে বিষয়টি সবার ভাবা দরকার তা হল - চট্টগ্রামের মানুষ চট্টগ্রাম ছেড়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে ধনেমানে-প্রতিভা-ক্ষমতায় সম্পন্ন মানুষজন দেশের সব জেলা-শহর ছেড়ে ঢাকায় ডেরা বাঁধছেন। কারণ সব ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রিভূত হয়ে পড়েছে। জাতীয়ভাবে যেমন ব্রেনড্রেন একটা সমস্যা তেমনি স্থানীয় পর্যায়েও তা প্রকট হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম পিছিয়ে পড়েছে। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামে ব্যাংক-বীমার সদর দপ্তর ছিল। আর ব্রিটিশ আমল থেকে অধিকাংশ বিদেশি কোম্পানি, সওদাগরি অফিস এখানেই ছিল, দেশি-বিদেশি কলকারখানাও এখানেই বেশি ছিল। বাঘা ডাক্তার-উকিলও ছিলেন পর্যাপ্ত। শিক্ষক ছিলেন নমস্য ব্যক্তিরা। আবার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও আগুয়ান ছিল চট্টগ্রাম। স্বাধীনতার আগেও ঢাকা-চট্টগ্রামে পার্থক্যের হার বড় জোর ৫৫-৪৫ হতো। কিন্তু এখন? ৮০-২০ বললেও মানতে চাইবেন না অনেকে।
রাজধানীর উন্নতি নিয়ে কারও গাত্রদাহ নেই, এটা রাজধানীর প্রাপ্য। কিন্তু বাণিজ্যিক রাজধানীর উন্নয়ন কেন ঠেকে থাকবে? এখানে কেন বঞ্চনা, বিলম্ব, কালক্ষেপণ?
দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে জীবনযাপনের উন্নত ব্যবস্থা তৈরি হবে না? এখানকার ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীদের কেন ছোটখাট সিদ্ধান্তের জন্যে ঘন ঘন, বারবার ঢাকায় ছুটতে হবে?
তাছাড়া সব সুযোগসুবিধা এক জায়গায় গড়ে-ওঠায় ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপেই তো ঢাকা মহানগরী স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজধানীকে অচল, অস্বাস্থ্যকর এবং বিপজ্জনক বসতিতে পরিণত করে কার লাভ? এর শেষই বা কোথায়?
বর্তমান বাস্তবতায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন এককভাবে মেয়রের কাজ নয়। এমনকি কেবল রাজনীতিবিদদের দিকে আঙুল তুললেও হবে না। একা ব্যবসায়ীরাও কিছু করতে পারবেন না। নগরবাসীকে একাট্টা হতে হবে। হ্যাঁ, জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিক - তিনি যে দলেরই হোন না কেন - এবং মেয়র - তিনি যে দল থেকেই নির্বাচিত হন না কেন - নেতৃত্ব দেবেন। আমি জনগণের নাগরিকসমাজের নেতৃত্বের কথাই বলছি। কেবল দলীয় নেতৃত্বে শক্তিশালী অবস্থান কিংবা অর্থবিত্তে ক্ষমতাবান হওয়ার কথা বলছি না। আজকাল রাজনীতিকরা সকলেই বড্ড দলীয় মানুষ হয়ে পড়েছেন। ভুলে যাচ্ছেন যে স্থানীয় পর্যায়ে ভালো কিছু করতে হলে দলবাজীতে কাজ হবে না। এতকাল হয় নি, বস্তুত কখনও হয় নি। নূর আহমদ চেয়ারম্যান কিংবদন্তী এমনি হন নি, সবার হয়ে চিরকালীন মঙ্গলের কাজ করেই হয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে দলমত সব মানুষ মিলেই সমাজ তৈরি করে তাতে সুখেদু:খে বসবাস করেন। জলাবদ্ধতার সমস্যা আওয়ামী লীগ-বিএনপির জন্য বা হিন্দু-মুসলমানের জন্য দুইরকম নয়। সবাই একইভাবে ভুগবেন। ভাঙা সড়কের হাড়ভাঙা নাচুনি সব্বার জন্যেই একইভাবে কষ্টকর।
আমাদের একজন মেয়র চাই যিনি ব্যক্তিগতভাবে দল করলেও পদ ও দায়িত্বের মর্যাদা রক্ষা করে সবার নেতা হতে পারবেন। আগামী তিন সপ্তাহ মেয়র পদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সে পরীক্ষাটাই দিতে হবে বলে আমি মনে করি।

                                                                               ***

Wednesday, March 18, 2015

সৃজনশীলতার পক্ষে আরেক ধাপ

আবুল মোমেন

গতকালের পত্রিকায় বলেছিলাম রাজনীতিতে সৃজনশীলতা প্রয়োজন। দেশের আন্দোলনরত প্রধান বিরোধী দলের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেছিলাম। কারণ দেশ অচল না হলেও এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে জনগণ তাদের আন্দোলনের ফলে।  আর আন্দোলনের ডাক দিয়ে খোদ বিএনপি নিজেই জটিল আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না অল্প কয়েকজনের জেদের প্রতিফলন ঘটছে এই কাগুজে আন্দোলনে।
আমরা বিরোধী মতামতের প্রতি সরকারের অনুদার কর্তৃত্ববাদী ও দমনমূলক ভূমিকা সমর্থন করি না, সমালোচনা করি। কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের আন্দোলনের সাথে দেশব্যাপী যেভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারা ও অন্যান্য নাশকতা চালানো হচ্ছে তাকে কিছুতেই সমর্থন জানানো যায় না। তদুপরি এর ফলে সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এতে নেতা-কর্মীরা এবং দল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। আন্দোলনের অনুষঙ্গ এই ভয়ঙ্কর তৎপরতা চলতে দিয়ে সরকারকে আলোচনায় বসতে বলা যায় হয়ত, কিন্তু সরকারের পক্ষে তা শোনা কি সম্ভব?
পরিস্থিতি যা তাতে বিএনপিকেই কর্মী-নেতাসহ দলকে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার ধাপে ধাপে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে পেরেছে বিএনপি নির্বাচনের পর থেকে একের পর এক সরকারকে ওয়াক ওভার দেওয়ার ফলে। এখনও নেপথ্যে থেকে যেভাবে কাগুজে আন্দোলন চালাচ্ছে তাও এক ধরনের ওয়াক ওভার।  সরকার ও বাহিনীগুলো তৎপরতা চালানোর যথেষ্ট জায়গা পাচ্ছে। আর যদি বিএনপি-জামায়াত এ পর্যায়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় নামে তাহলে তার তাপ লাগছে এবং ভোগান্তি পোহাচ্ছে জনগণ। অর্থাৎ সে আন্দোলন যতটা না সরকারের বিরুদ্ধে তারচেয়ে বেশি কার্যকর হবে জনগণের বিরুদ্ধে। তাতে জনগণ নিশ্চয় বিএনপির ওপর অসন্তুষ্ট হবে, ক্ষুব্ধ হবে।
এখন বিএনপির জন্যে বাংলা প্রবাদ ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ই খাটবে। তবে তাদের নিশ্চেষ্ট বসে থেকে অপেক্ষা করলে চলবে না। দল গুছানো এবং সঠিক কার্যক্রম নির্ণয়ই প্রথম কাজ। তারেক রহমান নেতৃত্বে দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন না। আপাতত ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগঠন এবং এদেশের রাজনীতি বোঝেন এমন নেতাদের ওপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাঁরাই বসে করণীয় সম্পর্কে দলের নেত্রীকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া এবং তাঁদের মতামতকে দলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তারপর সর্বস্তরে দলকে গুছিয়ে তুলতে হবে মূলত এলাকার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে। এরপর জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে হবে। সরকারের সঙ্গে বৈঠকে যেতে পারলে বিএনপি লাভবান হবে। বৈঠক সফল হলে লাভ তো হবেই, আর তখন ব্যর্থ হলে তার দায় সরকারের ওপর পড়বে। ফলে বৈঠকে বিএনপির হারানোর কিছু নেই।
একঘেয়ে কাগুজে আন্দোলনের কারণে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে, দেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং এর দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপছে। এ ধরনের ভ্রান্ত এবং নেতিবাচক কাজ দলের স্বার্থেই বিএনপির বন্ধ করা উচিত।


***

শিক্ষা কিংবা রাজনীতি ছেলেখেলা নয়

আবুল মোমেন

আমরা নিশ্চিত জানি কোনো রাজনৈতিক দলই শিশুদের প্রতি বিরূপ নয়। শিশুদের ক্ষতি হোক এমনটা কেউ চাইতে পারে না।
কিন্তু বিরোধী দলের ডাকে যে হরতাল-অবরোধ চলছে তাতে একতরফাভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। কারণ হরতাল মোটামুটি কাগুজে আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত বাকি সবই চলছে। স্বাভাবিকভাবে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের কল-কারখানা এবং বাণিজ্যিক অফিসও রয়েছে। শুধু হতে পারছে না পড়াশুনা।
এটা বলে বোঝানোর দরকার নেই শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা আজ বিরোধী দলে আছেন তারা একদিন সরকারে যাবেন, যেমন অতীতে ছিলেন ক্ষমতায়। তাঁদেরই দেশ চালাতে প্রয়োজন হবে শিক্ষিত দক্ষ কর্মীদল। আজকের শিশু ও শিক্ষার্থীরাই তো দেশের ভবিষ্যত। দেশের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেশের মানুষের উপকার করা তো সম্ভব নয়। শিশুদের জন্যে এটি একটি অরাজক পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতই পড়া দেওয়া হোক, বাড়িতে পড়তে বসুক, সেটা ঠিক নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার মত সুফল দেবে না। ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে জানতে পারি যে শিশুরা স্কুলের নিয়মের বাইরে চলতে চলতে পড়তেই চায় না। এ বয়সে এভাবে পড়ায় মন বসে না, খেলার দিকে মন পড়ে থাকে। এ খেলাও কোনো কাজের খেলা হবে না। তাদের তো মাঠে গিয়ে ঠিক মতো খেলার উপায় নেই। ঘরের মধ্যে ডানপিটেমি হয়, খেলা হয় না। কারণ খেলাও একটা নিয়মবদ্ধ শৃঙ্খলার বিষয়।
রাজনীতিও একটা ডিসিপ্লিন। রাজনীতি করেই রাজনীতিবিদ দেশ শাসন করবেন, দেশকে আইনের মাধ্যমে শৃঙ্খলায় চালাবেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের নিয়মনীতি আছে। এ কোনো ছেলেখেলা নয়। মানুষের প্রাণহানি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে না। ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাঞ্জাবের চৌরিচৌরাতে কয়েকটি প্রাণহানি ও নাশকতার ঘটনা ঘটলে এর নেতা মহাত্মা গান্ধি সারা ভারতবর্ষের অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আজ এদেশে শুধু পেট্রোল বোমায় পুড়ে মারা গেছে শ’খানেক মানুষ। এ বীভৎস কাণ্ড চলছে দু’মাসের ওপর। কিন্তু সাধারণের প্রাণঘাতি এ ‘আন্দোলন’ চলছেই। রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে এবং মানুষের প্রাণ নিয়ে ছেলেখেলা কিছুতেই চলতে দেওয়া উচিত নয়।
একইভাবে সরকারি বাহিনীর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে ছেলেখেলা এবং মানুষের প্রাণ নিয়ে ছেলেখেলাও অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বন্দুকযুদ্ধেও কম প্রাণহানি হয় নি।
এভাবে দিনে দিনে আমরা আইনের বাইরে বলে যাচ্ছি। রাজনীতিকদের টানাপোড়েনে দেশটাই কি আউটল হয়ে যাবে নাকি!
আমাদের আইনের কাছে নিয়মের কাছে ফিরতে হবে। সর্বত্র শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়ত শাসক থাকবেন, তাঁদের শক্ত শাসনদণ্ডও চলবে, কিন্তু তার তলে তলে ও ফাঁকে ফাঁকে সমাজে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে, অপরাধ বাড়বে। মানুষের জীবনে শান্তি স্বস্তি চলে যাবে।

***

Thursday, February 19, 2015

চট্টগ্রাম মাতৃভাষা সংগ্রামেও পিছিয়ে ছিল না

আবুল মোমেন

ভাষা আন্দোলনের মাসে ভাষার কথায় আসা যাক। এ প্রজন্মের তরুণদের জানা প্রয়োজন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে চট্টগ্রামের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ঢাকার পাশাপাশি একই সময়ে চট্টগ্রামেও গঠিত হয়েছিল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তখনকার তরুণ বামপন্থী কবি ও সংস্কৃতিকর্মী মাহবুবউল আলম চৌধুরী। যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন যুবলীগের সংগঠক ও পরবর্তীকালে বিখ্যাত শ্রমিক নেতা  চৌধুরী হারুনর রশিদ। এ সময় এ আন্দোলনে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন যুবলীগের তরুণ কর্মীরা।
এই সাথে মনে রাখতে হবে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি নিয়ে ভাষা আন্দোলনে শরিক হয়েছিল তমদ্দুন মজলিশও। এর দুই শীর্ষনেতা, পরবর্তীকালে বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবুল কাশেম এবং তরুণছাত্র ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ১৯৬৬ সনে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াত ড. মাহফুজুল হকও ছিলেন চট্টগ্রামের মানুষ।
বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারি ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও অসংখ্য ছাত্র হতাহত হওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রাম বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পরের দিন বাইশে ফেব্র“য়ারি লালদিঘির মাঠে সভা ডাকে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন রাতেই কবি মাহবুবউল আলম চৌধুরী প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরের মধ্যে রচনা করেন একুশের প্রথম কবিতা - ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। জ্বরের প্রচণ্ডতায় তিনি নিজের হাতে লিখতে পারেন নি। মুখে মুখে বলে গেছেন আর সঙ্গী চৌধুরী হারুন তা লিখে নিয়েছিলেন। কবিতাটি দীর্ঘ, বক্তব্যপ্রধান, আবেগপ্রবণ, আবার সেই সাথে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় লক্ষ্যপূরণের দৃঢ়সংকল্পে মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম। মুসলিম লীগ সরকার প্রেস থেকেই এটির মুদ্রিত কপি বাজেয়াপ্ত করে, কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং মুদ্রাকর ও প্রকাশককে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তখন তো ভাষা আন্দোলনের আবেগ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কবিতাটি যেন ছাইচাপা আগুন। আজ এটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ আমাদের।
চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষ ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। কেবল শহরে নয় বিভিন্ন মহকুমা ও থানা শহরে স্কুল-কলেজকে কেন্দ্র করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল আন্দোলন। সাহিত্যিক আবুল ফজল, কবিয়াল রমেশ শীল, তরুণ লেখক সুচরিত চৌধুরীসহ সর্বস্তরে এ আন্দোলনের পক্ষে মানুষ অবস্থান নিয়েছিল। অন্তত আমার জানা মতে আজও চট্টগ্রাম শহরে দু’জন ভাষা সৈনিক জীবনসায়াহ্নে উপনীত হয়ে দিনযাপন করছেন - এঁদের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এ কে এম এমদাদুল ইসলাম এবং অন্যজন বিশিষ্ট সমাজসেবক কৃষ্ণগোপাল সেন।
বাংলাভাষার চর্চা ও প্রসার নিয়ে চট্টগ্রামের গর্ব করার মত আরও বিষয় রয়েছে। মধ্যযুগে যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা স্তিমিত তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ আরাকান রাজসভায় রীতিমত বাংলাসাহিত্যের রাজসিক দরবার চলছে। আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মাগন ঠাকুর প্রমুখ তাঁদের সাহিত্য রচনা করে যাচ্ছিলেন যেগুলো আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে পড়া হয়।
শুধু সাহিত্যচর্চা নয়, ভাষার অধিকার রক্ষার জন্যে সুদূর সপ্তদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের অন্তর্গত সন্দ্বীপ থেকে এক কবি বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদী আওয়াজ তুলেছিলেন। সন্দ্বীপের সেই কবি আবদুল হাকিম রীতিমত তিরস্কার করে লিখেছিলেন - ‘ যেসব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/ দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/ নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যায়।’
তাঁর কবিতায় মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কী তীব্র, আর এর অবহেলাকারীদের প্রতি কী কঠোর ধিক্কার না প্রকাশ পেয়েছে।
এই উত্তরাধিকার মনে রেখে আমরা যেন বর্তমানকে একবার দেখি এবং ভবিষ্যতে মাতৃভাষা সুরক্ষার জন্যে নিজেদের করণীয় ঠিক করি।

এ কোন্ পথে চলেছে ওরা?

আবুল মোমেন

নিরীহ মানুষকে হাত বেঁধে চোখ বেঁধে ছুরি দিয়ে জবাই করা কি ইসলামের শিক্ষা হতে পারে? তারা অন্য ধর্মাবলম্বী হলেও? কোনো বন্দি মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করা কি ইসলাম? শিয়াপন্থী মুসলমানের মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে নির্বিচারে তাদের হত্যা করা কি ধর্মসম্মত কাজ হতে পারে?
ইসলামের শিক্ষা এটা নয়। নবীজীর শিক্ষাও এটা নয়। যে প্রাচীন গোত্রভিত্তিক হানাহানি বন্ধ করার জন্যে হযরত মোহাম্মদ (স:) ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেছেন এরা ঠিক সেই কাজই করছে। অর্থাৎ এক শ্রেণীর মুসলমানকে ফিরিয়ে নিচ্ছে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে। তারা বর্বর যুগ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। এবং তা চাইছে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। ওরা যে কাজ করছে তা জেহাদ নয়, ধর্মযুদ্ধ নয়, শ্রেফ বর্বরতা।
বরং এদের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব মুসলিম বিশ্বে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার অভাবে আজ সারা পৃথিবীর - একটি-দুটি ব্যতিক্রম ব্যতীত - মুসলিম দেশে দেশে অস্থিরতা, হানাহানি, দুর্যোগ চলছে।
এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ ছিল ব্যতিক্রম। এখানে বরাবর মানবিক ঔদার্য প্রাধান্য পেয়েছে। সুফী ও সাধকদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে আমাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। সে কারণে আরব বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে শিক্ষা বিস্তার ঘটছে দ্রুত, স্বাস্থ্য খাতে চমকপ্রদ উন্নয়ন ঘটেছে, মানুষের গড় আয় এবং আয়ু উভয়ই বেড়েছে। আমাদের রয়েছে মুক্ত গণমাধ্যম, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। এদেশের ভূমিজ সন্তান যারা তাদের ধর্ম যা-ই হোক সকলে বরাবর শোষণ-বঞ্চনা-দু:শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। তারই ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ, এবং এ কারণেই আমাদের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এদেশেও কিছু মানুষ ধর্মান্ধতার পশ্চাৎপদ চিন্তা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা দু:শাসক পাকিস্তানের দোসর হিসেবে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। আর আজও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চায় বাংলাদেশের অগ্রগতি।
আমাদের মনে হয় বাংলাদেশের সচেতন মানুষের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। প্রথমত বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মে মুসলমান এবং সাধারণজন যে কোনো মানদণ্ডে ভালো মুসলমান। তারা দেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে সহাবস্থানে     অভ্যস্ত। দ্বিতীয়ত, এদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চায়, তাতে একাধিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে, কোনো দলের আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা (তবে ধর্মহীনতা নয়) হলে কোনো দলের আদর্শে ধর্মীয় চেতনা (তবে ধর্মান্ধতা নয়) স্থান পেতে পারে। কিন্তু সবার লক্ষ্য হতে হবে দেশের উন্নয়ন, দেশের ভবিষ্যত। দেশের মানুষের ইচ্ছা এবং সে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে তারা যে ইতিহাস রচনা করেছে সেটাকেও মর্যাদা দিতে হবে সবার।
তৃতীয়ত, বর্তমান বিশ্বের মুক্তবাজার বা বিশ্বায়নের চাপ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একা থাকা যাবে না। তাহলে পিছিয়ে পড়তে হবে। আমাদের বহির্বিশ্বে বন্ধুরাষ্ট্র থাকবে, তবে লক্ষ্য রাখতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব যেন ক্ষুণœ না হয়। মর্যাদার হানী না হয় এবং দেশের স্বার্থও যেন বজায় থাকে। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সরকারকে যেমন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে তেমনি জনগণকেও একইভাবে পরিণত বুদ্ধির প্রমাণ দিতে হবে। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দেব, পশ্চিমের পুঁজিবাদী বিশ্ব সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাদের আর্থিক স্বার্থের ওপর। তারা ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। সেদেশের জনগণকে চারম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে এতটুকু কার্পণ্য তারা করে নি। একই ঘটনা ঘটছে প্যালেস্টাইন নিয়ে, আফগানিস্তান নিয়ে।
বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। বস্তুত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যে এখন কঠিন একটি সময় যখন তাদের চরম ধৈর্য, গভীর প্রজ্ঞা এবং যথার্থ দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। মানুষ পুড়িয়ে, অবরোধ-হরতাল করে, র‌্যাব-পুলিশ ব্যবহার করে, জেল-জুলুম অত্যাচার চালিয়ে, বিবৃতি আর মানববন্ধন করে দায় সারার চেষ্টা করলে হবে না। সমস্যাটা বুঝতে হবে দেশের এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে, দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে, দেশীয় সামাজিক পটভূমিতে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ভিত্তিতে। এই দু:সময়ে মাথা গরম করার সুযোগ নেই, ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক কৌশল ঠিক করেই সামনে এগুতে হবে।
আমার মনে হয় এ সময় প্রকৃত আলেম-ওলেমাদের এগিয়ে এসে ইসলামের সঠিক পথের কথা বলতে হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।