Friday, December 4, 2015

বিএনপির প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

 আবুল মোমেন

সরকারের দমনপীড়নের মুখে বিএনপি চুপসে গেল। বারবার চেষ্টা করেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। অনেকবারই তোড়জোর করে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল দল, কিন্তু মামলা-মোকদ্দমা আর গ্রেপ্তার-শাস্তির চাপে হাল ছেড়ে দিতে দেখা যাচ্ছে।
আমরা নিশ্চয় বিরোধী দলের ওপর সরকারের এই বলপ্রয়োগের নীতিকে সমর্থন করি না। গণতন্ত্রে বিরোধী মত এবং বহুমত থাকবেই। ফলে সরকারের এই অসহিষ্ণুতা নিন্দনীয়।
এই নিন্দা প্রকাশের সাথে সাথে একটু বিস্ময়ও বোধ না করে পারি না যে বিএনপি কেন কোনো আন্দোলন তৈরি করতে পারল না। বিএনপি নেতৃত্ব এ নিয়ে নিশ্চয় ভাবেন, তবে তাঁদের ভাবনা যেন মূলত সরকারের ভূমিকা ও বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ সরকারি বেপরোয়া পীড়নের মুখে মাঠে নামতে পারছে না কর্মীরা এই অভিযোগই তারা জানাচ্ছে, জনসম্পৃক্ত কোনো ইস্যুতেই তারা মাঠে নামছে না।
অতীতে বাংলাদেশ এরকম পরিস্থতি দেখেছে। ছয় দফার আন্দোলনের সময় আইয়ুব-মোনেম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় সকল প্রধান নেতাকেই জেলে ঢুকিয়েছিল, মামলা-মোকদ্দমায় ফাঁসিয়ে রেখেছিল। তখন দলের মহিলা নেত্রীরা, তরুণ নেতা, ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য অঙ্গ সংগঠন নানা কৌশলী কর্মসূচী দিয়ে তাদের রাজনীতিকে চাঙ্গা রেখেছিল। বিএনপির এসবই আছে, কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয়, কেবল ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে তাদের চেহারা ও কণ্ঠস্বরটুকু পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতিতে এটুকুতে কাজ হবে না। হচ্ছেও না।
এর মূল কারণটা বলা দরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি পর্ব কেবল গৌরবময় তা নয়, দেশের স্বাধীনতার পেছনে মূল ভূমিকা এ দুটিরই - একটি ভাষা আন্দোলন ও  ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তার পক্ষে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন আর অন্যটি হানাদার-দখলদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এই দুটি সংগ্রামেই আওয়ামী লীগ কেবল ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকে নি, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। এ হল বাস্তবতা। বিএনপি স্বাধীনতা-পরবর্তী দল, ফলে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী আন্দোলনে তার যুক্ত থাকার সুযোগ ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনীতি দাঁড় করাতে গিয়ে তারা দেশের ইতিহাসের গৌরবময় দুই পর্ব সম্পর্কে নিজেদের অবস্থানকে দুর্বল তো রেখেছেই, ক্ষেত্রবিশেষে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সাথে সম্পৃক্ত বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, লালন উৎসব ইত্যাদিতে এ দলের ভূমিকা নেই বললেই চলে। অথচ স্বাধীনতার পূর্ব বা পরবর্তী যে কোনো সামরিক-স্বৈরাচারের আমলে যখন প্রত্যক্ষ রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা চলে বা রাজনীতিকদের পক্ষে কাজ করা মুশকিল হয় তখন এসব উপলক্ষকে ঘিরে ছাত্র সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানই মাঠে সক্রিয় থেকেছে ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে জিইয়ে রেখেছে। আর এসব উদ্যোগের রাজনৈতিক সুফল একচেটিয়াভাবে পেয়েছে আওয়ামী লীগ।
বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একদিকে বাংলাভাষা, বাংলা সাহিত্য, রবীন্দ্র-নজরুল-বাউলের গানসহ বাঙালি সংস্কৃতি এবং অন্যদিকে মুক্তযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ ও চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুসহ এর নেতৃত্ব সম্পর্কে কী ভাবনা তা স্পষ্ট নয়।
স্পষ্ট হল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামির সাথে গাঁটছড়া, এবং তারই সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি পক্ষপাত, এমনকি দেশের ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি সহানুভূতি।
একটা বিষয় স্পষ্ট, এদেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মে মুসলমান এবং যথেষ্ট ধর্মভীরু বটে কিন্তু ভাষা, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অতীতের বিভ্রান্তি তারা কাটিয়ে উঠেছে। আর যে দেশের সিংহভাগ মানুষ তরুণ তাদের মনোভাবটাও বোঝা দরকার। তাদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে বটে কিন্তু তা-ও ঘটছে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা বিশ্বের ইরাক-লিবিয়া-আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্য নীতির কারণে। অধিকাংশ তরুণ তার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের অংশীদার হতেই ভালোবাসে। বাংলাদেশ এ দুটি অধ্যায় ও অর্জনকে কী করে অস্বীকার করবে?
তদুপরি নাগরিকসমাজের সচেতন ও সৃজনশীল অংশ আপোসহীন আবেগের সাথে এ দুটি বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিএনপি নেতৃত্ব এ বিষয়টি হয় অনুধাবন করছে না অথবা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব স্বীকার করছে না।
এর ফলে সাধারণভাবেই ছাত্র ও সচেতন নাগরিকদের কাছে বিএনপির আবেদন কমে গেছে। বরং জামায়াত, যুদ্ধাপরাধী ইস্যুতে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। আর একুশের বইমেলা, বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী, লালনমেলা, বাউল উৎসব ইত্যাদি বাঙালির প্রাণের উৎসবে কোথাও বিএনপি নেতা বা বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয়তা বা অংশগ্রহণ দেখা যায় না। এভাবে সমাজের সচেতন সক্রিয় সৃজনশীল অংশের কাছে বিএনপি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে।
এভাবে সমাজের মূলধারার বিপরীতে বা বাইরে থাকতে গিয়ে, অনেকের সন্দিগ্ধ মনে প্রশ্ন জাগছে, দলটি কি নানা ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ছে না?
সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলছে সত্য। সাধারণত সরাসরি মাঠের রাজনীতি সম্ভব না হলে যেসব বিকল্পের সন্ধান করে বিরোধী শক্তিগুলো তার একটি ষড়যন্ত্র। অতীতে আওয়ামী লীগ বিকল্প হিসেবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ছাত্র আন্দোলনের সহায়তা নিয়েছিল ও পেয়েছিল। ফলে তারা পাক সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেও নিজেরা ষড়যন্ত্রে জড়ায় নি। এতে আখেরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মাথা উঁচু করে বিজয়ী বেশে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে দলটির পক্ষে। বিএনপি এ ধরনের প্রকাশ্য প্রত্যক্ষ রাজনীতি বা রাজনৈতিক কার্যক্রম দাঁড় করাতে পারছে না। মাঝে মাঝে তাদের কোনো কোনো নেতা বা জোটভুক্ত সংগঠনের নেতা-কর্মী কিংবা সমর্থক নাগরিকদের গোপন তৎপরতার সন্ধান মিলছে। এতে রাজনৈতিক আন্দোলন দাঁড় করানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে বিএনপির জন্যে।
আমার মনে হয় মাঠের অবস্থা ও বাস্তবতা পর্যালোচনা করে বিএনপিকে তার নীতি-আদর্শ ও কার্যক্রম ঠিক করতে হবে। আজকের দিনে রাজনীতিতে ধর্ম ও ভারতবিরোধিতার ধুয়া তুলে ব্যাপক কোনো আন্দোলন বা সুবিধা আদায় করা যাবে না। নাগরিকসমাজ ও বামপন্থীরা পরিবেশ রক্ষার যে ধারাবাহিক আন্দোলন করছে তাতে বিএনপি নেই। সাম্প্রতিক ইস্যুভিত্তিক যেসব আন্দোলন - যেমন নতুন পে স্কেল নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলন, তাতেও এ দলটি নেই, নেই তাদের কোনো বক্তব্য। যেখানে নাগরিকসমাজ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ভাষা-সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে একটি প্রগতিশীল অবস্থানেই রয়েছে সেখানে তাদের পক্ষে বিএনপিকে সহজাত বন্ধু ভাবা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের জন্যে এ অনেকটা সরকারকে নিজের ঘরের মানুষদের সামলানোর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এ বাস্তবতায় বিএনপি দর্শকে পরিণত হচ্ছে।
আবার বিএনপির প্রতি সরকারি আচরণকে সমর্থন করতে না পারলেও বিএনপির অবস্থানের কারণে সচেতন জনগণ ও ছাত্রতরুণরা অধিকাংশই এসব ইস্যুতে দর্শকের ভূমিকাই পালন করে যাচ্ছে।
দর্শকের ভূমিকা থেকে খেলোয়াড়ের ভূমিকায় তারা কি এক হবে? সেটা নির্ভর করবে বিএনপির নেতৃত্বের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর। সেটা কি অদূরভবিষ্যতে তারা নিতে পারবে?


***

Saturday, November 7, 2015

বিপদগামীরা সংকট কত গভীর করবে?

আবুল মোমেন

আইএস, আল কায়েদা বা তালিবান নামে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করার জন্যে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশে যে জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে কি ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী ফুটে ওঠে? এবং এতে কি ইসলামের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়? একই প্রশ্নগুলো তোলা যায় একই উদ্দেশ্যে এ দেশে যেসব সংগঠন জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে এবং নিরস্ত্র মানুষ খুন করে চলেছে তার ফলাফল সম্পর্কে।
হিংসাত্মক ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে ইসলামের নামে। তাদের আক্রমণের শতকরা নব্বই ভাগ ঘটছে প্রতিপক্ষ মুসলমানের ওপর। এটা ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির চেহারা নিয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একতরফা আক্রমণের শিকার হচ্ছে মুক্তচিন্তার মানুষ এবং মানবিক তথা প্রকৃত ইসলামে বিশ্বাসীরা। যে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিতর এভাবে নৃশংস হানাহানি চলে তার সম্পর্কে অন্য ধর্মের মানুষের মনে শ্রদ্ধাবোধ থাকে না। ইসলামকে একটি যুদ্ধবাজ জঙ্গি ধর্মের ছাপ লাগিয়ে দিচ্ছে তারা। অথচ ইসলাম শব্দের অর্থ শান্তি। এ ধর্মের মূল শক্তিই শান্তি ও সাম্যের বারতায়।
ইসলামের বিজয় ঠিক তলোয়ারের সাহায্যে হয় নি। সে যুগের যুদ্ধের মাধ্যমে কাউকে পরাজিত করা গেছে, পদানত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু পরাজিত পদানত মানুষ ধর্মান্তরিত হয় বাধ্য হয়ে, অবস্থার গতিকে। কিন্তু যারা স্বেচ্ছায় সাগ্রহে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তারা তা করেছে এর সাম্য ও শান্তির বাণী শুনে, বিশেষভাবে নানা তরিকার সাধকদের সান্নিধ্যে এসে, কথা শুনে।
আজকের এই বিশ্বায়নের এবং বাজার অর্থনীতির ভোগবাদী পণ্য-সর্বস্ব জীবনে সব দেশে প্রায় সব মানুষের অন্তরে গভীর সংকট বিরাজ করছে। এ এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংকট। শতাব্দীকাল আগে ব্রিটিশ দার্শনিক এ. এন. হোয়াইটহেড আধুনিক কালের ঘনায়মান এই সংকটটি শণাক্ত করে বলেছিলেন চলমান ব্যবস্থার যে প্রবণতা তাতে মানুষ ক্রমেই নিজের অন্তরের শূন্যতায় গভীর সংকটে পড়বে। মানুষ তো সবসময় বিষয়-আশয় নিয়ে মগ্ন থেকে তার মনুষ্য জীবনের সার্থকতা ও চরিতার্থতা খুঁজে পায় না।
আজ এই দার্শনিকের আশংকা সত্যে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে এ সংকটগ্রস্ত মানুষকে ইসলাম নিশ্চয় সেবা দিতে পারত। কিন্তু জঙ্গি সংগঠনগুলো ইসলামের নামে সন্ত্রাসের পথে চলে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ হত্যার যে ঘৃণ্য পথ ধরেছে তাতে সেই সুযোগ গভীর চ্যালঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এদের অমানবিক তৎপরতাই যদি ইসলামের নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে থাকে তাহলে অমুসলিমের মনে ইসলাম সম্পর্কে কী ধারণা হবে? শান্তিকামী নিরীহ সাধারণ মুসলমান - যাদের সংখ্যা সারা বিশ্বে কোটি কোটি - তারাই বা এর কী ব্যাখ্যা খুঁজবে?
জঙ্গি সন্ত্রাসের কারণে পাকিস্তান, আফগানিস্তান উঠে দাঁড়াতে পারছে না। জঙ্গি হানাহানির কবলে পড়ে ইরাক, লিবিয়া বিপর্যস্ত। সিরিয়ায় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এসবের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমের স্বার্থবুদ্ধির চাল আছে। তারাই তালেবান, আল কায়েদা, ইসলামিক  স্টেট সৃষ্টি করেছে, এদের অস্ত্র সরবারাহের পিছনেও তারাই রয়েছে। কারণ আমরা দেখছি গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেসব দেশে সরাসরি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় আধিপত্য বিস্তারের হাত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে পশ্চিমের পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর পক্ষে। বিপর্যস্ত দেশগুলোর স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হওয়ার পর একদিকে তারাই তাঁবেদার শাসক সৃষ্টি করে পুরো অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে আর অন্যদিকে এক সময় তৈরি করা জঙ্গি সংগঠনগুলো সভ্যতা বিনাশের কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এই সুযোগে পশ্চিমা শক্তি নিজেদের অবস্থান সংহত করার জন্যে তাদের ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় র্শীষে রেখেছে আল কায়েদা, তালিবান বা আইএস প্রভৃতি সংগঠনকে।
বাংলাদেশে ইসলাম চর্চার ইতিহাস হাজার বছরের বেশি। এখানে মূলত সুফি সাধকরাই ইসলাম প্রচার করেছেন, ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। তাঁদের শিক্ষা এবং এদেশের ঐতিহ্যের মিশ্রণে এখানে মাবতাবাদী ধারায় ইসলামের চর্চা হয়েছে ও বিকাশ ঘটেছে। বাংলার মানবতাবাদ অত্যন্ত শক্তিশালী, বিশেষত ইসলামের প্রভাবে এই মানবতাবাদে সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুুক্তি ঘটেছে ও সাম্য মৈত্রীর চেতনা পুরিপুষ্ট হয়েছে যা পশ্চিমের মানবতাবাদে আমরা দেখি না। ইসলাম এভাবে জীবনের নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে - এখানে এবং বিশ্বের নানা দেশে। এটাই ইসলামের শক্তিশালী মূলধারা।
আজ পশ্চিমের চালে এবং অশিক্ষা ও ধর্মের ভ্রান্ত ধারণা ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কিছু বিপথগামী মানুষ ভ্রাতৃঘাতী সন্ত্রাসে লিপ্ত হয়ে মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে নেমেছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ এবং ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি কোনো ধর্মেই স্বীকৃত নয়, ইসলামে তো নয়ই। তারা যা করছে তাকে কোরানের আলোকে জেহাদ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এই সংকটের সময় মুসলিম সমাজ ও ইসলামের এবং মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা উচিত প্রকৃত আলেম ওলেমাদের। সাম্য এবং ঐক্য ও শান্তির বাণী আজ জরুরি যা ইসলামের জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে তারা দিতে পারেন।

***

Monday, October 19, 2015

শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়তা ও হতাশা

আবুল মোমেন

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে উদ্ভূত সমস্যাকে সরকার পাশ কাটাতে চাইছে। শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যে বোঝা যায় তাঁরা অনন্যোপায়। সম্প্রতি তিনি বলেছেন - যত সুপার টেকনোলজি ব্যবহার করা হোক না কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না। যারা অপরাধী তারা সুপার টেকনোলজির চেয়েও এগিয়ে থাকে (দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ অক্টোবর, ২০১৫)। শিক্ষামন্ত্রীর কথায় ফাঁসের সত্যতার স্বীকৃতি মেলে, যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় অস্বীকৃতির সংস্কৃতি ধরেই চলছে।
যে তরুণরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ভিত্তিতে গৃহীত পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলেছে তাদের দাবির নৈতিক ন্যায্যতা অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থেকে আমরা বুঝতে পারি এখানে আদতে কচি-মাথার নীতিবোধ আর পাকা-মাথার বাস্তববুদ্ধির টানাপোড়েন চলছে।
সরকার হয়ত ভাবছে এ পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হলে কৃতকার্য হয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা না পাল্টা আন্দোলনে নামে। রীতিমত সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে যাবে সরকার। এই সম্ভাব্য বিপদ তারা ডেকে আনতে চাইছে না।
নাগরিকসমাজ নিশ্চয় ফাঁস বা দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা এবং নৈতিক ন্যায্যতার পক্ষেই থাকবে। কিন্তু এটি একটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন বলে ক্ষতিগ্রস্ত অকৃতকার্য ছাত্রদের পক্ষে ব্যাপক ছাত্র-তরুণ ও নাগরিকসমাজের সক্রিয় ভূমিকা ঘটবে কিনা সন্দেহ। নৈতিকভাবে দুর্বল সমাজ অনবরত ছোটবড় নৈতিক ত্রুটিকে উপেক্ষা করে এবং আপস করেই চলতে অভ্যস্ত।
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর সততার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখেছেন, যা আজকের দিনে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দুর্লভ। তাঁর সরল উক্তির মধ্যে এ সমাজে সৎ মানুষের অসহায়তা ফুটে উঠেছে। এইখানে আমি মনে করি নাগরিকসমাজের দায়িত্ব রয়েছে। কেননা সমাজে সততা অসহায় এতিম থাকবে, বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
অন্যান্য ক্ষেত্রের কায়েমি স্বার্থের তুলনায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুর্নীতির ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। এর সাথে একদিকে ছাত্র-তরুণদের বৈষয়িক ও নৈতিক স্বার্থ জড়িত আর অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির প্রশ্ন যুক্ত। আমরা অনেক কাল ধরে বলে আসছি শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য যদি হয়ে ওঠে পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া তাহলে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতির চক্র সহজে ভাঙা যাবে না। কিন্তু পাকেচক্রে আমরা সেই চক্রের জালেই আটকেছি। আজকে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা - প্রাথমিক থেকে  - স্নাতকোত্তর পর্যন্ত - মূলত সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষাকেন্ত্রিক হয়ে পড়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে পরীক্ষার সম্পর্ক যে অঙ্গাঙ্গী, অন্যোন্যনির্ভর, তা সকলেই মানবেন। বিভিন্ন পর্বান্তে বা চূড়ান্ত পর্বের শেষে সনদ ও ডিগ্রি শিক্ষার ফসল বৈকি। কিন্তু তার মূল্য কি ব্যক্তিনিরপেক্ষ, অর্থাৎ মানুষটির চাইতেও বেশি?
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং অনুসৃত নীতির কারণে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই আজ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এ কারণে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সকলেরই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়েছে পরীক্ষার ফলাফল। ফলাফল-নিবেদিত ব্যবস্থায় পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্যে উল্লিখিত ত্রিপক্ষ সবসময় মরিয়া হয়ে থাকে। সবাই যেন রেসের ঘোড়া - প্রথম হওয়ার জন্যে টগবগ করে ছুটছে। জয়ের জন্যে সবার সম্মিলিত উদগ্র চাহিদার ফলে পরীক্ষাকে ঘিরে জুয়াড়িদের আবির্ভাব হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সফল হওয়ার সহজ ও কার্যকর পন্থার সন্ধান করতে করতে স্কুলকেও পাশ কাটিয়ে পরীক্ষায় সিদ্ধিলাভের দক্ষ মোক্ষম পদ্ধতি ও ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে এই আক্কেলমন্দরা - তার নৈতিক ভিত্তি না থাকুক। গড়ে উঠেছে নোটবই ব্যবসা কোচিং সেন্টার এবং মডেল টেস্ট পদ্ধতি। মানতেই হবে বাজার অর্থনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা। এখন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রদের ফরজ কাজ - নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠগ্রহণ নয় - কোচিং সেন্টারে উপস্থিত থাকা ও অবিরত মডেল টেস্ট দিয়ে পরীক্ষার্থী হিসেবে দক্ষ ও পোক্ত হয়ে ওঠা। নকল বন্ধের জন্যে নোটবই বন্ধ করার জেহাদে নেমেছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, কিন্তু ব্যবস্থার কারণে পরীক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও চাহিদা মেটাতে শিক্ষা-জুয়াড়িদের নোটবইসহ সব ব্যবসা বেশ জাঁকিয়েই চলছে। 
এভাবে আমরা একেবারে নিচের শ্রেণি থেকে ছাত্রদের শিক্ষার্থী সত্তার অকালমৃত্যু ঘটিয়ে তাদের পরীক্ষার্থী সত্তার বিকাশ ঘটাচ্ছি - সেটা শেষ পর্যন্ত উগ্র রূপই ধারণ করে এবং পরিণতিতে মানবিক মূল্যবোধ, সামান্য নীতিবোধেরও আকাল দেখা দেয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি একে অন্যের দেখাদেখি ভীত-বিভ্রান্ত অভিভাবকরা কোনো ঝুঁকিতে যেতে চান না। একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই সন্তানকে কোচিং সেন্টারের বা বাড়তি গৃহশিক্ষকের জিম্মায় দিয়ে হাঁপ ছাড়েন। পুরো স্কুল জীবনে পিএসসি-জেএসসি-এসএসসি শিশুর অবসর, বিনোদন, খেলাধূলা, বেড়ানো, সৃজনশীল কাজ, সাহিত্যপাঠ, এমনকি বাবা-মা-স্বজনদের সাথে নির্মল সময় কাটানো সবকিছুই শিকেয় ওঠে। এভাবে কেবল ছাত্রের মানুষ হওয়া কঠিন হচ্ছে তা নয়, সংশ্লিষ্টদের এবং এই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সৃষ্ট ভাগ্যান্বেষণের সুযোগ নিতে তৎপর ‘বুদ্ধিমানদের’ মন্যুষ্যত্ব বোধ ক্রমেই বিলুপ্ত হবে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা দুর্নীতি পিছু ছাড়বে না।
এভাবে বেড়ে উঠে অধিকাংশ শিশু প্রায়ই কৃতিত্বের সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ ডিগ্রিধারী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-আমলা হলেও সমাজচিত্র কি বলছে? ভালো মানুষের আকাল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না? এভাবে চললে সব প্রতিষ্ঠান, সব ব্যবস্থা ঘুণে ধরবে। চকমিলানো রাস্তা, ভবন বাড়বে, চকচকে-ঝকঝকে মানুষ হয়ত বাড়বে, তবে দখলদারি, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, নেশা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদি থামবে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাবে না? - বালাই ষাট্, এমন কথা মানতে নেই! বাঙালি এতটা অক্ষম জাতিতে পরিণত হয়নি। কেননা এ ফাঁস কার গলায় শক্তভাবে লাগছে? অবশ্যই ভবিষ্যত প্রজন্মের গলায় এবং পরিণামে দেশের।
আমাদের ধারণা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা সঠিক হলে এবং সে অনুযায়ী মানুষ, অবশ্যই কর্মদক্ষ মানুষ, তৈরিতে যথার্থ পদ্ধতির আশ্রয় নিলে দুর্নীতির ফাঁসে শিক্ষাকে ফাঁসি দিতে হয় না। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিস্কার। বিষয়টি বুঝে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের সবার জন্যে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টা সরকার বা শিক্ষামন্ত্রী যে বোঝেন না তা নয়। বোঝেন বলেই ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সনেই শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, তিন মাসের মধ্যে কমিটি খসড়া রিপোর্ট দেয় এবং আনন্দের বিষয় ছিল অতীতের ধারা ভেঙে এ প্রতিবেদনটি সর্বমহল গ্রহণ করেছে। এটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে কথা থাকলেও মোটের ওপর এটি ধরে এগিয়ে গেলে শিক্ষার ব্যাধি - মুখস্থ, নোটবই, পরীক্ষা ও ফল-কেন্দ্রিকতা কাটিয়ে ওঠা যেত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরীক্ষা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু থাকবে আরও অনেক কিছুর সাথে অনুশীলনের অংশ হিসেবে। ঘন ঘন পরীক্ষার ফলে জ্ঞানানুশীলনের ধারাবাহিকতায় বাধা বা ছেদ পড়তে থাকলে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকলে অভ্যস্ত হয়ে যায় প্রশ্নের উত্তর-আকারে জ্ঞানের বিষয়টিকে দেখতে। জ্ঞানের বা বিষয়ের অখ-তা ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তাদের ধারণা তৈরি হয় না। এরকম ব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে, বড় হয়েও, কোনো পূর্ণাঙ্গ বই পড়া, জটিল ব্যাখ্যা বা দূরূহ বিষয় ধৈর্য ধরে পড়া, শোনা বা বোঝার অভ্যাস তৈরি হয় না। এতে মানুষটার সর্বনাশ হয়ে যায়, কারণ এতে  শিক্ষার যে চূড়ান্ত লক্ষ্য একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা এবং তাই প্রকৃত স্বাধীন এবং তাই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তির যোগ্যতা দেয়া, তা সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। কেবল একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের বিবেচনা ও দায়িত্ব বোধ তৈরি হয় এবং তাই নিজের নিজের মর্যাদার পরোয়া করেন। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে তাঁর চরিত্র গঠিত হয়। তেমনি মানুষ প্রশ্ন ফাঁস করাকে হীন কাজ বলে বুঝতে পারেন, এবং বড় কথা হল, এর সাথে নিজেকে যুক্ত করতে তাঁর রুচি ও নৈতিকতায় বাধবে। ভালো মানুষ ও মানবিক সমাজ নির্মাণে উপযুক্ত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশ-র‌্যাব-ডিবি, সিসিক্যামেরা-টহলদারি-নজরদারি, জঙ্গিবাদ-নেশাগ্রস্ততা-অপরাধ, রাজনীতির দেউলিয়াপনা-সংস্কৃতির সংকট-সমাজের অবক্ষয় এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন ইত্যাদি কেবল বাড়তে থাকবে। তখন হয় মনে হবে প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস কোনো গুরুতর বিষয় নয় অথবা তা জেনেও এ উৎপাত মেনে নিতে হবে। 
এটা আদতে গুরুতর বিষয়। কেননা এতে সমাজে শিক্ষার সংকট লেগেই থাকবে, তেমনি থাকবে জাতির চরিত্র গঠনের সমস্যা। প্রশ্ন হল যে কথাটা আমরা জানি এবং মানি, যে কারণে ক্ষমতায় এসে সরকার শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল, তিনমাসে প্রতিবেদন প্রণয়ন এবং সে বছর থেকেই তা ধাপেধাপে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল তাকে কেন উপেক্ষা করা হচ্ছে? আমরা জানি না অর্থের অভাবে না অন্য কোনো কারণে সরকার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে হাত দিচ্ছে না। তবে এটা স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির তিন শতাংশের নিচে বরাদ্দ রেখে সংখ্যাগত উন্নতি সম্ভব হলেও গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়। তার জন্যে অন্তত আন্তর্জাতিক মান ৬% বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমান পরীক্ষার ফলের পিছনে ছুটে সংখ্যাগত সাফল্য আসবে, কিন্তু গুণগত মান অর্জন ঠেকে থাকবে। এ বাস্তবতায় যে একদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ঠেকানো যাবে না এবং অন্যদিকে সমস্যার জবাব দিয়ে গুণগত মান অর্জনের অভীষ্ট পথে চলা সম্ভব নয় তা বুঝে শিক্ষামন্ত্রীকে বারবার হয় অসহায়তা নয়ত হতাশা প্রকাশ করতে হবে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

Thursday, October 1, 2015

সিরিয়া সংকটের সমাধান ইউরোপের হাতে

আবুল মোমেন

২০১১ সালে সিরিয়ায় যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তখন সে দেশের জনসংখ্যা ছিল ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লক্ষ। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে এযাবৎ ৪০ লক্ষ মানুষ দেশান্তরিত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন। আরও ৮০ লক্ষ মানুষ দেশের ভিতরেই উদ্বাস্তু হয়েছেন। হিসেব কষলে দেখা যায় দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ গত ৪ বছরে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। আর দেশান্তরী হতে গিয়ে রক্ষণশীল হিসেবেও অন্তত তিন হাজার মানুষ ভূমধ্য ও ইজিয়ান সাগরে ডুবে মারা গেছেন, যাদের মধ্যে শিশু আয়লান কুর্দি ও তার বোন এবং তাদের মত অসংখ্য শিশুও রয়েছে।
আমরা দেখেছি সাদ্দাম হোসেন-উত্তর ইরাকে পুনর্গঠনের কাজ স্থানীয় বিবদমান গোষ্ঠীর ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির কারণে বারবার কেবল ব্যাহত হয়নি, এক অর্থে তা ব্যর্থ হতেই চলেছে। সেখানে শূন্যতা সৃষ্টি না হলে ইসলামিক স্টেট কীভাবে ইরাকে এত শক্তিশালী হয়, এতটা জায়গা দখলে নেয়, এত নৃশংসতা চালায়?
সিরিয়া আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের শেষ টার্গেট। সাদ্দাম, গাদ্দাফির মত বাশার আসাদকে এ পর্যায়ে তারা সর্বশেষ শিকার হিসেবে দেখতে চায়। বাশারকে রাশিয়া সমর্থন দিচ্ছে, ইরানও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তবে  গুরুত্বপূর্ণ হল রাশিয়ার ভূমিকা ও সমর্থন। রাশিয়া কি পরাশক্তি হিসেবে তার হৃতসম্মান পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে সিরিয়াকেই পরীক্ষার গিনিপিগ হিসেবে বেছে নিচ্ছে? গিনিপিগের ওপর পরীক্ষা চালালে নিজের তেমন ক্ষতি নেই। পুতিন বলেছেন সিরিয়াকে বাশার ও ইসলামি স্টেটের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। বিপরীতে পশ্চিমা মিত্রশক্তির বক্তব্য হল, সিরিয়ার জন্যে দুটিমাত্র বিকল্প নয়, তৃতীয় বিকল্পটিই একমাত্র পথ। বাশার এবং ইসলামি স্টেট উভয়কেই পরাভূত করে উদারপন্থী বাজার অর্থনীতির সমর্থক সরকার বসাতে হবে। এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশংকা এবং সিরিয়াবাসীর দুর্দশা অন্তহীন হয়ে উঠবে। ভয় হয় ভাবতে আরও কত লক্ষ মানুষের প্রাণ গেলে এবং দেশ গেলে তবে সিরিয়াবাসীর ‘বন্ধুরা’ শান্ত হবে।
বাঙালি কবির বাণী শিরোধার্য করেও কুহকিনী আশার ছলনে একটু হলেও সাড়া দেওয়া যায়। কারণ ইউরোপের শরণার্থী নেওয়ার এবং মানবতার দু:খজনক বিপর্যয় সহ্য করার ক্ষমতার শেষপ্রান্ত দেখা যাচ্ছে। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর সুবিন্যস্ত মলাট ভেতরকার সংকট ও তিক্ত চেহারা আর ঢাকতে পারবে না। কিন্তু ইউরোপ কি সভ্যতার বড়াই এমনি ছেড়ে দেবে? এখানেই সিরিয়াবাসীর জন্যে সামান্য সম্ভাবনার আলো দেখা যাচ্ছে।
আবার ইউরোপে কিছু মৌলিক সংকটও দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য ই ইউ থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা ছাড়ে নি, নতুন নির্বাচনও গ্রিসের সংকট থামাতে পারবে না এবং খোদ ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিমের দেশের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এগুলোকে এড়িয়ে ইউরোপ কীভাবে সব দিক রক্ষা করবে তাই সামনের কয়েকটি দিনে দেখতে হবে। সময় খুবই কম। তাদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সমস্যার জট খুলতে হবে এবং সম্ভবত চির-ধরা ঐক্যের বাঁধনটা সময়মত সারাতে হবে। এ ছাড়া ইউরোপের জন্যে অন্য বিকল্প  নেই বলেই মনে হয়।
জার্মেনি ইউরোপীয়  ঐক্যের নেতার ভূমিকা নিয়েছে, চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল তাঁর চেষ্টা থামান নি। ফ্রান্স প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সিরিয়া সংকট এবং তা থেকে উদ্ভূত অব্যাহত শারণার্থী প্রবাহ তাদের যেন ভাববারও সময় দিচ্ছে না। কৌশল নির্ধারণে এবং তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের জন্যে যে দূতিয়ালি, সংলাপ-আলাপ চালাতে হয় তার ফুরসৎ নেই। শরণার্থীর চাপে গ্রিস, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি জেরবার। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমের সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ছে। ইউরোপের স্বার্থে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দ্রুত থামা দরকার। যুদ্ধ থামানো কি সমাধান? রাশিয়ার জন্যে হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে না। এখনও অবস্থা এরকমই।
এ পর্যায়ে একমাত্র এই ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি থামাতে পারে ইউরোপ, তার নিজের প্রয়োজনের জরুরি তাগিদ থেকে। ইউরোপে অস্থিরতা চলতে থাকলে, অনৈক্যই সত্য হয়ে দাঁড়ালে গোটা বিশ্বের ভবিষ্যত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমরা জানি না  ইউরোপের দেশগুলো যুগপৎ ঐতিহাসিক ও মানবিক এই দায়িত্ব পালন করবে কিনা। 

Sunday, September 20, 2015

বারবার তারা কেন জয়ী হবে?

আবুল মোমেন

এই যে লিবিয়া ইরাক এবং সম্প্রতি সিরিয়া থেকে দলে দলে মানুষ দেশত্যাগী হয়ে পাড়ি দিচ্ছে তার মূলে গেলে কোন চেহারাগুলো ভেসে উঠবে তা যেন ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারছে না। ব্রিটেন ওদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অনুদার মনোভাব নিয়েছে। উত্তর-পশ্চিমের সুইডেন দুয়ার খুলতেই নারাজ। ফ্রান্সও দুয়ার এঁটে বসে থাকতে চাইছে। জার্মেনি-অষ্ট্রিয়ার সরকারি ঔদার্য অবাধ ছিল না, উদ্বাস্তুর সংখ্যা লাখ ছোঁয়ার আগেই তটস্থ হয়ে ওরা সীমানা বন্ধ করে দিয়েছে। মনের কথা খুলে বলেছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী - মুসলমান উদ্বাস্তু নিতে তাঁর আপত্তি আছে। তাঁর মনোভাব হচ্ছে তাঁরই মত পুরো ইউরোপেরও আপত্তি থাকা উচিত।
লিবিয়া ইরাক সিরিয়া থেকে হঠাৎ বাঁধভাঙা ঢলের মত দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়তে চাইছে কেন? আর কেউ না বুঝলেও ইউরোপেরই তো জানার কথা। 
তিনটি দেশে যে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার মূলে কারা? এসব অঞ্চলে যে আইএস আর আইএসআইএল নামে মুসলিম জঙ্গি সংগঠন সৃষ্টি হয়ে মানবতা ও মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে তা-ব চালাচ্ছে তাদের এই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে কারা? কারাইবা তৈরি করেছিল আল-কায়েদা, তালেবান? কারা পেছনে ছিল ওসামা বিন লাদেন কিংবা মোল্লা ওমর অথবা জওয়াহিরি-বকরদের উত্থানের পিছনে? একটু খবরাখবর যারা রাখেন তারা অবশ্যই জানেন কোন দেশগুলোর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি অস্ত্রব্যবসায়? মানুষ এও জানে ডব্লিউএমডি বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র মওজুদের অজুহাত তুলে কারা স্থিতিশীল দেশ ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামকে হত্যা করে ইরাকে বর্তমান গৃহযুদ্ধের নৈরাজ্য সৃষ্টির মূলে। মানুষ জানে গণতন্ত্রের নামে লিবিয়া-আফগানিস্তানে উপজাতীয় বিবাদ উশকে গৃহযুদ্ধের অবস্থা তৈরি করেছে কোন মিত্রশক্তি। আজ সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে হটানোর নামে কারা সে দেশের স্থিতিশীলতা ভেঙে দিয়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে? তা কি কারো অজানা? আজকের ইউরোপ অভিমুখী উদ্বাস্তু পরিবারগুলো তো এসব গৃহযুদ্ধেরই বলি।
অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রই এই মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির মূল কারিগর। ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মেনি মৈত্রী সূত্রে গণতন্ত্রের নামে এসব আগ্রাসনে অংশ নিয়েছে। সুইডেন খুচড়ো অস্ত্রের ব্যবসায়ে শীর্ষদের অন্যতম। কে না জানে গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এরকম অস্ত্রই। আইএসের কাছ থেকে কিংবা দস্যুতায় লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর কাছে থেকে তেল কিনছে যে সব বহুজাতিক কোম্পানি তাদের মালিকানা কাদের সেসবও সবারই জানা। আর ইতিহাসের পাতা ধরে পিছিয়ে গেলে জানা যাবে কীভাবে ব্রিটেন-ফ্রান্স-স্পেন-পর্তুগাল ছাড়াও হল্যাণ্ড-বেলজিয়ামের মত ছোট ছোট ইউরোপীয় দেশও একসময় এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের জন্যে হামলে পড়েছিল। আমরা জানি কী পাশব নৃশংসতায় তারা সব লুটে নিয়েছে উপনিবেশগুলোর। ছোট্ট প্রশ্ন - আজ পর্যন্ত সেসব বহুজাতিক কোম্পানির আড়ালে তেল ও অন্যান্য খনিজের ওপর প্রভুত্ব বজায় রাখছে কারা? মানুষ তো সব জানে। ইউরোপের বিত্ত, ঐশ্বর্য আর নাগরিকদের উচ্চমানের জীবনের পিছনে বিপুল পুঁজির যোগান এসেছে কীভাবে সে ইতিহাস আজ কারো অজানা নেই।
পালের গোদা আজ অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র এবং তারা যথেষ্ট ধূর্ততার সঙ্গে কাজ চালাচ্ছে। দেখুন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে কতকগুলোতে - সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাত প্রভৃতিতে - আছে তাদের বশংবদ সরকার। সেখানে নিজেদের স্বার্থে তেলের ব্যবসা চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। অতএব এসব দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার বহাল থাকলেও  গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো তাগিদ তাদের নেই, মানবাধিকার নিয়ে মাথাব্যথা নেই। উত্তর আফ্রিকা ও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও আধুনিক জীবনব্যবস্থায় অগ্রগামী ছিল লিবিয়া ও ইরাক। তদুপরি এ দুটি দেশের সরকার-প্রধান সাদ্দাম হোসেন ও মুয়ামার গাদ্দাফি ছিলেন স্বাধীনচেতা, এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তাই এসব দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম অস্থির হয়ে পড়েছিল। সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দেশ দুটি তছনছ করে দিয়েছে। ইরান আর সিরিয়াকে বাগে আনতে না পেরে বড়ই পেরেশানে  আছে পশ্চিম। অবশেষে সিরিয়ার ব্যাপারে ধৈর্য রক্ষা করা গেল না। আক্রমণে এগিয়ে এলো আইএস - স্বার্থ সিদ্ধি হচ্ছে পশ্চিমের।  আর এরই খেসারত হিসেবে এত মানুষের ঢল ইউরোপ অভিমুখে। যুক্তরাষ্ট্র জানে উত্তর আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তার দেশে ঢোকা সম্ভব নয়। যদি যায় তো ভূমধ্যসাগর অথবা তুরস্ক হয়ে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাবে মানুষ। ফলে তার গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না। 
সাম্প্রতিক উদ্বাস্তু ঢলকে এসব অঞ্চলে পশ্চিমের হস্তক্ষেপ ও ভুল নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কিন্তু এও আমরা জানি জাতিসঙ্ঘ বলুন আর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা শরণার্থী কমিশন বলুন সর্বত্রই ওদের স্বার্থ বিবেচনার মানুষ রয়েছেন। তদুপরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সমর্থকরাই পাল্লায় ভারি। তারা তো শক্তি ও বিত্তের জোরে বিশ্বব্যবস্থাটা নিজেদের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে।
পশ্চিমা উন্নত জীবন ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন  দেখিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বিশ্বশক্তির ভারসাম্যই শুধু নষ্ট করা হয় নি, তৃতীয় বিশ্বের স্বতন্ত্র অস্তিত্বও বিলীন হয়েছে এতে। গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির ধুয়া তুলে একমেরু বিশ্বের নেতারা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশকেই শক্ত স্বাধীন অবস্থানে থাকতে দিচ্ছে না। এভাবেই ভেঙে গেছে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে আফ্রো-এশীয় সংহতি পরিষদের, শক্তিহীন ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা, আরব লীগ, ওআইসির মত সংগঠনগুলো। বরং ডব্লিউটিও এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর ভূমিকা জোরদার করে পশ্চিমই এককভাবে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে এসেছে।
আমার তো মনে হয় মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষার জন্যে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশসমূহের উচিত হবে জাতিসঙ্ঘের পাশাপাশি নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতিসঙ্ঘ গড়ে তোলা। ইউএনওর পাশাপাশি ইউএনএএ বা ইউনাইটেড ন্যাশনস্ অব এশিয়া অ্যা- আফ্রিকা গঠিত হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে চীন যেভাবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে আরেকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে তেমন সব উদ্যোগ নিতে হবে। নিজেদের বিবাদ মিটিয়ে চীন এসব উদ্যোগে ভারত ও জাপানকে সম্পৃক্ত করতে চাইছে। তাতে অগ্রগতিও আছে, যুক্ত হবে রাশিয়া - যেদেশটি ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে আছে। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ হতে পারে।
এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার এইসব দেশের বিকল্প শক্তি দাঁড় করাবার সামর্থ্য রয়েছে। এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে, ক্ষমতার স্থিতি নষ্ট হতে থাকলে সন্দেহ করতে হবে যে তার পেছনে পশ্চিমের স্বার্থান্ধ সাম্রাজ্যবাদের হাত আছে কিনা। কারণ, অতীতের এবং সাম্প্রতিক কালের সব ঘটনার পেছনেই তাদের হাত ও কারসাজি তো জলজ্যান্ত সত্য বিশ্ববাসীর সামনে। দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি মানুষ মানবিক ও উদার হলেও রাষ্ট্রশক্তি শেষ পর্যন্ত স্বার্থান্ধ হয়ে পড়ে। ফলে আরও সাবধানতা দরকার। ওরা বারবার ধর্মের কার্ড খেলে চলেছে, উত্তরোত্তর কট্টর জঙ্গি পন্থীদের ভরসা করছে ও উশকে দিচ্ছে। মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বুলি আওড়ালেও এসব কি কোথাও তারা বাস্তবায়ন করেছে, করতে পেরেছে যেসব দেশে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে আর লাখ লাখ মানুষ মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য হয়েছে এর খেসারত হিসেবে? না, তারা পারে নি, কারণ গণতন্ত্র রফতানি-যোগ্য পণ্য নয়। একইভাবে মানবাধিকার বা আইনের শাসনও রফতানি করা যায় না। তা সংশ্লিষ্ট জনগণকেই অর্জন ও আদায় করতে হয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুতে সে প্রক্রিয়াকে তারা বরং ব্যাহত করেছে।
ধর্মের আফিমের মত ব্যবহার গরিব দেশে এখনও কার্যকর - এটা মস্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। উগ্র ও জঙ্গি ধর্মপন্থার আড়ালে সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন কায়দায় ঠিকই তার স্বার্থ হাশিল করে যাচ্ছে। এতে মানুষের সত্যিকারের ধর্মবোধ, মানবিক নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অযথা বিঘ্ন ঘটছে। সাম্রাজ্যবাদ অবশ্যই বরাবরই চতুর ধূর্ত খেলোয়াড়। কিন্তু বারবার তারাই জয়ী হবে?

Monday, September 14, 2015

মিলানেও উচ্চারিত হল সংস্কৃতির গুরুত্বের কথা

আবুল মোমেন

আরব বিশ্বে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের যোদ্ধাদের হাতে একের পর এক প্রাচীন সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধ্বংস হওয়ার পর রণাঙ্গনের বাইরেও প্রতিকার নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক যে সংস্থাটি মানবসভ্যতার এসব মূল্যবান প্রত্নসম্পদ রক্ষার কাজে নিয়োজিত সেই ইউনেস্কো সঙ্গতভাবেই এগিয়ে এসেছে। এরই রেশ ধরে ইতালির সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডেকেছিলেন মিলানে। মিলান এক্সপো ২০১৫-এর সম্মেলন কক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আমাদের সংস্কৃতি সচিবের সাথে আমারও যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
এতকাল সাংস্কৃতিক নিদর্শন রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা অথবা পাচারকারীদল। কিন্তু এরকম স্বেচ্ছাপ্রণোদিত পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ এক অভাবিত ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এরকম পরিস্থিতি অভিনব, এরকম প্রতিপক্ষও কল্পনাতীত ছিল সকলের। মিলানে আলোচনার একটি মোদ্দা শিরোনাম ছিল : জাতিসমূহের মধ্যে সংলাপের উপকরণ হিসেবে সংস্কৃতি। এতে উপস্থিত ৮৫টি দেশের মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের মধ্যে দু’দিনে (৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট) ৫৭ জন কথা বলেছেন। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ সময় ছিল ৪ মিনিট করে। ইতালির সংস্কৃতি ও পর্যটন বিষয়ক মন্ত্রী ও লেখক দারিও ফ্রান্সেসচিনি এতসব কেউকেটা ব্যক্তিদের সামলেছেন ভালোভাবেই। মিনিটখানেকের বেশি বাড়তি সময় কেউ নিতে পারেন নি। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রীকে বরাদ্দ সময়ের মধ্যেই কথা শেষ করতে হয়েছে। মাইক্রোফোনে কলম বেশ জোরেই ঠুকে সময়-সচেতন করেছেন সকলকে। বক্তৃতায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ সংস্কৃতির মানবিক ঐতিহ্যের দিক তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি সংস্কৃতি আদানপ্রদানের গুরুত্বও স্বীকার করেছেন। বাঙালি সংস্কৃতির মানবিক ঐতিহ্যের ধারা এবং বর্তমান সরকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কঠোর ভূমিকার কথা আমাদের দিক থেকে সংস্কৃতি সচিব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন।
মানবিক সংস্কৃতির ধারা ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা যে যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয় তা সকলেই বুঝতে পারছেন। এটি কেবল স্থানীয় কিছু মানুষের সচেতনতাতেও সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্যে সকলের চিন্তার নৈকট্য দরকার এবং তাই সব দেশ মিলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা জরুরি। এভাবে একটি সম্মিলিত বৈশ্বিক প্রয়াস দ্রুত প্রণীত ও বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। সেই তাগিদ থেকেই মিলানের এ সম্মেলন।
বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের এ উপলব্ধি উপস্থিত নগণ্য আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। এর একটি বিশেষ কারণ আছে। ১৯৭৫-এর পট-পরিবর্তনের পর দেশে যখন আমাদের জন্যে দমবন্ধ-করা পরিবেশ তখন তেমন কিছু না ভেবে শিশুদের আনন্দে-সৃজনে মাতিয়ে রাখার যে কাজ শুরু করেছিলাম তা পাঁচ বছরের মধ্যে শিশুশিক্ষার কাজে টেনে নিয়েছিল আমাদের। কাজটার প্রাথমিক তাড়না এসেছে প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রয়োজনে। তার সাথে ছিল শিশুদের মানসগঠনে বুনিয়াদ তৈরিতে ভূমিকা রাখার তাগিদ। বুঝতে পারছিলাম শিক্ষা হল মূল জায়গা, সেখানে কাজ না হলে তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলা যাবে না।
কাজ শুরু করে বুঝতে পারলাম প্রথাগত শিক্ষার ধারা আমাদের কাজে আসবে না। নিজেদের পথ নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। মাটি তৈরি না করেই শিশু-চারার কাছে ফল চাওয়ার যে প্রচলিত ধারা তা আমাদের অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা বলে মনে হয়। আমরা দুটো বক্তব্যের ওপর জোর দিয়েছিলাম - ভয়হীন আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা এবং পরোৎকর্ষ (perfection) নয় অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি। অভিভাবকদের ডেকে বললাম আমাদের ওপর আস্থা রাখতে, ব্যক্তিগতভাবে আমি ও অধ্যক্ষা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জিম্মাদার হতে চাইলাম। আমাদের কথা ছিল - এ বয়সে অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ওরা কেবল গ্রহণ, সংগ্রহ ও সঞ্চয় করবে - এর পরিমাপের দায়িত্ব থাকবে কেবল স্কুলের। স্কুলই দেখবে তাদের ভাণ্ডারে কতটা ছড়া, কবিতা, গল্প, নানা তথ্য, বিভিন্ন ধারণা, জ্ঞানের কথাবার্তা জমা পড়ছে এবং যা জমছে তার মান কেমন। এ পর্যায়ে তাদের গোগ্রাসে নিতে দিন - সব ইন্দ্রিয় পূর্ণ সত্তায় নিতে থাকুক। আমরা বলেছিলাম, একটু চ্যালেঞ্জ দিয়েই, ওদের ভিত্তির পরিসরটা আমরা অনেক বড় ও গভীর করে দেব, তাতে বড় হয়ে কোনো পর্যায়েই আর তাদের ঠেকতে হবে না। তারা নিজের শক্তিতেই এগিয়ে যাবে। প্রথম বছরে আমাদের ওপর আস্থা রাখলেন ১৫ জন অভিভাবক। তারা নানা রকম পরিবার থেকে এসেছেন - উচ্চশিক্ষিত চাকুরে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, মাঝারি দোকানদার, তবে বেশির ভাগ ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরে পরিবারের ছেলেমেয়ে। বলাই বাহুল্য, অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত ছিলেন না, এরকম নিরীক্ষাপ্রবণতার ঝুঁকিটা তাঁদের সবসময় ভাবিত রাখত। অধ্যক্ষা হিসেবে শীলা মাঠে থেকে অভিভাবকদের প্রাত্যহিক চাপ সামলে গেছে। সবার কথা ছোট্ট পরিসরে বলা যাবে না, প্রথম যে ছাত্রটি ভর্তি হয়েছিল, টিঅ্যাণ্ডটির সীমিত আয়ের চাকুরে পিতার সন্তান, সে এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান। এভাবেই আমরা চলেছি, এবং চেয়েছি চালিয়ে যেতে। 
আমরা চেয়েছি ওদের মনের সবকটা জানালা সবসময় খোলা রাখতে। পরীক্ষা এক ধরনের কপাট, আবদ্ধতা তৈরি করে। একে বড় করে তুলে বাধার প্রাচীর বানিয়ে কোনো চাপ তৈরি করতে চাই নি। প্রত্যেক ছাত্র গাইতে পারত, আবৃত্তি পারত, গল্পবলা, বিতর্ক - সবই পারত (এখনও স্কুলে ছাত্রসংখ্যা অনেক বাড়ার পরও বেশিরভাগই পারে)। পঁচিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রাক্তনীদের স্বতস্ফূর্ত ও সপ্রতিভ সব পরিবেশনা দেখে উপস্থিত বহুজাতিক কোম্পানির এক প্রধান কর্তাকে এদের এই সপ্রতিভতা ও পারঙ্গমতা চমকে দিয়েছিল।
এসবই শিশুদেরই কৃতিত্ব। আমরা কেবল তাদের সুপ্ত ক্ষমতাগুলো জাগিয়ে তুলতে ও রাখতে চেয়েছি, চেষ্টা করেছি অনাহুত অন্যায্য চাপের কারণে এসব যেন নষ্ট না হয়।
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই আমরা বাইরেও একটু বলতে থাকলাম - শিশুশিক্ষা মূলত একটি সাংস্কৃতিক কাজ। গানবাজনা বা কলা (art) অর্থে নয়, সৃজনশীলতা, সুরুচি, সৌন্দর্য এবং মাত্রাজ্ঞানের মত গুণের চর্চা ও তা আয়ত্ত্ব করাই সংস্কৃতি চর্চা। নীতিবোধ ও মানবিকতার বিষয়ে সংবেদনশীলতাও এতে তৈরি হয়ে যায়। এই শেখার নৈপুণ্য মেলে কেবল যথার্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে। তাই শিক্ষার সুফল পাওয়ার শর্ত হল উপযুক্ত মানবিক সাংস্কৃতিক বাতাবরণ নির্মাণ। ফুলকিতে আমরা এই চেষ্টাই করেছি। প্রাথমিকে এভাবে তৈরি হলে তারা পরবর্তী উচ্চতর ধাপগুলো যোগ্যতার সাথে পেরুতে পারে।
যত দিন গেছে, দেশের অর্থনৈতিক বা মানুষের বৈষয়িক উন্নতি হলেও, সামাজিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সামরিক ও ছদ্ম সামরিক শাসন তো বটেই এমনকি গণতান্ত্রিক আমলেও এ সংকট কেবল ঘনিয়েছে। এর প্রতিষেধক যে যথার্থ শিক্ষা তা কেউই তেমন ভাবেন নি। এক সময় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ, মাদক ও অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে অনেককেই ভাবিত করেছে। প্রচলিত শিক্ষার সীমাবদ্ধতা নজরে পড়ল এবং মানসম্পন্ন আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একটি বড় কাজ বলে মনে করলেন অনেকেই। এ ধারায় দেশের অগ্রণী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করল নালন্দা ২০০১ সনে। এ স্কুল এখন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেরই মনোযোগ পাচ্ছে। এটা আশার কথা। কিন্তু এ দেশে যে স্কুলগামী ছাত্রের সংখ্যা চার কোটির অধিক। তাদের পরীক্ষামুখী মুখস্থ বিদ্যার দু:স্বপ্নের (আইনস্টাইনের ভাষায়) মধ্যে ফেলে রেখে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদ্যোগ কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবে সমাজে!
তবে আশার কথা সরকারের ভিতরেই অনেকেই বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সচেতন, সংস্কৃতিমন্ত্রী বিষয়টা বোঝেন ও কিছু করতে আগ্রহী, এবং শিক্ষামন্ত্রীসহ মন্ত্রি-পরিষদের আরও অনেকেই হয়ত এ নিয়ে ভাবেন। সচিবালয়েও কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে। আমরা বুঝি অভ্যস্ত ধারা থেকে নতুন একটি ধারায় আসার ঝুঁকি নিয়েও তাঁদের ভাবনা-দুর্ভাবনা রয়েছে। এটা আদতে আলাপ-আলোচনা ও মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক কাজ করে ক্রমে সর্বত্র বাস্তবায়নের বিষয়। তবে কোনো অবস্থাতেই সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। মাত্রাতিরিক্ত পরীক্ষার অব্যাহত মুখস্থের প্রবণতাই কেবল বাড়ছে না চাপের মধ্যে থাকা ছাত্রদের মাদক ও ধর্মান্ধতাসহ অন্যান্য ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। নিজেদের জানাবোঝার ঘাটতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই হচ্ছে না এবং পুঞ্জিভূত ঘাটতির বিপুল ফাঁক নিয়ে তারা সর্বোচ্চ শিক্ষার দুয়ারে এসে রীতিমত হোঁচট খাচ্ছে। সেখানে তৈরি হয়েছে জ্ঞানের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ এক বাস্তবতা।
মিলানের সম্মেলন থেকে কেন ফুলকির কথায় এসেছি সেটা আশা করি পরিষ্কার হয়েছে। পচাত্তরের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী অবক্ষয়ের মুখে ত্রিশ বছর আগে যে কথাটি ফুলকি বলেছিল, আজ দ্যাখা যাচ্ছে তা অন্য এক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বিশ্বনেতৃবৃন্দের চিন্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আসলে একজন মানুষ যতটা সামাজিক জীব ততটাই সাংস্কৃতিক প্রাণী। শিক্ষা, ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খাদ্য, সজ্জা, ভাষা, শিল্প - মানুষের চর্চিত ও আচরিত এবং সৃষ্ট ও কৃত সকল কর্ম মিলে তৈরি হয় তার সংস্কৃতি। এর গোড়াপত্তন শৈশবে না হলে সর্বনাশ, কারণ এসময়ই মনোজগতের ভিৎ তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টা ফ্যাল্না নয়, জাতির ভবিষ্যত এবং দেশের অগ্রগতির সাথেই এটি যুক্ত।

***

Monday, September 7, 2015

ধিক্কারের অধিক


আবুল মোমেন

এটা ছবি?
এটা কি শিশুর ছবি?
না, এটা তো ধিক্কার,
ধিক্কারের অধিক,
তিরস্কার -
আমাকে তোমাকে
পৃথিবীসুদ্ধ মানুষকে।

ভূমধ্যসাগর কেন হবে
আয়লানের প্রতিপক্ষ বলো,
যুদ্ধবাজ জঙ্গি মুসলিম আর
আপন পাপের প্রায়শ্চিত্তে বিমুখ
উদাসীন গৃধ্নু প্রতীচী
যুগপৎ ইতিহাস থেকে বর্তমানে
যোগসূত্র বেঁধেছে যখন!

এটা ছবি?
এটা কোনো ছবি হলো?
যা কিছু দেখছি প্রতিদিন
এর একটিও ছবি নয়,
ভুলেও ভেবো না এরা শুধু ছবি,
সব কটি ধিক্কার এরা,
ধিক্কারের অধিক
তিরস্কার।

 লোকেই দিয়েছে নাম ছবিটিকে
- ভেসে যাওয়া মানবতা।
সেই সাথে বলো
সভ্যতার অবনত পতাকার প্রতিচ্ছবি।
তোমরা ভুলো নি নিশ্চয়
ইতিহাস -
এসবই তো মানচিত্র ভাগের
সেই পুরোনো খেলার
শেষ-দৃশ্যের ছবি।
লোভ আর নিষ্ঠুরতার
অবিনত আগ্রাসনে ক্লান্ত শ্রান্ত
মাথাহেঁট - ন্যায় ও জয়ের
অস্তরবি।
এসবই মনুষ্যত্ব বলিদানের
বিয়োগান্ত মর্মান্তিক
অন্তিম সময়ের
ধাবমান দৃশ্যাবলী।
যবনিকা - টলতে টলতে ধীরে
এগিয়ে আসছে
সভ্যতার ভগ্নস্তূপ জুড়ে।

হায় পয়গম্বর, হায় যীশু
হায় হায় সক্রেটিস
কী হাল দেখি তোমাদের
অনুসারীদের?
এক দল খুনে লিপ্ত, মুখর ধ্বংসে,
অন্যরা গা বাঁচাতে উদ্গ্রীব!

মানবতা নয়, আপন
মনুষ্য পরিচয়ও নয়,
সবকিছু জমে জমে তলিয়ে যাচ্ছে
ভূমধ্যসাগরের অতল সুনীলে।
শিশু নয়, ওরা নয় নারী,
নয় যেন একটিও মানুষ ওখানে -
ভয়-পাওয়া তাড়া-খাওয়া যারা
ছুটছে ওখানে, শূন্য চোখে
ওদের বারতা একটিই -
সভ্যতার ঘণ্টা বেজেছে,
ছুটি হয়ে গেছে।
যে ওখানে শুয়ে আছে
সে কিন্তু আয়লান কুর্দি নয় -
ছিন্ন পাপড়ি ওটি
উড়ে এসে ভেসে এসে
পড়েছে ওখানে।
প্রাণ দিয়ে বহন করেছে
সাধ্য ছিল যতটুকু
ওর ছোট্ট দেহের
পাপার্ত এ পৃথিবীর
অবশিষ্ট পুণ্যটুকু।

ওরা তো শিশু নয়.
জলের জিম্মায় প্রাণ রেখে
জননী মৃত্তিকায়
ফুটে আছে
শুভ্র পারিজাত ফুল,
জবাব দিচ্ছে তোমাদের
খুনে-স্বভাবের আর
টেনে খুলে দিচ্ছে
মুখোশ সবার -
তোমার আমার। আর
হাটে হাড়ি ভেঙে জানিয়ে দিয়েছে
সভ্যতার নামে যত জারিজুরি।

দেবশিশু লজ্জায় মুখ নিচু
করে আছে।
এত শূন্য ফাঁপা মানুষের কাছে
তার নেই কোনো প্রত্যাশা।
বাবাকে বাঁচার শেষ আকুতিতে
ধ্বনিত হয়েছে শিশুকণ্ঠে
ধিক্কারের রুদ্র ভাষা।
তারপর খুলেছে অর্গল।
অবশেষে সভ্যতার শ্লেষ্মা ঝেড়ে
আড়মোড়া ভেঙেছে ইউরোপ,
যদিও ওপাড়ে দলপতি
এখনো নিশ্চুপ।
কথা হল, কতটা জাগবে
সবার বিবেক? বলি,
কতদূর, কতদিন স্থায়ী হবে
জাগরণ?

তোমাদের বুদ্ধি বটে
ওকে ভাবো কুর্দি আয়লান শুধু
বেহদ্দ বেকুব যত -
এখন ও শুধুই ধিক্কার,
বিবেকের ছিন্ন পাপড়ি।
মুখ নিচু করে উপুড় শরীরে
প্রত্যাখ্যান করেছে ব্যর্থ
আমাদের। আর ওর
নিথর ভাষায় সোচ্চার
শুয়ে আছে যে শরীর
সেটি কোবানি শিশুর নয়,
দগদগে মোটা অক্ষরে
লিখেছে সে
প্রত্যাখ্যান।
ওটি শিশু নয়,
শুধ্ইু তজর্নি
দ- ঘোষণার আগে
উঁচানো আঙুল।
শিশুর বারতা সামান্যই -
ধিক্কার তোমাদের,
ধিক্কারের অধিক
তিরস্কার।
৫-৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
চট্টগ্রাম