Monday, July 8, 2019

নয়নের জন্যে ক্রোধ, নয়নদের জন্যে শোক


আবুল মোমেন

বরগুনার নয়ন বণ্ড তার নায়ক জেমস বণ্ডের মত হতে পারে নি। আদতে একালের এ সমাজে বাস করে তার বয়েসি তরুণের পক্ষে জেমস বণ্ডকে জানা সম্ভব নয়। সেকালের বাঙালি বণ্ড দস্যু মোহন বা দুস্যু বাহরামকে চেনাও তার কপালে ছিল না। সে পাড়ার বা জেলা শহরের যেসব মাস্তানদের অনুকরণে বড় হচ্ছিল তাদের কারো পক্ষেই বণ্ড-বাহরাম হওয়া সম্ভব ছিল না। তারা বর্তমান দূষিত রাজনীতির পরগাছা। একসময় কাজে লাগে, কিন্তু প্রয়োজন ফুরোলেই উপড়ে ফেলতে হয়। কখনও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বাড় বাড়লে ছেঁটে ফেলতে হয়। নয়নের পৃষ্ঠপোষকরা রিফাত খুন হওয়ার পর থেকেই তার পাশ থেকে সরে গিয়েছিলেন। এখন তো নয়ন বণ্ড পর্ব চুকে গেছে।
আলোচিত খুনি নয়ন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। রিফাত হত্যাকা- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়লে পুরো জাতি নয়ন ও তার দোসরদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছিল। আমাদের দেশে সুবিচার প্রাপ্তি নিয়ে মানুষের মনে ঘোরতর সন্দেহ আছে। পুলিশের সততা ও দক্ষতা নিয়ে যে সংশয় তা বিচার বিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমার ধারণা দূরদর্শী বিবেকবান মুষ্টিমেয় মানুষ ছাড়া দেশের বাদবাকি সকল মানুষ এতে সন্তুষ্টই হয়েছেন। জনমতের এই গতিপ্রকৃতি পুলিশ ও জননেতারা ভালোই জানেন। ফলে বিচারবহির্ভুত ক্রসফায়ারে দীর্ঘসূত্রী বিচারের প্রতীক্ষা থেকে তাঁরা সকলকে মুক্তি দিতে চান। যেহেতু নকল বণ্ডের জন্যে কারও সহানুভূতি নেই তাই অল্পকিছু মানুষের উদ্বেগ নিয়ে মাথা ঘামানোরও কিছু নেই।
হয়ত মানুষ খুশিই হয়েছে। রাষ্ট্র প্রাণহীন সত্তা, অনুরাগ-বিরাগের উর্দ্ধে জনগণের ইচ্ছায় আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। জনগণের ইচ্ছা অবশ্য রাষ্ট্রের মত অনুরাগ-বিরাগের উর্দ্ধে আইন দ্বারা পরিচালিত হয় না। প্রায়স এবং প্রধানত এ ইচ্ছা আবেগ দ্বারা চালিত হয়, আর আবেগ সাধারণত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুরাগ-বিরাগের দ্বারাই প্রভাবিত হয়। আর এই জন্যেই রাষ্ট্রকে মানবিক অনুরাগ-বিরাগের উর্দ্ধে থেকে কঠোরভাবে আইনের দ্বারা পরিচালিত হতে হয়। আইনের পথ থেকে বিচ্যুত হলে বা সংসারের অনুরাগ-বিরাগের প্রভাবে চালিত হলে রাষ্ট্র নিজের চরিত্র হারাতে থাকে। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়। চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যায় বর্তমান বাংলাদেশে রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র অন্য দুই অঙ্গের চেয়ে শক্তিশালী, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনে প্রভাবক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তাঁরা জনপ্রতিনিধিদের চেয়েও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছেন। আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে কিনা সেটি তাত্ত্বিক তর্কের বিষয়। তবে রাষ্ট্রে আইনের শাসন যে লাঘব হয়েছে বা হয়ে চলেছে সে বিষয়ে সংশয় নেই।
আইনের শাসনের অভাব বা দুর্বলতার ফাঁক গলে সমাজে নানা অনাচার তৈরি হতে থাকে। রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের সম্পর্কে ভারসাম্যের সমস্যা তৈরির মত আইনের ফাঁক গলে যেমন ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে ঠিক তেমনি ক্রসফায়ারে যারা নিকেশ হচ্ছে তারাও তৈরি হচ্ছে। হয়ত একদল আইনের আশ্রয়ে থেকে এ সংস্কৃতিতে অংশ নিচ্ছে আরেক দল আইন প্রণেতাদের প্রশ্রয়ে থেকে আইন ভাঙছে। কে বেশি দায়ি, কে আগে কে পরে - এই ইঁদুর-বিড়াল বা টম অ্যা- জেরি গেইমে সময় ব্যয় না করে কাজের কথায় আসা যাক।
জার্মান মহাকবি গ্যয়টে একটি কবিতার লিখেছেন - ‘আত্মনিয়ন্ত্রণই শুধু মহত্ত্বের নিশ্চয়তা দিতে পারে।/সীমা মানতে পারার মধ্যে প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে,/এবং অন্য কিছুু নয় শুধুই আইনই পারে আমাদের স্বাধীনতা দিতে।’
ঈশপের গল্পেও জানা যায় খরগোশ খুব তৎপর চৌকস হলেও আখেরে বিজয়ী হয় ধীরস্থির কচ্ছপ। কচ্ছপের আয়ুও খরগোশের দশগুণ হবে। আমরা কথায় কথায় রাষ্ট্রের দীর্ঘজীবন কামনা করে থাকি। বলি - বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। তাহলে কিন্তু খরগোশের মত অতি দৌড়ঝাঁপ বা লম্ফঝম্ফ বাদ দিয়ে খানিকটা কচ্ছপের মতই ধীরস্থির - একটু ভাষা দিয়ে বলি - দূরদর্শী প্রজ্ঞার সাথে পথ চলতে হবে। সেটা অবশ্য আইনের শাসনে চলার পথ, যেমনটা ঈশপের কচ্ছপ চলেছিল।
আইনের শাসনে আসতে হলে নয়ন বণ্ড তৈরি হওয়ার যে সামাজিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে সেদিকে নজর দিতে হবে। নয়ন যদি রোগবাহী জীবাণু হয়ে থাকে তাহলে তার বাহক বাতাস বা জল হল দেশের বর্তমান রাজনীতি। আমি বহুবার লিখেছি, নতুন যুগ এসেছে, কালান্তর ঘটেছে, তার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তন আনতে হবে রাজনীতিতে। প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর একালে আগ্নেয়াস্ত্র বা বাহুবলে কাজ হবে না। সাময়িক লাভ হলেও আখেরে খেসারত অনেক বেশি গুণতে হবে। একালে বাহু নয় মস্তিষ্কই খাটাতে হবে। এমনকি একালের যুদ্ধেও বাহুবল গৌণ, মুখ্য হল মেধার দৌড়। মেধা-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা লাগবে, ঘৃণা-প্রতিহিংসা লোভে কাজ হবে না। কিন্তু যেখানে মানুষগুলো তৈরি হচ্ছে সেই পরিবার, স্কুল কিংবা সমাজ গঠন-পুনর্গঠনে যত কথা হচ্ছে তত কি কাজের কাজ কিছু হচ্ছে?
যদি একজন নয়ন শৈশবে এমন একটা বাড়ি পেত যেখানে সে শান্তভাবের গান শুনতে পেত, চমৎকার ছবিওয়ালা বই পেত, মজাদার গল্প শুনতে পেত; যদি ছোটবেলায় এমন একটি পাড়া পেত যেখানে অনেক সমবয়সি খেলার সাথী হত তার, থাকত মাঠ ও তাতে দৌড়ানো ও খেলার স্বাধীনতা; যদি এমন একটি স্কুল পেত যেখানে পড়া মুখস্থের পরিবর্তে সে খেলত, গাইত, আবৃত্তি করত, গল্প শুনত ও বলত, অনেক বড় মাপের মনীষীর জীবনকথা শুনত, নিজ হাতে এটা-ওটা বানাত; যদি বালকবেলায় (নয়না হলে বালিকাবেলা) সে কোনো সংগঠন পেত যেখানে নানা কাজে, প্রতিযোগিতায়, অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিতে সে নিজের অনেক গুণের খবর পেত, তৃপ্ত হত নিজেকে ছাপিয়ে তার বড় হওয়ার সাধ, পেত হাততালি, বাহবা আর দু’একটা পুরস্কার; আর সেই বয়সে সে যদি এমন দু’চারজন বড় ভাই-আপুর সান্নিধ্য পেত যারা তার শৈশব-কৈশোরে পাশে থেকে কখনও আনন্দ দিয়ে, কখনও আশ্বস্ত করে, কখনও চমক দিয়ে, কখনও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তার বড় হওয়ার পথকে সুগম করে দিত!
আমি নিশ্চিত নয়ন এমন শৈশব এমন কৈশোর পায় নি। শিশুরা সবচেয়ে বেশি দেখে শেখে, অনুকরণ ভালোবাসে তারা। তার দেখা জীবন থেকেই নয়ন শিক্ষা নিয়েছিল। সেই শিক্ষা তাকে কেবল বাঁচতে দেয় নি তা নয়, জীবনে এবং মরণে তার কপালে ধিক্কারই এনে দিয়েছে। এটি আদতে মানবতার পরাজয়ের কাহিনী। এই পরাজয় বস্তুত এই সমাজের এই রাষ্ট্রের। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘজীবিতার পথ নয়, হোঁচট আর হুমড়ি খেলে পতনই ঘটে, অপঘাত মৃত্যুর শংকা বাড়ে।
তাই বলব এভাবেই যদি আমরা চলতে থাকি, নয়নদের ‘বড়’ হতে দেই তবে পরিণতি এরকমই ঘটবে। এ কেমন বাস্তবতা - দেশের উন্নয়ন ঘটছে মহাসমারোহে আর মানুষের ঘটছে অবনতি! মন্যুষ্যত্বের ঘটছে পরাভব! সমাজের উন্নয়ন ছাড়া বস্তুগত বা বহিরঙ্গের উপরিকাঠামোর উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। নজর দিতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে। পদ্মাসেতুর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল স্কুলশিক্ষার মানোন্নয়ন, শিশু-কিশোর ছেলেমেয়েদের জন্যে আনন্দময় জীবন নিশ্চিত করার কাজ। ভাবুন তো স্কুলগুলোর কথা - মাঠ, মিলনায়তন, মঞ্চ ছাড়া; গান-আবৃত্তি-চারুকলা-নাটক ছাড়া; খেলাধূলা-সাঁতার কাটা-গাছে চড়া ছাড়া; অফুরন্ত অবসর, গল্প শোনার আসর, নানান অভিযান ছাড়া; নিজস্ব সকাল-জ্যোৎস্না-সুনীল আকাশ ছাড়া; একজন প্রিয় আপু, প্রিয় দাদা-ভাইয়া ছাড়া কীভাবে কতটি প্রজন্ম কেবল পড়া-পরীক্ষার চাপে এবং অযত্ন-বেখায়ালে বেড়ে উঠেছে এদেশে।
নয়নের প্রতি ক্রোধ ছিল, ক্রোধ নিয়ে লিখতে লিখতে ওর মতদের জন্যে বড্ডা মন খারাপ হয়ে গেল। উদ্বেগ বাড়ল দেশের ভবিষ্যত নিয়ে।

***






Tuesday, September 26, 2017

কোচিং-নোটবই বন্ধের আইন ও আমাদের শিক্ষার সংস্কৃতি

আবুল মোমেন

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ২০০৯ সালেই জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে। এ কমিটি পরের বছর ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে সরকারের কাছে জমা দেয়। পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে অসংখ্য শিক্ষা কমিশন হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে গঠিত শিক্ষা কমিশনের সংখ্যাও ছয় সাতটির মত হবে। সব কটি নিয়ে কোনো-না-কোনো মহল থেকে বিতর্ক উঠেছিল এবং এগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরপর নানা আলোচনা ও বিতর্কের মুখে হিমাগারে ঠাঁই পেয়েছিল। এবারই প্রথম প্রাথমিক কিছু বিতর্ক সত্ত্বেও শিক্ষানীতিটি শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন মহলের আপত্তি শুনেছেন ও তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রায় সর্বমহল কর্তৃক গৃহীত এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়নে কমিটি গঠিত হয় ২০১১ সালে। কাজটা অবশ্যই সহজ ছিল না, কারণ প্রায় দুই শত বছর ধরে চলে আসা একটি শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার সুপারিশ ছিল এতে। এটি একটি বিশদ বিষয়, আমরা আজকে কোচিং-টিউশন-নোটবই নিষিদ্ধের সুপারিশেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।
এই আইনটিকে আমরা স্বাগত জানাই এবং আশা করব এটি খসড়াতে আটকে থাকবে না, যথাযথ প্রস্তুতিসহ কার্যকর হবে। কেননা কেবল আইন করলেই তো হবে না, তার বাস্তবায়ন জরুরি। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপরাধ দমনের জন্যে প্রচুর আইন আছে, কিন্তু তাতে অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। অনেক সময় আইন বাস্তব কারণেই প্রয়োগ করা যায় না, আবার বাস্তব কারণেই অনেক আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা সম্ভব হয় না। বিষয়গুলোর গভীরতা ও জটিল বাস্তবতা আমাদের বিবেচনায় থাকতে হবে।
এদেশে প্রাইভেট টিউশনের ঐতিহ্য প্রায় আধুনিক স্কুল শিক্ষার সমবয়সী। অর্থাৎ এটি প্রায় দু’শ বছরের পুরোনো প্রথা। কীভাবে এটি গড়ে ওঠে? এই গ্রাম ও কৃষিপ্রধান দেশে আধুনিক স্কুল শিক্ষার সূচনা হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় কলকাতা মহানগরীতে। দেখাদেখি অন্যান্য ছোটবড় নগরেও ধীরে ধীরে স্কুল চালু হয়। এইখানে একটা বিষয় মনে রাখতে বলব। সাধারণত কৃষিপ্রধান গ্রামীণসমাজ শিল্পপ্রধান নাগরিকসমাজের তুলনায় ইনফর্মাল বা অনানুষ্ঠানিক (সেই সাথে অপ্রতিষ্ঠানিকও বটে) হয়ে থাকে। এই সংস্কৃতির দুর্মর প্রভাব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সাম্প্রতিককালের দুর্বলতা থেকেও প্রকাশ পায়।
দেখা যাচ্ছে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকাশের সাথে সাথেই শিক্ষার অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সহায়ক ধারা হিসেবে গড়ে উঠেছিল। প্রথম পর্যায়ে প্রথম প্রজন্ম থেকেই গ্রামীণ পরিবারগুলো সন্তানের শিক্ষার জন্যে শহরে আত্মীয়/পরিচিত পরিবারের সহায়তা নিয়েছে। তারাও এমন জায়গীরকে (বা লজিং মাস্টার) স্বাগত জানিয়েছে মূলত নিজেদের শিশুসন্তানদের লেখাপড়ার একজন তদারককারী পাওয়ার আশায়। এ নিয়ে বহু ঘটনা ও কাহিনী বাংলাসাহিত্যে এবং বাংলা চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এ কেবল শিক্ষাবঞ্চিত পরিবারের প্রথম প্রজন্মের জন্যেই সত্য ছিল না, দেখা যাচ্ছে ঠাকুরপরিবারের মত শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা শহুরে পরিবারেও গৃহশিক্ষক রাখার রেওয়াজ ছিল - তাঁদের কেউ বাড়িতে থাকতেন কেউ সময় ধরে এসে বাড়ির শিশুদের পড়িয়ে যেতেন। এর সরস বর্ণনা রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলাতে পাওয়া যাবে। এই প্রথা গত দু’শ বছরে কখনো বন্ধ হয় নি।
এই প্রথা টিকে থাকার কারণ একাধিক। প্রথমত - অনেকের সাথে দ্বিমত হতে পারে, তবে আমার ধারণা এটিই গুরুতর কারণ - আমাদের সমাজ ( তাই পরিবার এবং ব্যক্তিও) কখনো শিক্ষার মৌলিক, প্রধান ও চরম লক্ষ্য যে আজীবন শিক্ষার্থী থাকার দক্ষতা ও  প্রণোদনা অর্জন তা কখনো বুঝতে পারে নি। যে ভাষা ও জ্ঞানচর্চার সূচনা স্কুলে হয় তার মূল উদ্দেশ্য হল ভবিষ্যতের পরিণত মানুষটাকে বুনিয়াদি আবেগ-অনুভূতি-উপলব্ধির সাথে পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ-যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় উত্তীর্ণ করা।
কিন্তু শিক্ষার এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সমাজ ও সরকার কারো বিবেচনায় না থাকায় কালে কালে শিক্ষার লক্ষ্য জ্ঞান ও জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা অর্জন থেকে সম্পূর্ণ সরে কেবলমাত্র পরীক্ষা ও তাতে কৃতিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে সমাজের যে সনাতন জ্ঞানবিমুখ এবং পর্যবেক্ষণ-যুক্তি-বিশ্লেষণ বিমুখ ভাবাবেগ-নির্ভর প্রবণতা ছিল তার পালেই একতরফা জোরেসোরে হাওয়া লেগেছে, এবং তা আদতে দু’শ বছর ধরেই চলছে। এর প্রভাব পুরো সমাজ-জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আজো প্রকটভাবে উপস্থিত। এর ওপর আজকাল পরীক্ষার ফলাফলের সাথে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি, স্কুলে সরকারি সাহায্যকে যুক্ত করে দেওয়ায় পরীক্ষামুখী পাঠচর্চায় একেবারে জোয়ার চলছে। সংশ্লিষ্ট সকলের ভাবনাতে এর বাইরে আর কিছুই নেই বলে মনে হয়।
শিক্ষাবাজারে (দু:খিত এই শব্দবন্ধ প্রয়োগের জন্যে) জ্ঞানের পরিবর্তে পরীক্ষার ফলই একমাত্র কাক্সিক্ষত ‘সামগ্রী’ হওয়ায় একে ঘিরেই বাজারের প্রবণতাগুলো নির্ধারিত হবে এটাই স্বাভাবিক। এই বাজারই অধিকতর সাফল্যের সাথে চতুর পসরা সাজাতে সাজাতেই তৈরি করে নিয়েছে কোচিং সেন্টার নোটবই এবং উদ্ভাবন করেছে পরীক্ষা-দক্ষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া - নিরন্তর মডেল টেস্ট, যা কোচিং সেন্টারের মূল কাজ। শুনেছি প্রতিযোগিতার বাজারে ব্যবসা ধরে রাখার জন্যে কোনো কোনো কোচিং সেন্টার কৃতী ছাত্রদের (থুড়ি পরীক্ষার্থীদের) ট্যাবও উপহার দিচ্ছে। এরই উপজাত হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ফলাফল প্রভাবিত করার মত শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট নানা দুর্নীতি। শিক্ষা যেহেতু মানুষ তৈরির কাজ তাই এক্ষেত্রে সৃষ্ট সব দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থা আদতে আত্মঘাতী। বলতেই হবে যে ব্যবস্থা শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত করে তার গলদগুলো ঠিক না করে কেবল আইন দিয়ে শিক্ষার নেতিবাচক উপদ্রবগুলো কি বন্ধ করা যাবে?
সমস্যা আরো রয়েছে। উপরের বিষয়টি অনেকাংশে শিক্ষার সংস্কৃতির বিষয়, কিন্তু এতে কাঠামোগত সমস্যাও বিস্তর। এ দেশে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত আদর্শ  অবস্থার চেয়ে এখনো অনেক পিছিয়ে। সরকার চেষ্টা চালাচ্ছেন বটে কিন্তু এখনো সরকারি স্কুলেই শ্রেণিকক্ষে প্রায় একশ ছাত্র নিয়ে একজন শিক্ষককে হিমশিম খেতে দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষে অধিক ছাত্র এবং স্কুলসময় প্রয়োজনের (বা আদর্শের) তুলনায় কম হওয়াও স্কুলে যথাযথ পাঠদানের অন্তরায়। তার ওপর রয়েছে শিক্ষকদের দক্ষতার ও কর্মস্পৃহার ঘাটতি। সর্বোপরি তো রয়েছে নিরন্তর পরীক্ষার চাপ। সবরকম ঘাটতি ও চাপ পূরণের জন্যে কোচিং ও সহায়ক গ্রন্থের দ্বারস্থ হচ্ছেন সকলে। বলাই বাহুল্য, পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ছাড়ছেন না কোনো পক্ষ, শিক্ষকরাও নয়। এভাবে সবার সহযোগিতা ও ভুল সিদ্ধান্তের যোগফল হল আজ স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টার, শিক্ষকের চেয়ে টিউটর, পাঠ্যবইয়ের চেয়ে নোটবই এবং শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে ব্যবস্থায় পরীক্ষার একাধিপত্য চলে সেখানে আইন প্রয়োগ ও পুলিশি অভিযান চালিয়ে কি কোচিং-টিউশন-নোটবই বন্ধ করা যাবে? বাজারের চাহিদা ও ব্যাপকতা এবং শিক্ষার প্রকৃত চাহিদা তৈরির ব্যর্থতার এই বাস্তবতায় এসব পরিপূরক-সহায়ক এবং লাভজনক ব্যবস্থা ভিন্ন চেহারায় টিকে থাকবে বলেই আশংকা হয়।
সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতার বিচারে বলছি আইন প্রয়োগের সাথে সাথে বা মাধ্যমে আমরা কি শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ঠিকভাবে নির্ধারণ করে চলতে পারব? পরীক্ষার ক্রমবর্ধমান চাপে পিষ্ট স্কুলশিক্ষা থেকে যে গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান গবেষণাগারের ব্যবহার, নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, এমনকি খেলাধূলা ও শিক্ষা সফর, স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশ (বা দেয়াল পত্রিকা তৈরি) প্রায় নীরবে হারিয়ে গেছে তার ক্ষতি নিয়ে আমরা কি সচেতন? কীভাবে স্কুলশিক্ষায় মেধাবী উদ্যোগী তরুণরা যুক্ত হবে তার কোনো পরিকল্পনা কি আছে আমাদের? এদিকে পরীক্ষার আশু তাগিদ এবং বিপরীতে স্কুলে যথার্থ শিক্ষাদানের মত সময় ও সুযোগের অভাব, শিক্ষকের অদক্ষতা, পরিবারের শিক্ষার সব দায়িত্ব অন্যের ওপর অর্পণের মনোভাবের যোগফল হল শিক্ষার উল্টোযাত্রা। বাজারে সৃষ্ট এই চাহিদা যেহেতু রাতারাতি দূর হবে না তাই হয়ত আইন প্রণয়নের পর দৃশ্যমান কোচিং সেন্টার অদৃশ্য হবে, গাইডবই নিষিদ্ধ পুস্তকের রূপ ধারণ করবে, শিক্ষকরা পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে নেপথ্যে কাজ চালাবেন। বলা যায় পুরো প্রক্রিয়াটা আরো অনানুষ্ঠানিক রূপ নেবে। আর এই ইনফর্মাল সমাজ সেটা লুফে নেবে। হয়ত সন্তানের সুশিক্ষা (অর্থাৎ পরীক্ষায় ভালো ফল) নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত বিভ্রান্ত পুলিশ সদস্যরাও এ বাস্তবতায় করণীয় নির্ধারণেও একইভাবে দুশিন্তায় ও বিভ্রান্তিতে থাকবেন। পুরো প্রক্রিয়াটা লেজেগোবরে হলে আমরা কি বিভ্রান্ত হব না, এমনকি দুশ্চিন্তাগ্রস্তও হব না?
শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরের কাজ প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পরে কাজটা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে; কোচিং নোটবই প্রাইভেট টিউশনের নিদান হিসেবে খসড়া আইনে স্কুলের ব্যবস্থাপনায় স্কুল সময়ের পরে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত ফিতে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি স্কুলগুলোতে দুই পর্বে স্কুল হয়, তার ওপর অনেক স্কুলেই কলেজ চালু হয়েছে। এ অবস্থায় নিম্ন আয়ের ক্লান্ত শ্রান্ত অনুদ্দীপ্ত (demotivated) শিক্ষককূল এতে কি আকৃষ্ট হবেন? আর সরকার ও গণমাধ্যমের আশকারায় পরীক্ষার ফল নিয়ে মত্ত ‘ভালোছাত্র’, তাদের ফলানুরাগী ও তাতেই মশগুল অভিভাবকরা এবং শিক্ষা নিয়ে অন্ধ চিন্তায় আচ্ছন্ন সমাজ কি হঠাৎ আইনের চোখ রাঙানিতে ঘুম থেকে জেগে উঠবে? প্রত্যাশাটায় বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিনা তা আইন কার্যকর হলেই বোঝা যাবে।

***


Sunday, May 14, 2017

শিক্ষায় সংস্কৃতির পাঠ জরুরি

আবুল মোমেন

আমাদের দেশে শিশুমাত্রই উপেক্ষিত, সুস্থ শৈশব থেকে তারা বঞ্চিত। হতদরিদ্র-দরিদ্র পরিবারের শিশুর বঞ্চনার বাস্তবতা আমরা জানি, কিন্তু ধনীর সন্তানও কি আদর্শ শৈশব কাটাতে পারে? তাদের হয়ত ভোগ-আস্বাদনের সুযোগ সীমাহীন, কিন্তু শিশুর আনন্দের প্রধান উৎস তো অংশগ্রহণমূলক কাজে (বা খেলায়)। সেখানে অধিকাংশের জীবনই কাটে বন্দিদশায়, একাকীত্বে। সচরাচর শিশু খেলনার অপেক্ষায় থাকে না, কিন্তু খেলনা পেতে নিশ্চয় তার ভালো লাগে। অনেক বাবা-মা শিশুর এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তার সাথে খেলার বদলে তাকে খেলনার প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে শৃঙ্খলা আদায় করেন (চুপ করে বসে থাকা, দ্রুত খাওয়া ইত্যাদি)। বড়রা শিশুর 'দুর্বলতা'কে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে নিজের কার্যসিদ্ধি করলেও পরিণামে শিশুর মধ্যে কাক্সিক্ষত জিনিস আদায়ের দরকষাকষির মনোবৃত্তি উশকে তোলেন। তাতে  সম্পর্কের সারল্য ও স্বতস্ফূর্ততা চোট খায়, এর মধ্যে উভয় পক্ষে চালাকির প্রবণতা ঢুকতে থাকে।
শিশুর মনোজগৎ সরল বলেই সৎ, সততার সারল্যেই ফোটে তার সৌন্দর্য। তুলনায় বড়দের জগৎ অনেক জটিল এবং বিস্তর কৌশল, বহুতর দায়, বিচিত্র সব ভাবনা এবং নানান বিবেচনার প্রভাবে সেটা নিছক সাদা-কালোয় তৈরি নয়। সে জন্যে শিশুর সাথে চলা ও খেলার সময় বড়দের একটু সতর্ক অর্থাৎ বাড়তি বিবেচনা মাথায় রাখতে হবে। বাঙালি সমাজ তা করে না। বাঙালি সমাজমানসের কিছু মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য আছে যা শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্যে নেতিবাচক - যেমন, সমাজটা কপটতায় অভ্যস্ত, নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়ে উদাসীন (মুখে খুব বলে, কিন্তু আচরণে সম্পূর্ণ উদাসীন), এ সমাজ পক্ষপাতদুষ্ট, সহজাত ঔদার্য ও সহিষ্ণুতার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। শিশুর প্রতি চরম নিষ্ঠুরতার অনেক দৃষ্টান্ত আমরা সম্প্রতি দেখেছি।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাই যে শিশু এমন এক অসীম সম্ভাবনাময় পাত্র যার আধেয়সমূহ কেবল সরল নয়, কাঁচা, সুপ্ত, উন্মুখ অর্থাৎ গ্রহণ ও বিকাশের জন্যে হন্যে হয়ে আছে। এ সময় তার নিজের বিচারক্ষমতা দুর্বল, দূরদর্শিতাও তার কাছে কাম্য হতে পারে না। কিন্তু হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে শিশু যদি কেবল সঠিক জিনিস পায়, ন্যায্য কথাটাই শুনতে পায় তাহলে বিচারবোধ, দূরদর্শিতাসহ তার সব দক্ষতা ও মূল্যবোধই বিকশিত হবে।
সেটাই পথ, সেই পথে চলার আয়োজনটাই জরুরি। হয়ত এখান থেকে আমরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে শিশুর জন্যে সমতাভিত্তিক সুষ্ঠুবিকাশের মানবিক স্বর্গীয় বাস্তবতা তৈরি করা সম্ভব ( যা বাস্তবে ঘটেছিল) তার কথা টানতে পারি। কিন্তু সে আলোচনা শিশুর বিকাশের প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে রাজনৈতিক দিকেই মোড় নেবে। আজকে আমরা সেদিকে যাব না।
আমাদের ধারণা বর্তমান বাস্তবতাতেও শিশুর বিকাশে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া সম্ভব। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চ্যালেঞ্জটাও আমাদের জন্যে কম বড় ছিল না। সীমাবদ্ধ জমি ও পুঁজির স্বল্পতার বিপরীতে ক্রমবর্ধমান মানুষের যে চ্যালেঞ্জ তা আমরা ভালোভাবে উৎরেছি, কেবল যে চালে উদ্বৃত্ত হয়েছি তা নয়, সব্জি, মাছ, ফলেও প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছি। এ বিপ্লব ঘটেছে নিজেদের অর্থায়নে, পরিশ্রমে, দক্ষতায় ও প্রযুক্তির ব্যবহারে। কৃষিবিপ্লবের মতই শিক্ষাবিপ্লব দরকার।
খাদ্যের চাহিদা যেহেতু জৈবিক তাই প্রাণিমাত্রই তা বোঝে। জ্ঞান খাদ্যের মত বস্তু নয়, বিমূর্ত বিষয়, এর পরিমাপের ব্যবস্থাটি কৃত্রিম, জ্ঞানের নিজস্ব প্রকৃতি হল এর অব্যাহত বিকাশ। তাই জ্ঞান হল চর্চার বিষয়, এর উদ্ভাবন নবায়ন, নিত্য পরিমার্জন অপরিহার্য। এর নিছক চর্চার আনন্দই হল মৌলিক, তা যদি পরীক্ষার ফলের অর্থাৎ পরিমাপের কৃত্রিম ব্যবস্থার ফাঁদে আটকে পড়ে তবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়।
আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সমাজকে  - এটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ হয়ে উঠছে না। জ্ঞানের বিচারে এ সমাজ অনেকাংশে তামাদি - অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ বেশির ভাগ বিষয়ে পুরোনো ধ্যানধারণা, বিশ্বাস আঁকড়ে আছেন। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিলেও এটিই বাস্তবতা। জ্ঞান হল অসীম এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হবে নানা আলোচনা ও তর্কবিতর্কের মাধ্যমে প্রাণবন্ত, মুক্ত, বিকাশমান। কিন্তু আমাদের সমাজমানসে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার এখনো দৃঢ়মূল শুধু নয়, যেটুকু জ্ঞানচর্চা হয় তা পদ্ধতির কারণে কার্যত বিশ্বাসে, কখনো অন্ধবিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়। এভাবে বলা যায় সমাজটা অনুসন্ধিৎসায়, যুক্তিতে তথা জ্ঞানের অজানা নতুন পথে দু:সাহসী অভিযানের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত নয়। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও তাতে ছাত্র-শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও সমাজ বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার অনুকূল নয়। আর নয় বলেই এখানে যে কোনো স্তর থেকে যে কোনো  শিক্ষার্থী যে কোনো অন্ধবিশ্বাসে দীক্ষিত হতে পারে। ধর্মীয় চরমপন্থা যা সম্প্রতি জঙ্গিবাদে প্রকাশ পাচ্ছে তার প্রচারণাকে প্রতিরোধের মত পাল্টা যুক্তি-ভাবনা বর্তমান বিদ্যায় কুলাবে না।
জ্ঞানের দিক থেকে এটি স্থবির, এবং যেহেতু স্থবিরতা প্রাণজ বস্তুকে পচন ও ক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়, তাই এ সমাজের অবস্থাও সেরকমই হচ্ছে। দালানকোঠা নির্মাণকেই গুরুত্ব দিচ্ছি, আরাম ও ভোগ, বিলাস ও বিনোদন গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাণের বিকাশ, জ্ঞানের আনন্দ মোটেও পাত্তা পাচ্ছে না। এটা সংস্কৃতির সংকট, যা শিশুকাল থেকেই শিক্ষার মাধ্যমে পাওয়ার কথা।
শিক্ষার একটা সংস্কৃতি আছে যেমন সব বিষয়ের থাকে। শিক্ষার সংস্কৃতির নিহিত চাহিদা হল মুক্ত পরিবেশ, অংশগ্রহণের অবাধ সুযোগ, প্রকাশের স্বাধীনতা।
তাই স্কুল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ভাবলে তার অনুকূল সাংস্কৃতিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্যে শিক্ষার দুটি দিক নিয়ে ভাবা জরুরি -
১.       প্রশ্নের উত্তর-নির্ভর পরীক্ষাকেন্দ্রিক বিদ্যাচর্চার স্থলে জ্ঞানচর্চার জন্যে ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি) ও গণিতে দক্ষতা ও পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নানা বিষয়ে জ্ঞানার্জন হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
২.       সেই লক্ষ্য অর্জনে সাফল্যের জন্যে চাই জ্ঞানচর্চার সাথে সাথে আত্মপরিচয়ের শিকড়ের সাথে শিশুমনের সংযোগ ঘটা। সে লক্ষ্যে চাই -
  ক.   দেশ ও জনগোষ্ঠীর ইতিহাস-জ্ঞান, বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস, মানুষের অর্জন ও অবদান সম্পর্কে ধারণা;
   খ.     নিজের দেশজ সংস্কৃতির সাথে সম্যক পরিচয় এবং বিশ্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা;
  গ.   সৃজনশীলতার চর্চা এবং নিজের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাচর্চা ও এসবের রসাস্বাদনের দক্ষতা অর্জন;
   ঘ.    চর্চার মাধ্যমে যুক্তি, বিচার, বিবেচনা, বিশ্লেষণের সক্ষমতা অর্জন;
   ঙ.    মানবিক গুণাবলি এবং নাগরিকের অধিকার, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা।
সবিনয়ে বলব, দ্বিতীয় ধারার কাজকে সহশিক্ষামূলক কাজ বলে দূরে ঠেলে রাখলে চলবে না। এসব শিক্ষার প্রান্তিক বিষয় নয়, শিক্ষার অনুষঙ্গী নয়, প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং জরুরি ও অন্তর্গত বিষয়। এ পর্যায়ে শিশুরা দল বেঁধে নানা কাজে অংশগ্রহণ করবে, যেমন  - খেলা, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান প্রকল্প, দেয়াল পত্রিকা, প্রকৃতিপাঠ, বিতর্ক ইত্যাদি। এসব চর্চা হলে শিক্ষার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে অর্জিত হবে। লক্ষ্য ঠিক থাকলে কাজ বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। কৃষক যদি দ্বিগুণ ও ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান দিয়ে যেতে পারে তাহলে শিক্ষিত তরুণরা মিলে কেন পারবে না শিক্ষায় গুণগত রূপান্তর ঘটাতে?
আমরা জানি ঠিক যেমন জমির স্বল্পতার বিপরীতে জনসংখ্যার আধিক্য ছিল বড় সংকট তেমনি ছাত্রের তুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মানসম্পন্ন শিক্ষকের রয়েছে সংকট। আমরা বুঝি রাতারাতি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় । তবে শিক্ষাকে কৃষির সাথে সবটা মেলানো না গেলেও এক ফসলা জমিকে যেমন তিনফসলা করা গেছে তেমনি এক স্কুলকে তিন শিফ্টে চালানো যায় - দুটি শিফ্টে নিয়মিত লেখাপড়া হবে আর বিকেল-সন্ধ্যার শিফ্টে সংস্কৃতির পাঠ চলবে। সংস্কৃতি শব্দটা এখানে আমরা এর ব্যাপকার্থে প্রয়োগ করছি যা মানুষের মন-মানসিকতা, রুচি, নীতিবোধ উন্নত করে জীবনকে আলোকিত করবে।
এ পাঠ হয়ত শিক্ষকরা দিতে পারবেন না। এর জন্যে প্রয়োজন হবে শিক্ষাকর্মীর। আমরা যেন ভুলে না যাই, ষাটের দশকে ছাত্রকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক কর্মীরাই ছিলেন পরিবর্তনের মূল শক্তি। আজ যদি উন্নত দেশ গঠনে শিক্ষিত জাতির প্রয়োজনে শিক্ষায় বিপ্লব ঘটাতে হয় তবে চাই উজ্জীবিত দেশপ্রেমিক দক্ষ শিক্ষাকর্মীর দল। তারা হবেন পরিবর্তনের কারিগর ও রূপকার। আর এই সংস্কৃতিপাঠের জন্যে আমাদের থাকবে কর্মপরিকল্পনা, পাঠক্রম ও পুস্তিকাসহ উপকরণ।
এভাবে চর্চার উপকার এই যে শিশুর মন ও মনন অনেক রকম বিষয় এবং শিল্পকলার সাথে পরিচিত হবে ও তা উপভোগের জন্যে তৈরি হতে থাকবে। বড় হতে হতে তাদের মানসে অনেক অবলম্বন তৈরি হবে ভিতর-বাইরের কু-প্রবৃত্তির তাড়না ও প্রলোভন প্রতিরোধের জন্যে। মৌলবাদ, নেশার হাতছানি প্রতিরোধে কিংবা যৌবনের উন্মেষকালে মানবজীবনের বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে খাপখাইয়ে নেওয়ার কাজটিও তাদের জন্যে অনেক সহজ হবে। শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির পাঠ যুক্ত হলে এভাবে মানুষ তার জৈব তাড়না ও মনের অন্ধ সংস্কারের জাল ছিন্ন করার মত আলোর অস্ত্র হাতে পায়।
তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই শিক্ষায় সাংস্কৃতিক পাঠের বিষয় অন্তর্ভুক্তির কথা জরুরিভিত্তিতে ভাবতে হবে।
সরকার শিক্ষা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন। বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর চিন্তাভাবনাও চলছে।  আমরা আশা করব বর্তমান বাজেটে অন্তত ইউনিসেফ-নির্ধারিত জিডিপির ২০% এবং বার্ষিক বাজেটের ৬% ভাগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হবে। এর বাইরে আশা করি সরকারি অর্থায়নে এবং আন্তর্জাতিক অর্থসংস্থার সহায়তায় শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে আরো প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।


***

Monday, January 9, 2017

পথিকৃৎ সাহিত্যিককে শতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি

আবুল মোমেন

বাংলা গদ্যের সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টান পাদ্রি আর হিন্দু পণ্ডিতদের হাতে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। বাঙালি মুসলমান সুলতানি আমলে পদাবলী করেছে, কিছু পরে আরাকান রাজসভায় কাব্যচর্চা করেছে। পুথিসাহিত্যের ইতিহাসও কম পুরোনো নয়, যাতে মুসলিম লেখকদের অবদানই বেশি।  তবে গদ্য রচনায় তাঁদের অংশগ্রহণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক  থেকেই ভালভাবে শুরু হয়।
কথাসাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান শুরু হয় আরও পরে। এ ক্ষেত্রে মীর মোশারফ হোসেনের নাম সবার আগে আসবে - মূলত বিষাদসিন্ধুর কারণে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করলেও সৃজনশীল রচনা হিসেবে এসবের মান ততটা উচ্চস্তরের নয়। উপন্যাস হিসেবে কাজী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ এবং নজিবর রহমান সাহিত্যরত্বের আনোয়ারা প্রথম পাঠক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে। বেগম রোকেয়া, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী নজরুল ইসলামের মত গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম লেখক উপন্যাস রচনা করলেও তাঁদের এসব সৃষ্টির সাহিত্যমূল্য এবং তাঁদের মূল অবদানের প্রেক্ষাপটে ততটা বেশি নয়। এদিক থেকে মাহবুব উল আলমের গল্প ও উপন্যাসের মান বাংলাসাহিত্যের বিচারে যথেষ্ট উন্নত। একটিমাত্র উপন্যাস লিখে কথাসাহিত্যের পথ-রচনায় সহায়তা করেছেন মনীষী হুমায়ুন কবীরের মত প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবী। এর আগে আবুল মনসুর আহমদ ব্যাঙ্গাত্মক সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান অসংগতি ও কুসংস্কারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আবুল ফজল তাঁর সমাজ সংস্কারক ও প্রগতিচেতনার ধারায় মানবতাবাদী আদর্শভিত্তিক উপন্যাস রচনা করেছেন।
আবু রুশদ-এর প্রয়াসেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল - নাগরিক আভিজাত্যের গণ্ডির বাঁধন ভেঙে জীবনের বৃহত্তর পরিসরে তিনি আসতে পারেন নি। গ্রামবাংলার সাধারণ কৃষিসমাজের যে জীবন এবং তার আধুনিক জীবন গঠনের প্রয়াস, রাজনীতির নানান বাঁক, সমাজের অগ্রগতি ও পিছুটান, জাতি ও রাষ্ট্রগঠনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বয়ান লেখার দায় পালনে এগিয়ে এলেন শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, সরদার জয়েনউদ্দিন আর আবু ইসহাক প্রমুখ। এঁদের বলা যায় বাঙালি মুসলিম  কথাসাহিত্যের দ্বিতীয় প্রজন্ম। এঁদের প্রায় একদশকের কনিষ্ঠ সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পূর্ববঙ্গের মুসলিম গ্রামসমাজের বয়ানই লিখলেন, কিন্তু তাঁর মৌলিকত্ব ও স্বাতন্ত্র্যে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট হয়ে থাকলেন।
শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও সরদার জয়োনউদ্দিন রাজনীতি সচেতন লেখক এবং বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার বিষয়ে এক ধরনের অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। এঁরা মাদ্রাসায় শিক্ষিত, গ্রামেই বড়  হয়েছেন এবং বাঙালি মুসলিমসমাজকে ভালোভাবেই জানেন। শেষোক্ত দু’জন প্রথম জীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে  তিনজনই চিন্তাচেতনায় ছিলেন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল। তবুও তুলনায় শওকত ওসমান প্রধানত সাহিত্যিশিল্পী - রাজনীতি তাঁর মানসের প্রধান প্রণোদনা হলেও জীবনের অন্যান্য বিষয়ও তাঁকে ভাবিয়েছে, লেখায় সেসব তুলে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
আবু জাফর শামসুদ্দীনে পদ্মা মেঘনা যমুনা, সরদার জয়েনউদ্দিনের অনেক সূর্যের আশা বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক অভিযাত্রাকে তুলে ধরার ব্রত থেকেই যেন লেখা। উপন্যাসের কুশীলবরা সেই ইতিহাসের ধারা ও বাঁক, অগ্রগতি ও পিছুটান, সম্ভাবনা ও ব্যর্থতার বয়ান নির্মাণে ভূমিকা পালন করেছে, শওকত ওসমান জননী উপন্যাসে গ্রামীণসমাজ এবং তার এক বিশিষ্ট নারী-চরিত্রকে ঘিরে অনেক চরিত্রই তুলে আনেন - মুসলিম রাজনীতির প্রেক্ষাপট ছাপিয়ে মানব-জীবনের পরিসরেই তাঁদের ফুটিয়ে তুলতে চান।
যখন শওকত ওসমান রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা করেন তখন রূপকের আশ্রয় নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গের কষাঘাতে একেবারে লক্ষ্যভেদী হতে চেয়েছেন তাঁর ক্রীতদাসের হাসি পাকিস্তান আমলে রচিত হয় সামরিক স্বৈরাচারকে ব্যঙ্গ ও আক্রমণের বিষয়বস্তু করে। আমাদের সাহিত্যে এটি একটি ব্যতিক্রমী সাহসী সংযোজন। এ তাঁর আদর্শিক লড়াই বটে, কিন্তু সাহিত্যেরই ফর্মের মধ্যে থেকে তা চালালেন। তাঁর গল্পে এবং অন্যান্য উপন্যাসেও আমরা দেখি রাজনীতি বা রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কিংবা চৌহদ্দিতে তিনি আটকে থাকেন নি। জীবনেরই গল্প বলার চেষ্টা করে গেছেন।
শওকত ওসমান পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশভাগের পরে এদেশে এসেছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার পরে উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের গ্রামের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই, তা গড়ে উঠেছে নাগরিক সমাজের সাথে।
কিন্তু এদেশটি, বিশেষত এর সচেতন শিক্ষিত নাগরিক সমাজের জীবনের বড় অংশ জুড়েই আছে রাজনীতিÑ সেই ’৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই। শওকত ওসমান বেশিদিন আগন্তুক হয়ে থাকেন নি। জাতির মূলধারা কেবল চিনে নেননি তা বিনির্মাণে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, ভাবনা-চিন্তা দিয়ে তার রূপায়নে ভূমিকা পালন করেছেন। সেই থেকে শওকত ওসমান পূর্ব বাংলার সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের অগ্রসেনাদের একজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সে অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। পঁচাত্তরের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পরে তিনি দেশান্তরী হয়ে নিজের পক্ষপাত ও অবস্থান স্পষ্ট করলেন। এটি কেবল বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য বা তাঁর দলের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ করে না, বরং এ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অবিচল সামূহিক অঙ্গীকারই প্রকাশ পায়। যিনি রণাঙ্গনের যোদ্ধা নন, যাঁর লড়াইয়ে মূল অস্ত্র কেবল কলম ও লেখা তাঁর জন্যে দেশত্যাগীর উদ্বাস্তুজীবন কেবল অনিশ্চিতিতে ভরা নয়, দারুণ কষ্টকর ও হতাশাময় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তা হয়েও ছিল। তবে বাংলাদেশের লড়াকু ছাত্রজনতা কখনো হাল ছাড়েনি বলে তাঁর জন্যে স্বদেশ প্রত্যার্তনের মত বাস্তবতা তৈরি করতে পেরেছিল। দেশে ফিরে শওকত ওসমান তাঁর লড়াইকে আরো শাণিতই করলেন। এ পর্যায়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম জীবনের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল অন্য অনেকের মতই।
বাংলাদেশ, বহু বছর পরে, বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বে তার প্রতিষ্ঠিত পথে ফিরে এসেছে। এর পেছনে শওকত ওসমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে বাংলাদেশের এই সঠিক বাংলাদেশ হয়ে ওঠার ফিরতিযাত্রা বা অভিযাত্রা এখনো শেষ হয় নি। তাই শতবর্ষে তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গিয়েও বলতে হবে যে তাঁর অভাববোধ এখনও শেষ হয় নি। শওকত ওসমান পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশ যে এখনো রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত হয়ে উঠতে পারে নি! তাই শওকত ওসমানের মত মানুষের অভাব এখনো ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশে। তবে লেখকের শরীরী মৃত্যু ঘটলেও লেখার মাধ্যমে তাঁরা তো অমর।

শওকত ওসমান এদেশের অমর পথিকৃৎদের একজন। শতবর্ষে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

Wednesday, December 28, 2016

নাসিকের অভিজ্ঞতা, জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যাশা

আবুল মোমেন

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি সরকার একটা টেস্ট কেস হিসেবে নিয়েছিল বলে মনে হয়। অনেকের ভাষ্য মতে এসিড টেস্ট। সরকারের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে বলা যায়। ইতিপূর্বে সিলেট, বরিশাল, রাজশাহীতে এবং পরে গাজিপুরে মেয়র নির্বাচনে হোঁচট খেয়ে সরকার কৌশল পাল্টেছিল। বিশেষভাবে রাজশাহী ও গাজিপুরে পরাজয়ে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয় সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার কারণ ঘটেছিল। রাজশাহীর লিটন কাজ দিয়ে মানুষের মন এতটাই জয় করেছিলেন যে পরিচিত অনেক বিএনপিপন্থীকেও দেখেছি তাঁকে ভোট দিতে চট্টগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে সুদূর রাজশাহী যেতে। আর গাজিপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমতউল্লা খান বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক এম. এ. মান্নানের তুলনায় পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে জনপ্রিয় স্থানীয় নেতা ছিলেন। তাঁদের পরাজয়ে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত চক্রের নেতিবাচক ভূমিকা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। এমনকি তারা পরিবর্তনের জন্যে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকেও হিসেবের মধ্যে নেয় নি। অবশ্য ঐ সময়ে সরকারের উন্নয়ন কাজ ও দেশের উন্নতির চিত্র মানুষের কাছে স্পষ্ট ছিল না। তখন মাত্র দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে উত্তরণ ঘটতে শুরু করেছে। তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে এসব বিষয় আলোচিত হচ্ছিল। কিন্তু স্থানীয় ভোটার পর্যায়ে তখনও তা ততটা দৃষ্টিগোচর হয় নি। ফলে সরকারের দাপটে অসহায় বিএনপি যেন সহানুভূতি টেনেছিল মানুষের।
এর পরে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন হয়েছে তিনটি - ঢাকার দুটি এবং চট্টগ্রামের একটি। এবারে প্রার্থী নির্বাচনে সরকার দলীয় পরিচয়ের বৃত্ত থেকে বাইরে থাকতে পেরেছিল। তবে নির্বাচনে বিএনপির জন্যেও সম-সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি ছিল এমন কথা বলা যাবে না। ভোটাররা সরকারের উন্নয়নের বারতাটা ততদিনে পেতে শুরু করেছে, আবার সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অপারগতাও অস্পষ্ট থাকে নি। ভোট কম পড়েছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হয় নি। বিএনপি অভিযোগ তুলে মাঠ ছেড়ে দিয়েছিল।
এর পরে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন প্রায় একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এর ফলে বহু কষ্টে অর্জিত গণতান্ত্রিক ভোটাধিকারের কার্যকারিতা সম্পর্কে জনমনে সংশয়ের কারণ ঘটেছিল। মানুষ ভোট বা নির্বাচনে আগ্রহ হারাতে থাকে।
এ সময়ে আরো দুটি ঘটনা ঘটে। সত্যিই দেশে উৎপাদন, বিশেষত কৃষি উৎপাদনে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হয়ে সাধারণের জীবনে স্বস্তি এসেছে। শহরগুলোয় রাস্তাঘাট, উড়ালপুল, দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করেছ, সারা দেশে সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক কার্যকর উন্নয়ন ঘটেছে। সরকারও এ সাফল্যকে এই প্রথম ভালোভাবে প্রচারণায় কাজে লাগাতে পেরেছে। মানুষ সরকারের প্রতি, বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ফিরে পেতে থাকে।
অপর বিষয়টি হল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শাস্তি ও শাস্তি কার্যকরের পাশাপাশি এই সূত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রচারণার নতুন পরিবেশ তৈরি। এতে নতুন প্রজন্ম, যারা নতুন ভোটার হচ্ছে - তাদের প্রায় সত্তর হাজার এবারে নাসিক নির্বাচনে ভোটার ছিলেন - তারা বিএনপির জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ থাকার বিষয়টি ভালোভাবে নেয় নি। আমার ধারণা এরা নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে আইভির পক্ষে ভোট দিয়েছে।
তৃতীয় একটি বিষয়ও নজরে রাখা দরকার। গত প্রায় আট বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের ভাবমূর্তি আরো বাড়াতে পেরেছেন। প্রথম থেকেই, সেই বিডিআর ঘটনা থেকে, তিনি সাহস ও দক্ষতার সাথে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন ও মোকাবিলা করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর নেতৃত্ব প্রশংসিত ও স্বীকৃত হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার বিষয়ে বিএনপির অস্পষ্ট সন্দেহজনক ভূমিকা খুলে ধরার ব্যাপারে তাঁর দৃঢ়তা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।
স্বীকার করতেই হবে স্বাধীনতার পরে এই প্রথম যেন সবরকম প্রশাসনিক শাখা ও স্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষেরা বেশি সংখ্যায় দায়িত্বে এসেছেন। মনে হয় বিচার বিভাগও এক্ষেত্রে সঠিক অবস্থানে আছেন।
অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণের হাতে আসতে থাকলে নিম্ন পর্যায়ে দলীয় রাজনীতির অন্ধ অনুসারী থাকার প্রবণতা কমে আসে। সাধারণত রাজনীতি অল্প কিছু মানুষের জন্যে লাভজনক বিষয় হয়, অধিকাংশকে এ থেকে লাভ আদায়ে অনেক ঝুঁকি ও অপবাদ সইতে হয়। এর চেয়ে নানা রকম উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অর্জনের পথগুলো এখন অনেকটা দৃশ্যমান। তরুণরা আজ রাজনীতির চেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী হচ্ছে বেশি। তারা জানে বর্তমান স্থিতিশীলতা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শক্ত হাতের শক্তিশালী শাসন এক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হবে। ফলে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও আম মানুষ, বিশেষত উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তা ও তারুণ্যশক্তি, এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় নি। আপাতত ঘামাবে বলেও মনে হয় না। এ অবস্থায় বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বিএনপি যদি জামায়াত ও ইসলামি ঐক্য জোটের মত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ দলগুলোকে সঙ্গে রেখে জনগণকে কাছে টানতে চায় তাহলে খুব কাজ হবে না।
শেখ হাসিনা প্রায় একক সিদ্ধান্তেই বড় রকমের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর প্রশাসন ও রাজনীতি পরিচালনা করছেন। তিনি সর্বাধিক জোর দিয়েছেন অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর, তাতে বিশেষত জ্বালানি খাতের উন্নয়নের প্রশ্নে - অনেক মহলের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েও - বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে চান। কিন্তু এর কোনো কোনোটি, অন্তত রামপাল প্রকল্প, শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে ভোগান্তিতে ফেলতে পারে, কারণ এটি সত্যিই বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত  করবে। তবে আপাতত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে ও সঞ্চালন ঠিকঠাকভাবে চললে তিনি লাভবান হবেন। শহরে দৃশ্যমান উন্নয়নে জোর দিচ্ছেন, গ্রামেও উন্নয়দের ছোঁয়া পৌঁছে গেছে, তাও দৃশ্যমান ভাবেই। সামাজিক সব সূচকে উন্নতি দৃশ্যমান - গড় আয় আর গড় আয়ুর অগ্রগতি এককথায় চমকপ্রদ।
শেখ হাসিনা এখন দুর্নীতি দমনের বিষয়ে আন্তরিক হতে পারেন। তাঁর আত্মবিশ্বাস এতটাই বেড়েছে যে দলের অনেক বিশৃঙ্খলাকারী সদস্যের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রাধিকার মেনে নিচ্ছেন। এতে যুবলীগ-ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তারের ও বিত্ত অর্জনের অবৈধ তৎপরতা কমে এলে আওয়ামী লীগ আরো লাভবান হবে। অবস্থান শক্ত হওয়া এখন সরকার মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন। এতে যেসব অপবাদ ও অপশক্তির বোঝা বইতে হয় তা থেকে দল মুক্তি পাবে। সেটা আখেরে আওয়ামী লীগ ও তার সরকারকেই লাভবান করবে।
এবারে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে সুকৌশলে শামীম ওসমানকে দমানো হয়েছে। নির্বাচনের আগেপড়ে তিনি অনেক বাগাড়ম্বর ও নাটকীয় চমকের আশ্রয় নিলেও বস্তুত তাকে সম্পূর্ণ উপক্ষো করেই নারায়ণগঞ্জ মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিশাল বিজয় অর্জন করেছেন। এটা নারায়ণঞ্জের ভবিষ্যত রাজনীতির জন্যে একটি নাটকীয় পরিবর্তনের বারতা দিচ্ছে বলেই মনে হয়।
এ নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচনের জন্যেও কিছু বারতা তো পাওয়া গেল। নির্বাচনে বিজয়ী হতে টাকা কিছু লাগলেও পেশিশক্তির প্রয়োজন নেই। সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াও সুষ্ঠু নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হতে পারে, সাথে প্রয়োজন দলীয় কোন্দল ও স্থানীয় স্বার্থের বিরোধগুলোকে কাটিয়ে ওঠার মত পরিকল্পনা, সর্বোপরি সত্য হল যোগ্য ও সৎ প্রার্থীই বিজয়ী হন।
এই বারতা বিএনপি আওয়ামী লীগ উভয় দলের জন্যেই এসেছে। উভয় দল মিলে যেভাবে গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার অবক্ষয় ঘটিয়েছিল এখন তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ এসেছে, সময় তৈরি হয়েছে। এভাবেই তো একটা দেশ এগিয়ে যায়।
বর্তমান বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আশার কথা রাষ্ট্রপতি বড় দুই দলের আস্থায় আছেন এবং আমরা আশা করি তিনি সে আস্থার ভালো প্রতিদান উভয় দলকেই দেবেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনোরূপ হস্তক্ষেপ ছাড়া অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের সাহস অর্জন করেছে - এটাই আজ বড় কথা। তবে তা পূর্ণতা পাবে যদি এই  সাহস দেশকে আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন থেকে একটি স্বাধীন মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচন কমিশন উপহার দিতে পারে। তার পরীক্ষা যদি নারায়ণগঞ্জে হয়ে থাকে, তাহলে তাতে সরকার ও কমিশনকে সকলেই পাশ মার্ক দেবেন। ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষকরা সকলেই তা দিয়েছেন ,দিচ্ছেন।
শেষে দুটি কথা বলতে হয়। প্রথমত, রাজনীতি সৎ লোকের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবারে জোরদার করা হোক। দ্বিতীয়ত, দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে হলে দেশের  অপর বড় দল বিএনপিকে তাদের প্রশ্নবিদ্ধ রাজনীতি নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনকে স্থায়ীভাবে বিতাড়ন করতে চাইলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশীদার বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলকেও যে কোনো রকম প্রশ্নবিদ্ধ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আশা করি এই পরাজয়ের জন্যে গৎবাঁধা সমালোচনার পথে না হেঁটে বিএনপি তাদের জন্যে সৃষ্ট নতুন চ্যালেঞ্জগুলো বুঝে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।

***

Thursday, December 15, 2016

আইনের আশ্রয়ে নয় সঠিক লক্ষ্যাদর্শেই শিক্ষার মুক্তি

আবুল মোমেন

সরকার কোচিং-টিউশনি এবং নোটবইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকে পিছু হটে এলো। শিক্ষামন্ত্রী এ নিয়ে প্রায় জেহাদে নেমেছিলেন, কিন্তু বাস্তবতা, বা তারও চেয়ে বেশি, নোটবই ও কোচিং ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে, নমনীয় হতে বাধ্য হলেন।  বর্তমানে সংশোধিত যে খসড়া আইনটি মন্ত্রীপরিষদে গেছে তার যেটুকু পত্রিকায় পড়েছি (প্রথম আলো, ৭ নভেম্বর ২০১৬) তাতে বোঝা গেল এ আইনের আওতায় কোচিং, টিউশনি, নোটবই সবই বহাল থাকবে। অর্থাৎ কঠোর আইন করে এবং জেহাদ ঘোষণা করেও এগুলো বন্ধ করা যায় নি। যেসব কারণে আইন ও প্রচারণা সত্ত্বেও এসব বন্ধ করা যায় নি তা বিবেচনায় নিয়েই ব্যবস্থা নিলে ভালো হত।
সাধারণভাবে এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভবিক যে, একজন ছাত্রকে কেন তার পাঠের বিষয়গুলো বুঝতে পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষের পাঠ ও বিদ্যায়তনের শিক্ষকের সহযোগিতার বাইরে আরও বাড়তি সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হবে? এটা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশে স্কুল-শিক্ষা প্রবর্তনের আদিকাল থেকেই গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ‘ছেলেবেলা’ বইতে তাঁর সেজদা ছাড়াও এন্তার গৃহশিক্ষকের বর্ণনা দিয়েছেন। গল্প-উপন্যাসেও আমরা গৃহশিক্ষকদের কথা পাই। এঁরা সাধারণত  গ্রাম থেকে শহরে উচ্চ শিক্ষার জন্যে এসে সম্পন্ন গৃহস্থবাড়িতে থেকে সে বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়ার সংস্থান করতেন ও নিজের পড়াশুনা চালিয়ে যেতেন যা জায়গির নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দুসমাজে আর বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে মুসলিমসমাজে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রশ্ন তোলা যায়, গৃহশিক্ষকের প্রয়োজন হত কেন? শুরুতে সমস্যাটা ছিল এ ধরনের আনুষ্ঠানিক অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে অভিভাবকদের প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অভাব। ফলে উচ্চতর শ্রেণির ছাত্ররা একাজে সহায়ক হতো, এবং বিনিময়ে তাদেরও আবাসন ও আহার্যের সংস্থান হত। তাছাড়া বিংশশতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত শহরে খুব সীমিত সংখ্যক পরিবারের বসবাস ছিল, কর্তারা মেসে বাস করে জীবিকা নির্বাহে অথবা জীবন উপভোগে সময় ব্যয় করতেন। তাই গ্রাম থেকে এনে সন্তানকে কোনো গৃহস্থ বাড়িতে থাকতে দিতেন। গ্রামীণ পরিবারে বহুকাল ধরেই স্কুলগামী শিশুরা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম প্রজন্ম। বাবা-মা তাদের দেখভালে অক্ষম ছিলেন এবং উপযুক্ত কাউকে, প্রায়ই নবীন কোনো শিক্ষককে, বাড়িতে থাকতে দিয়ে বা টাকার বিনিময়ে গৃহশিক্ষক হিসেবে রাখতেন।
গৃহশিক্ষকতা ব্যক্তির জন্যে সাময়িক পেশা হলেও এরকম কর্মপ্রার্থীর নিত্য চাহিদা ও জোগান থাকায় এর একটা ধারাবাহিকতা এ সমাজে বরাবর ছিল। বলা যায় এ পেশা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
বিষয়টা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে জটিল এবং বিশিষ্ট হয়ে উঠল এ কারণে যে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুশত বছর অতিক্রান্ত হলেও আমাদের সমাজ শিক্ষা বা লেখাপড়া বা পঠনপাঠন কিংবা জ্ঞানার্জনকে এর - অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও এতদ্সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি, সনদপত্র ইত্যাদির - বাইরে জীবনের সাথে যুক্ত বা জীবনে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে নি। শিক্ষা এক জীবনবিযুক্ত প্রক্রিয়া, এর একমাত্র লক্ষ্য ও মোক্ষ হল ডিগ্রি ও সনদপত্র, জীবনকে তাৎপর্যময়, আনন্দময় করে তোলার রসদও যে এখান থেকেই আসবে; এখান থেকেই মানুষটার ভাবনার জগৎ, বিবেচনার বোধ ও ক্ষমতা, ধৈর্য, মমতা, সহিষ্ণুতা, ঔদার্য, সহানুভূতি, সেবাপরায়নতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলী অর্জিত হবে তার ভাবনা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আর নেই। একসময় শিক্ষা মহৎ আদর্শ লালন করত, শিক্ষকরা সে আদর্শের প্রতিভূ ছিলেন। এখন তাকে আমরা বেশিরকম বৈষয়িক বিবেচনায় বেঁধে ফেললাম।
এদিকে ছাত্রত্ব শেষ করার পর কাউকে তো আর বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা দিতে হয় না, কিন্তু জীবনে পদে পদে বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, মানবিকতাসহ বিভিন্ন দক্ষতা ও মূল্যবোধের পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। সেসব পরীক্ষায় যে আমরা ভালো করছি না তা সমাজের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এর দায় শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা এড়াতে পারে না।
পরীক্ষা, পাঠ্যবই ও সিলেবাস এবং জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক যে শিক্ষা তাতে কারো শিক্ষার্থী সত্তার কোনো গুরুত্ব নেই, সমস্ত জোরটা গিয়ে পড়ে পরীক্ষার্থী হিসেবে তার দক্ষতার ওপর। স্কুল (এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) পরীক্ষা ও পাঠ্যবইয়ের বাইরেও আরো নানা বিষয়ে ছাত্রকে অবহিত, আগ্রহী ও দক্ষ করে তোলার কথা। সেখানে সে খেলবে, মিশবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি করবে, এবং স্কাউট-গাইড করবে, দেশ এবং  বিদেশের কথাও জানবে, কোনো কাজে যুক্ত হবে ইত্যাদি।
কিন্তু কী এক জাতিগত তাড়নায় সকলেই বুঝেছেন যে, শিক্ষার লক্ষ্য হল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, ক্রমে তা-ই একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে! সেদিক থেকে স্কুলকে টেক্কা দিয়ে পরীক্ষার ফলার্জনের আর্থিক বাজারটি দখলে নিয়েছে কোচিং সেন্টার। স্কুল শিক্ষকরা স্কুলে মনোযোগ না দিয়ে ব্যাচ পড়ানোর দিকে মন দিয়ে শিক্ষাবাজার থেকে মুনাফা নিচ্ছেন। আর জায়গির ও গৃহশিক্ষকতা যাদের গতি হত তারা দল বেঁধে কোচিং সেন্টার দিয়ে শিক্ষাবাজারের সবচেয়ে সফল বণিকে পরিণত হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষা দেয়, ওরা বলে মডেল টেস্ট। এভাবে ছাত্ররা দক্ষ দুরন্ত পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত হয়।
এভাবে তারা ভালো ফলও করে, কিন্তু বিনিময়ে অর্থ ছাড়াও আরো মূল্য দেয়, তাহল তার পড়াশুনার ইচ্ছা, জ্ঞানার্জনের আগ্রহ, সেটা আদতে অংকুরেই ঝরে যায়, অবিকশিত থেকে যায়। সে সংবাদপত্র বা প্রচারপত্র ছাড়া আর কিছুই পড়তে পারে না। বই-পুস্তক পাঠে মনোযোগও দিতে পারে না, আনন্দও পায় না। আমরা এভাবে পাঠ্যবইয়ের বাছাই করা অংশের (কেননা দক্ষ কোচ নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুর প্রশ্নের উত্তর শেখান) ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে শিক্ষিত জাতি গঠন করছি! আখেরে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চকচকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও অধূনা তরুণরা না পারে শুদ্ধ বাংলা শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে, না পারে জাতির শ্রেষ্ঠ কৃতি সম্পর্কে বলতে কিংবা পারে না বিখ্যাত মনীষীদের কথা বা জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে ।
আমাদেরই ব্যবস্থার কারণে ছাত্র-অভিভাবক উভয়ের কাছেই স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টারের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। যেসব স্কুল ভালো ফল করছে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তারাও কোচিং-এর অনুকরণে সাপ্তাহিক, মাসিক, বিষয়ভিত্তিক, অধ্যায়ভিত্তিক হরেক পরীক্ষার জালে ছাত্রদের বেঁধে রেখেছে। আইন দিয়ে এ ফলের লোভ আর পরীক্ষার মড়ক ঠেকানো যাবে না এবং এদের জ্বালানি নোটবইও বন্ধ হবে না। যদি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয় পরীক্ষা তাহলে কেবল যে শিক্ষার উদ্দেশ্য খণ্ডিত সীমিত হয়ে পড়ল তা নয়, এই সংকীর্ণ কিন্তু লোভনীয় উদ্দেশ্যকে ঘিরে বাণিজ্য তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, তৈরি করা সহজ। যদি ছাত্রের অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক গুণাবলী-দক্ষতা অর্জনের দায়ও শিক্ষার ওপর থাকত তবে কোচিং সেন্টার বা গৃহশিক্ষক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে টেক্কা দিতে পারত না।
আমি যে বিষয়টি এখানে বলতে চাইছি তা কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচ্য নয়, এটি হল জাতি গঠনের প্রশ্ন। আমরা কি পরীক্ষা পাশের সংকীর্ণ মাপকাঠির ভিত্তিতেই জাতিগঠন করব নাকি আরও ব্যাপ্ত পরিসরে মানুষকে বিবেচনায় নেব সেটি আগে ঠিক করতে হবে। পরীক্ষা পাশই যদি মাপকাঠি হয় তবে কোচিং-নোট বই ব্যবসা কখনো বন্ধ করা যাবে না। এটি জাতির জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
আমরা কি লক্ষ্য করছি শিশুরা পালে পালে যেসব কোচিং সেন্টারে ছুটছে সেগুলো একজাতের কারাগার, স্কুলগুলো হল বন্দিশালা আর বাড়িগুলো বহুতল ভবনে খাঁচার মত ঝুলে থাকে। আর মাঠ, অবসর, বন্ধুবান্ধব, যোগ্য নেতা, শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া শিশুরা কেবল পরীক্ষার ঘানি টানছে। শৈশবের জন্যে বড়দের কাছ থেকে একটু মায়া একটু সহানুভূতি দরকার, ভাবনা দরকার, পরিকল্পনা চাই। সেটা দিতে আমরা বড় কার্পণ্য করছি। সোনার ডিম পাড়ার জন্যে তৈরি হওয়ার আগেই হাঁসগুলোকে বন্ধ্যা করে দিচ্ছি।
প্রত্যেকের বাড়ির পরিবেশ ঠিক করা রাষ্ট্রের কাজ নয়, কিন্তু স্কুলের ভূমিকা ঠিক করা সম্ভব। তবে তার আগে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে। জাতিগতভাবে আমাদের বুঝতে হবে যে পাঠ্যবইয়ের বাছাই অংশের নোট পড়ে শিক্ষিত জাতি গঠন এবং যথার্থ মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। বরং এই খণ্ডিত বিকৃত শিক্ষার বাইরে থেকে হয়ত মানুষ হওয়া সম্ভব।

মূল জায়গাটা ঠিক করে স্কুলকে সেভাবে গড়ে তুললে আপনিই মানুষ কোচিং-নোট বইয়ের পিছনে কড়ি ঢালবে না, শ্রম দেবে না। আর তারপরে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যটা শিশুদের জন্যে আরও সৃজনশীল সব উপকরণ ও কাজের চ্যালেঞ্জ ভিত্তিক হয়ে উঠবে, তাতে মেধাবীরা অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারবে। জাতি ও শিক্ষার নাভিশ্বাস থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।

***

Saturday, December 10, 2016

গা ভাসিয়ে নাকি গা লাগিয়ে পাব রোকেয়াকে?

আবুল মোমেন


বাংলাদেশে বেগম রোকেয়ার ভাবমূর্তি এখন উজ্জ্বল। হয়ত বলা যায় বাঙালি মুসলিম সমাজের তিনিই শীর্ষ নারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর নামে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রিনিবাস হয়েছে, রাজধানীতে সড়কের নামকরণ হয়েছে তাঁর নামে। জনজীবনে বেগম রোকেয়া এভাবে প্রতিষ্ঠিত আজ।
বেগম রোকেয়ার সাহিত্যের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে নারীর অবরোধমুক্তি। পর্দাপ্রথার আতিশয্যকে তিনি কষাঘাত করেছেন সাহিত্যে - বিশেষত অবরোধবাসিনীর পত্রে। দ্বিতীয় বিষয় ছিল ধর্মের নামে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করার বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ।
তবে বাংলাদেশে তাঁর জীবনের মূল ব্রত নারী শিক্ষার প্রসার আজ ঘটে চলেছে - এই ভেবে আত্মপ্রসাদ পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি ঘটছে যুগের নিয়মে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের সাথে তাল মিলিয়ে। কিন্তু এ প্রশ্নটা না ভুললেই নয় - নারী, এবং ছেলেরাও, বর্তমান বাংলাদেশে যে শিক্ষা পাচ্ছে এবং শিক্ষা পেয়ে যেভাবে বড় হচ্ছে বেগম রোকেয়া কি তার কথাই ভেবেছিলেন?
আজ বাংলাদেশের সমাজমৃত্তিকায় জঙ্গিবাদ বীজ বপন করেছে, ধর্মান্ধতা শক্তিশালী হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িকতা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। রোকেয়া এসবের বিরুদ্ধেই লিখেছেন, বলেছেন এবং কাজ করে গেছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে স্বামীর কাছ থেকে প্রেরণা ও সহযোগিতা উভয়ই পেয়েছিলেন। সম্ভবত তাই নারী-পুরুষের সমতা ও অংশগ্রহণে সমাজের কল্যাণ তিনি দেখেছেন।
বাংলাদেশ নানামুখী পথে চলছে। তবে মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ নারীকে অবরোধবাসিনীই দেখতে চাইছে। যদিও একদিক থেকে প্রায় রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নের রাজ্যের মতই আজকের বাংলাদেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধী নেত্রী, সংসদের বিরোধী নেত্রী, সংসদের উপনেতা, স্পিকার, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, উচ্চ আদালতের একাধিক বিচারপতি মহিলা তবুও আমরা জানি এটি রোকেয়া কল্পিত ও কথিত নারীস্তান নয়। রীতিমত পুরুষস্তান। রোকেয়া পুরুষতন্ত্রকে সমালোচনার হুল ফোটানোর জন্যেই এক নারীস্তানের কল্পলোক সৃষ্টি করেছিলেন - অবরুদ্ধ নারীর আর্তনাদ ও ফরিয়াদ যেন তাঁর  জোরালো লেখায় অন্যভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।
আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে এত এত নারী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের প্রাধান্য সত্ত্বেও বলতে হবে, সাধারণের সমাজে নারীর অবস্থান রোকেয়ার ভাবনাকে উপহাসই করছে। নারী নির্যাতন বাড়ছেই কেবল। নারীর নিরাপত্তা আজ সবচেয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।
তাঁর স্বপ্নের পথ থেকে অপসৃয়মান এ সমাজে তবুও রোকেয়া স্মরণীয় ব্যক্তি, শ্রদ্ধেয় নাম, ইতিহাসের বরেণ্য চরিত্র। ব্যস এটুকুই। অর্থাৎ বাহ্য স্বীকৃতি দিয়েই আমরা খালাস। সমাজবাস্তবতা তো তাই বলে। তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করছি না আমরা, তাঁর লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে আমরা অপারগ।
রোকেয়ার সৃষ্ট সাহিত্য পাঠেই তাঁকে পাওয়া যাবে, রোকেয়ার জীবনেই মিলবে তাঁর জীবনাদর্শের শিক্ষা। কিন্তু এ সমাজে একালে যেন নাম নেওয়াই যথেষ্ট, আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপনেই দায়িত্ব শেষ হয়।
বেগম রোকেয়ার ভাবমূর্তি নতুন প্রজন্মের কাছে - যারা তাঁর নামাঙ্কিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে, ছাত্রী নিবাসে থাকে - কীভাবে পৌঁছায়, নির্মিত হয়? হয় কি? এ সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। যেটুকু ধারণা হয় তা হবে রোকেয়াকে লজ্জা দেওয়ার সামিল।
রোকেয়ার নি:স্বীকরণের মাধ্যমে এক নামসর্বস্ব রোকেয়াকে তৈরি করে নেওয়া হল কি? নামসর্বস্ব রোকেয়ার নামে জয়ধ্বনি দেওয়া সহজ। তাঁর বইয়ের পাতা খুললে, তা পড়লে, চিন্তার সাথে পরিচিত হলেই বিপদ। তাহলে নিশ্চিন্তে গা ভাসানো যাবে না। আমরা কি গা ভাসিয়েই চলব নাকি রোকেয়ার তুল্য না হলেও তাঁর অনুসারী হয়ে গা লাগিয়ে কাজ করে তাঁর ঋণ স্বীকার ও শোধ করব।


***