Thursday, October 1, 2015

সিরিয়া সংকটের সমাধান ইউরোপের হাতে

আবুল মোমেন

২০১১ সালে সিরিয়ায় যখন গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তখন সে দেশের জনসংখ্যা ছিল ২২ মিলিয়ন বা দুই কোটি ২০ লক্ষ। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে এযাবৎ ৪০ লক্ষ মানুষ দেশান্তরিত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন। আরও ৮০ লক্ষ মানুষ দেশের ভিতরেই উদ্বাস্তু হয়েছেন। হিসেব কষলে দেখা যায় দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ গত ৪ বছরে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। আর দেশান্তরী হতে গিয়ে রক্ষণশীল হিসেবেও অন্তত তিন হাজার মানুষ ভূমধ্য ও ইজিয়ান সাগরে ডুবে মারা গেছেন, যাদের মধ্যে শিশু আয়লান কুর্দি ও তার বোন এবং তাদের মত অসংখ্য শিশুও রয়েছে।
আমরা দেখেছি সাদ্দাম হোসেন-উত্তর ইরাকে পুনর্গঠনের কাজ স্থানীয় বিবদমান গোষ্ঠীর ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির কারণে বারবার কেবল ব্যাহত হয়নি, এক অর্থে তা ব্যর্থ হতেই চলেছে। সেখানে শূন্যতা সৃষ্টি না হলে ইসলামিক স্টেট কীভাবে ইরাকে এত শক্তিশালী হয়, এতটা জায়গা দখলে নেয়, এত নৃশংসতা চালায়?
সিরিয়া আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের শেষ টার্গেট। সাদ্দাম, গাদ্দাফির মত বাশার আসাদকে এ পর্যায়ে তারা সর্বশেষ শিকার হিসেবে দেখতে চায়। বাশারকে রাশিয়া সমর্থন দিচ্ছে, ইরানও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তবে  গুরুত্বপূর্ণ হল রাশিয়ার ভূমিকা ও সমর্থন। রাশিয়া কি পরাশক্তি হিসেবে তার হৃতসম্মান পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে সিরিয়াকেই পরীক্ষার গিনিপিগ হিসেবে বেছে নিচ্ছে? গিনিপিগের ওপর পরীক্ষা চালালে নিজের তেমন ক্ষতি নেই। পুতিন বলেছেন সিরিয়াকে বাশার ও ইসলামি স্টেটের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। বিপরীতে পশ্চিমা মিত্রশক্তির বক্তব্য হল, সিরিয়ার জন্যে দুটিমাত্র বিকল্প নয়, তৃতীয় বিকল্পটিই একমাত্র পথ। বাশার এবং ইসলামি স্টেট উভয়কেই পরাভূত করে উদারপন্থী বাজার অর্থনীতির সমর্থক সরকার বসাতে হবে। এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশংকা এবং সিরিয়াবাসীর দুর্দশা অন্তহীন হয়ে উঠবে। ভয় হয় ভাবতে আরও কত লক্ষ মানুষের প্রাণ গেলে এবং দেশ গেলে তবে সিরিয়াবাসীর ‘বন্ধুরা’ শান্ত হবে।
বাঙালি কবির বাণী শিরোধার্য করেও কুহকিনী আশার ছলনে একটু হলেও সাড়া দেওয়া যায়। কারণ ইউরোপের শরণার্থী নেওয়ার এবং মানবতার দু:খজনক বিপর্যয় সহ্য করার ক্ষমতার শেষপ্রান্ত দেখা যাচ্ছে। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর সুবিন্যস্ত মলাট ভেতরকার সংকট ও তিক্ত চেহারা আর ঢাকতে পারবে না। কিন্তু ইউরোপ কি সভ্যতার বড়াই এমনি ছেড়ে দেবে? এখানেই সিরিয়াবাসীর জন্যে সামান্য সম্ভাবনার আলো দেখা যাচ্ছে।
আবার ইউরোপে কিছু মৌলিক সংকটও দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য ই ইউ থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা ছাড়ে নি, নতুন নির্বাচনও গ্রিসের সংকট থামাতে পারবে না এবং খোদ ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিমের দেশের মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এগুলোকে এড়িয়ে ইউরোপ কীভাবে সব দিক রক্ষা করবে তাই সামনের কয়েকটি দিনে দেখতে হবে। সময় খুবই কম। তাদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সমস্যার জট খুলতে হবে এবং সম্ভবত চির-ধরা ঐক্যের বাঁধনটা সময়মত সারাতে হবে। এ ছাড়া ইউরোপের জন্যে অন্য বিকল্প  নেই বলেই মনে হয়।
জার্মেনি ইউরোপীয়  ঐক্যের নেতার ভূমিকা নিয়েছে, চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল তাঁর চেষ্টা থামান নি। ফ্রান্স প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু সিরিয়া সংকট এবং তা থেকে উদ্ভূত অব্যাহত শারণার্থী প্রবাহ তাদের যেন ভাববারও সময় দিচ্ছে না। কৌশল নির্ধারণে এবং তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের জন্যে যে দূতিয়ালি, সংলাপ-আলাপ চালাতে হয় তার ফুরসৎ নেই। শরণার্থীর চাপে গ্রিস, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি জেরবার। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমের সাথে সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ছে। ইউরোপের স্বার্থে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দ্রুত থামা দরকার। যুদ্ধ থামানো কি সমাধান? রাশিয়ার জন্যে হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে না। এখনও অবস্থা এরকমই।
এ পর্যায়ে একমাত্র এই ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি থামাতে পারে ইউরোপ, তার নিজের প্রয়োজনের জরুরি তাগিদ থেকে। ইউরোপে অস্থিরতা চলতে থাকলে, অনৈক্যই সত্য হয়ে দাঁড়ালে গোটা বিশ্বের ভবিষ্যত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমরা জানি না  ইউরোপের দেশগুলো যুগপৎ ঐতিহাসিক ও মানবিক এই দায়িত্ব পালন করবে কিনা। 

Sunday, September 20, 2015

বারবার তারা কেন জয়ী হবে?

আবুল মোমেন

এই যে লিবিয়া ইরাক এবং সম্প্রতি সিরিয়া থেকে দলে দলে মানুষ দেশত্যাগী হয়ে পাড়ি দিচ্ছে তার মূলে গেলে কোন চেহারাগুলো ভেসে উঠবে তা যেন ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারছে না। ব্রিটেন ওদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অনুদার মনোভাব নিয়েছে। উত্তর-পশ্চিমের সুইডেন দুয়ার খুলতেই নারাজ। ফ্রান্সও দুয়ার এঁটে বসে থাকতে চাইছে। জার্মেনি-অষ্ট্রিয়ার সরকারি ঔদার্য অবাধ ছিল না, উদ্বাস্তুর সংখ্যা লাখ ছোঁয়ার আগেই তটস্থ হয়ে ওরা সীমানা বন্ধ করে দিয়েছে। মনের কথা খুলে বলেছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী - মুসলমান উদ্বাস্তু নিতে তাঁর আপত্তি আছে। তাঁর মনোভাব হচ্ছে তাঁরই মত পুরো ইউরোপেরও আপত্তি থাকা উচিত।
লিবিয়া ইরাক সিরিয়া থেকে হঠাৎ বাঁধভাঙা ঢলের মত দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে মানুষ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়তে চাইছে কেন? আর কেউ না বুঝলেও ইউরোপেরই তো জানার কথা। 
তিনটি দেশে যে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার মূলে কারা? এসব অঞ্চলে যে আইএস আর আইএসআইএল নামে মুসলিম জঙ্গি সংগঠন সৃষ্টি হয়ে মানবতা ও মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে তা-ব চালাচ্ছে তাদের এই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে কারা? কারাইবা তৈরি করেছিল আল-কায়েদা, তালেবান? কারা পেছনে ছিল ওসামা বিন লাদেন কিংবা মোল্লা ওমর অথবা জওয়াহিরি-বকরদের উত্থানের পিছনে? একটু খবরাখবর যারা রাখেন তারা অবশ্যই জানেন কোন দেশগুলোর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি অস্ত্রব্যবসায়? মানুষ এও জানে ডব্লিউএমডি বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র মওজুদের অজুহাত তুলে কারা স্থিতিশীল দেশ ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামকে হত্যা করে ইরাকে বর্তমান গৃহযুদ্ধের নৈরাজ্য সৃষ্টির মূলে। মানুষ জানে গণতন্ত্রের নামে লিবিয়া-আফগানিস্তানে উপজাতীয় বিবাদ উশকে গৃহযুদ্ধের অবস্থা তৈরি করেছে কোন মিত্রশক্তি। আজ সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে হটানোর নামে কারা সে দেশের স্থিতিশীলতা ভেঙে দিয়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে? তা কি কারো অজানা? আজকের ইউরোপ অভিমুখী উদ্বাস্তু পরিবারগুলো তো এসব গৃহযুদ্ধেরই বলি।
অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রই এই মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টির মূল কারিগর। ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মেনি মৈত্রী সূত্রে গণতন্ত্রের নামে এসব আগ্রাসনে অংশ নিয়েছে। সুইডেন খুচড়ো অস্ত্রের ব্যবসায়ে শীর্ষদের অন্যতম। কে না জানে গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এরকম অস্ত্রই। আইএসের কাছ থেকে কিংবা দস্যুতায় লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর কাছে থেকে তেল কিনছে যে সব বহুজাতিক কোম্পানি তাদের মালিকানা কাদের সেসবও সবারই জানা। আর ইতিহাসের পাতা ধরে পিছিয়ে গেলে জানা যাবে কীভাবে ব্রিটেন-ফ্রান্স-স্পেন-পর্তুগাল ছাড়াও হল্যাণ্ড-বেলজিয়ামের মত ছোট ছোট ইউরোপীয় দেশও একসময় এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের জন্যে হামলে পড়েছিল। আমরা জানি কী পাশব নৃশংসতায় তারা সব লুটে নিয়েছে উপনিবেশগুলোর। ছোট্ট প্রশ্ন - আজ পর্যন্ত সেসব বহুজাতিক কোম্পানির আড়ালে তেল ও অন্যান্য খনিজের ওপর প্রভুত্ব বজায় রাখছে কারা? মানুষ তো সব জানে। ইউরোপের বিত্ত, ঐশ্বর্য আর নাগরিকদের উচ্চমানের জীবনের পিছনে বিপুল পুঁজির যোগান এসেছে কীভাবে সে ইতিহাস আজ কারো অজানা নেই।
পালের গোদা আজ অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র এবং তারা যথেষ্ট ধূর্ততার সঙ্গে কাজ চালাচ্ছে। দেখুন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে কতকগুলোতে - সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাত প্রভৃতিতে - আছে তাদের বশংবদ সরকার। সেখানে নিজেদের স্বার্থে তেলের ব্যবসা চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। অতএব এসব দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার বহাল থাকলেও  গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো তাগিদ তাদের নেই, মানবাধিকার নিয়ে মাথাব্যথা নেই। উত্তর আফ্রিকা ও মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও আধুনিক জীবনব্যবস্থায় অগ্রগামী ছিল লিবিয়া ও ইরাক। তদুপরি এ দুটি দেশের সরকার-প্রধান সাদ্দাম হোসেন ও মুয়ামার গাদ্দাফি ছিলেন স্বাধীনচেতা, এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তাই এসব দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম অস্থির হয়ে পড়েছিল। সরাসরি হস্তক্ষেপ করে দেশ দুটি তছনছ করে দিয়েছে। ইরান আর সিরিয়াকে বাগে আনতে না পেরে বড়ই পেরেশানে  আছে পশ্চিম। অবশেষে সিরিয়ার ব্যাপারে ধৈর্য রক্ষা করা গেল না। আক্রমণে এগিয়ে এলো আইএস - স্বার্থ সিদ্ধি হচ্ছে পশ্চিমের।  আর এরই খেসারত হিসেবে এত মানুষের ঢল ইউরোপ অভিমুখে। যুক্তরাষ্ট্র জানে উত্তর আফ্রিকা বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তার দেশে ঢোকা সম্ভব নয়। যদি যায় তো ভূমধ্যসাগর অথবা তুরস্ক হয়ে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাবে মানুষ। ফলে তার গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না। 
সাম্প্রতিক উদ্বাস্তু ঢলকে এসব অঞ্চলে পশ্চিমের হস্তক্ষেপ ও ভুল নীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কিন্তু এও আমরা জানি জাতিসঙ্ঘ বলুন আর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা শরণার্থী কমিশন বলুন সর্বত্রই ওদের স্বার্থ বিবেচনার মানুষ রয়েছেন। তদুপরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের সমর্থকরাই পাল্লায় ভারি। তারা তো শক্তি ও বিত্তের জোরে বিশ্বব্যবস্থাটা নিজেদের মত করে সাজিয়ে নিয়েছে।
পশ্চিমা উন্নত জীবন ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন  দেখিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বিশ্বশক্তির ভারসাম্যই শুধু নষ্ট করা হয় নি, তৃতীয় বিশ্বের স্বতন্ত্র অস্তিত্বও বিলীন হয়েছে এতে। গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির ধুয়া তুলে একমেরু বিশ্বের নেতারা তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশকেই শক্ত স্বাধীন অবস্থানে থাকতে দিচ্ছে না। এভাবেই ভেঙে গেছে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে আফ্রো-এশীয় সংহতি পরিষদের, শক্তিহীন ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা, আরব লীগ, ওআইসির মত সংগঠনগুলো। বরং ডব্লিউটিও এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর ভূমিকা জোরদার করে পশ্চিমই এককভাবে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে এসেছে।
আমার তো মনে হয় মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষার জন্যে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশসমূহের উচিত হবে জাতিসঙ্ঘের পাশাপাশি নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতিসঙ্ঘ গড়ে তোলা। ইউএনওর পাশাপাশি ইউএনএএ বা ইউনাইটেড ন্যাশনস্ অব এশিয়া অ্যা- আফ্রিকা গঠিত হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে চীন যেভাবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে আরেকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে তেমন সব উদ্যোগ নিতে হবে। নিজেদের বিবাদ মিটিয়ে চীন এসব উদ্যোগে ভারত ও জাপানকে সম্পৃক্ত করতে চাইছে। তাতে অগ্রগতিও আছে, যুক্ত হবে রাশিয়া - যেদেশটি ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে আছে। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ হতে পারে।
এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার এইসব দেশের বিকল্প শক্তি দাঁড় করাবার সামর্থ্য রয়েছে। এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে, ক্ষমতার স্থিতি নষ্ট হতে থাকলে সন্দেহ করতে হবে যে তার পেছনে পশ্চিমের স্বার্থান্ধ সাম্রাজ্যবাদের হাত আছে কিনা। কারণ, অতীতের এবং সাম্প্রতিক কালের সব ঘটনার পেছনেই তাদের হাত ও কারসাজি তো জলজ্যান্ত সত্য বিশ্ববাসীর সামনে। দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি মানুষ মানবিক ও উদার হলেও রাষ্ট্রশক্তি শেষ পর্যন্ত স্বার্থান্ধ হয়ে পড়ে। ফলে আরও সাবধানতা দরকার। ওরা বারবার ধর্মের কার্ড খেলে চলেছে, উত্তরোত্তর কট্টর জঙ্গি পন্থীদের ভরসা করছে ও উশকে দিচ্ছে। মুখে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বুলি আওড়ালেও এসব কি কোথাও তারা বাস্তবায়ন করেছে, করতে পেরেছে যেসব দেশে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে আর লাখ লাখ মানুষ মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য হয়েছে এর খেসারত হিসেবে? না, তারা পারে নি, কারণ গণতন্ত্র রফতানি-যোগ্য পণ্য নয়। একইভাবে মানবাধিকার বা আইনের শাসনও রফতানি করা যায় না। তা সংশ্লিষ্ট জনগণকেই অর্জন ও আদায় করতে হয়। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুতে সে প্রক্রিয়াকে তারা বরং ব্যাহত করেছে।
ধর্মের আফিমের মত ব্যবহার গরিব দেশে এখনও কার্যকর - এটা মস্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। উগ্র ও জঙ্গি ধর্মপন্থার আড়ালে সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন কায়দায় ঠিকই তার স্বার্থ হাশিল করে যাচ্ছে। এতে মানুষের সত্যিকারের ধর্মবোধ, মানবিক নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অযথা বিঘ্ন ঘটছে। সাম্রাজ্যবাদ অবশ্যই বরাবরই চতুর ধূর্ত খেলোয়াড়। কিন্তু বারবার তারাই জয়ী হবে?

Monday, September 14, 2015

মিলানেও উচ্চারিত হল সংস্কৃতির গুরুত্বের কথা

আবুল মোমেন

আরব বিশ্বে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের যোদ্ধাদের হাতে একের পর এক প্রাচীন সাংস্কৃতিক নিদর্শন ধ্বংস হওয়ার পর রণাঙ্গনের বাইরেও প্রতিকার নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক যে সংস্থাটি মানবসভ্যতার এসব মূল্যবান প্রত্নসম্পদ রক্ষার কাজে নিয়োজিত সেই ইউনেস্কো সঙ্গতভাবেই এগিয়ে এসেছে। এরই রেশ ধরে ইতালির সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডেকেছিলেন মিলানে। মিলান এক্সপো ২০১৫-এর সম্মেলন কক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আমাদের সংস্কৃতি সচিবের সাথে আমারও যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
এতকাল সাংস্কৃতিক নিদর্শন রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা অথবা পাচারকারীদল। কিন্তু এরকম স্বেচ্ছাপ্রণোদিত পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ এক অভাবিত ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এরকম পরিস্থিতি অভিনব, এরকম প্রতিপক্ষও কল্পনাতীত ছিল সকলের। মিলানে আলোচনার একটি মোদ্দা শিরোনাম ছিল : জাতিসমূহের মধ্যে সংলাপের উপকরণ হিসেবে সংস্কৃতি। এতে উপস্থিত ৮৫টি দেশের মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের মধ্যে দু’দিনে (৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট) ৫৭ জন কথা বলেছেন। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ সময় ছিল ৪ মিনিট করে। ইতালির সংস্কৃতি ও পর্যটন বিষয়ক মন্ত্রী ও লেখক দারিও ফ্রান্সেসচিনি এতসব কেউকেটা ব্যক্তিদের সামলেছেন ভালোভাবেই। মিনিটখানেকের বেশি বাড়তি সময় কেউ নিতে পারেন নি। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রীকে বরাদ্দ সময়ের মধ্যেই কথা শেষ করতে হয়েছে। মাইক্রোফোনে কলম বেশ জোরেই ঠুকে সময়-সচেতন করেছেন সকলকে। বক্তৃতায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ সংস্কৃতির মানবিক ঐতিহ্যের দিক তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি সংস্কৃতি আদানপ্রদানের গুরুত্বও স্বীকার করেছেন। বাঙালি সংস্কৃতির মানবিক ঐতিহ্যের ধারা এবং বর্তমান সরকারের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কঠোর ভূমিকার কথা আমাদের দিক থেকে সংস্কৃতি সচিব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন।
মানবিক সংস্কৃতির ধারা ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা যে যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয় তা সকলেই বুঝতে পারছেন। এটি কেবল স্থানীয় কিছু মানুষের সচেতনতাতেও সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্যে সকলের চিন্তার নৈকট্য দরকার এবং তাই সব দেশ মিলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলা জরুরি। এভাবে একটি সম্মিলিত বৈশ্বিক প্রয়াস দ্রুত প্রণীত ও বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। সেই তাগিদ থেকেই মিলানের এ সম্মেলন।
বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের এ উপলব্ধি উপস্থিত নগণ্য আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। এর একটি বিশেষ কারণ আছে। ১৯৭৫-এর পট-পরিবর্তনের পর দেশে যখন আমাদের জন্যে দমবন্ধ-করা পরিবেশ তখন তেমন কিছু না ভেবে শিশুদের আনন্দে-সৃজনে মাতিয়ে রাখার যে কাজ শুরু করেছিলাম তা পাঁচ বছরের মধ্যে শিশুশিক্ষার কাজে টেনে নিয়েছিল আমাদের। কাজটার প্রাথমিক তাড়না এসেছে প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রয়োজনে। তার সাথে ছিল শিশুদের মানসগঠনে বুনিয়াদ তৈরিতে ভূমিকা রাখার তাগিদ। বুঝতে পারছিলাম শিক্ষা হল মূল জায়গা, সেখানে কাজ না হলে তাদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলা যাবে না।
কাজ শুরু করে বুঝতে পারলাম প্রথাগত শিক্ষার ধারা আমাদের কাজে আসবে না। নিজেদের পথ নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। মাটি তৈরি না করেই শিশু-চারার কাছে ফল চাওয়ার যে প্রচলিত ধারা তা আমাদের অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা বলে মনে হয়। আমরা দুটো বক্তব্যের ওপর জোর দিয়েছিলাম - ভয়হীন আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষা এবং পরোৎকর্ষ (perfection) নয় অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি। অভিভাবকদের ডেকে বললাম আমাদের ওপর আস্থা রাখতে, ব্যক্তিগতভাবে আমি ও অধ্যক্ষা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জিম্মাদার হতে চাইলাম। আমাদের কথা ছিল - এ বয়সে অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ওরা কেবল গ্রহণ, সংগ্রহ ও সঞ্চয় করবে - এর পরিমাপের দায়িত্ব থাকবে কেবল স্কুলের। স্কুলই দেখবে তাদের ভাণ্ডারে কতটা ছড়া, কবিতা, গল্প, নানা তথ্য, বিভিন্ন ধারণা, জ্ঞানের কথাবার্তা জমা পড়ছে এবং যা জমছে তার মান কেমন। এ পর্যায়ে তাদের গোগ্রাসে নিতে দিন - সব ইন্দ্রিয় পূর্ণ সত্তায় নিতে থাকুক। আমরা বলেছিলাম, একটু চ্যালেঞ্জ দিয়েই, ওদের ভিত্তির পরিসরটা আমরা অনেক বড় ও গভীর করে দেব, তাতে বড় হয়ে কোনো পর্যায়েই আর তাদের ঠেকতে হবে না। তারা নিজের শক্তিতেই এগিয়ে যাবে। প্রথম বছরে আমাদের ওপর আস্থা রাখলেন ১৫ জন অভিভাবক। তারা নানা রকম পরিবার থেকে এসেছেন - উচ্চশিক্ষিত চাকুরে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, মাঝারি দোকানদার, তবে বেশির ভাগ ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত চাকুরে পরিবারের ছেলেমেয়ে। বলাই বাহুল্য, অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত ছিলেন না, এরকম নিরীক্ষাপ্রবণতার ঝুঁকিটা তাঁদের সবসময় ভাবিত রাখত। অধ্যক্ষা হিসেবে শীলা মাঠে থেকে অভিভাবকদের প্রাত্যহিক চাপ সামলে গেছে। সবার কথা ছোট্ট পরিসরে বলা যাবে না, প্রথম যে ছাত্রটি ভর্তি হয়েছিল, টিঅ্যাণ্ডটির সীমিত আয়ের চাকুরে পিতার সন্তান, সে এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান। এভাবেই আমরা চলেছি, এবং চেয়েছি চালিয়ে যেতে। 
আমরা চেয়েছি ওদের মনের সবকটা জানালা সবসময় খোলা রাখতে। পরীক্ষা এক ধরনের কপাট, আবদ্ধতা তৈরি করে। একে বড় করে তুলে বাধার প্রাচীর বানিয়ে কোনো চাপ তৈরি করতে চাই নি। প্রত্যেক ছাত্র গাইতে পারত, আবৃত্তি পারত, গল্পবলা, বিতর্ক - সবই পারত (এখনও স্কুলে ছাত্রসংখ্যা অনেক বাড়ার পরও বেশিরভাগই পারে)। পঁচিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রাক্তনীদের স্বতস্ফূর্ত ও সপ্রতিভ সব পরিবেশনা দেখে উপস্থিত বহুজাতিক কোম্পানির এক প্রধান কর্তাকে এদের এই সপ্রতিভতা ও পারঙ্গমতা চমকে দিয়েছিল।
এসবই শিশুদেরই কৃতিত্ব। আমরা কেবল তাদের সুপ্ত ক্ষমতাগুলো জাগিয়ে তুলতে ও রাখতে চেয়েছি, চেষ্টা করেছি অনাহুত অন্যায্য চাপের কারণে এসব যেন নষ্ট না হয়।
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই আমরা বাইরেও একটু বলতে থাকলাম - শিশুশিক্ষা মূলত একটি সাংস্কৃতিক কাজ। গানবাজনা বা কলা (art) অর্থে নয়, সৃজনশীলতা, সুরুচি, সৌন্দর্য এবং মাত্রাজ্ঞানের মত গুণের চর্চা ও তা আয়ত্ত্ব করাই সংস্কৃতি চর্চা। নীতিবোধ ও মানবিকতার বিষয়ে সংবেদনশীলতাও এতে তৈরি হয়ে যায়। এই শেখার নৈপুণ্য মেলে কেবল যথার্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে। তাই শিক্ষার সুফল পাওয়ার শর্ত হল উপযুক্ত মানবিক সাংস্কৃতিক বাতাবরণ নির্মাণ। ফুলকিতে আমরা এই চেষ্টাই করেছি। প্রাথমিকে এভাবে তৈরি হলে তারা পরবর্তী উচ্চতর ধাপগুলো যোগ্যতার সাথে পেরুতে পারে।
যত দিন গেছে, দেশের অর্থনৈতিক বা মানুষের বৈষয়িক উন্নতি হলেও, সামাজিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সামরিক ও ছদ্ম সামরিক শাসন তো বটেই এমনকি গণতান্ত্রিক আমলেও এ সংকট কেবল ঘনিয়েছে। এর প্রতিষেধক যে যথার্থ শিক্ষা তা কেউই তেমন ভাবেন নি। এক সময় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ, মাদক ও অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে অনেককেই ভাবিত করেছে। প্রচলিত শিক্ষার সীমাবদ্ধতা নজরে পড়ল এবং মানসম্পন্ন আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা একটি বড় কাজ বলে মনে করলেন অনেকেই। এ ধারায় দেশের অগ্রণী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করল নালন্দা ২০০১ সনে। এ স্কুল এখন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অনেকেরই মনোযোগ পাচ্ছে। এটা আশার কথা। কিন্তু এ দেশে যে স্কুলগামী ছাত্রের সংখ্যা চার কোটির অধিক। তাদের পরীক্ষামুখী মুখস্থ বিদ্যার দু:স্বপ্নের (আইনস্টাইনের ভাষায়) মধ্যে ফেলে রেখে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি উদ্যোগ কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবে সমাজে!
তবে আশার কথা সরকারের ভিতরেই অনেকেই বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সচেতন, সংস্কৃতিমন্ত্রী বিষয়টা বোঝেন ও কিছু করতে আগ্রহী, এবং শিক্ষামন্ত্রীসহ মন্ত্রি-পরিষদের আরও অনেকেই হয়ত এ নিয়ে ভাবেন। সচিবালয়েও কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে ইতিবাচক ভাবনা রয়েছে। আমরা বুঝি অভ্যস্ত ধারা থেকে নতুন একটি ধারায় আসার ঝুঁকি নিয়েও তাঁদের ভাবনা-দুর্ভাবনা রয়েছে। এটা আদতে আলাপ-আলোচনা ও মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক কাজ করে ক্রমে সর্বত্র বাস্তবায়নের বিষয়। তবে কোনো অবস্থাতেই সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। মাত্রাতিরিক্ত পরীক্ষার অব্যাহত মুখস্থের প্রবণতাই কেবল বাড়ছে না চাপের মধ্যে থাকা ছাত্রদের মাদক ও ধর্মান্ধতাসহ অন্যান্য ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। নিজেদের জানাবোঝার ঘাটতি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই হচ্ছে না এবং পুঞ্জিভূত ঘাটতির বিপুল ফাঁক নিয়ে তারা সর্বোচ্চ শিক্ষার দুয়ারে এসে রীতিমত হোঁচট খাচ্ছে। সেখানে তৈরি হয়েছে জ্ঞানের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ এক বাস্তবতা।
মিলানের সম্মেলন থেকে কেন ফুলকির কথায় এসেছি সেটা আশা করি পরিষ্কার হয়েছে। পচাত্তরের পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী অবক্ষয়ের মুখে ত্রিশ বছর আগে যে কথাটি ফুলকি বলেছিল, আজ দ্যাখা যাচ্ছে তা অন্য এক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বিশ্বনেতৃবৃন্দের চিন্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আসলে একজন মানুষ যতটা সামাজিক জীব ততটাই সাংস্কৃতিক প্রাণী। শিক্ষা, ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খাদ্য, সজ্জা, ভাষা, শিল্প - মানুষের চর্চিত ও আচরিত এবং সৃষ্ট ও কৃত সকল কর্ম মিলে তৈরি হয় তার সংস্কৃতি। এর গোড়াপত্তন শৈশবে না হলে সর্বনাশ, কারণ এসময়ই মনোজগতের ভিৎ তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টা ফ্যাল্না নয়, জাতির ভবিষ্যত এবং দেশের অগ্রগতির সাথেই এটি যুক্ত।

***

Monday, September 7, 2015

ধিক্কারের অধিক


আবুল মোমেন

এটা ছবি?
এটা কি শিশুর ছবি?
না, এটা তো ধিক্কার,
ধিক্কারের অধিক,
তিরস্কার -
আমাকে তোমাকে
পৃথিবীসুদ্ধ মানুষকে।

ভূমধ্যসাগর কেন হবে
আয়লানের প্রতিপক্ষ বলো,
যুদ্ধবাজ জঙ্গি মুসলিম আর
আপন পাপের প্রায়শ্চিত্তে বিমুখ
উদাসীন গৃধ্নু প্রতীচী
যুগপৎ ইতিহাস থেকে বর্তমানে
যোগসূত্র বেঁধেছে যখন!

এটা ছবি?
এটা কোনো ছবি হলো?
যা কিছু দেখছি প্রতিদিন
এর একটিও ছবি নয়,
ভুলেও ভেবো না এরা শুধু ছবি,
সব কটি ধিক্কার এরা,
ধিক্কারের অধিক
তিরস্কার।

 লোকেই দিয়েছে নাম ছবিটিকে
- ভেসে যাওয়া মানবতা।
সেই সাথে বলো
সভ্যতার অবনত পতাকার প্রতিচ্ছবি।
তোমরা ভুলো নি নিশ্চয়
ইতিহাস -
এসবই তো মানচিত্র ভাগের
সেই পুরোনো খেলার
শেষ-দৃশ্যের ছবি।
লোভ আর নিষ্ঠুরতার
অবিনত আগ্রাসনে ক্লান্ত শ্রান্ত
মাথাহেঁট - ন্যায় ও জয়ের
অস্তরবি।
এসবই মনুষ্যত্ব বলিদানের
বিয়োগান্ত মর্মান্তিক
অন্তিম সময়ের
ধাবমান দৃশ্যাবলী।
যবনিকা - টলতে টলতে ধীরে
এগিয়ে আসছে
সভ্যতার ভগ্নস্তূপ জুড়ে।

হায় পয়গম্বর, হায় যীশু
হায় হায় সক্রেটিস
কী হাল দেখি তোমাদের
অনুসারীদের?
এক দল খুনে লিপ্ত, মুখর ধ্বংসে,
অন্যরা গা বাঁচাতে উদ্গ্রীব!

মানবতা নয়, আপন
মনুষ্য পরিচয়ও নয়,
সবকিছু জমে জমে তলিয়ে যাচ্ছে
ভূমধ্যসাগরের অতল সুনীলে।
শিশু নয়, ওরা নয় নারী,
নয় যেন একটিও মানুষ ওখানে -
ভয়-পাওয়া তাড়া-খাওয়া যারা
ছুটছে ওখানে, শূন্য চোখে
ওদের বারতা একটিই -
সভ্যতার ঘণ্টা বেজেছে,
ছুটি হয়ে গেছে।
যে ওখানে শুয়ে আছে
সে কিন্তু আয়লান কুর্দি নয় -
ছিন্ন পাপড়ি ওটি
উড়ে এসে ভেসে এসে
পড়েছে ওখানে।
প্রাণ দিয়ে বহন করেছে
সাধ্য ছিল যতটুকু
ওর ছোট্ট দেহের
পাপার্ত এ পৃথিবীর
অবশিষ্ট পুণ্যটুকু।

ওরা তো শিশু নয়.
জলের জিম্মায় প্রাণ রেখে
জননী মৃত্তিকায়
ফুটে আছে
শুভ্র পারিজাত ফুল,
জবাব দিচ্ছে তোমাদের
খুনে-স্বভাবের আর
টেনে খুলে দিচ্ছে
মুখোশ সবার -
তোমার আমার। আর
হাটে হাড়ি ভেঙে জানিয়ে দিয়েছে
সভ্যতার নামে যত জারিজুরি।

দেবশিশু লজ্জায় মুখ নিচু
করে আছে।
এত শূন্য ফাঁপা মানুষের কাছে
তার নেই কোনো প্রত্যাশা।
বাবাকে বাঁচার শেষ আকুতিতে
ধ্বনিত হয়েছে শিশুকণ্ঠে
ধিক্কারের রুদ্র ভাষা।
তারপর খুলেছে অর্গল।
অবশেষে সভ্যতার শ্লেষ্মা ঝেড়ে
আড়মোড়া ভেঙেছে ইউরোপ,
যদিও ওপাড়ে দলপতি
এখনো নিশ্চুপ।
কথা হল, কতটা জাগবে
সবার বিবেক? বলি,
কতদূর, কতদিন স্থায়ী হবে
জাগরণ?

তোমাদের বুদ্ধি বটে
ওকে ভাবো কুর্দি আয়লান শুধু
বেহদ্দ বেকুব যত -
এখন ও শুধুই ধিক্কার,
বিবেকের ছিন্ন পাপড়ি।
মুখ নিচু করে উপুড় শরীরে
প্রত্যাখ্যান করেছে ব্যর্থ
আমাদের। আর ওর
নিথর ভাষায় সোচ্চার
শুয়ে আছে যে শরীর
সেটি কোবানি শিশুর নয়,
দগদগে মোটা অক্ষরে
লিখেছে সে
প্রত্যাখ্যান।
ওটি শিশু নয়,
শুধ্ইু তজর্নি
দ- ঘোষণার আগে
উঁচানো আঙুল।
শিশুর বারতা সামান্যই -
ধিক্কার তোমাদের,
ধিক্কারের অধিক
তিরস্কার।
৫-৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
চট্টগ্রাম



Tuesday, August 25, 2015

স্কুল শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনার সময় এসেছে

আবুল মোমেন

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাকে পরীক্ষামুখী মুখস্থবিদ্যার বৃত্ত থেকে কীভাবে বের করে প্রকৃত শিক্ষার বৃহৎ পরিসরে মুক্তি দেওয়া যায় সেটাই আজ শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের ভাবনার প্রধান বিষয় হওয়া উচিত। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে - অন্তত শিক্ষার ক্ষেত্রে - সংখ্যাগত দিকটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তাতে নিঃসন্দেহে আমরা ভালো করেছি। প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েশিশুসহ প্রায় শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি হওয়াই একটা বড় অর্জন। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার যথেষ্ট হলেও আমাদের গ্রামগঞ্জের বাস্তবতায় এটাকেও বড় অর্জন বলতে হবে। আর সব ছাত্রের জন্যে বছরের প্রথম দিনে উৎসবের মাধ্যমে বিনামূল্যে সব বই - প্রায় ৩২ কোটি বই - বিতরণ চমকপ্রদ এবং বিস্ময়কর সাফল্য।
২০১৫ তে এমডিজি শেষ হবে এবং তারপর শুরু হবে কৌশলগত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের পর্ব। এই লক্ষ্য অর্জন আমাদের জন্যে কঠিন হয়ে পড়তে পারে যদি না গুণগত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো সময়মত অনুধাবন করে এখনই যথাযথ পদক্ষেপের কথা ভাবা না হয়। আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা এবং যোগ্যতা নিয়ে কারো মনে প্রশ্ন নেই। তাঁর সাথে কথা বলে মনে হয়েছে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষাটি দেশের গ্রামগঞ্জের দরিদ্রমানুষের জন্যে  যাঁরা দেশের জনসংখ্যার গরিষ্ঠাংশ - সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়ে ইতিবাচক প্রণোদনার কাজ করেছে। মনে হয় তাঁর পর্যবেক্ষণটি বাস্তবতারই প্রতিফলন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করে প্রথম থেকেই যারা এই পরীক্ষা প্রচলনের যৌক্তিকতা ও সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি, এটাই তাদের প্রশ্নের সদুত্তর কিনা সে বিষয়ে এখনও আমি সংশয় প্রকাশ করব। এডুকেশন ওয়াচের গত ১৯ আগস্ট প্রকাশিত ২০১৪ সনের প্রতিবেদন আমার মত সকলের সংশয়কে যথেষ্ট শক্ত ভিত্তি দেয়। এটি নিয়ে ব্র্যাক-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরিটাস এবং প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে দেশের অগ্রগণ্য বিশেষজ্ঞ ড. মনজুর আহমদ, গত ১৯ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে যে নিবন্ধ লিখেছেন তা থেকে কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরছি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার মূল্যায়নভিত্তিক এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত, ড. মনজুরের ভাষায়, কয়েকটি মূল লক্ষণীয় বক্তব্য হল - এ পরীক্ষা প্রবর্তনের ফলে ১. পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করার প্রবণতা উৎসাহিত হচ্ছে, ২. স্কুলের বাইরে প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, ৩. গাইডবই মূল পাঠ্যবইকে ছাপিয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, ৪. ছাত্ররা নকল ও অনৈতিক আচরণে আকৃষ্ট হচ্ছে, ৫. এ পদ্ধতিতে শিক্ষার বৈষম্য বাড়ছে।
ওপরের পাঁচটি বক্তব্য নিয়ে বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল কারো মনে সংশয় থাকার কথা নয়। আর যদি আরেকটু গভীরে গিয়ে এ পর্যায়ে শিক্ষার হালচাল সম্পর্কে জানতে চাই তার জন্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনই যথেষ্ট বলে মনে করি। সরকার কেন নিজেদেরই মাঠপর্যায়ের জরীপের প্রতিবেদন উপেক্ষা করছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। মোটের ওপর এ দুই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে ড. মনজুর সমাপনী পরীক্ষার কারণেই সৃষ্ট প্রাথমিক শিক্ষার পাঁচটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরেছেন । পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে - এডুকেশন ওয়াচ -
১. পরীক্ষা কি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের সুনির্দিষ্ট দক্ষতাগুলো পরিমাপ করতে পারে? প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণেই দেখা যাচ্ছে উচ্চ পাশের হারের বিপরীতে কেবল বাংলা ও গণিতে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের হার মাত্র এক চতুর্থাংশ। বাকি তিন-চতুর্থাংশের অর্জন নানামাত্রায় অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রার নিচে। আমরা জানি তার মধ্যে বেশ বড় অংশের অবস্থা হতাশাজনক।
২. এতে কি শিক্ষাদান ও গ্রহণ প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান বাড়ছে? না, এতে মুখস্থের প্রবণতা উৎসাহিত হচ্ছে, ছাত্রের বিষয় বোঝা ও সৃজনশীলতা এবং পাঠক্রমের মূল বিষয়গুলো অনুধাবন উপেক্ষিত হচ্ছে। তদুপরি চিন্তা ও যুক্তিচর্চা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
৩. এটা কি মানসম্পন্ন শিক্ষার আবশ্যিক উপাদান হিসেবে শ্রেণিকক্ষে ছাত্রের বুনিয়াদি মূল্যায়নের সহায়ক, সম্পূরক এবং এ প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে? বুনিয়াদি মূল্যায়ন শিক্ষকের জন্যে প্রাত্যহিক কাজ যা সমাপনী পরীক্ষার মত সামষ্টিক চূড়ান্ত মূল্যায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সকলে মিলে এ পরীক্ষাটিকেই প্রাথমিক শিক্ষার এমন এক কেন্দ্রীয় নায়ক করে তোলা হয়েছে যাতে অত্যুৎসাহী অভিভাবক, কোচিং ব্যবসায়ী এবং অযাচিত হস্তক্ষেপে সিদ্ধ গণমাধ্যম (নিয়মিত প্রশ্নোত্তর ছাপিয়ে আর পরীক্ষাভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে) মিলে প্রায় প্রথম শ্রেণি থেকেই যে কোনো পরীক্ষাতেই নব্বইয়ের ঘরে নম্বর পাওয়াকেই মোক্ষ বানিয়ে ছেড়েছে। বাস্তব অবস্থা জেনে সাক্ষ্য দিচ্ছি অভিভাবক-শিক্ষকরা মিলে ছাত্রদের শৈশব তছনছ করে দিচ্ছে।
৪. এটি কি শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা বজায় রেখে মান অর্জনে অবদান রাখছে? সঙ্গত কারণেই যেসব অভিভাবক পাঁচসালা পরিকল্পনা নিয়ে (১ম-৫ম শ্রেণি) সন্তানদের মডেল টেস্টের মুখস্থবিদ্যায় পারঙ্গম করে তুলতে পারেন তারা বেশি ভালো করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত গরিব ঘরের ছাত্ররা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
৫. এটি কি শিশুদের জন্যে একটি উন্নয়নমুখী ও সহায়ক বাতাবরণ তৈরির গুরুত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? ম্যাজিক মান জিপিএ ৫ নিয়ে গণমাধ্যম, অভিভাবকসহ সমাজ, কোচিং ব্যবসায়ী শিক্ষকবৃন্দ মিলে যে প্রচারণার মায়াজাল সৃষ্টি করেছেন তাতে যে অধিকাংশ ছাত্র তুলনায় কম নাম্বার পায় তাদের কল্পনাতীত সামাজিক ও মানসিক দুর্দশা আড়ালে থেকে যায়। আমাদের নিষ্ঠুর অসংবেদনশীল গণমাধ্যম ও অভিভাবকসমাজ শিশুমনের ব্যথা-বেদনা, সংকোচ-সংবেদনার কোনো খবরই রাখে না, তোয়াক্কা করে না।
সকলেই জানেন প্রাথমিক পর্ব হচ্ছে শিশুর শিক্ষার - জীবনব্যাপী অব্যাহত শিক্ষাগ্রহণের - প্রস্তুতি কাল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - এ হল সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের কাল। এটি কোনো কারণেই ছাত্রের কাছে ফল প্রত্যাশা করার সময় নয়। যা দেখার তা হল তার সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের কাজটি বাধাহীনভাবে ঠিকঠাকমতো চলছে কি না, তার সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের ভা-ার মানসম্পন্ন সম্ভারে সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে কিনা। পরীক্ষা কেবল বাধা নয়, তার ভূমিকা মুখ্য ও প্রধান হয়ে উঠলে ছাত্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। সাধে কি মহান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন একে নাইটমেয়ার বা দুঃস্বপ্ন আখ্যা দিয়েছেন। আমাদের ব্যবস্থার গুণে এখন পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়াটাই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্ররা সাক্ষ্য দিচ্ছে কীভাবে বাবা-মা এবং কোচিং শিক্ষকরা জিপিএ ৫ পাওয়ার জন্যে তাদের ওপর শারীরিক-মানসিক লাঞ্ছনাসহ জুলুম চালায়। তাদের শৈশব হরণ করা হয়েছে। 
পরীক্ষা প্রকৃতিগতভাবে একটি প্রতিযোগিতা। জীবন প্রতিযোগিতাময় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, এবং এর জন্যে প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে মানবসমাজ গঠন এবং মানবসভ্যতার বিকাশে প্রতিযোগিতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সহযোগিতা। মানুষের অগ্রগতিকে পাখির উড্ডয়নের সাথে তুলনা করে বলা  যায় দুটি ডানার মত-ই সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার ভূমিকা এখানে। কিন্তু কেবল প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠলে তাতে স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতার বীজ নিয়েই বড় হবে শিশু। আর বৃহত্তর সমাজবাস্তবতায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তার ভিতরে পরিপুষ্ট এসব বীজ শক্তি নিয়েই প্রকাশিত হবে। আমাদের সমাজে এটাই ঘটছে। মানবমনের এই গতিপ্রকৃতির সাথে শিক্ষার সংশ্লিষ্টতা বুঝতে হলে শিক্ষা ও মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে ধারণা থাকা প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যের বিষয়, তা বাস্তবজীবনে জয়ী হওয়ার জন্যে মরিয়া ও মোহগ্রস্ত বিষয়বুদ্ধি-তাড়িত সমাজের নেই। অথচ হাতেনাতে এর প্রমাণ পাওয়া যায় উচ্চ শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ে। অধিকসংখ্যায় উত্তীর্ণ করাতে এবং উচ্চ শিক্ষায় আসন দিতে কেবলই মান নামানোর নির্দেশনা আসে। তাতে প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরিসংখ্যান চমকপ্রদ দেখায়, কিন্তু মানবিচারের সময় ধরা পড়ে যায় ফাঁক ও ফাঁকি। এভাবে আমরা শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করতে পারব না এবং, আরও রূঢ় বাস্তবতা হল, দুর্নীতির মহামারিসহ সামাজিক অবক্ষয় ঠেকাতে পারব না, সকল প্রতিষ্ঠানের অধোগতি ও অকার্যকরতার অবসান হবে না।
টানা চল্লিশ বছর ধরে শিশুর শিক্ষা ও মানসবিকাশের কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি উত্তরোত্তর পরীক্ষার চাপ বাড়ছে, এবং গত কয়েক বছরে তা শিশু-নিপীড়নের মাত্রাছাড়া পর্যায়ে পৌঁছেছে। সকলকে সতর্ক করে বলব, এর ফল জাতির জন্যে ভালো হবে না। ধর্মান্ধতা, সন্ত্রাস ও মাদকের মত অভিশাপ বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ শৈশবে মানবিক বিকাশের উপযুক্ত রসদের ঘাটতি। আর সমাজে অসহিষ্ণুতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, ক্ষুদ্রতা, নিষ্ঠুরতা এবং শিশু-নারী-দরিদ্র ও  প্রান্তিকজনের প্রতি উপযুক্ত সংবেদনশীলতার অভাবের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে পরিত্রাণ দূরের কথা, তা আরও প্রকট হয়ে উঠবে। দুর্নীতি এবং অপরাধপ্রবণতা তো গলগ্রহের মত সঙ্গী হয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশেদেশে ইসলামি জঙ্গিদের উত্থান এবং তাদের হাতে মানবজাতির সাংস্কৃতিক সম্পদের যে বেহাল দশা হচ্ছে তার  প্রেক্ষাপটে গত এপ্রিলে প্যারিসে ইউনেস্কোর একটি বৈঠক হয়েছিল। আর তার আলোচনার পটভূমিতে গত ৩১ জুলাই ও ১ আগস্ট ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রীর আহ্বানে মিলান এক্সপো ২০১৫-র হল ঘরে বসেছিল ‘জনগণের মধ্যে সংলাপের উপকরণ হিসেবে সংস্কৃতি’ শীর্ষক সম্মেলন। তাতে বিশ্বের ৮৫টা দেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যোগ দিয়েছিলেন। আমন্ত্রণপত্রেই গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির ভূমিকা উত্তরোত্তর বাড়ছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ উপন্যাস শেষের কবিতায় লিখেছিলেন, কমলাহীরের পাথরটি হল বিদ্যা আর তা থেকে যে আলো ঠিকরে বেরোয় তা হল সংস্কৃতি। আমরা বলতে বাধ্য হচ্ছি পরীক্ষার আতিশয্য ও সামূহিক চাপে খোদ বিদ্যাই অনর্জিত থেকে যাচ্ছে, ফলে আজ শিক্ষিত (আদতে ডিগ্রিপ্রাপ্ত) মানুষের কর্ম ও চিন্তায় আলোর প্রকাশ ঘটে না।
আমরা আমাদের কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই আশির দশকের গোড়া থেকে স্কুল চালু করে, খানিকটা রবীন্দ্রনাথের ভাবনার অনুসারে, বলে এসেছি শিক্ষার সাথে সংস্কৃতিচর্চার সমন্বয় না হলে তা সার্থক হবে না। বলা প্রয়োজন, আমরা সংস্কৃতি বলতে গান-বাজনা-নাচ-নাট্য অর্থাৎ কেবল কলাচর্চার কথা বলি না, সংস্কৃতি শব্দটির ব্যাপ্ত ও পুঙ্খানুপঙ্খ তাৎপর্যসহ এর সমগ্রতায় ধরতে চাই। এভাবে চর্চা হলে শিশু সাহিত্যশিল্পে দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীল প্রতিভা ও মানবিক গুণাবলী বিকাশের অবকাশ পাবে। আর শিশু সমৃদ্ধ মন নিয়ে বড় হলে তার প্রভাব সমাজে পড়বেই। তাতে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা, নিষ্ঠুরতার মত ক্ষুদ্রতা ও অমানবিকতার সংস্কৃতি ও গ্লানি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব। শিক্ষা নিয়ে - অন্তত স্কুল শিক্ষা নিয়ে - আমাদের নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে।
                                                                                 ***

Sunday, August 23, 2015

ছাত্রসংগঠনের হাজারিবাগ শাখা কেন?

আবুল মোমেন

শেষ পর্যন্ত সরকার হার্ড লাইনেই গেল। দু’দিনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের তিনজন ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেল।
বিচারবহির্ভূত হত্যা বা মৃত্যু সুস্থ মস্তিষ্কে সমর্থন করা যায় না। বোঝা যায় সরকারও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ওপর আস্থা রাখতে পারে নি। আশু সমাধানের বেআইনি মর্মান্তিক পথটিই গ্রহণ করল।
দেশে দু’ধরনের সংকটে এমন এক বিষচক্র তৈরি হয়েছে যা ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের দিক থেকে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া পর্যন্ত একদিকে চলে দুর্নীতি আর অন্যদিকে দুর্নীতি ও অদক্ষতার যোগফল হিসেবে মামলা হয় দুর্বল। দ্বিতীয় সংকট হল, প্রথম সংকটটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় অপরাধীরা মামলা বা আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো না কোনো স্তরে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে তা কাজে লাগায়। রাজনীতির অপরাধ-সংশ্লিষ্টতার সংস্কৃতি জোরদার হওয়ার পর থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় সংঘটিত কয়টি খুনের সুবিচার নিশ্চিত ও সম্পন্ন হয়েছে? খুনের সংখ্যা তো শয়ের ঘর ছাপিয়ে হাজারের কোঠায় পৌঁছেছে। এই বিচারহীনতার পুঞ্জিভূত পরিণতি নিয়ে আমরা কখনো গভীরভাবে ভাবি নি। বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে এমনটা হতে দিয়েছি। অবস্থা এমন হয়েছে যে সর্বোচ্চ আদালত থেকেও বলা হচ্ছে নিচের স্তরে যোগ্য বিচারকের অভাব রয়েছে, সুষ্ঠুভাবে রায় লেখার মত মানুষও কমে যাচ্ছেন। তেমনি দক্ষ আইনজীবীও সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। সবটা মিলে সর্বত্র একটা ফাঁপা চাকচিক্যের আড়ালে আমরা আসল বিষয় হারিয়ে ফেলছি। দালানকোঠার বহর বাড়ছে, প্রযুক্তির আড়ম্বর ঘটছে, গাড়ি এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ের বৈভবও বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলেছে।
বিচারহীনতা থেকে বিচারবহির্ভূত ‘বিচারের’ ফাঁদ খুব দূরের কিছু নয়। যারা ক্রসফায়ারের শিকার হচ্ছে তারা এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল যে তার সীমা সম্পর্কে ধারণা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদের এই ধারণাটা আপনা-আপনি হয় নি, তারা তো আস্কারা পেয়েই এভাবে চলে এসেছে অর্থাৎ তাদের এভাবে চলতে দেওয়া হয়েছে।  তাদের এই ভাবনাটাকে ভিত্তিহীন বলাও মুশকিল। কারণ সত্যিই তো বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং সেইসূত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচারের আওতামুক্ত থাকার চক্রটি বহুদিন ধরেই কার্যকর রয়েছে। হঠাৎ যে সরকার তাদের ইনফর্মাল বাহুবল নিয়ে বিব্রতবোধ করবে বা সমালোচনা থেকে বাঁচার জন্যে এমন বেপরোয়া নির্মমভাবে তাদের শায়েস্তা করা হবে সেটা তারা ভাবতেই পারে নি।
সরকার তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বরং কিছুটা বাহবা নিতে চাইবে - দ্যাখ, আমরা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, নিজের দলের কেউ আইন ভাঙলে তাকেও ছাড়ি না। তবে ক্রসফায়ারে না দিয়েও অনেককে দল থেকে বহিষ্কার করে মামলায় গ্রেপ্তার করে, দীর্ঘমেয়াদে জেলে রেখে সরকারের বারতাটা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্ষমতা আর লোভ সত্যিই তো অন্ধ - এ হল অন্ধশক্তি। 
ক্রসফায়ারে নিহত ছাত্রলীগ নেতা আরজুর পরিচয় জেনে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হয় - হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগ কমিটি থাকবে কেন? ছাত্রলীগ একটি ছাত্রসংগঠন, এর শাখা তো থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ভিত্তিক হবে ছাত্র সংগঠনের শাখা। একটি কেন্দ্রীয় কমিটি থাকবে, তার অধীনে জেলা কমিটি এবং মহানগর কমিটি থাকবে। কিন্তু এলাকাভিত্তিক কমিটি কেন? এরকম কর্মক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতাহীন কমিটি হলে তাদের কাজ কী হবে? নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব না থাকায় এসব শাখায় ভাগ্যান্বেষী অছাত্র তরুণরা এসে ভীড় করবে। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে তো তাদের ভীড় ঠেকানো যাবে না। ছাত্র সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হলে এগুলোকে অবশ্যই শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যায়ল ও কলেজ-কেন্দ্রিক সংগঠন হতে হবে। তাতে নেতাদের ছাত্রত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সহজ হবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে গণতান্ত্রিকব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনগুলো বন্ধ হয়ে আছে। নির্বাচনহীনতার অর্থ গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি আর এর পরিণতি হল অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্ন পথে নেতাদের ক্ষমতাবান হওয়ার ঝোঁক বাড়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের দখলদারি এবং কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি - প্রধান দলগুলোর ক্ষেত্রে - মূলত ভর্তি বাণিজ্য, টেণ্ডারবাজি, নিরীহ ছাত্রদের শোষণ এবং একছত্র কায়েমি ক্ষমতার অন্যান্য অনুষঙ্গ অপতৎপরতার দূষণ ও বিকার সমাজদেহে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ছাত্র রাজনীতি থেকে আপাতত জাতি কিছুই পায় না।
লক্ষ্যহীন, আদর্শহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং সৎকর্মহীন নেতৃত্ব এবং রাজনীতি নানা ধরনের উৎপাত তৈরি করে। দোকানপাটে চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, ছিনতাই রাহাজানি, অপহরণ ও মুক্তিপণ ইত্যাদি বলপ্রয়োগের ক্ষমতার চর্চা অপ্রতিহতভাবে চলছে। মানুষ এসব উৎপাতে এতটা অতিষ্ঠ হয়েছে যে ছাত্র-তরুণদের সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক মনোভাব প্রবল। এমনকি ক্রসফায়ার নিয়ে মানুষ বিচলিত নয়। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত কেউ মাথাই ঘামায় না। এই অবক্ষয় থেকে বেরুতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকার দখলদারি বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান ধারার নেতৃত্ব ও কাঠামো থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।
এ জন্যে আমি প্রস্তাব করব - অন্তত এক বছরের জন্যে - ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হোক, সকল কমিটিও ভেঙে দেওয়া হোক। ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাজনীতি করার অধিকার বন্ধ হবে না। কিন্তু সংগঠন থাকবে না। এই এক বছরের মধ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান - বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ - স্ব স্ব ছাত্রসংসদের নির্বাচন করবেন। এ নির্বাচনে ছাত্ররা সরাসরি অংশ নেবে, তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্যানেল তৈরি করতে পারবে। কিন্তু কেবলমাত্র নিয়মিত ছাত্ররাই এতে অংশ নিতে পারবে। একবার এম. এ. পাশ করে আবার অন্য বিষয়ে ভর্তি হলেও তারা নির্বাচনের যোগ্য হবে না। এভাবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান প্রচারণা, প্রার্থী নির্বাচন, ভোট, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে নিয়মাবলী নির্ধারণ করে নেবেন।
আমার ধারণা একবার ছাত্রসংসদের নির্বাচন চালু হলে, প্রথম দু’একবার যদি কিছু কিছু সমস্যা হয়ও, আখেরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভালো ছাত্র, যোগ্য প্রার্থীদের সামনে আনতে চাইবে সাধারণ ছাত্ররা। অছাত্র, চাঁদাবাজ, দখলদার, অস্ত্রবাজ, মাস্তান, ধর্ষকদের হাত থেকে শিক্ষা, রাজনীতি, ছাত্রসমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনগণ এবং দেশ ও সমাজকে রক্ষা করার এটাই পথ। সাধারণ ছাত্ররা তাদের মনোবল ফিরে পাবে, নিজেদের সংঘবদ্ধ শক্তির চমকপ্রদ প্রকাশ দেখে উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি বিতর্কিত ব্যক্তিরা দখলদার হিসেবে বিতাড়িত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে সংলাপে বসতে পারেন। তার আগে জাতীয় সংলাপও হতে পারে । সংসদেও বিষয়টি আলোচিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই যা চলছে তা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। কে কোন স্বার্থে কোন এলাকায় নিজে নিজে ক্ষমতাসীন দলের কোনো অঙ্গ সংগঠনের শাখা খুলে নিজেই সভাপতি পদ গ্রহণ করে নিজের কোন স্বার্থ হাসিল করবে তা না পারবে বুঝতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, না তাদের সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছেন, ছাত্রলীগে শিবির এবং আওয়ামী লীগে জামায়াতের লোকজন ঢুকে পড়ছে। ঢুকে পড়বেই তো। যদি সংঠনের নাম এবং গণতন্ত্র ও আদর্শ উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো কাজ না থাকে তাহলে নেতাদের একমাত্র কাজ তো হবে নিজের অর্থবিত্ত, ক্ষমতাবৃদ্ধি আর সে ক্ষমতার রোয়াব দেখিয়ে আশেপাশের সবাইকে দাবিয়ে রাখা। 
এখন একাজই তো করছে অঙ্গ সংগঠনগুলো। তার মধ্যে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের তারুণ্যের কারণে রাখঢাক করে কাজটা সারতে পারছে না। খোদ সরকারের জন্যে কেউ কেউ আপদ-বালাই হয়ে উঠছে। কিন্তু সে বালাই ক্রসফায়ারে দূর করার ব্যবস্থাটি সুবুদ্ধির বা দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করছে না।  এটিকে বলব, সকল বিকল্পের মধ্যে নিকৃষ্ট বিকল্প। কারণ বিচারহীনতার পুঞ্জিভূত সংস্কৃতি আজ আমাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতিতে নিয়ে আসছে। এরপরের স্তরটি হল জায়গায় জায়গায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, যেমনটা সেদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নরসিংদিতে ডাকাত সন্দেহে মোট ছয়জনকে পিটিয়ে খুন করা হল। 
তার পরের ধাপটি হল কাউকে প্রতিপক্ষ মনে হলেই ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে সন্দেহভাজন বানিয়ে গণপিটুনির ব্যবস্থা করা। আমরা বিচারহীনতা ও বিচার বহির্ভূত ক্ষমতার বহুমুখী কুফলও এ সমাজে দেখছি। দুর্নীতি সাথে এই অপরাধপ্রবণতা পাল্লা দিয়ে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে থামব আমরা? তাই আশু পরিবর্তন চাই। প্রথমে ছাত্র সংগঠন থেকেই শুরু হোক। এখানে শৃঙ্খলা ফেরোনো হলে অন্য সব অঙ্গ সংগঠনেও ফেরানো সহজ হবে। বিষয়টা ভাবতে হবে। 
শেষে আবারও বলব, ছাত্রসংগঠনের আবার হাজারিবাগ শাখা কেন?

***

Saturday, August 15, 2015

শূন্যতায় তুমি শোকসভা

আবুল মোমেন


আজকের দিনটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করার দিন। ১৯৭৫ সালের এইদিনে ঘাতকদল তাঁকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। তারপর থেকে বাংলাদেশ যেন এক অভিভাবকহীন পরিবার - ছন্নছাড়া, দিগভ্রান্ত।
একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালালে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে, কিন্তু তাঁরই নেতৃত্বে, মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল। পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের হুমকির মধ্যে তিনি প্রিয় দেশ ও দেশবাসীর কাছ থেকে শারীরিকভাবে অনেক দূরে ছিলেন।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁর সহকর্মীদের যোগ্য নেতৃত্ব ও ভারতের সহায়ক সরকারের সহযোগিতায় আমরা অত্যন্ত কঠিন সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম গৌরবের সঙ্গে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যা সম্ভব হয়েছিল পঁচাত্তরে তাঁর মৃত্যুর পরে তা সম্ভব হয়নি। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, কেন? একাত্তরে তাকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, সেটাই কি কারণ? একাত্তরে তাঁর পক্ষে যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ ছিলেন, যেমন তাজউদ্দিন আহমদসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সেটাই কি কারণ? এ দুটি কারণই সত্য বলে মনে হয়।
কিন্তু তারও চেয়ে সত্য তৃতীয় একটি কারণ। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কেবল বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি অপরাধ ছিল না; এ ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অংশ; খন্দকার মুশতাক এই ষড়যন্ত্রের একজন অংশীদার, বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় মীর জাফর।
পটপরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বায়ান্নো থেকে বিপুল ত্যাগ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে জাতির অর্জিত আদর্শ ও মূলনীতিগুলো বিসর্জন এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন তছনছ করে দিয়ে প্রত্যাখ্যাত পাকিস্তানি ধারার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা ও ধর্মান্ধ  চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করে। কেবল তা-ই নয়, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ নির্যাতনও  চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় জেনারেল জিয়া সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মুসলিম ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী এবং ধর্মান্ধ দলসমূহকে রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত ও সেসব দলের নেতৃবৃন্দকে সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করেন। জিয়ার পরে এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আর সংবিধানে ধর্মীয় পরিচয় লাগিয়ে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেহারা পাল্টে দিলেন। নব্বইয়ের পরে ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়া একই ধারাই অব্যাহত রাখেন।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত দীর্ঘ দু-দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর নাম গণমাধ্যমে, পাঠ্যবই ও অন্যান্য প্রচারণা থেকে মুছে দেওয়া হয়, তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ থাকে। অন্যান্য জাতীয় নেতাদের কথাও অনুচ্চারিত থেকে যায়। ফলে এ সময়ে দেশে নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা এ দেশের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারেনি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন বা মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভূমিকা তা ঠিকভাবে জানতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতা অর্জনে কারা ছিল বন্ধুরাষ্ট্র, এ সময় ভারত-সোভিয়েতের ভূমিকা ইত্যাদিও জানা হয়নি তাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়, ভূমিকা এবং বিপরীতে রাজাকার-আলবদর ও অন্যান্য দালালদের কী ভূমিকা তা-ও ঠিকভাবে জানানো হয়নি। চীন, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকার কথাও তারা জানতে পারেনি।
ফলে কুড়ি বছরের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের মনে বিভ্রান্তি এবং বিতর্কের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আজও আমরা এই বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জের টানছি, এবং তার খেসারত দিয়ে যাচ্ছি। এ যেন সত্যিকারের অভিভাবকহীন এক ছন্নছাড়া পরিবারের দিগভ্রান্ত পদচারণা চলছে।
পরিস্থিতি আজ এ রকম যে, একজন দেশদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে সরকার পরিচালনার ব্যর্থতাকে গুলিয়ে ফেলছি আমরা। অপরাধের সঙ্গে অপারগতাকে এক করে ফেলছি। চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে এক কাতারে রাখছি।
আমরা জানি, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, নবগঠিত অনভিজ্ঞ সরকার ও প্রশাসন পরিচালনার মতো দুরূহ কাজ করতে হয়েছে। সেই সঙ্গে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ওঁত পেতে থাকা পরাজিত শক্তির এদেশীয় দোসরদের চক্রান্ত এবং অন্যদিকে অতি-উৎসাহী উচ্চাভিলাষী মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরাজিত পাকিস্তান, তার বন্ধুরাষ্ট্র চীন ও সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহ মিলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করার  চেষ্টা করে গেছে। এদেরই অপতৎপরতার ফলে ১৯৭৪-এ দুর্ভিক্ষ হয়েছে, গোলাম আজমগং প্রশ্রয় পেয়েছে ও জামায়াতসহ অসংখ্য ধর্মান্ধ দল শক্তি সঞ্চয় করেছে। এভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমে চরম মনোভাবের এক বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। আজকের দিনে বাংলাদেশের এই অস্থির বর্তমান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আমরা যে অভাব প্রতিদিন অনুভব করি তা হল একজন যোগ্য নেতার, একজন যথার্থ অভিভাবকের। আর তখন স্বভাবতই মনে পড়ে যায় বঙ্গবন্ধুর কথা। মনে পড়ে যায় কীভাবে ইতিহাসের উজান বেয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের মানুষের নয়নমণি, একমাত্র নেতা, পরম নির্ভর অভিভাবক।
তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তার আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। মৃত্যুদিবসে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করব জাতির এই চরম সংকটকালে তাঁর কন্যা একজন যোগ্য উত্তরসূরি রাজনৈতিক নেতাই ও রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন সেই প্রার্থনা জানিয়ে।
২০০৯ সনে জাতীয় সংসদে বিপুল আসনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। আমরা লক্ষ করছি শেখ হাসিনা এবারে ক্ষমতায় এসে দেশকে পঁচাত্তর-পরবর্তী পিছুটান থেকে উদ্ধারের ব্রত নিয়েছেন। সত্যি বলতে কি এখন কাজটা বঙ্গবন্ধুর আমলের চেয়েও কঠিন। তখন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের কাল, বাঙালির ঐক্য গঠনের কাল। আজ বিশ্বায়ন আর বাজার অর্থনীতির চাপ একদিকে আর অন্যদিকে ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কঠিন এই পথ থেকে অবশ্য সরতে রাজি নন বঙ্গবন্ধু-কন্যা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, এসডিজি পূরণ করে এমডিজি পূরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তিনি বজায় রেখেছেন। তবুও বর্তমান আওয়ামী লীগের পক্ষে আগের মত একাট্টা হয়ে আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না। দলের ভিতর থেকেই নানা সংকট তৈরি হচ্ছে, বাইরের সংকট তো আছেই।
তবুও মনে হয় পঁচাত্তরের পিছুটান কাটানোর এটাই শেষ সুযোগ। ফলে শেখ হাসিনাকে সফল হতেই হবে। আর সে পথে বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা নিতে পারেন তা হল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। আজকে দেশে তরুণের সংখ্যা জনসংখ্যার অর্ধেক তারা কোনো দল করে না, আর অর্ধেক যে নারী তারাও অধিকাংশ দলভুক্ত নয়। ফলে ঐক্যের সঠিক বাতাবরণ তৈরি হলে যারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজনীতি করছে তারা আবারও একাত্তরের মত জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্রগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।

***