Tuesday, September 23, 2014

কী তৈরি করছি - শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী?

আবুল মোমেন

শিক্ষামন্ত্রীর নিরহঙ্কার নেতৃত্বে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রা আমাদের দেশে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাত্রকে বত্রিশ কোটি বই শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পৌঁছে দেওয়ার মত বিস্ময় যেমন আছে তেমনি আছে সর্বমহলের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে রীতিমত বাস্তবায়ন শুরু করার মত ঐতিহাসিক অর্জন। শিক্ষামন্ত্রীর সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে ভরসায় শিক্ষা নিয়ে যাঁরা ভাবেন তাঁদের বিবেকের ওপর চেপে বসতে থাকা একটি দুর্ভাবনা ও উদ্বেগ তুলে ধরার কথা ভাবছি।
একেবারে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পুরো শিক্ষাকে যে আমরা পরীক্ষার মধ্যে -গণ্ডিবদ্ধ করে ফেললাম কাজটা কি ঠিক হল? প্রশ্নটা তোলা জরুরি কারণ এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য - জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিক তৈরি - বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘাটতি রেখে শিক্ষার অপর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কতটা হতে পারে তাও বিচার্য বিষয়। এ দুটি বিষয়ের পরিপূরকতা বাধাগ্রস্ত হলে কাজ হবে না, কারণ দক্ষকর্মী তৈরি হবে জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিকের ভিত্তিভূমির ওপর।
পরীক্ষা হল শিক্ষার্থীর সিলেবাস ভিত্তিক অর্জিত শিক্ষার মান যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। আমাদের দেশে যে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ দেওয়া এবং তার ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাতে বিভিন্ন স্তরের সম্পূর্ণ অর্জনলক্ষ্য পূরণ ও পরিমাপ কোনোটাই করা সম্ভব নয়। নিচের পর্যায় থেকে অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং তার আবার পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ফল কেমন তা আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিতসমাজের গড় আচরণ ও ভূমিকা থেকেই বোঝা উচিত। একটি অসম্পূর্ণ শিক্ষার প্রভাবে নানা অসম্পূর্ণতা নিয়েই সমাজ গড়ে উঠছে। বরং এই নব্যশিক্ষিতদের দাপটে আমাদের সনাতন ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ও নৈতিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সমাজ আজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতায় বিপথগামী হয়ে পড়েছে।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার নগদ-লক্ষ্য হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তা এত উগ্রভাবে প্রধান হয়ে উঠেছে যে বাকি লক্ষ্যগুলো বাকিই থেকে যাচ্ছে, আর তাতে প্রত্যেক ছাত্রের জীবনে মানবিক শিক্ষার বকেয়ার পাহাড় জমছে। ছাত্র যেমন তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচারও হয় একমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। পরীক্ষা সর্বগ্রাসী হয়ে রীতিমত স্কুল ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই অকেজো করে দিয়েছে। কারণ পরীক্ষায় ভালো করা আদতে এমন একটি দক্ষতা যার জন্যে স্কুলে ব্যয়িত সময়কে রীতিমত অপব্যয় বলে মনে হচ্ছে অনেকেরই, বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার ও টিউটরের পাঠ। লক্ষ্য যদি একমাত্র পরীক্ষাই হয় তবে সে বিচারে এটাই বেশি ফলপ্রসূ। ছাত্র-অভিভাবকদের চাহিদা এবং সরকারের চাপের মধ্যে পড়ে শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের কাজ করছেন এবং স্কুল নয় বস্তুত পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় খাটছেন (কোচিং সেন্টার সম্পর্কে একথা আরও বেশি খাটে)। তবে তারা খুশিমনেই খাটছেন কারণ এটি আর্থিকভাবে লাভজনক। শিক্ষার্থীকে নিছক পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের এ অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে থাকায় বর্তমানে শিক্ষক-অভিভাবক সকলেই পরীক্ষাকেই ধ্যানজ্ঞান এবং শিক্ষা বলে ভুল - না, অন্যায় - করছেন। ফলে শিক্ষা প্রশাসন-শিক্ষকসমাজ-অভিভাবক এবং এর ভিকটিম ছাত্র মিলে বিপথগামিতার ও অধোগতির রমরমা চলছে অবাধে। সোনালি পাঁচ-তারকা শিক্ষার্থীদের, থুড়ি পরীক্ষার্থীদের, সহাস্য ছবির আড়ালে এ অবক্ষয় ঢাকা যাচ্ছে না।
মুশকিল হল, এ আনন্দ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী। কারণ প্রাপ্ত শিক্ষা যে টেকসই নয় তা প্রথমে পরবর্তী ধাপের ভর্তি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়ে যায় তাতে অধিকাংশের ফলাফলের হাল দেখে। কিন্তু তার আরও স্থায়ী অর্থাৎ টেকসই কুফল দেখা যায় সমাজে - ‘শিক্ষিত’ মানুষদের দক্ষতার মান এবং  দুর্নীতি-অনৈতিকতার নৈরাজ্য দেখে। এছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষের ন্যূনতম অর্জনের চিত্রও ভয়াবহ। দু’ একটি নমুনা দেওয়া যাক।
প্রাথমিকের মোদ্দা কয়েকটি অর্জনলক্ষ্য হল পড়া-লেখা-বলা-শোনা (শুনে বোঝা) এবং গণিতে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন। গোটা ছাত্রজীবনেই এসব অর্জনের অগ্রগতি চলবে।
বাস্তবে কী ঘটছে? প্রাথমিক স্তর নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য জরীপে দেখা যাচ্ছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ শিশু উপরোল্লিখিত দক্ষতাগুলো নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী অর্জনে ব্যর্থ থেকেই প্রাথমিক পর্যায় সমাপ্ত করে, যাদের অনেকেই জিপিএ ৫-ও পেয়ে থাকে। তাদের কথা ছেড়ে দিন, আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের  ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্তদের সামনে শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাতা খুলে পড়ে শোনাতে বলেন তাহলে অভিজ্ঞতাটা কেমন হবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, দু’চারজন ছাড়া কেউই ভাব ও অর্থ ফুটিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে গড়গড় করে পড়তে পারে না। পদে পদে হোঁচট খায়, এবং পাঠ ও রস উভয়ই ব্যাহত হয়।
চার বছর (বা ৬ বছর) বয়স থেকে আঠার বছর (অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রলম্বিত হচ্ছে) একটানা পড়াশুনার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবারই জ্ঞানভিত্তিক স্মৃতি অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ এত বছরে তারা যেসব বিষয় পড়েছে (বা তাদের পড়ার কথা) যেমন - বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা শাখা, মানবিক ও অন্যান্য বিদ্যা - তার পুঞ্জিভূত যে সঞ্চয় তাদের থাকার কথা তা গড়ে উঠছে না। বেচারা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন কেবল সঞ্চয় থাকলেও হবে না, কারণ তা স্তূপাকার হয়ে জঞ্জালে পরিণত হবে যদি না এ দিয়ে ভাবনা, চিন্তা, দর্শনসহ মনন ও উপভোগের নানান রসদ তৈরির প্রক্রিয়া চালু থাকে। এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কেবল নির্ধারিত কিছু পাঠ্যবই পড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যায় না। আর আমাদের দেশে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত ছাত্র অযথা পুরো পাঠ্যবই বা কেন পড়বে? শিক্ষক-টিউটরের সহযোগিতায় তারা আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরগুলোই শুধু শেখে, প্রায় ক্ষেত্রে মুখস্থ করে। এভাবে কোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে জানা হয় না, যেটুকু জানা হয় তার কোনো মননশীল চর্চার সুযোগ নেই। এই কাটছাঁট করা শিক্ষার উপমা হতে পারে পাখা ছেঁটে দেওয়া পাখি, যে আর উড়তে পারে না।
এভাবে শিক্ষাটা অর্থাৎ জানা বোঝা ইত্যাদি হয় ভাসা-ভাসা। যা সে পড়ে বা তার পড়ার কথা, সেসব কখনও তার ভাবনার বিষয় হয় না, বস্তুত এভাবে কারও সমৃদ্ধ চিন্তাজগত তৈরি হয় না। এ কারণে আমরা দেখি সংসদে সুস্থ তর্ক হয় না অশ্লীল ঝগড়া হয়। জাতীয় জীবনে কোনো ইস্যুতে সারগর্ভ আলোচনা হয় না একতরফা গোঁয়ার্তুমির প্রকাশ ঘটে।
পরীক্ষার এই দোর্দ--প্রতাপে জ্ঞানার্জন ও সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠার রসদগুলো অধিকাংশের অনায়ত্ত থেকে যাচ্ছে। এর চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় বাংলা সম্মানের পাঠ শেষ করে  রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ভিন্ন কোনো বইয়ের নাম বলতে পারে না এমন তরুণ প্রচুর এবং মূল টেকস্ট না পড়ে ইংরেজিসাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন এদেশেই সম্ভব। একথাও বলা যায়, উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার পরও অধিকাংশের সাহিত্যবোধ, সমাজচিন্তা, বিজ্ঞানমনষ্কতা ইত্যাদি অবিকশিত থেকে যায়। পরীক্ষার রিলে রেসে আবদ্ধ ছাত্রজীবন কাটিয়ে অধূনা অধিকাংশ শিক্ষিতজনের স্কুলজীবনে নাটকে, অভিনয়ে, গানে, আবৃত্তিতে, বিতর্কে কি স্কাউটিং, ক্যাম্পিং, ক্রীড়ার অভিজ্ঞতা থাকছে না; স্কুল, সহপাঠী, শিক্ষককে নিয়ে এমন বৈভবময় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছে না যা ভবিষ্যত জীবনে বারবার ফিরে ফিরে আসবে মধুর উদ্দীপক স্মৃতিচারণ হয়ে। সঞ্চয়হীন মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে অবশ্যই দরিদ্র থাকবে, আর স্মৃতিহীন মানুষের মানবিক খুঁটিগুলো তৈরি হয় না। বেপরোয়া কাজে কি বখাটেপনায় লিপ্ত হতে তার অন্তর থেকে রুচির বাধা তৈরি হবে না। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাদের পক্ষে সম্ভব। এই রিক্ততার বড় খেসারত হচ্ছে আমাদের শিক্ষিতজনদের প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম গড়ে উঠছে না - পেশা বা জীবিকার সত্তার বাইরে মনুষ্যসত্তার মান খুবই খারাপ হচ্ছে।
পরীক্ষাই সব হয়ে ওঠায় একে ঘিরে শিক্ষার প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, এমনকি বেআইনি কাজ ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা। অন্ধবিশ্বাস যেমন ধর্মকে ঘিরে অসাধু ব্যক্তিদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয় এ ‘শিক্ষাও’ তার উপজাত হিসেবে নোটবই, টেস্ট পেপার, মেডইজি, কোচিং সেন্টার, টিউশিন এবং অবশ্যই প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষাকে জড়িয়ে রাখছে। বত্রিশ সেট প্রশ্ন তৈরি করেও এটা বন্ধ করা যাবে না। কারণ শিক্ষার একমাত্র আরাধ্য দেবতা যদি হয় পরীক্ষা তো তাঁকে তুষ্ট করার জন্যে পুণ্যলোভী - এক্ষেত্রে A+ লোভী - শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবক, তেমন পুরোহিতই খুঁজবেন যিনি যে কোনো মূল্যে - অর্থাৎ অবৈধ পথে হলেও - মোক্ষ লাভে সহায় হবেন। শিক্ষকের মধ্যে তেমন যোগ্য সাহসী মানুষের অভাব ঘটাই স্বাভাবিক। তাতে কেউ দমবেন না। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা, কেরানি, প্রেসকর্মী, দপ্তরি, মায় দারোয়ান ইত্যাদি যেকোনো স্তর থেকে কাক্সিক্ষত ‘সাহসী যোগ্য’ পুরুষ এগিয়ে আসবেনই। হয়ত দর চড়বে, প্রণামী বাড়বে - এই যা।
২.
এটি আদতে শৈশবেই সশ্রম দ-প্রাপ্ত শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প। ঘরের নামে ওদের খাঁচায় বন্দি রাখা হয়, শিক্ষা জীবন কাটে কারাগারে, পরীক্ষার দ- খাটতে খাটতে। আশ্চর্য ব্যাপার হল শিক্ষা নয় এই দ- ভোগেই সবাই যেন প্রলুব্ধ হয়, এমনকি এতে আনন্দ পেতে থাকে, তার জন্যে নানা প্রলোভনও মওজুদ থাকছে। ফলে মানবজীবনের প্রস্তুতিকাল, পুরো কৈশোর ও প্রথম তারুণ্য, পরীক্ষার শৃঙ্খলে বাঁধা থাকছে। তাদের মাঠের, মুক্ত হাওয়ার, আলোর, আকাশের, গাছের, মাটির, জলের, সমবয়সীর সঙ্গের, বড়দের  স্নেহমমতার এবং গল্পের, সুরের, রঙের, আঁকার, ভাঙার, গড়ার, চড়ার, লাফাবার, দৌড়োবার যে অপরিমেয় ক্ষুধা-চাহিদা তা কি পূরণ করেছি আমরা? তার প্রকৃত আনন্দ, তার মনের বিকাশ কিসে সেসব ভাবনা কি আমাদের শিক্ষার এজেণ্ডায় আর সমাজের ভাবনায় আছে?
কোন ব্যবস্থায় একজন নিউটন জীবনসায়াহ্নে বলতে পারেন ‘আমি মাত্র জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি’ তা আমরা ভাবি না। আর ভাবি না বলেই জীবনপ্রভাতেই শিক্ষার্থীর গায়ে পরীক্ষার্থীর যুদ্ধ চড়িয়ে দিচ্ছি।
আমরা কেন এভাবে একটি - আসলে কোটি কোটি - বিয়োগান্তক গল্প রচনা করে চলেছি? এটা আফসোসের কথা, কারণ এ পরিণাম ঠেকানো সম্ভব - সহজেই এর পরিণতি মিলনাত্মক করা যেত।

***



Monday, September 8, 2014

কোন্ পথে চলবে বিএনপি

আবুল মোমেন

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত বিরোধী দলের মূল কাজ হল জনগণের পাশে থেকে দেশ ও জনস্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান গ্রহণ। বক্তব্য প্রকাশ এবং নানা মাত্রার আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে তা করাই রেওয়াজ। এছাড়া জনগণের কোনো ভোগান্তির সময়ও তাদের পাশে দাঁড়ানো রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গে বন্যা হচ্ছে। বন্যা বেশ ভালো মতই হচ্ছে এবং বহু মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। পত্রপত্রিকার খবরে বোঝা যাচ্ছে ত্রাণ কাজ এখনও অপ্রতুল। তাছাড়া এসব অঞ্চলে বিপুল দরিদ্র মানুষ এমনিতেই যে কষ্টে থাকে তা জানা থাকলে এ সুযোগে তাদের ঘরবসতি ও জীবনমানের উন্নতির জন্যে কিছু মানবিক কাজ করে রাজনৈতিক দল লাভবান হতে পারে। এছাড়া গার্মেন্টস কারখানাকে ঘিরেও মানবিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ রয়েছে।
সারাদেশে রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় যোগাযোগ খাতে জনদুর্ভোগ চরম পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি লঞ্চডুবি ও প্রচুর প্রাণহানিতে  এ খাতের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে। এভাবে তালিকা দীর্ঘ করা সম্ভব।
বিএনপি এরকম কোনো ইস্যু নিয়েই আন্দোলনে নামছে না। সব সময় সব ইস্যুতে তাদের সুচিন্তিত বক্তব্য থাকে না। ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দলটিকে দেখাও যাচ্ছে না। বলা যায়, প্রত্যক্ষভাবে মাঠ-পর্যায়ে জনসেবার রেওয়াজ যেন এ দলটির মধ্যেই নেই।
বিএনপি নেতা-কর্মীরা জানেন কোনো মতে সাধারণ নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাদের জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি। হয়ত তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির জয় অবধারিত। ফলে দেখা যাচ্ছে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকা- মূলত সরকার পতন ও দ্রুত মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।  মনোভাবটা হয়ত এরকম, একবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ফিরে পেলে সব কাজই করা সম্ভব, করা হবে।
এই মনোভোবের কারণে দলের রাজনীতির জন্যেই কতকগুলো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, বিএনপি যে সরকারের বাইরে থাকলেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালনে অসচেতন ও অক্ষম এ সমালোচনা সমর্থিত হয়। দ্বিতীয়ত, বিএনপির রাজনীতি একমাত্র এই দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ায় একে অগ্রাহ্য করা কিংবা এটি আদায়ে সম্ভাব্য আন্দোলন ঠেকানোর জন্যে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে মাঠে না নেমে সরকারি নানা ব্যবস্থা ও বাহিনীর সহায়তার মাধ্যমেই কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে দেশের নানা অঞ্চলে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠা ও দানা বাঁধানোর কোনো সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তৃতীয়ত, সরকার পরিবর্তন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জনকল্যাণের জন্যে যদি করাও হয়ে থাকে তা মূলত একটি আইন ও সাংবিধানিক বা বলা যায় আদর্শিক বিষয় কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে জনদুর্ভোগ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় বলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। তারা বোঝে এটা দলের নীতি-নির্ধারকদের এজে-া, এতে যুক্তি বা বক্তব্য হাজির করা তাদের এক্তিয়ারের বিষয় নয়। চতুর্থত, এভাবে চলতে থাকায় জেলা পর্যায়ের নেতা ও সারাদেশের কর্মীদের মধ্যে যথার্থ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলন দাঁড় করাতে না পারার হতাশা ছড়াচ্ছে। ফলে দিনে দিনে দল ও দলীয় কাজকর্মে স্থবিরতা নামছে। সরকার শাসনদ- আরও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে রাখার ও চালানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
নি:সন্দেহে এটি বিএনপির রাজনীতির জন্যে কঠিন সময়। এ সময় নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সৃজনশীলতা এবং অঙ্গীকার ও সাহসী ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। মানতেই হবে নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সূত্রে বলা দরকার বর্তমান সময়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের পুরোনো ধরণ ও ভাবনা নিয়ে রাজনীতিতে এগুনো যাবে না। সময়োপযোগী পরিবর্তনের তাগিদ বোঝার জন্যে নেতৃত্বে দূরদর্শিতা প্রয়োজন, আর তা সম্পাদন করার জন্যে প্রয়োজন সৃজনশীল হওয়ার ক্ষমতা। তারপর চাই কর্মীদের নিয়ে সরকারি দল ও বাহিনীর প্রতিবন্ধকতা ভেঙে মাঠে নামার সাহস। এ তিন ক্ষেত্রেই এখনও পর্যন্ত খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান দলকে যথাযথ নেতৃত্ব দিতে পারেন নি।
বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির বিবেচনায় আওয়ামী লীগের একটি বড় সাফল্য হল জামায়াতে ইসলামির গায়ে ভালোভাবে যুদ্ধাপরাধীর ছাপ মেরে দিতে পারা। তার ওপর, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইসলামি জঙ্গিবাদ উত্থানের সমস্যার আলোকে ওয়াহাবিপন্থাসহ সুন্নিধারা থেকে উদ্ভূত নানান কট্টরপন্থা সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যেও সচেতনতা ও সতর্কতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামকে রাজনৈতিক সঙ্গী রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মকা-ে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে হয়  না।
একটি খাঁটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির উচিত ছিল ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা বর্তমান সরকারের ভূমিকায় ধীরে ধীরে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হতে থাকা নাগরিকসমাজের বিভিন্ন ফোরামের সাথে সংযোগ বাড়ানো। এটি ফলপ্রসূ করতে হলে অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াত সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পরিষ্কার করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। অতি সম্প্রতি দলে ক্রমেই সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও দলীয় অবস্থান ও ভূমিকায় তার প্রতিফলন দেখা না গেলে এ কেবল সাময়িক রাজনৈতিক চাল বলেই গণ্য হবে। জনমনে কোনো গুরুত্ব পাবে না।
মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক অঙ্গনে কঠিন সময় ও প্রতিকূল চ্যালেঞ্জ একটি রাজনৈতিক দলের সামনে দলীয় ভাবমূর্তি, দলের প্রভাব এবং দল ও নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর বিরাট সুযোগ তৈরি করে। বস্তুত এভাবেই ষাটের দশকে পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী শাসকের দমনপীড়নের মুখেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাঙালির জনপ্রিয় সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বিপরীতে ক্ষমতায় থেকে সামরিক এজেন্সির সহযোগিতায় বিভিন্ন দলমতের মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা আজ প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে। এতকাল বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের এই সংকটের সাথে পরিচিত হন নি, কারণ তেমন বাস্তবতা তৈরি ছিল  না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আজ তা প্রকাশ হওয়ার পরে দলের নেতৃত্বকে পরিবর্তন-সংশোধনের বিষয় উপলব্ধি করতে দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের চাপের মুখে তাদের আচরণ ও ভূমিকা দিশাহীন শিক্ষানবীশ রাজনীতিকের মত মনে হচ্ছে। ফলে কর্মসূচিগুলো যে নামকাওয়াস্তে দায়সারাগোছের কাজ তা বুঝতে কারও অসুবিধা হচ্ছে না। নিজেরাসহ কেউই এগুলোর ব্যাপারে এখনও সিরিয়াস নন। এভাবে চললে আগামী নির্বাচনে আপনা-আপনি বিজয় এসে ধরা দেবে বলে নিশ্চিত থাকার সুযোগ বিএনপির জন্যে আর থাকবে না। আর কর্মীদের ছাপিয়ে ততদিনে হতাশার ছোঁয়া জনমনেও পৌঁছাবে।
বিএনপির ভবিষ্যত বর্তমানে নিহিত রয়েছে। বলা যায় বর্তমান সময় বিএনপির জন্যে ক্রান্তিকাল হিসেবে এসেছে। দেখা যাক তারা কি আওয়ামী লীগের মত সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে টিকে থাকতে পারবে নাকি মুসলিম লীগের মত বড় ধরনের পরাজয়ের ধাক্কায় ধীরে ধীরে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

Saturday, July 26, 2014

মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শিক্ষা দেয়

আবুল মোমেন

পশ্চিমের গণমাধ্যম মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার ট্রাজেডি যে গুরুত্ব পেয়েছে তা গাজায় ইজরায়েলের নরমেধযজ্ঞকে ছাপিয়ে গেছে। একইভাবে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে ও অন্যান্য কূটনৈতিক তৎপরতাতেও এ ইস্যুটিাই এখন প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা অবশ্যই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। আর বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা একটি নিকৃষ্ট ধরনের অপরাধ। অবশ্যই এ ট্র্যাজেডির সুষ্ঠু স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করে শাস্তি দেওয়া সবারই দাবি।
গাজায় ইজরায়েলের সর্বাত্মক আক্রমণ বস্তুত ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে গণহত্যার ঘটনা। শুধু নিহত ও আহতের সংখ্যা এবং ও সম্পদ ধ্বংসের দিক থেকে এ বর্বর আক্রমণ বিমান দুর্ঘটনার চেয়ে আকারে অনেক বড়। মৃতের সংখ্যা পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে, আহত দুই হাজারের ওপরে। সবচেয়ে বড় কথা মারা যাচ্ছে বেসামরিক মানুষ, যার অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, হামাসের রকেট হামলা বা সামান্য প্রতিরোধ বানের জলে খড়কুটোমাত্র। এটি একতরফা গণহত্যার ঘটনা। এ শতাব্দীর এযাবৎ সবচেয় বড় ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে বিশ্ববাসীর সামনে। নিহতদের সকলেই মুসলমান, এখন রমজান মাস চলছে, সামনে ঈদ।
মালয়েশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান ট্র্যাজেডি নিয়ে পশ্চিমের এত গরজের মূল কারণ এ ঘটনায় তারা প্রতিপক্ষ রাশিয়ার দিকে আঙুল তাক করতে পারছে। ক্রিমিয়া দখলের অজুহাতে তারা একজোট হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা চালাচ্ছে। তাতে অবশ্য পুতিনকে নরম করা যায় নি। এবারে ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনের বিদ্রোহী রুশপন্থীদের সমর্থন দানের অজুহাতে রাশিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘোলাটে নয়। একেবারে কাঁচের মত স্বচ্ছ। ইজরায়েল কোনো রকম রাখঢাক করছে না, তারা ঘোষণা দিয়েই হামাস-দমনের নামে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে হানা দিয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। খুনী কে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চুপ।
তারা কেন চুপ সে ইতিহাস অবিদিত নয়। কেন কৃত্রিমভাবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হল, কারা করল তা সবার জানা আছে। ১৯২২ সনে বেলফুর ঘোষণার মাধ্যমে এই নবযাত্রা শুরু। ১৯৪৬ সনে প্যালেস্টাইন থেকে আরব মুসলমানদের উৎখাত করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিজয়ী ব্রিটেন-ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র যেন যুদ্ধে নাৎসি অনাচার-অবিচারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দিল। আদতে ইহুদিবাদীদের এ পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বহু পুরোনো। ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন হ্রাস পাচ্ছিল তখন তারা সর্বত্র কৌশলগত সুবিধা কায়েমের প্রয়াস চালিয়েছে। উপমহাদেশে পাকিস্তান সৃষ্টি ও কাশ্মীর সমস্যা তৈরি যেমন তেমনি প্রত্যক্ষভাবে শাসকের হাত গুটানোর আগে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি করল ইজরায়েল রাষ্ট্র। রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিরা এসে বসতি করেছে এই জবরদস্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে। ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ থেকে নিয়ে আজকের দিন পর্যন্ত ইতিহাস বিচার করলে দেখা যাবে প্রতিবারের যুদ্ধে ইজরায়েল তার ভূসীমানা বাড়িয়েছে। ইহুদি বসতি বাড়িয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। এবারে যুদ্ধ শেষ হলে হয়ত পশ্চিম তীরে কিছু জমি দখলে রাখবে তারা।
ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা যখন মানবাধিকার বা আইনের শাসনের কথা বলে, যখন আমাদের এ বিষয়ে নানা উপদেশ দিতে চায় তখন এর ভণ্ডামির দিকটাও যেন আমরা খেয়াল রাখি। এসব যে নিতান্ত ফাঁকা বুলি, তাদের দ্বৈতনীতি ও দ্বৈত মানদণ্ডের প্রমাণ তা-ও আমাদের বুঝতে হবে। আমরা নিশ্চয় দেশে সবার মানবাধিকারের সুরক্ষা চাইব, আমরা অবশ্যই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকুক এমনটাই চাই। কিন্তু তা নিজেদের তাগিদে, নিজেদের বিবেক বোধ থেকেই চাইব। কারও শেখানো বুলি হিসেবে নয়, তাদের মুখপাত্র হয়ে নয়। বিশেষ ভাবে আমরা অবশ্যই পশ্চিমা দেশ বা তাদের সংস্থাগুলোকে সাক্ষী মেনে নিজের দেশের সমস্যা সমাধান করতে যাব না। তাদের ভণ্ডামি, মিথ্যাচার, দ্বিবাচার আজ আর গোপন কিছু নয়।
কথা হল, মুসলিম দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা বিশ্ব এভাবে মুরুব্বিয়ানা করে চলেছে কীভাবে কেনই বা তারা বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ একাজ অপ্রতিহতভাবে করতে পারছে? না, এটা কোনো মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন নয়। এর উত্তরও সবার জানা।
মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের মুরুব্বী দেশ সৌদি আরব। আর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সেখানকার সকল তেলসমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আত্মবিক্রিত হয়ে আছে। ওআইসি বা আরব লীগের শক্তিশালী সদস্য হচ্ছে সৌদি আরব। এসব আরবদেশের শাসক সম্প্রদায় তেলের সম্পদে অচিন্ত্যনীয় বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আর ওদের সকল তেলখনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক কোম্পানির অধীনে পরিচালিত। তাদের উপার্জিত অর্থ বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে লগ্নি খাটার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে তেলের উৎস দেশগুলোকে কমিশন দিয়ে বিপুল উপার্জন করছে তারা আর অন্যদিকে উৎস দেশসমূহের অর্জিত কমিশনের টাকার সিংহভাগ থাকছে তাদের মালিকানাধীন ব্যাংকে বা খাটছে তাদের দেশসমূহে অন্যান্য ব্যবসায়িক খাতে। এই মহালাভের স্বর্গসুখ কোনো বোকাও সহজে ছাড়তে যাবে না। আর এখনও পর্যন্ত গোত্রবিভক্ত অনাধুনিক আম আরব জনগণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলতে পারে নি। তাদের ওপর স্বৈরাচারী বাদশাহী শাসন চলছে, ইসলামের নামে সকল রকম গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে সেসব দেশে। শাসককুলকে বিভোর করে রাখা হয়েছে ভোগবিলাসের আনন্দে, যেমন একসময় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন চীনাদের বুঁদ করে রেখেছিল আফিমের নেশায়।
কেন পশ্চিমারা ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেনের ওপর এত খাপপা ছিল, এত খড়্গ হস্ত হল? তাও অবশ্য কারো অজানা থাকার কথা নয়। আরব অঞ্চলে সাদ্দাম ছিলেন অন্যান্য শাসকদের থেকে পৃথক। তিনিও স্বৈরাচারী ছিলেন, কিন্তু ছিলেন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তি, তিনি তাঁর দেশের তেলখনির ওপর অধিকার বাড়াচ্ছিলেন, তেল ব্যবসা স্বাধীনভাবে চালাচ্ছিলেন। ফলে তাঁকে নিয়ে মুরুব্বীদের সমস্যা। আরেক সমস্যা হল ভূতাত্ত্বিক জরীপে দেখা যাচ্ছে ইরাকে আরও প্রচুর তেল ও গ্যাস মওজুদ রয়েছে। এরকম একটি ‘সোনার’ খনি এরকম একজন ‘বেয়াড়া’ লোকের হাতে ছেড়ে দিতে চায় নি পশ্চিমের কার্পোরেট মুরুব্বীরা। তাদের হয়েই দেশ শাসন করেন ওবামা-বুশরা, ব্লেয়ার-ক্যামেরুনরা। ফলে তাদের চাপ এবং নিজেদের গরজ কাজ করেছে একযোগে। মনে করুন ১৯৫৩ সনে ইরানের ঘটনা। সেদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ড. মোসাদ্দেক সরকার যে-ই তেলখনি জাতীয়করণ করল অমনি একটা অজুহাত খাড়া করে আক্রমণ চালাল ব্রিটেন। সরকারের পতন ঘটাল এবং দ্রুত শাহের মাধ্যমে পশ্চিমের শিখণ্ডি সরকার বসানো হয়েছিল।
তাই মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদী বিশ্বের আলাদা কোনো রাজনীতি নেই। অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বারাই তাদের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। এমনকী গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা মানবাধিকারের মত ইস্যুগুলো নিছক রাজনৈতিক ছলমাত্র। নতুবা তারা কেন গণতন্ত্রহীনতা, আইনের শাসনের অভাব বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরাকে আক্রমণ চালাল আর গণতন্ত্রের সামান্যতম নমুনাও যেসব দেশে নেই সেই সৌদি আরবের সরকারকে চাপে রাখে না, হুঁশিয়ার করে না? তারা যে অজুহাতে ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছে, কার্যত ইরাক ধ্বংস করেছে, সেই সব অজুহাত অনেক বেশি খাটে সৌদি আরব, কুয়েত, আবুধাবির মত দেশের ক্ষেত্রে।
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইজরায়েলের ভূমিকা কেমন তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ধর্মের জঙ্গিরূপ ধারণ কীরকম আত্মঘাতী ফলাফল আনে তা-ও দেখছি হামাসের ভূমিকা ও তার পরিণাম দেখে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার কী ধরনের পরিণতি সৃষ্টি করে তাও দেখছি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কট্টর ইসলামি দেশগুলোর ভূমিকায়। আমাদের দেশেও ধর্মান্ধদের হাতে মানবতার লাঞ্ছনা যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি প্রকারান্তরে তা কীভাবে ধর্মের বাণী ও শিক্ষার পরিপন্থী ভূমিকা রাখে। আমরা দেখছি ধর্মীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্থা ওআইসি বা আরব লীগও চরম সংকটের সময়ও কেমন অকার্যকর হয়ে থাকে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন অতীতের জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের মত মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের মহাজোট। ষাট-সত্তরের দশকে এ জোট যখন সক্রিয় ছিল তখন বিশ্বের রাজনৈতিক হালচাল তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল, তখনই এশিয়া-আফ্রিকা থেকে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান হয়েছে, গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ হয়েছে। তখনই যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো এবং কার্যকর প্রতিবাদ হয়েছে - সে কিউবা সংকট হোক আর আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ হোক। সেদিন প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্ব নয় বিশ্ব রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের নায়ক ছিলেন নেহেরু-নাসের-নক্রুমা-টিটোর মত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা। আজ আবার সেই রকমের বিশ্ব ফোরাম দরকার। সেই ফোরাম তার নেতাও তৈরি করে নেবে। তবেই তথাকথিত মুক্তবিশ্বের অন্যদের অবরুদ্ধ করার অন্যায়ের, ছলনার, ধাপ্পাবাজির রাজনীতিকে অকার্যকর করা যাবে। ইজরায়েলের মত  ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ধৃষ্টতাও বন্ধ করা সম্ভব হবে।



Wednesday, July 9, 2014

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির সন্ধানে

আবুল মোমেন

ব্রিটিশ শাসকরা ১৮৬১ সনে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করেছিল। বিশেষ এলাকা দুটি কারণে -১. এর বৈচিত্রপূর্ণ প্রকৃতি যেখানে পাহাড় আর অরণ্য রয়েছে জীববৈচিত্রের ভাণ্ডার হিসেবে এবং ২. জনবৈচিত্র যা ১১টি উপজাতির স্ব-স্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র নিয়ে বিশিষ্ট। এই জনগণ মূলত অরণ্যচারী এবং মূলধারার নাগরিক সংস্কৃতির বাইরে নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে নিভৃত জীবনে অভ্যস্ত। এদের জীবনাচার ও সংস্কৃতি সমভূমির কৃষিসমাজের পূর্ববর্তী কালের। সে অর্থে তুলনামূলকভাবে প্রাচীন কিংবা আদিম। এর মধ্যে আকস্মিকভাবে এবং গুণগতভাবে যদি ভিন্ন জীবনাচারে অভ্যস্ত মানুষজনের ব্যাপক আনাগোনা ও বসবাস শুরু হয় তাহলে দুই কালিক সংস্কৃতি, যা প্রায় মৌলিকভাবেই বিপরীত, তার মধ্যে সংঘাত দেখা দেবে।
এই মৌলিক বৈপরীত্য সম্পর্কে দুটি কথা বলা যায়। সমভূমির মানুষের কৃষিসমাজ গড়ে উঠেছে বন কেটে আবাদ করার নীতির ভিত্তিতে। কেবল বন কাটা নয়, কৃষিসমাজের মানুষের লক্ষ্য থাকে যে কোনা জমিকে -তা বন হোক, নতুন জাগা চর হোক কি এবড়োথেবড়ো পতিত জমি হোক সেগুলোকে আবাদযোগ্য করে তোলা। বিপরীতে পাহাড়ী অরণ্যে বসবাসকারী ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রকৃতির সাথে সহবাসে অভ্যস্ত, একে মৌলিকভাবে পাল্টাতে তারা নারাজ। ফলে এদের হাতে বন-সম্পদ যুগ যুগ ধরে রক্ষা পেয়ে এসেছে। অনেকেই মনে করেন জুম চাষে পাহাড়ে যে আগুন দেওয়া হয় তাতে বনসম্পদ নষ্ট হয়। আসলে অরণ্যাচারী জনগোষ্ঠী বরাবরই প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় সংখ্যায় অল্প থাকে, ফলে তাদের এ ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতি প্রয়োজনীয় ফসল ফলানোর পাশাপাশি বনভূমিকে উর্বর করার পদ্ধতিও বটে। তাই শত বছরের ইতিহাস থেকে দেখা যায় এ অঞ্চলে কৃষিসমাজের বাঙালির ব্যাপক আবাসনের আগে বনভূমি বিনষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই। বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ বাঁচিয়ে জীবনধারনের এ তাদের সহজাত শিক্ষা। কিন্তু কৃষিজীবী মানুষ বনকে আপদ মনে করে আর সবধরনের পশুকেই হিং¯্র ও বিপজ্জনক ভাবে। ফলে দুটিরই বিনাস তার সহজাত অভ্যাস।
দ্বিতীয় বৈপরীত্যের বিষয়টিও মৌলিক। অরণ্যবাসীর জীবনে ও মননে প্রকৃতিই সবকিছুর আধার ও নিয়ন্তা। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি তার মনোভাব ভক্ত বিশ্বাসীর এবং এর পূজা করেই সে শান্তি পায়। তৌহিদি ধর্মের মানুষের মানস এর বিপরীত। ফলে বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক উভয় সংস্কারেই বৈপরীত্য বিদ্যমান।
এই বৈপরীত্যের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব বিবেচনায় নিলে কেবল পার্বত্য জেলা নয় অন্যান্য সমভূমির বনাঞ্চল বা স্বকীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে অভ্যস্ত সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ঘটানোর মত যেকোনো কাজের আগে দশবার ভাবা দরকার। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে ভাবতে হবে বিশেষভাবে।
২.
আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারব না যে বাংলাদেশ কেবল একটি জনবহুল দেশই নয়, এখানে ভূমির তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। সে কারণেই কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে এদেশে খাদ্যাভাব ও দারিদ্র লেগেই ছিল। আধুনিক প্রযুক্তি ও  উপকরণের ব্যবহার বাড়িয়ে খাদ্যাভাব দূর করা গেছে, কিন্তু দারিদ্র্য এখনও আমাদের বড় সমস্যা। অর্থনীতি ও মানুষের পেশায় পরিবর্তন ঘটছে। শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে যাচ্ছে, প্রান্তিক নারীরা দলে দলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন। শিক্ষার হার বাড়ছে,স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুযোগসুবিধা বাড়ায় গড় আয়ু ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে, দারিদ্র কমছে। কিন্তু জমি বনাম জনসংখ্যার সংকট কমানোর উপায় নেই - কারণ জমি স্থিতিশীল আর জনসংখ্যা বর্ধিষ্ণু।  তিনটি মূল কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাস্তচ্যুত হচ্ছে - ১. প্রাকৃতিক কারণ, যেমন নদী ভাঙন বা সিডরের মত দুর্যোগ, ২. দারিদ্র, যে কোনো পারিবারিক দুর্যোগ বা উৎসবে তাদের সহায় সম্বল বিক্রি করতে বাধ্য হয় প্রান্তিক মানুষ এবং ৩. আকস্মিকভাবে বিত্তবান হয়ে ওঠা মানুষ ও নতুন গজিয়ে ওঠা আবাসন শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রলোভন ও চাপে দরিদ্র মানুষ জমি হারাচ্ছে। ফলে মাথা গুঁজবার ঠাঁই খুঁজতে গ্রামের বাস্তচ্যুত এবং স্বল্পায়ী ও বেকার মানুষ বিপদ আপদ ভবিষ্যত কিছু নিয়েই ভাববার অবকাশ পায় না। তার কাছে বর্তমান এক নির্মম ও কঠিন বাস্তবতা। এর ফল হিসেবে আমরা দেখি যে-চর মাত্রই সমুদ্র থেকে জাগছে, যেখানে এখনও জোয়ার ভাটার খেলা চলে, যে জমি দিনে দু’বার জোয়ারে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায় সেখানেও মানুষ মাচাঘর তুলে বসবাস শুরু করে দিচ্ছে। সুন্দরবনের বাঘ-কুমীর-সাপের সঙ্গে লড়ে বসতি করছে, নোনা পানির মধ্যে ঘর তুলছে, চট্টগ্রাম শহরে পাহাড়ের পাদদেশে ধসের ঝুঁকির মধ্যে সংসার পাতছে। আর শহরের ফুটপাথে, রেললাইনের ধারে, যেকোনো পতিত জমিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে শোয়ার জায়গা করে সপরিবারে দিন গুজরান করছে। যেদেশে প্রায় চল্লিশ ভাগ মানুষ এরকম বসতি সঙ্কটে আছে তাদের জন্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ছয় হাজার বর্গমাইলের বিস্তীর্ণ তিনটি জেলা একটা আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। নতুন-জাগা চর, পাহাড়ের পাদদেশ বা বাঘ-কুমীর অধ্যুষিত অরণ্য বা মহানগরের ফুটপাত, রেললাইনের ধারের চেয়ে এ অঞ্চল তাদের বেশি পছন্দের জায়গা হওয়াই স্বাভাবিক।
মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদার মধ্যে বাসস্থানের অধিকার অন্যতম। সরকার এ অধিকার পূরণের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। তাদের মাথায় বিপন্ন মানুষের পুনর্বাসনের জন্যে নানা বিকল্পের মধ্যে নিশ্চয় পার্বত্য অঞ্চলের কথাও এসেছে এবং সেভাবে কাজ হয়েছে।
তবে পার্বত্য অঞ্চলে প্রথম ব্যাপক হারে সরকারি উদ্যোগে বাঙালি বসতিস্থাপনের পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৭৯-৮০-৮১’র দিকে জেনারেল জিয়া এ কাজ শুরু করেছিলেন মূলত শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিকার হিসেবে। উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে ছাপিয়ে বাঙালি জনসংখ্যা বাড়ানো। তাঁর অনুসৃত নীতি পরবর্তী পনের বছর ধরে  জেনারেল এরশাদ ও বেগম জিয়ার সরকার পালন করে গেছে। এর ফলে সত্যি সত্যিই পাহাড়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য পাহাড়ীদের প্রতিকূলে চলে গেছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যা সম্ভবত পাহাড়ী-বাঙালি ৪৮:৫২ হয়ে গেছে, যা স্থানীয় অধিবাসী হিসেবে পাহাড়ীদের পক্ষে মানা কঠিন।
৩.
এবারে আমাদের বুঝতে হবে এর ফলাফলটা কী হল। মনে রাখতে হবে ১৯৭৯-৮০’র আগে দীর্ঘদিনে স্বাভাবিক নিয়মে পাহাড়ে সমভূমি বাঙালিদের যে বসতি গড়ে উঠছিল তাতে কোনো সংকট হয়নি। তারা পরস্পর মিলে মিশে বসবাস করেছে। কিন্তু এবারে দুটি কারণে সংকট তীব্র হল। প্রথমত, পাহাড়ে বাঙালি অভিবাসনের সরকারি নীতির পিছনে এমন একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল যাকে স্বাধিকারের জন্যে সংগ্রামরত জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের একটি হীন চক্রান্ত বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। বাস্তবে তাই হয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকানো যায় নি। দ্বিতীয়ত, অল্পসময়ে যে ব্যাপক বাঙালিকে পরিকল্পিতভাবে সেখানে বসতির ব্যবস্থা করা হয়েছে তাদের অধিকাংশের পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র ছিল কৃষি। প্রথম অধ্যায়ে কৃষিসমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য-প্রবণতার কথা বলা হয়েছে তা এখানে ঘটেছে। পাশাপাশি কৃষি শিল্পের বিকাশের জন্যে সরকার বাঙালিদের নির্বিচারে জমি বরাদ্দ দিয়ে সংকট ঘনীভূত করেছে। এতে একেবারে এই বাস্তব ভূমি-সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ একটা গভীর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক সংঘাতের সম্মুখীন হল। প্রকৃতিভিত্তিক সরল এবং আদিম। জীবনসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠী প্রকৃতি-উদাসীন বা প্রকৃতি শাসনে অভ্যস্ত সাকার পূজা বিরোধী জটিল প্রবল সংস্কৃতির চাপের মধ্যে পড়ে যায়। তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনব্যবস্থা, খাদ্যোৎপাদন পদ্ধতি, নিভৃত জীবনযাপন, স্বাধীন মুক্ত জীবনের অভ্যাস আকস্মাৎ ভেঙে পড়েছে। তারা ভূমি হারিয়েছে, খাদ্য সংকটে পড়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা নিভৃতের মুক্ত জীবনের অধিকার খুইয়েছে। সবটা মিলে এটি তাদের জন্য বড় রকমের আঘাত।
৪.
আমাদের মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত সমভূমির ভূমিহীন মানুষের কিছু অভিবাসন হওয়া অযৌক্তিক নয়। কিন্তু তা হতে হবে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের নেতৃবৃন্দের বা নির্ভরযোগ্য জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটির মতামত নিয়ে। এ ব্যবস্থাটি  সামগ্রিকভাবে দেশের জন্যে প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি মূল্যবান জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে সমভূমির বাঙালি অভিবাসন হবে, কিন্তু তা হতে হবে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় মানুষের সম্মতিতে এবং প্রকৃতি, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের কৃষ্টি-ঐতিহ্য রক্ষার জন্যে কিছু শর্তের ভিত্তিতে। একমাত্র এভাবেই এ অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে হয়।

Thursday, April 10, 2014

কোথায় আছে অমৃত?

আবুল মোমেন

রাষ্ট্রের গতিপথ কখনও মসৃণ নয়, উত্থানপতন ও বাঁকবদল এত বড় আকারে হয়ে থাকে যে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, প্রতি পঞ্চাশ বছরে একবার মহাদেশের মানচিত্রে পরিবর্তন ঘটে। ইউরোপের দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টা সহজে বোঝা যাবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পর ইউরোপের মানচিত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। তারপর ১৯৮৯-এর পরে জার্মেনি, চেকেশ্লোভাকিয়া (এখন বিলুপ্ত), যুগোশ্লাভিয়া (এখন পাঁচটি ভাগে বিভক্ত) এবং পূর্বেকার সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এই অস্থিরতা যে এখনও কাটেনি তা সাম্প্রতিক ক্রাইমিয়া ক্রাইসিসে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকাতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক কাল শেষ হয়ে স্বাধীনতার পর্ব শুরু হওয়ায় তখনই রদবদল ঘটেছে। তাতে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর ও মধ্য আফ্রিকার মানচিত্র নির্মাণ ঠিক ছিল কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত এতে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিষয়টিই অগ্রাধিকার পেয়েছে। তারই জের ধরে  প্যালেস্টাইন সমস্যা ষাট বছর ধরে চলছে বা ইরাক আকষ্মিকভাবে কুয়েত দখল করে নিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের আবির্ভাব প্রমাণ করে উপমহাদেশে ১৯৪৭-এর সাম্রাজ্যবাদী দেশভাগ সঠিক ছিল না। এসব দৃষ্টান্ত থেকে রাষ্ট্রের অস্থিরতা আমরা বুঝতে পারি।
এর ওপরে আছে রাষ্ট্রশাসনেও নানা উত্থানপতন। ভিন্ন মতাবলম্বী নিয়েই গণতন্ত্র, কিন্তু সেই গণতন্ত্রই অনেক সময় চরম ফ্যাসিবাদের উত্থানে সহায়ক হয়ে থাকে, যেমন হয়েছিল ১৯৩৬ সালে জার্মেনিতে নির্বাচনে হিটলারের বিজয়ের মাধ্যমে।
এখন প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের  দেশ ভারতবর্ষে সাধারণ নির্বাচন শুরু হয়েছে। সব জরিপ ও জল্পনায় বলা হচ্ছে এবারের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়ান্স (এনডিএ) বিজয়ী হবে এবং ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গার জন্যে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদীই হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সবার আশংকা বিজেপির অতীতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির তুলনায় মোদী শক্ত হাতে তাঁর নিজস্ব ও দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইবেন। তাতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সমাজজীবনে পরিবর্তনের হাওয়া লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি মুসলিম সমাজের তুলনায় বলা যায় হিন্দু সমাজের উপরিকাঠামোর পোশাকি সংস্কৃতি দৃশ্যত অনেক উদার হলেও তার হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সামাজিক এজেন্ডা বস্তুত অনেক রক্ষণশীল ও কট্টরভাবে অনুদার। ফলে এরকম শাসনামলে অহিন্দু সম্প্রদায়গুলো, বিশেষত বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিমসমাজ, বৈষম্যের শিকার হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়া উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান দেশেও যে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই।
এবারের নির্বাচনে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী দলের ভূমিকা নেওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সংযত ছিল। ইশতেহারের ঘোষণায় এমন ইঙ্গিত থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় তারা ভারতবর্ষের ঐক্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর জোর দিচ্ছে। তাতে ভারতীয় শক্তিশালী বণিকসম্প্রদায় মোদীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া দারিদ্র, বৈষম্য, শোষণ-পীড়িত সমাজের সাধারণ মানুষ বরাবর স্থিতিশীল সরকার ও শক্তপোক্ত শাসকের পক্ষে। একারণেই ভারতের সাধারণ মানুষ আম আদমি পার্টির নীতি বাগিশ অবস্থানকে দুর্বলতা বলে গণ্য করেছে এবং ক্ষমতা প্রয়োগ না করে ত্যাগ করার নীতিকে সমর্থন জানায় নি। দলের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ঝাড়ার কারণ সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় যাকে পাঠিয়েছিল তার এভাবে নীতির দোহাই দিয়ে দুম করে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াকে তারা দুর্বলের আচরণ ও প্রতারণার শামিল মনে করেছে। এর চেয়ে অল্পসল্প দুর্নীতি করে শক্ত হাতে ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তাকে নেতা মানতে তারা স্বস্তি বোধ করত। এই মনস্তত্ত্ব আমাদের সমাজেও প্রবল।
রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রশাসনে এরকম উত্থান পতন ও বাঁকবদল অবশ্যম্ভাবী বলেই সমাজকে পরিণত, স্থিতিশীল ও পোক্ত হতে হয়। তা না হলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গনে নানা রকম ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকলে সমাজ তা নিজ শক্তি ও প্রজ্ঞায় সামলাতে পারবে না। সমাজ বকাটা ঘুড়ির মত দিগ্ভ্রান্ত হয়ে নানান স্রোতের মধ্যে যে ঢেউটি প্রবল হবে তাতেই সওয়ার হবে। অভীষ্ট পথে না গিয়ে ভুল পথেও চলে যেতে পারে। সে কারণে সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় যেগুলো বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যেও পথ দেখাতে পারে। তেমনি থাকতে হয় অভিভাবকতুল্য জ্যেষ্ঠ নাগরিক, যাঁরা সংকটের সময় নির্দিষ্টভাবে পথের দিশা দিয়ে থাকেন।
আমরা যদি দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব  গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনেক রকম ঢেউ উঠেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা পথ হারাইনি। ভাষা-সাহিত্য-শিল্প নিয়ে চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা হয়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যও চরম ছিল, ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ ও সামাজিক কুসংস্কারের দৌরাত্ম্য, রাজনীতিতে ভ্রান্ত পথের মোহও ছড়ানো হয়েছিল। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ জাতির অভিভাবক ও পথ প্রদর্শকের ভূমিকা এবং ছাত্ররা অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করেছিল। একেবারে আলাদাভাবে বলা যায় ভাষা আন্দোলনের সময় বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও পুথি গবেষক মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ একেবারে বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁরা যুগান্তকরী বক্তব্য রেখেছেন এ সময়ে। আর তাঁদের সাথে সে সময়ের প্রবীণ-নবীন অধিকাংশ লেখক ও শিক্ষাবিদ এককাতারে শামিল হয়েছিলেন। ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় কথাসাহিত্যিক শিক্ষাবিদ আবুল ফজল ও কবি ও নারীনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল বলিষ্ঠভাবে অভিভাবকত্ব দিয়েছেন। তখনকার অস্থির সময়ে লেখক-শিল্পীদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীসহ বুদ্ধিজীবীরা সরব ও সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতিবিদরা সেই সময়ে এদের  প্রদর্শিত পথেই হেঁটেছেন। তাতে জাতীয় ঐক্য যেমন হয়েছে, তেমিন সকল বাধা জয় করে সামনে এগুনোও সম্ভব হয়েছে। সেই সময় সংবাদপত্র, যেমন দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজার্ভার ও পূর্বদেশের ভূমিকা স্মরণ করুন। নিশ্চয় মনে পড়বে মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুস সালাম-এর মত সম্পাদক-সাংবাদিকদের কথা। আজকে এই সমাজে সাহসী প্রজ্ঞাবান নি:স্বার্থ অভিভাবকের অভাব প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ও অভিভাবকহীন। বিদ্যা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মূল্য এখানেও হতাশাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার পাদপীঠ থেকে ডিগ্রি ও সনদ বিক্রয়ের কারখানায় পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হল সেই প্রতিষ্ঠান যেখানে বিদ্যা উৎপন্ন হয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এখানে দেশবিদেশের জ্ঞানীগুণীরা নিজেদের কাজ করবেন আর ছাত্ররা তাঁদের সঙ্গে থেকে জ্ঞানচর্চার জোগালি হিসেবে কাজ করে পরিণতি লাভ করবে। অতীতের নালন্দা বা তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিদেশের জ্ঞানীগুণীদের আগমনের কথা আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি। একইভাবে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গা বিরোধী ভূমিকা, ছেষট্টির ছয়দফার আন্দোলন, আটষট্টির স্বাধিকার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা ভাবুন। এখন কোথায় সংবাদপত্রের সেই ভূমিকা, কোথায়ইবা সেইসব মানবের সম্পাদক ও সাংবাদিক?
এখন বিশ্বায়নের এই কালে বাস করেও আমরা কূপমণ্ডুকতার চর্চা করছি। এর প্রভাব পড়ছে সর্বত্র, আমাদের জীবনের কোথাও মননশীলতার ছাপ নেই, এর প্রয়োজনও নেই। তাই চিন্তার দৈন্য, রুচির বিকার, অনুকরণসর্বস্বতা চলছে সর্বত্র। স্বার্থচিন্তা, ভোগের উদগ্র লালসার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ন্যায়-অন্যায় বোধ, জ্বলে যাচ্ছে সুশাসন ও আইনের শাসনের ধারণা, মিথ্যাচার, কপটতা, তোষামোদী, ক্ষমতার ও বিত্তের দম্ভ, ফাঁপা ও ফাঁকা গরিমায় প্রায় অসহ্য হয়ে উঠছে সমাজ জীবন। এ অবস্থার মধ্যেও পুরস্কার-স্বীকৃতি-সম্মাননার হিড়িক চলছে। তার কোনটা ঠিক কোনটা ছলনা বোঝা দায়। এভাবে মুড়ি-মুড়কি একদর হয়ে গেছে। খনার বচনে আছে যে দেশে ঘি ও তেলের দাম সমান সেই দেশে বাস করবে না। এদেশে অনেক আগেই মুজিব-জিয়াকে এক পাল্লায় তোলার কৌশল কাজ দিয়েছে। এবার কি তারেক জিয়া সেরকম একটা ভূমিকায় পৌঁছে যাবে? তাঁর সর্বশেষ কথার চালটা অনুসারীরা এদেশেও  চালু করে পাল তোলার মত বাতাস সৃষ্টির চেষ্টা চালাবেন সন্দেহ নেই। কথা হল তাতে কি উঠে পড়বেন তাঁদের সমর্থক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপকরাও? ভবী কি ভুলবে এসব কথায়? বিশ্বাস করা যায় না এমন তরল অস্থির সমাজের মনমানসিকতা।
কিন্তু এই বাস্তবতা এবং এর পরিণতি নিয়ে কেউ যেন মাথা ঘামাতে রাজি নন। সবাই গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা ও বিত্তই সমাজে প্রভাব ও প্রতিপত্তি নির্ধারণ করছে আর দুর্বল অংশ তোষামোদ ও কপটতার আশ্রয় নিয়ে গা ভাসাচ্ছে। এ যেন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সমাজ। সমাজে এ ধরনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠার সময়ে আজ থেকে শিকি শতাব্দী আগে কবিতায় লিখেছিলাম -
এখন উচু হওয়ার সময়/ কুঁজো হওয়ার/’
এবং ‘... প্রবল অনুরাগে/নিচু হয়ে সবাই
এ ওর/‘শিরদাঁড়া ভেঙে বেছে দেয় কাঁটা-/ যা কিনা
বিশ্রি/অপ্রয়োজনীয়/এবং/কাঁটার আপদ ঘুচিয়ে/
সরীসৃপ শৈথিল্যে মেতে ওঠে/তারপর।’
আমরা শিরদাঁড়াহীন প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি, সরীসৃপ শৈথিল্যে
মেতে উঠছি। বিষ নিয়ে খেলছি-অমৃত কোথায় জানি না।


Tuesday, March 4, 2014

গ্রামপতনের শব্দ আর কত শুনব?

আবুল মোমেন


১৯৭১-এ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ১৯৯১ তে গণতন্ত্র। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এ দুটিই তো ছিল জাতির স্বপ্ন। দুটিই অর্জিত হয়েছে। প্রথমটির পরে ৪৩ বছর অতিবাহিত হল আর দ্বিতীয়টি অর্জনের পরে কেটে গেছে ২২টি বছর। মধ্যে দু’বছরের অনির্বাচিত সরকারকে হিসেব থেকে বাদ দিলেও দুই দশক তো পার হয়েছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে। কিন্তু মানুষ কি স্বাধীনতা পেয়েছে? গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দায় থাকে? যেখানে বিরোধী দল সংসদে,গণমাধ্যমে ও সমাজে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়? যেখানে ধর্ম-জাতি-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ভোগ ও প্রয়োগ করতে পারে?
এসব প্রশ্নের জবাব শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত ধনী-নির্ধন নারী-পুরুষ সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বড়-ছোট সকল নাগরিক মনে মনে বা প্রকাশ্যে বারবার যে ভাষায় উচ্চারণ করে তা বেশির ভাগ সময় প্রশ্নমুখর - নানা কেনর সমাহারে সে প্রশ্নমালা তৈরি হয়। এবং শেষে উচ্চারিত হয় অসহায় কাতরধ্বনিতে পাল্টা প্রশ্ন - কেন আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি? নাগরিকদের অনেকে কোনো কোনো সময়, আর কেউ কেউ স্থায়ীভাবেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাঁরা দেশ, রাজনীতি, প্রশাসন, ভবিষ্যতসহ সবতাতেই আস্থা হারিয়েছেন।
কিন্তু আমাদের শিক্ষিত শহুরে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী হলেও সাধারণ মানুষ আবহমান কাল ধরেই কারও ভরসায় বসে না থেকে নিজের চেষ্টায় জীবনধারণ করে চলেছে। তাদের চাহিদা সামান্য, তারা শেখে দ্রুত, প্রয়োগে সফল। দেখা যায় মানুষের যেগুলো ন্যূনতম বস্তুগত চাহিদা সেগুলো অর্জনে আমাদের দেশ সফল। প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জাতীয় টিকা কর্মসূচী সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্য, নারীর উপার্জন, দারিদ্র দূরীকরণ ইত্যাদিতে আমাদের সাফল্য প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে থাকে। জনসংখ্যার গড় আয়ুও তারাই বাড়াতে পেরেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় উন্নতি করা দরকার ছিল, যেসব জায়গায় অবস্থার গুণগত পরিবর্তন না হলে কোনো উন্নতিরই চূড়ান্ত ফল লাভ ও তা টেকসই করা সম্ভব নয় তার দায়িত্ব পড়েছে শিক্ষিত শহুরেদের ওপর। সেখানেই আমরা বরাবর হোঁচট খাচ্ছি, আর তাতে তলায় যে অগ্রগতি হচ্ছে তার চূড়ান্ত টেকসই ফল অধরা থেকে যাচ্ছে। সে কাজগুলো হল, যেমনÑশিক্ষার মানোন্নয়ন, পুষ্টি ও রোগ পরিচর্যা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, নারীর প্রকৃত সমানাধিকার ও ক্ষমতায়ন, কৃষিজাতপণ্যের বাজারজাতকরণ ও বিপণন, জীবন মানের উন্নয়ন, যোগাযোগে সড়ক ও গণ পরিবহনের উন্নয়ন ইত্যাদি। এসব কাজের দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের ওপর। এরাই অদক্ষতা, দুর্নীতি, হীনম্মন্যতা, কোন্দলপ্রবণতা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের নিচের তলার মানুষের কঠিন পরিশ্রম ও বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্যকে ব্যক্তিস্বার্থের ভোগে লাগায় ও নষ্ট করে।
তাহলে একথা কি স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে না যে এ দেশে একদল খেটে খুটে সমাজ ও অর্থনীতির চাকা চালু রেখেছে আর আরেক দল বসে বসে তা ধ্বংস করছে? হয়ত এরকম সরলভাবে জাতিকে বিভক্ত করা উচিত নয়, আমার উদ্দেশ্যও তা নয়। মূল গোলমালটা বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অসফলতা নামক রোগের মূল কারণ নির্ণয় করাই আমাদের লক্ষ্য। সবাই জানতে চান বারবার এগিয়ে আবার মুখ থুবড়ে পড়ার কারণটা কি? জাতি যদি একটি দেহ হয় তো মানবদেহের মতই তার মৌল উপাদান হাড়, কোষ, পেশি, রক্তনালী ইত্যাদি সবই সচল রয়েছে শ্রমজীবীদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে। কিন্তু এসব থেকে যথার্থ ফল লাভ ব্যাহত হচ্ছে। এসবই ঘটছে পরিচালনা ও রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত অংশের গাফিলতিতে। এরা শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণি। কী কারণে এরা মাঠের মানুষদের শ্রমের উপার্জন ব্যর্থ করে দিচ্ছে? এদের এ অবস্থানে আসার পেছনে দায়ী যা তার নাম শিক্ষা। হ্যাঁ অপরাধীর নাম শিক্ষা। দেশে ও সমাজে গোলমালটা পাকাচ্ছে, ঘটাচ্ছে, জিইয়ে রাখছে শিক্ষিতরাই। শিক্ষার মূল ক্ষেত্র অবশ্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান - আপাতত আমরা স্কুল পর্যন্ত ধরেই  কথা বলব। কারণ এটুকুতেও যদি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যেত তাহলেই একটা যথার্থ শিক্ষিত জাতি আমরা পেতাম। তাহলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, নৈতিক বিবেচনা শক্তি এবং সৃজনশীল ক্ষমতা এমন পর্যায়ে অর্জিত হতে পারত যা তাকে দুটি সম্পদে যথার্থ মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হতে সাহায্য করত। সে দুটি সম্পদ হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদাবোধ। হ্যাঁ স্কুলের পাশাপাশি পরিবার, ধর্ম, রাজনীতি, গণমাধ্যমও জনশিক্ষার প্রসার ও জনমানস গঠনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবার ছাড়া উল্লিখিত সব প্রতিষ্ঠানই শিক্ষিত মানুষদের হাতেই রয়েছে। ফলে ভ্রান্ত ও অসম্পূর্ণ শিক্ষার দায় আমরা এড়াতে পারি না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক জরীপে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে অন্তর্ভুক্তির পরিমাণ ছেলেমেয়ে মিলেই প্রায় শতভাগ হলেও অর্জন-লক্ষ্য পূরণে সাফল্য কেবল হতাশাজনক নয়, রীতিমত চমকে দেওয়ার মত দু:খজনক। গণিতে নির্ধারিত মান অর্জন করে মাত্র ৩০ ভাগ ছাত্র আর মাতৃভাষা বাংলায় তা শোচনীয়ভাবে ২৬ শতাংশ! অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুর ৫/৬ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষ কোনো কাজে আসছে না। বর্তমান সরকার সংখ্যাগত সাফল্যের ওপর জোর দিতে গিয়ে পরীক্ষা বাড়িয়ে দেওয়ায় ফলাফল সর্বস্ব হয়ে পড়ছে শিক্ষা, বাড়ছে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা যার ফলে শিক্ষা গুটিকয়েক প্রশ্নের উত্তর শেখার    নামান্তর হয়ে পড়েছে। ধর্ম চর্চার বিষয়টি দখল করে নিয়েছে ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ম নিয়ে রাজনীতিবাজ এবং প্রাচীনপন্থী কট্টরপন্থীরা। এরা একটি মানবিক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের মত পরিবেশ বিঘিœত করেই ক্ষান্ত হয় না, পাশাপাশি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধ সঞ্চারে ব্যর্থ হয়ে ও মৌলবাদ-জঙ্গিবাদকে উস্কে দিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করছে। রাজনীতিবিদরা আপাতত গালভরা বুলির মুখোশ পরে ক্ষমতার মধু লুটে আখের গুছাতেই ব্যস্ত রয়েছেন। গণমাধ্যমে বৈদ্যুতিক চ্যানেলগুলো সঠিক চিন্তা, যোগ্য সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞার অভাবে বোকার বাক্সের অধিক কিছু হতে পারছে না। মুদ্রণ মাধ্যমে অস্বাভাবিক, অস্বাস্থ্যকর বিষ্ফোরণ ঘটে এখন বিকার ও বিভ্রান্তি চলছে, কেউবা বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়েই মরিয়া। পরিবার প্রধানরা ভোগবাদিতার বাজারে নানামুখী চাপের মধ্যে পড়ে প্রকৃত অভিভাবকত্ব দিতে অক্ষম। কোনো সূত্র থেকেই জনশিক্ষা ও জনরুচি তথা সুস্থ জনমানস গঠনের কোনো উপাদান, আহার্য মিলছে না। ফলে সমাজের নিচের তলার মানুষ দিনরাত খেটে কোনো মতে কায়ক্লেশে বেঁচে আছে। আমরা তাদের উৎপাদন ব্যয় না মিটিয়ে উৎপাদনের সাফল্যের ভাগ লুটে নিচ্ছি। শিক্ষার নামে তাদের সাথে পরিহাস করছি, ধর্মের নামে তার সুস্থ বিনোদনের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে নিক্ষেপ করছি অসুস্থ অন্ধকার জীবেনর দিকে। সাংবাদিক-শিক্ষক-চিকিৎসক-রাজনীতিবিদ, এমন কি জনসেবকের ভূমিকায় অভিনয় করে তাদের শ্রমের মূল্য না চুকিয়ে আখের গুছাচ্ছি।
এভাবে চলতে থাকলে দেশের সিংহভাগ মানুষের স্বাধীনতা আসবে কোত্থেকে? গণতন্ত্রে তাদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হবে?
আমাদের গণতন্ত্রের মানসকন্যারা অস্ত্রধারীদের বেষ্টনিতে বন্দিত্বের নিরাপত্তায় বাস করেন। আমাদের সবধরনের নেতারা-রাজনীতিক সাংবাদিক শিক্ষক চিকিৎসক প্রকৌশলী আইনজীবী সকল ক্ষেত্রে নেতারাই বিত্ত-ক্ষমতার বা নেতৃত্ব-তোষামুদির বৃত্তে বাঁধা পড়েছেন। শিক্ষিত বিবেকবান উন্নত চরিত্রের মুক্ত মানুষ কোথায়?
যে সমাজে এ ধরনের মুক্ত মানুষ বেশি থাকবেন কেবলমাত্র সেই সমাজই এগিয়ে যেতে পারবে। আমরা দূর থেকে হতাশা, বেদনা ও আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে দেখি কীভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের ভরসাস্থলগুলো উন্মত্ত ভয়ঙ্কর ঘোলাস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে। কবি জীবনানন্দের ভাষায় চারদিক থেকে প্রতিনিয়ত ‘গ্রামপতনের শব্দ শোনা যায়।’
আর কত জনপদ লোকালয় ভাঙলে বোধোদয় হবে আমাদের?

Monday, February 24, 2014

একুশের বিকাশ কোন্ পথে ঘটছে?

আবুল মোমেন

১.
একুশে উদযাপনের ধরণ ও তাৎপর্য উভয়ই যেন বদলে গেছে। গোড়ায় লক্ষ্যটা কেন্দ্রীভূত ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার আদায়ে। সেই সংগ্রামের চেতনার উৎস ছিল এই দিনটি যা তখনও শহীদ দিবস হিসেবেই অভিহিত হত। কিছুদিনের মধ্যে ভাষা থেকে সাহিত্য এবং সাহিত্য থেকে সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ল এ চেতনার প্রভাব। কারণ সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন জরুরি হয়ে দেখা দিলে একুশেই হল সেই চেতনার প্রতীক। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সম্মিলনে জনমনে জোরদার হল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। বলাই বাহুল্য, এই চেতনারও অনুপ্রেরণা এলো একুশে ফেব্র“য়ারি থেকেই। ফলে কালক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সকল উদ্দীপনার উৎস হল একুশ যার প্রতীক ছিল শহীদ মিনার। এভাবে একুশে ফেব্র“য়ারি হয়ে উঠল আমাদের জাতীয় দিবস এবং জাতীয় জীবনে তাৎপর্যবাহী দিন আর শহীদ মিনার তারই প্রতীক।
গোড়া থেকেই একুশে পালনের মূল অনুষঙ্গ ছিল দেশপ্রেম ও উদ্দীপনার গান আর জাতীয় চেতনা লালন ও বিকাশের উপযোগী সাহিত্য। এক সময় একুশের স্মরণিকা প্রকাশ আর প্রভাতফেরী ও বৈকালিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন ছিল আবশ্যিক কাজ। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা একুশের চেতনারই সম্প্রসারণ। এ প্রতিষ্ঠান তাই বরাবর দিনটি সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে এসেছে। স্বাধীনতার পরে এর পরিসর ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। ক্রমে একুশের সাথে বইমেলা এবং বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার যোগ ঘটে গেল। এখন একুশের মাস জুড়ে বাংলা একাডেমীর বইমেলা, সেমিনার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রভাব দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। এটিই জাতীয়ভাবে একুশের মুখ্য অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সারা দেশে পড়েছে, প্রায় সব জেলাশহরে আজ ছোট আঙ্গিকে হলেও বইমেলা আয়োজিত হচ্ছে, সর্বত্র কিছু কিছু প্রকাশনাও হয়ে চলেছে।
আজকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রকাশনা শিল্পের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে একে প্রকাশনা শিল্পের বিপ্লবও বলা যাবে। প্রতিদিন বাংলা একাডেমীর বই মেলায় ১০/১২টা নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়, সারা মাসে অন্তত হাজার তিনেক নতুন বই প্রকাশিত হয়। দেশে প্রকাশনার সংখ্যাও বেড়েছে, কেবল বাংলা একাডেমীর মেলাতেই পাঁচ শতাধিক সংস্থা তাদের বই নিয়ে অংশ নেয়, এর মধ্যে শ’খানেকের ব্যবসাও খারাপ নয়। প্রকাশকবৃন্দ প্রায় সারা বছরই এই মেলাকে কেন্দ্র করেই তাঁদের প্রকাশনার পরিকল্পনা করেন। আমাদের প্রকাশনা-শিল্প মূলত একুশে-কেন্দ্রিক।
বাংলা একাডেমীর পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ জাতীয় ও আঞ্চলিক নানা সংগঠন ব্যাপক আয়োজনে একুশে উদযাপন করে থাকে। বিভিন্ন  নগরে কর্পোরেশন কিংবা নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সম্প্রদায়গুলো একুশে উদযাপনে সোৎসাহে অংশ নিচ্ছে, নিজেদের স্বতন্ত্র আয়োজনও করছে। এমনকি সাহেবিয়ানায় অভ্যস্ত ক্লাবগুলো কিংবা ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সাড়ম্বরে একুশে উদযাপনে মেতে উঠছে!
২.
ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী নানা আয়োজনে উদযাপনের মাধ্যমে একুশে আজ যেন জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। একুশেকে কেন্দ্র করে দেশের প্রকাশনা শিল্পের বিস্তার যেমন ঘটেছে তেমনি এর ব্যবসায়িক দিকটি মূলত একুশের  ওপর নির্ভরশীল। একুশে এখন মূলত উৎসব এবং বাণিজ্যের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হচ্ছে। প্রকাশকরা বলছেন এ বছর ব্যবসায় ভালো হয়েছে কিংবা বলেন ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও বাদ নেই, এখানেও ব্যবসায়ের প্রভাব বাড়ছে। এছাড়া বুটিক, তৈরি পোশাক, খাবারদাবারসহ আনুষঙ্গিক আরও ব্যবসায়ের আওতা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে।
নিশ্চিন্তে বলা যায়, যেহেতু বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে, লক্ষ্মীর স্পর্শে ধন্য হয়েছে একুশে তাই এর বাড়বাড়ন্ত অব্যাহত থাকবে। আশার কথা, এই বাণিজ্যের মূল ভিত্তি এখনও সারস্বত সাধনা। লক্ষ্মী-সরস্বতীর যুগল সম্মিলনে একুশের অগ্রযাত্রা ভালোভাবে চলবে এ আশাবাদকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
হয়ত প্রশ্ন উঠতে পারে লক্ষ্মী না সরস্বতী কার প্রভাব বাড়ছে বেশি? তাছাড়া একুশে কেবল সরস্বতীর সাধনার বিষয়ও ছিল না, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সাথে এতে ধ্বংস ও সৃষ্টির ব্যাপারটা হয়ে উঠেছিল মুখ্য। সেই শৈবশক্তির ভূমিকা কি আজ বিনোদন ও বাণিজ্যের আগ্রাসনে একেবারেই বাদ চলে যাচ্ছে?
৩.
একুশে উদযাপনের ব্যাপ্তি এখন বিশ্বময়, অন্তত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটির স্বীকৃতি আসার পর থেকে। কিন্তু এ দেশে মাতৃভাষা বাংলা তো আজ কাক্সিক্ষত আদৃত ভাষা নয়। সবাই তো ছুটছেন ইংরেজির পেছনে, ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের রমরমা বাড়ছে, ব্যবসাসফল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাচর্চার বাহন ইংরেজি, সেদিকেই ঝুঁকছে বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী। কম্প্যুটার আর মোবাইলেও ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত ইংরেজির চর্চা হচ্ছে। একসময় রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল এ জাতি, আজ তাদের উত্তরসুরীরা স্বেচ্ছায় সাগ্রহে বাংলা লিখছে সেভাবে কিংবা তারই সাঁটভাষ্যে আলাপচারিতা চালাচ্ছে। রেস্তোঁরা, ক্যাম্পাস, মিলনায়তন, বাজার, পথঘাটে কান পাতলে তরুণ ও কিশোর, এমনকি শিশুদের কণ্ঠে ইংরেজি অথবা বাংলিশ কথোকথন কানে আসবে। যেটুকু বাংলা বলছে তাও আঞ্চলিক কিংবা আঞ্চলিকের খিচুড়ি ভাষা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মধ্যেই রয়েছে একুশের মেলায় প্রকাশিত বইয়ের গর্বিত লেখক, একুশে উপলক্ষে পুরস্কৃত কবি, টকশো মাতানো কথাকার, সেমিনারের চিন্তাশীল বক্তার সন্তান বা পৌত্র-দৌহিত্র, পৌত্রী-দোহিত্রীরাই যারা ইংরেজি-বাংলিশে বাৎচিৎ করে কান ঝালাপালা  করছে।
যদি প্রকাশিত বইগুলো ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়ি বা পড়ার চেষ্টা করি তাহলে প্রথম ঘা খেতে হবে অধিকাংশ লেখকের ভাষাগত দুর্বলতায়, তারপর অতৃপ্তির কারণ হবে লেখায় চিন্তার মৌলিকত্বের অভাব। মাতৃভাষার ব্যবহারে এক ধরনের অরাজক অবস্থা চলছে, অপরিণত বুদ্ধির ছাপ যত্রতত্র।
এদেশে সাহিত্যচর্চার দিকে ঝোঁক বেড়েছে, বই প্রকাশের হিড়িক পড়েছে, কবিতা ও উপন্যাসের কমতি নেই। নব্য লেখকদের অনেকেরই প্রথম লেখাই বই আকারে বেরুচ্ছে, কোনো কোনো নব্য লেখক একসাথে এক ডজন বইও প্রকাশ করছেন। একুশে উপলক্ষে যত বই বেরুচ্ছে তার অর্ধেকের বেশি লেখক নিজের টাকায় বের করেন। এতে নৈরাজ্যের নদে কূলপ্লাবী জোয়ার বইছে। দুটি কারণে এই নৈরাজ্য ঘটে চলেছে-দেশে লেখক বাড়লেও প্রকৃত সম্পাদক ও সমালোচক তৈরি হচ্ছে না। কিংবা লেখকদের দাপটে সম্পাদক ও সমালোচকরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এঁরা তো হলেন ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবক ও পাহারাদার। এ সমাজ সবক্ষেত্রেই মুক্তকচ্ছ থাকতে চাইছে, নব্যধনী যেমন আইন-আদালতের তোয়াক্কা করে না, সবই নিজের কব্জায় রাখতে চায়, তেমনি নব্য লেখককূলও প্রশংসা-স্বীকৃতির দায় নিজেদেরই আওতায় রাখতে চান। এ প্রভাব ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার-স্বীকৃতি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে আজ বাংলা ভাষার  ও সাহিত্যের খাঁটি অভিভাবক এবং যোগ্য পাহারাদার নেই। ভাষার প্রতি সুবিচার করতে পারছি না আমরা, ভাষা চর্চায় কোনো নীতি মানছি না। যখন আমাদের পূর্বসুরীরা ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তখন কেবল বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব ছিল, কিন্তু কি শিক্ষা কি গণমাধ্যম কি সমাজজীবন সবখানে বাংলারই রাজ্যপাট ছিল রমরমা। আজ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে বাংলার, এমনকি একুশের কপালে বৈশ্বিকে স্বীকৃতিও জুটেছে, কিন্তু এ ভাষা শিক্ষাসহ সমাজ-জীবনের সবখানে দুয়োরানি হয়ে আছে।
ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়ে ওঠায় একুশে উদযাপন নিয়ে আর ভয় নেই, কোনো শক্তিই এই টাকার টঙকারের প্রতি বধির হবে না। কিন্তু সরস্বতীর কী হবে? সারস্বতসাধনাই যদি সংকটে থাকে তাহলে একুশের আর থাকে কি?

###