Sunday, August 23, 2015

ছাত্রসংগঠনের হাজারিবাগ শাখা কেন?

আবুল মোমেন

শেষ পর্যন্ত সরকার হার্ড লাইনেই গেল। দু’দিনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের তিনজন ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেল।
বিচারবহির্ভূত হত্যা বা মৃত্যু সুস্থ মস্তিষ্কে সমর্থন করা যায় না। বোঝা যায় সরকারও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ওপর আস্থা রাখতে পারে নি। আশু সমাধানের বেআইনি মর্মান্তিক পথটিই গ্রহণ করল।
দেশে দু’ধরনের সংকটে এমন এক বিষচক্র তৈরি হয়েছে যা ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের দিক থেকে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া পর্যন্ত একদিকে চলে দুর্নীতি আর অন্যদিকে দুর্নীতি ও অদক্ষতার যোগফল হিসেবে মামলা হয় দুর্বল। দ্বিতীয় সংকট হল, প্রথম সংকটটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় অপরাধীরা মামলা বা আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো না কোনো স্তরে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে তা কাজে লাগায়। রাজনীতির অপরাধ-সংশ্লিষ্টতার সংস্কৃতি জোরদার হওয়ার পর থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় সংঘটিত কয়টি খুনের সুবিচার নিশ্চিত ও সম্পন্ন হয়েছে? খুনের সংখ্যা তো শয়ের ঘর ছাপিয়ে হাজারের কোঠায় পৌঁছেছে। এই বিচারহীনতার পুঞ্জিভূত পরিণতি নিয়ে আমরা কখনো গভীরভাবে ভাবি নি। বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে এমনটা হতে দিয়েছি। অবস্থা এমন হয়েছে যে সর্বোচ্চ আদালত থেকেও বলা হচ্ছে নিচের স্তরে যোগ্য বিচারকের অভাব রয়েছে, সুষ্ঠুভাবে রায় লেখার মত মানুষও কমে যাচ্ছেন। তেমনি দক্ষ আইনজীবীও সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। সবটা মিলে সর্বত্র একটা ফাঁপা চাকচিক্যের আড়ালে আমরা আসল বিষয় হারিয়ে ফেলছি। দালানকোঠার বহর বাড়ছে, প্রযুক্তির আড়ম্বর ঘটছে, গাড়ি এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ের বৈভবও বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলেছে।
বিচারহীনতা থেকে বিচারবহির্ভূত ‘বিচারের’ ফাঁদ খুব দূরের কিছু নয়। যারা ক্রসফায়ারের শিকার হচ্ছে তারা এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল যে তার সীমা সম্পর্কে ধারণা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদের এই ধারণাটা আপনা-আপনি হয় নি, তারা তো আস্কারা পেয়েই এভাবে চলে এসেছে অর্থাৎ তাদের এভাবে চলতে দেওয়া হয়েছে।  তাদের এই ভাবনাটাকে ভিত্তিহীন বলাও মুশকিল। কারণ সত্যিই তো বিচারহীনতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং সেইসূত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচারের আওতামুক্ত থাকার চক্রটি বহুদিন ধরেই কার্যকর রয়েছে। হঠাৎ যে সরকার তাদের ইনফর্মাল বাহুবল নিয়ে বিব্রতবোধ করবে বা সমালোচনা থেকে বাঁচার জন্যে এমন বেপরোয়া নির্মমভাবে তাদের শায়েস্তা করা হবে সেটা তারা ভাবতেই পারে নি।
সরকার তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বরং কিছুটা বাহবা নিতে চাইবে - দ্যাখ, আমরা কতটা ন্যায়নিষ্ঠ, নিজের দলের কেউ আইন ভাঙলে তাকেও ছাড়ি না। তবে ক্রসফায়ারে না দিয়েও অনেককে দল থেকে বহিষ্কার করে মামলায় গ্রেপ্তার করে, দীর্ঘমেয়াদে জেলে রেখে সরকারের বারতাটা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্ষমতা আর লোভ সত্যিই তো অন্ধ - এ হল অন্ধশক্তি। 
ক্রসফায়ারে নিহত ছাত্রলীগ নেতা আরজুর পরিচয় জেনে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হয় - হাজারিবাগ থানা ছাত্রলীগ কমিটি থাকবে কেন? ছাত্রলীগ একটি ছাত্রসংগঠন, এর শাখা তো থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ভিত্তিক হবে ছাত্র সংগঠনের শাখা। একটি কেন্দ্রীয় কমিটি থাকবে, তার অধীনে জেলা কমিটি এবং মহানগর কমিটি থাকবে। কিন্তু এলাকাভিত্তিক কমিটি কেন? এরকম কর্মক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতাহীন কমিটি হলে তাদের কাজ কী হবে? নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব না থাকায় এসব শাখায় ভাগ্যান্বেষী অছাত্র তরুণরা এসে ভীড় করবে। ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে তো তাদের ভীড় ঠেকানো যাবে না। ছাত্র সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হলে এগুলোকে অবশ্যই শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যায়ল ও কলেজ-কেন্দ্রিক সংগঠন হতে হবে। তাতে নেতাদের ছাত্রত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সহজ হবে।
আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে গণতান্ত্রিকব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনগুলো বন্ধ হয়ে আছে। নির্বাচনহীনতার অর্থ গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি আর এর পরিণতি হল অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্ন পথে নেতাদের ক্ষমতাবান হওয়ার ঝোঁক বাড়া। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের দখলদারি এবং কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি - প্রধান দলগুলোর ক্ষেত্রে - মূলত ভর্তি বাণিজ্য, টেণ্ডারবাজি, নিরীহ ছাত্রদের শোষণ এবং একছত্র কায়েমি ক্ষমতার অন্যান্য অনুষঙ্গ অপতৎপরতার দূষণ ও বিকার সমাজদেহে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ছাত্র রাজনীতি থেকে আপাতত জাতি কিছুই পায় না।
লক্ষ্যহীন, আদর্শহীন, উদ্দেশ্যহীন এবং সৎকর্মহীন নেতৃত্ব এবং রাজনীতি নানা ধরনের উৎপাত তৈরি করে। দোকানপাটে চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, ছিনতাই রাহাজানি, অপহরণ ও মুক্তিপণ ইত্যাদি বলপ্রয়োগের ক্ষমতার চর্চা অপ্রতিহতভাবে চলছে। মানুষ এসব উৎপাতে এতটা অতিষ্ঠ হয়েছে যে ছাত্র-তরুণদের সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক মনোভাব প্রবল। এমনকি ক্রসফায়ার নিয়ে মানুষ বিচলিত নয়। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত কেউ মাথাই ঘামায় না। এই অবক্ষয় থেকে বেরুতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকার দখলদারি বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান ধারার নেতৃত্ব ও কাঠামো থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।
এ জন্যে আমি প্রস্তাব করব - অন্তত এক বছরের জন্যে - ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হোক, সকল কমিটিও ভেঙে দেওয়া হোক। ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার ও রাজনীতি করার অধিকার বন্ধ হবে না। কিন্তু সংগঠন থাকবে না। এই এক বছরের মধ্যে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান - বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ - স্ব স্ব ছাত্রসংসদের নির্বাচন করবেন। এ নির্বাচনে ছাত্ররা সরাসরি অংশ নেবে, তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্যানেল তৈরি করতে পারবে। কিন্তু কেবলমাত্র নিয়মিত ছাত্ররাই এতে অংশ নিতে পারবে। একবার এম. এ. পাশ করে আবার অন্য বিষয়ে ভর্তি হলেও তারা নির্বাচনের যোগ্য হবে না। এভাবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান প্রচারণা, প্রার্থী নির্বাচন, ভোট, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে নিয়মাবলী নির্ধারণ করে নেবেন।
আমার ধারণা একবার ছাত্রসংসদের নির্বাচন চালু হলে, প্রথম দু’একবার যদি কিছু কিছু সমস্যা হয়ও, আখেরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভালো ছাত্র, যোগ্য প্রার্থীদের সামনে আনতে চাইবে সাধারণ ছাত্ররা। অছাত্র, চাঁদাবাজ, দখলদার, অস্ত্রবাজ, মাস্তান, ধর্ষকদের হাত থেকে শিক্ষা, রাজনীতি, ছাত্রসমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনগণ এবং দেশ ও সমাজকে রক্ষা করার এটাই পথ। সাধারণ ছাত্ররা তাদের মনোবল ফিরে পাবে, নিজেদের সংঘবদ্ধ শক্তির চমকপ্রদ প্রকাশ দেখে উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি বিতর্কিত ব্যক্তিরা দখলদার হিসেবে বিতাড়িত হবে।
রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে সংলাপে বসতে পারেন। তার আগে জাতীয় সংলাপও হতে পারে । সংসদেও বিষয়টি আলোচিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই যা চলছে তা আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। কে কোন স্বার্থে কোন এলাকায় নিজে নিজে ক্ষমতাসীন দলের কোনো অঙ্গ সংগঠনের শাখা খুলে নিজেই সভাপতি পদ গ্রহণ করে নিজের কোন স্বার্থ হাসিল করবে তা না পারবে বুঝতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, না তাদের সরকার। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছেন, ছাত্রলীগে শিবির এবং আওয়ামী লীগে জামায়াতের লোকজন ঢুকে পড়ছে। ঢুকে পড়বেই তো। যদি সংঠনের নাম এবং গণতন্ত্র ও আদর্শ উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো কাজ না থাকে তাহলে নেতাদের একমাত্র কাজ তো হবে নিজের অর্থবিত্ত, ক্ষমতাবৃদ্ধি আর সে ক্ষমতার রোয়াব দেখিয়ে আশেপাশের সবাইকে দাবিয়ে রাখা। 
এখন একাজই তো করছে অঙ্গ সংগঠনগুলো। তার মধ্যে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের তারুণ্যের কারণে রাখঢাক করে কাজটা সারতে পারছে না। খোদ সরকারের জন্যে কেউ কেউ আপদ-বালাই হয়ে উঠছে। কিন্তু সে বালাই ক্রসফায়ারে দূর করার ব্যবস্থাটি সুবুদ্ধির বা দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করছে না।  এটিকে বলব, সকল বিকল্পের মধ্যে নিকৃষ্ট বিকল্প। কারণ বিচারহীনতার পুঞ্জিভূত সংস্কৃতি আজ আমাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতিতে নিয়ে আসছে। এরপরের স্তরটি হল জায়গায় জায়গায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, যেমনটা সেদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নরসিংদিতে ডাকাত সন্দেহে মোট ছয়জনকে পিটিয়ে খুন করা হল। 
তার পরের ধাপটি হল কাউকে প্রতিপক্ষ মনে হলেই ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে সন্দেহভাজন বানিয়ে গণপিটুনির ব্যবস্থা করা। আমরা বিচারহীনতা ও বিচার বহির্ভূত ক্ষমতার বহুমুখী কুফলও এ সমাজে দেখছি। দুর্নীতি সাথে এই অপরাধপ্রবণতা পাল্লা দিয়ে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে থামব আমরা? তাই আশু পরিবর্তন চাই। প্রথমে ছাত্র সংগঠন থেকেই শুরু হোক। এখানে শৃঙ্খলা ফেরোনো হলে অন্য সব অঙ্গ সংগঠনেও ফেরানো সহজ হবে। বিষয়টা ভাবতে হবে। 
শেষে আবারও বলব, ছাত্রসংগঠনের আবার হাজারিবাগ শাখা কেন?

***

Saturday, August 15, 2015

শূন্যতায় তুমি শোকসভা

আবুল মোমেন


আজকের দিনটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বিশেষভাবে স্মরণ করার দিন। ১৯৭৫ সালের এইদিনে ঘাতকদল তাঁকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। তারপর থেকে বাংলাদেশ যেন এক অভিভাবকহীন পরিবার - ছন্নছাড়া, দিগভ্রান্ত।
একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালালে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে, কিন্তু তাঁরই নেতৃত্বে, মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল। পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের হুমকির মধ্যে তিনি প্রিয় দেশ ও দেশবাসীর কাছ থেকে শারীরিকভাবে অনেক দূরে ছিলেন।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁর সহকর্মীদের যোগ্য নেতৃত্ব ও ভারতের সহায়ক সরকারের সহযোগিতায় আমরা অত্যন্ত কঠিন সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম গৌরবের সঙ্গে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে যা সম্ভব হয়েছিল পঁচাত্তরে তাঁর মৃত্যুর পরে তা সম্ভব হয়নি। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, কেন? একাত্তরে তাকে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, সেটাই কি কারণ? একাত্তরে তাঁর পক্ষে যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানুষ ছিলেন, যেমন তাজউদ্দিন আহমদসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সেটাই কি কারণ? এ দুটি কারণই সত্য বলে মনে হয়।
কিন্তু তারও চেয়ে সত্য তৃতীয় একটি কারণ। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কেবল বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি অপরাধ ছিল না; এ ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অংশ; খন্দকার মুশতাক এই ষড়যন্ত্রের একজন অংশীদার, বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় মীর জাফর।
পটপরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বায়ান্নো থেকে বিপুল ত্যাগ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে জাতির অর্জিত আদর্শ ও মূলনীতিগুলো বিসর্জন এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন তছনছ করে দিয়ে প্রত্যাখ্যাত পাকিস্তানি ধারার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা ও ধর্মান্ধ  চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করে। কেবল তা-ই নয়, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ নির্যাতনও  চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় জেনারেল জিয়া সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মুসলিম ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার প্রাধান্য দিতে শুরু করেন। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী এবং ধর্মান্ধ দলসমূহকে রাজনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত ও সেসব দলের নেতৃবৃন্দকে সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করেন। জিয়ার পরে এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আর সংবিধানে ধর্মীয় পরিচয় লাগিয়ে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেহারা পাল্টে দিলেন। নব্বইয়ের পরে ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়া একই ধারাই অব্যাহত রাখেন।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত দীর্ঘ দু-দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর নাম গণমাধ্যমে, পাঠ্যবই ও অন্যান্য প্রচারণা থেকে মুছে দেওয়া হয়, তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ থাকে। অন্যান্য জাতীয় নেতাদের কথাও অনুচ্চারিত থেকে যায়। ফলে এ সময়ে দেশে নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়, যারা এ দেশের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারেনি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন বা মুক্তিযোদ্ধাদের যে ভূমিকা তা ঠিকভাবে জানতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতা অর্জনে কারা ছিল বন্ধুরাষ্ট্র, এ সময় ভারত-সোভিয়েতের ভূমিকা ইত্যাদিও জানা হয়নি তাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়, ভূমিকা এবং বিপরীতে রাজাকার-আলবদর ও অন্যান্য দালালদের কী ভূমিকা তা-ও ঠিকভাবে জানানো হয়নি। চীন, সৌদি আরব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকার কথাও তারা জানতে পারেনি।
ফলে কুড়ি বছরের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের মনে বিভ্রান্তি এবং বিতর্কের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছে। আজও আমরা এই বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জের টানছি, এবং তার খেসারত দিয়ে যাচ্ছি। এ যেন সত্যিকারের অভিভাবকহীন এক ছন্নছাড়া পরিবারের দিগভ্রান্ত পদচারণা চলছে।
পরিস্থিতি আজ এ রকম যে, একজন দেশদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে সরকার পরিচালনার ব্যর্থতাকে গুলিয়ে ফেলছি আমরা। অপরাধের সঙ্গে অপারগতাকে এক করে ফেলছি। চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে এক কাতারে রাখছি।
আমরা জানি, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, নবগঠিত অনভিজ্ঞ সরকার ও প্রশাসন পরিচালনার মতো দুরূহ কাজ করতে হয়েছে। সেই সঙ্গে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ওঁত পেতে থাকা পরাজিত শক্তির এদেশীয় দোসরদের চক্রান্ত এবং অন্যদিকে অতি-উৎসাহী উচ্চাভিলাষী মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরাজিত পাকিস্তান, তার বন্ধুরাষ্ট্র চীন ও সমর্থক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহ মিলে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল বাংলাদেশকে বিপদগ্রস্ত করার  চেষ্টা করে গেছে। এদেরই অপতৎপরতার ফলে ১৯৭৪-এ দুর্ভিক্ষ হয়েছে, গোলাম আজমগং প্রশ্রয় পেয়েছে ও জামায়াতসহ অসংখ্য ধর্মান্ধ দল শক্তি সঞ্চয় করেছে। এভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক-সামাজিক জীবনে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং ক্রমে চরম মনোভাবের এক বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। আজকের দিনে বাংলাদেশের এই অস্থির বর্তমান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আমরা যে অভাব প্রতিদিন অনুভব করি তা হল একজন যোগ্য নেতার, একজন যথার্থ অভিভাবকের। আর তখন স্বভাবতই মনে পড়ে যায় বঙ্গবন্ধুর কথা। মনে পড়ে যায় কীভাবে ইতিহাসের উজান বেয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের মানুষের নয়নমণি, একমাত্র নেতা, পরম নির্ভর অভিভাবক।
তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়েই তার আরব্ধ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। মৃত্যুদিবসে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করব জাতির এই চরম সংকটকালে তাঁর কন্যা একজন যোগ্য উত্তরসূরি রাজনৈতিক নেতাই ও রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন সেই প্রার্থনা জানিয়ে।
২০০৯ সনে জাতীয় সংসদে বিপুল আসনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। আমরা লক্ষ করছি শেখ হাসিনা এবারে ক্ষমতায় এসে দেশকে পঁচাত্তর-পরবর্তী পিছুটান থেকে উদ্ধারের ব্রত নিয়েছেন। সত্যি বলতে কি এখন কাজটা বঙ্গবন্ধুর আমলের চেয়েও কঠিন। তখন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের কাল, বাঙালির ঐক্য গঠনের কাল। আজ বিশ্বায়ন আর বাজার অর্থনীতির চাপ একদিকে আর অন্যদিকে ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কঠিন এই পথ থেকে অবশ্য সরতে রাজি নন বঙ্গবন্ধু-কন্যা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, এসডিজি পূরণ করে এমডিজি পূরণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তিনি বজায় রেখেছেন। তবুও বর্তমান আওয়ামী লীগের পক্ষে আগের মত একাট্টা হয়ে আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না। দলের ভিতর থেকেই নানা সংকট তৈরি হচ্ছে, বাইরের সংকট তো আছেই।
তবুও মনে হয় পঁচাত্তরের পিছুটান কাটানোর এটাই শেষ সুযোগ। ফলে শেখ হাসিনাকে সফল হতেই হবে। আর সে পথে বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা নিতে পারেন তা হল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। আজকে দেশে তরুণের সংখ্যা জনসংখ্যার অর্ধেক তারা কোনো দল করে না, আর অর্ধেক যে নারী তারাও অধিকাংশ দলভুক্ত নয়। ফলে ঐক্যের সঠিক বাতাবরণ তৈরি হলে যারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজনীতি করছে তারা আবারও একাত্তরের মত জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্রগোষ্ঠীতে পরিণত হবে।

***


Wednesday, August 12, 2015

রাজন রাকিব রবিউল আর হন্তারক সমাজ

আবুল মোমেন

রাজন, রাকিব, রবিউল - তিনটি শিশুরই নামের অদ্যাক্ষর -র। প্রথম জনের খুঁটিতে বাঁধা করুণ কাতর চাহনির মর্মান্তিক ছবিটি মন থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়। রাজন আর রাকিবের ছবি দেখেছি, রবিউলের মুখটা অদেখা হলেও কল্পনা করে নিতে পারি। পত্রিকায় মুদ্রিত রাজন-রাকিবের চেহারা দুটি বড় মায়াবী, বড়ই নিষ্পাপ কমনীয়তায় পবিত্র। ভাবি বয়সোচিত দুষ্টুমির সময় কেমন প্রাণবন্ত দেখাত ছেলেদুটিকে। প্রাণচাঞ্চল্য তো এ বয়সেরই ধর্ম। রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের সূত্রে দুষ্টুছেলে ফটিকের সাথে আমরা গভীরভাবে পরিচিত। ফটিক, বলাই, আশু - তাঁর এসব বালক চরিত্রের কাকে ছেড়ে কার কথা ভাবি। এই নিষ্কলুষ বালকেরা সকলেই যেন ছিল এই কলুষ-তামস-ভারাক্রান্ত জগতে অতিথিমাত্র। বড়দের নিষ্ঠুরতায় অকালে ছুটি হয়ে গেছে রাজন, রাকিব, রবিউলের। তবে এ ছুটি ফটিক বা বলাইয়ের পথে হয় নি।
গল্পে বালক দুটির মৃত্যুর পেছনে সমাজ এবং সংসারের উপেক্ষা আর অবহেলা-অনাদরের ভূমিকাই মুখ্য। গিন্নি গল্পে অবোধ নিষ্পাপ প্রাণচঞ্চল বালক আশুর প্রতি সমাজের অভিভাবকদের নিষ্ঠুর পীড়নের দৃষ্টান্ত পাই। এ সমাজে বালক বয়সের দুরবস্থার কথা রবীন্দ্রনাথ সরাসরিই বলেছেন। হঠাৎ শরীরে বেড়ে ওঠে তারা, গলার স্বর পাল্টাতে শুরু করে - ছোটর দলেও পড়ে না বড়র দলেও মানায় না। এদিকে শরীরের অভ্যন্তরে তো হরমোনের রূপান্তর ঘটতে থাকে। বালক শৈশব ছাপিয়ে পৌঁছে যায় বয়:সন্ধিতে। স্বয়ং সন্ত অগাস্টিন তাঁর স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন কী এক অজানা তাড়নার অস্থিরতায় কতই না ভুগেছেন তখন। বাধ্য হয়ে নিজেকে সংযত করতে কত কা-ই না তাঁকে করতে হয়েছে। রুশ ভাষার শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক তলস্তোয়ের নামের আগে ঋষি অভিধা প্রয়োগ করা হয়। ঋষি তলস্তোয় তাঁর বালক বয়সের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বয়:সন্ধির তাড়নায় কীসব অপকীর্তি ঘটাতেন সেসব কথা অকপটেই লিখে গেছেন। বালকমাত্রই অনুসন্ধিৎসু, কৌতূহল তার বয়সোচিত স্বভাবধর্ম। বিধাতা তাকে এভাবে তৈরি করেছেন বলেই সে কিছু অনাসৃষ্টি ঘটিয়ে তবেই সৃষ্টির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। মার্কিন কথাসাহিত্যিক মার্ক টোয়েন ডানপিটে দূর্ধর্ষ হাকল্কে সাহিত্যে অমর করে গেছেন। সাহিত্যে ডানপিটেদের রাজা হল অলিভার - হতদরিদ্র পরিবারের রাস্তায় বেড়ে ওঠা ছেলে অলিভার টুইস্ট। এসবই বাস্তব থেকে নেওয়া চরিত্র।
বড়রা চিরকালই ছোটদের দুষ্টুমির জন্যে একটু-আধটু শাসন করতেন, তাঁদের এই অধিকার সবাই মেনেই নেয়, এ নিয়ে বালকরাও বিশেষ মাথা ঘামায় না। শিশুদের - মনে রাখতে হবে বালকরাও শিশু - শারীরিক শাস্তি দেওয়া বা অপমানসূচক তিরস্কার করা তাদের মানসিক  (অনেক ক্ষেত্রে শারীরিকও) স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং তা মাত্রা ছাড়ালে ক্ষতি গভীর, এমনকি স্থায়ীও হতে পারে। তাই আধুনিক কালে শিশুদের প্রতি এ ধরনের শাস্তিমূলক আচরণকে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু সমাজমানস সহজে পাল্টায় না। বাবা-মা, শিক্ষক এবং দুর্ভাগা শিশু শ্রমজীবীদের নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে মনিবগণের দিক থেকে শিশুর অপরাধের জন্যে শাস্তিই - যা প্রায় ক্ষেত্রে চরম অপমানসূচক তিরস্কার দিয়ে শুরু হয়ে তাতেও গায়ের ও মনের ঝাল না মিটলে পিটুনির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় - বরাদ্দ এ সমাজে। এ যেন সমাজ-সংস্কৃতির অচ্ছেদ্য ঐতিহ! শুনেছি প্রায় সব স্কুলেই মার অব্যাহত রয়েছে, পরিবারেও প্রহার-সংস্কৃতির প্রতাপ থামে নি।
রাজন, রাকিব বা রবিউলের ওপর প্রযুক্ত শাস্তি কোনো ব্যক্তি রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আকস্মিকভাবে ঘটান নি। তিন ক্ষেত্রেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে এবং মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত। মনস্তাত্ত্বিক হয়ত বলবেন, ক্রোধের সাথে অহঙের যোগে এসব মাত্রাছাড়া নৃশংসতা ঘটছে। হত্যাকারীরা এই শিশুগুলোর ওপর চরম নির্যাতন চালিয়ে তিলেতিলে অসীম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে খুন করেছে। তাদের কৃতকর্মে এও বোঝা যায় যে এই পৈশাচিকতা তারা উপভোগ করেছিল। হত্যার মূল অভিপ্রায় হয়ত একজনেরই ছিল, কিন্তু অপরাধীর শাস্তি বিধানে ‘দায়িত্বশীল’ আরও ‘অভিভাবক’ প্রতিটি ঘটনাতেই স্বত:প্রণোদিত হয়ে জুটে গিয়েছিল। ফলে বোঝা যায় এ সমাজে নিষ্ঠুরতা, অপরাধপ্রবণতা এবং বিবেকহীনতার এক মারাত্মক অমানবিক সংস্কৃতি বহমান রয়েছে। এসব ঘটনা এমনি ঘটছে না, আমাদের প্রশ্রয়ে, আমাদেরই সাহচর্যে-সহযোগিতায়, সবার সমন্বিত যোগসাজশে একাত্তরের বীর বাঙালির অপমৃত্যু ঘটিয়েছি আমরা। কারণ প্রকৃত কাপুরুষই পারে শিশুর ওপর নিষ্ঠুর প্রতিশোধ চরিতার্থ করতে। আজ শিশু-নারী, আদিবাসী, দরিদ্র, দুর্বলমাত্রই এ সমাজে সবলের শাসন-শোষণের শিকার হচ্ছে। আমরা সমাজ হিসেবেই মনুষ্যত্বের গভীর সংকটে তলিয়ে যাচ্ছি।
বিচারহীনতা ও অপরাধীর শাস্তি না হওয়ার একটা পরিণতি এক্ষেত্রে অবশ্যই যুক্ত হচ্ছে। রাজন, রাকিব, রবিউলদের হত্যাকারীদের বিচার ও কঠিন শাস্তি অবশ্যই হতে হবে। এটি রাষ্ট্রের করণীয়। রাষ্ট্র অবশ্য সমাজেরই সৃষ্টি এবং তারই প্রতিফলন মাত্র। ফলে বিবেকহীনতা ও অপরাধের সাথে সহবাস এরও মজ্জাগত রোগ।
সমাজে পচন ব্যাপক ও গভীর সে কথা আমরা সকলেই জানি। তবুও একদম বসে পড়ছে না তার কারণ দুটি - এত কিছুর মধ্যেও শুভবোধসম্পন্ন মানুষ, তা যত অঙ্গুলিমেয়ই হোক, সমাজে টিকে আছেন। তাঁরা সংখ্যালঘু হলেও বিবেকের কণ্ঠস্বর ও সচ্চরিত্রের মহিমা কাপুরুষ বিবেকহীনদের কিছুটা হলেও দমাতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হল, এ সমাজে তথাকথিত বিবেকহীন অভিভাবকদের চেয়ে ভুক্তভোগী রাজন-রাকিব-রবিউলরাই সংখ্যায় বেশি। তাদের চেয়ে একটু বড় বালক ও তরুণরাও সমাজে বিবেকহীনদের চেয়ে বেশি পরিমাণেই রয়েছে। নষ্ট সমাজ এদের পীড়ন করলেও এবং বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করার সব আয়োজন চালিয়ে গেলেও, মনে হয়, প্রাণশক্তিতে ভরপুর সজীব প্রাণ এত সহজে পরাজিত হয় না।
আজ প্রয়োজন শুভশক্তির কাছ থেকে সমাজের শুভবোধকে জাগানোর জন্যে নিরন্তর উচ্চারণ এবং ধারাবাহিক কাজ। সে কাজের শ্রেষ্ঠ উপায় হল বালক-বালিকা, তরুণ-তরুণীদের সাথে সেতুবন্ধন রচনা। অর্থাৎ তাদের সাথে কথা বলার অসংখ্য সুযোগ তৈরি করা এবং তা অব্যাহত রাখা। এ কাজে বাহন হতে পারে শিল্পকলা ও সংস্কৃতিচর্চা। ধরা যাক, পাঠচক্র তৈরি করলেন বড়রা, তাতে সেরা সাহিত্যের সাথে লিঙ্গ-নির্বিশেষে শিশু-কিশোর-বালকদের পরিচয় ঘটানো হবে। তাদের পরিচয় ঘটাতে হবে জীবনের বিচিত্র সব সম্ভারের সাথে। বুঝতে হবে জীবন কেবল সংগ্রাম এবং যাপনের বিষয় নয়, নয়  কেবল ভোগ ও প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার মঞ্চ, এ হল উপভোগ এবং উদযাপনের  ক্ষেত্র। উপভোগ করতে হলে সে কেবল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা বা পাঠক থাকলেও হবে না, তাতে কিছু উপকার নিশ্চয় হবে, কিন্তু সবচেয়ে ফলপ্রসূ পথ হচ্ছে শিশুরা যদি সক্রিয় অংশীদার হয়ে চর্চা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবনকে উপভোগ ও উদযাপন করতে শেখে। তাই প্রয়োজন সাহিত্য পাঠকে অগ্রাধিকার দিয়ে আবৃত্তি, নাটক, গান, নাচ ইত্যাদি যার যার সামর্থ্য ও অভিরুচি অনুযায়ী চর্চার সুযোগ করে দেওয়া। এতেও শেষ নয়, কারণ বড়দের ভুলে গেলে চলবে না, শৈশব-কৈশোরে তাঁদের মনেও ছিল অফুরন্ত বিস্ময়বোধ - যা সামান্যের ছোঁয়ায় সাড়া দিতে সক্ষম, ছিল অসীম কৌতূহল - যা তুচ্ছকেও জানতে চায়। আর এ বয়সে নগণ্যের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পায় শিশু। সে ভালোবাসে অভিযান, রোমাঞ্চ এবং নানা রকম চ্যালেঞ্জ। ফলে কেবল ঘরবন্দী জীবন তার নয়। প্রাসঙ্গিক হতে পারে ভেবে জানাই, একবার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা আমাকে বলেছিল - মানুষ আসলে অন্যান্য প্রাণীদের মতই বহিরঙ্গন (ওরা বলেছিল আউটডোর) প্রাণী, ভুল করে ঘরে ঢুকে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বিশ্বপ্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে বিশ্বশিশুর নিত্য খেলা চলে। ‘আবরণ’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি শৈশবে দিগম্বর শিশুকে ধূলোবালিতে ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। কবির দু:সাহস অনেক, লিখেছেন সাত বছর পর্যন্ত পোশাকের বালাই দিয়ে ওকে কষ্ট না দিলেও চলে। হায়, যেদেশে দু-তিন বছরের শিশুকন্যাও ধর্ষিতা হয় সেখানে এ সৎসাহস কবে বিদায় নিয়েছে, কবি কীভাবে বুঝবেন!
সমাজের অঙ্গনে আমাদের অনেক কাজ। নারীদের মধ্যেও শিশু উৎপীড়ক ও নির্যাতক বেড়ে চললেও মূলত পুরুষ সম্প্রদায়ের মধ্যে সত্যিকারে পৌরুষের অভাব থেকেই সমস্যা বাড়ছে। সৎসাহস হারিয়ে কে-ই বা পুরুষ থাকতে পারে? রবীন্দ্রনাথ অবিস্মরণীয় বাঙালি বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর চরিত্রের প্রধান গৌরব ‘তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব’।
হ্যাঁ অজেয় পৌরুষ ও অক্ষয় মনুষ্যত্বের সাধনাই করতে হবে - নারীমাত্র দর্শনেই যে পৌরুষ লালসা কাতর হয়, অন্যের আত্মসম্মানবোধে যে মনুষ্যত্ব ক্ষয় পায় তার হাত থেকে সমাজকে উদ্ধার করতে হবে।
এ কাজে প্রথমে আমাদেরই দোষ স্বীকার করতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে রাজন-রাকিব-রবিউল কিংবা ত্বকীদের অপমৃত্যুর দায় সমাজের অংশ হিসেবে আমরা কেউ এড়াতে পারি না। আমরা সকলেই শিশুহত্যার অংশীদার! ব্যক্তি পর্যায়ে এই উপলব্ধি ঘটলে পরিবর্তনের কাজ কিছুটা সহজ হবে। কাজ হতে হবে দুই ক্ষেত্রে - পরিবারে এবং স্কুলে। আপাতত এক্ষুনি সরকার স্কুলে স্কুলে মূল শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক শিক্ষা চালু করে দিতে পারেন।
সাংস্কৃতিক সাক্ষরতা ও সাংস্কৃতিক পাঠ নিয়ে সত্তর বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। এখন এ মুহূর্তে চাই রাজন-রাকিব-রবিউলসহ গত সাড়ে তিন বছরে যে প্রায় এক হাজার শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেছে এ সম্পর্কে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হোক, প্রত্যেকটি মামলা পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্র নিক এবং দ্রুতবিচার আইনে অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তির বিধান করা হোক।

***

Sunday, August 2, 2015

ছাত্রলীগের সম্মেলনের সূত্রে

আবুল মোমেন
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দু’দিনব্যাপী জাতীয় সম্মেলন গতকাল (২৬ জুলাই) শেষ হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেবল প্রধান অতিথি হিসেবে ছাত্রসংগঠনের এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন নি, বক্তৃতায় সংগঠনটির অভিভাবক হিসেবে দায় ও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা জানি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী সব ছাত্র সংগঠনই কোনো-না-কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন। এই বিধানের অনেক সমালোচনা থাকলেও দেশের আরও কয়েকটি খারাপ বিধানের মত স্বৈরাচার-প্রণীত এ বিধানটিও রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী ছাত্রাবস্থায় ছাত্রলীগ করেছেন এবং প্রাক্তনী হিসেবে তাঁর পক্ষপাত থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু মুশকিল হল তিনি প্রধানমন্ত্রী, দলমত-নির্বিশেষে সবার প্রতি - অবশ্যই অপরাধী বা দেশদ্রোহী ব্যতীত - তাঁর আচরণ ও ভূমিকায় সমতাই কাম্য। এমন উন্নত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয় আমরা কি কোনো পর্যায় থেকেই কখনোই পাব না?
আরও মুশকিল হল প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী এবং ছাত্রলীগের সভাপতি ও অন্যান্য নেতার বক্তৃতায় অতীতের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র ছাত্রলীগের গৌরবময় ভূমিকার কথাই  বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যেকের বাগ্মিতার নানা পর্যায়ে এ মনোভাবই ফুটে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে দুটি কথা বলা যায়। প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে কথাটা সত্য নয়; দ্বিতীয়ত, তাই যদি সত্য হবে তবে ছাত্রলীগের এই একলা চলোরে নীতি কি সমর্থনযোগ্য? পঞ্চাশের দশক থেকেই গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে আরও বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন মাঠে সক্রিয় ছিল। কখনও তাদের সমর্থকের সংখ্যাগত আয়তন ছাত্রলীগকে ছাপিয়েছে, তারও চেয়ে বড় কথা দীর্ঘদিন এমন বেশ কয়েকটি সংগঠনের সাথে ছাত্রলীগ কাঁধ মিলিয়ে কাজও করেছে। এসব কথা অস্বীকৃত হলে, অনুচ্চারিত থাকলে এখনকার ছাত্র-তরুণরা ভুল বারতা পাবে, আর এখনকার ছাত্রলীগ কর্মীরা নিজেদের এককভাবে সফল গৌরবের অধিকারী ভাববে। বর্তমান বাস্তবতায় এটা ক্ষমতার নানা বিকারে আক্রান্ত ছাত্রলীগের জন্যে যথাযথ পথনির্দেশক বক্তব্য হয়েছে বলে মনে করা কঠিন।
বাংলাদেশের রাজনীতির - এমনকি গণতান্ত্রিক রাজনীতিরও - যেসব দুর্বলতা ও মন্দ দিক আছে তার মধ্যে কয়েকটি বরাবর প্রকটভাবেই ধরা পড়ে। নিজের দল সম্পর্কে ফাঁপিয়ে বলা, অন্যদের বাদ দিয়ে অতীতের সব কৃতিত্ব নিজেদের ভাগে রাখা, এবং সর্বশেষ না হলেও নিকৃষ্ট একটি হল, নিজ দলের আচরণ, ভোগদখল তথা অধিকার ও কায়েমি স্বার্থের অবস্থানকেই প্রাধান্য দেওয়া। তাতে কোনো রকম গণতান্ত্রিকতা চালিয়ে নেওয়া মুশকিল। কাছাকাছি মতাদর্শের রাজনৈতিক শক্তি, যেগুলো জাতীয় পর্যায়ে না হলেও স্থানীয়ভাবে অন্তত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাত্রলীগের সমকক্ষ বা তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে সেগুলোকে দমানোকে বহুকাল ধরে ছাত্রলীগ অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে সুদিনে ছাত্রলীগ  বরাবর একাকীই থেকেছে, কেবল যখন সামরিক স্বৈরাচারের আমলে চরম প্রতিকূলতায় পড়েছে, তখন সর্বদলীয় কমিটি করেছে। কিন্তু অনুকূল পরিবেশে এবং নির্বাচনের সময় বিরুদ্ধতায় যথেষ্ট কঠোর থেকেছে যাতে তাদের একক আধিপত্য বজায় থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হল, দেশে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতির অনেক প্রতিপক্ষ মাঠে সক্রিয় যাদের অনেকেই সম্ভবত আজ আন্তর্জাতিক জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের সাথেও যুক্ত আছে। এমনিতেই মুসলিম-প্রধান দেশে পঁচাত্তর পরবর্তীকালে দুই  স্বৈরাচার ও বেগম জিয়ার দুই দফা শাসনের সুবাদে মুসলিম জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে দেশে। বৃহৎ শক্তির বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে সাধারণভাবেই মুসলিমমানসে ক্ষোভ ও ক্রোধ তৈরি হয়েছে। এর রাজনৈতিক বহি:প্রকাশ যে কোনো সুযোগে ঘটতেও পারে। এক কথায় বলা যায় আইউব-জিয়া-এরশাদের মত সামরিক শাসকদের আমলের চেয়েও বর্তমান বাস্তবতা অনেক জটিল এবং কঠিন অনিশ্চয়তায় ভরা। বেগম জিয়ার বিএনপির রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও প্রগতির শক্তির বিরুদ্ধে এই সম্ভাব্য অপশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে - অন্তত অতীতের অভিজ্ঞতা তাই বলে।
ফলে সমাজে গণতন্ত্রের সংগ্রাম অনেক বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন আজ। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির সাথে সাথেই ছাত্রলীগসহ অন্যান্য প্রগতিশীল দল জোটবদ্ধ আন্দোলনে নেমেছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জনসহ অন্যান্য সাফল্য এসেছিল।
জিয়া-এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং তা ধরে রাখার জন্যে জবরদস্তি ও দখলদারির রাজনীতি চালু করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে প্রায় একই কৌশলেই এগুতে হয়েছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগকে। কিন্তু তখন ছাত্রলীগ সমমনা প্রগতিশীল দলগুলোকে কোনো অবস্থাতেই ছাত্রসংসদের নির্বাচনে বিজয় অর্জনের সুযোগ দিতে চায় নি। বিপক্ষশক্তি তো এ কৌশলেই এগুতে চেয়েছে, আখেরে ছাত্রলীগসহ সকলের সংগঠন নষ্ট হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ছাত্ররাজনীতি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। একটা সময়ের পর থেকে এদেশে আর কোনো পর্যায়েই ছাত্রসংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হচ্ছে না। যে পর্যায় থেকে নাগরিকরা গণতন্ত্রের সবক নেবেন, নেতা হওয়ার প্রশিক্ষণ পাবেন সেখানে গণতন্ত্রের চাকাই রুদ্ধ হয়ে গেল। যত স্বচ্ছ ব্যালেট বাক্সের ব্যবস্থা হোক না কেন একেবারে সাধারণ সদস্যদের নির্ভেজাল মতামতের ভিত্তিতে দলের কর্মকর্তা নির্বাচিত হওয়া সম্ভব বলে কারও বিশ্বাস হয় না।
অথচ বর্তমান জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধ রক্ষণশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে ওঠার আশংকার তলা থেকে দেশকে ধর্ম ও মত চর্চার সুস্থ আবহসহ একটি যথাযথ গণতান্ত্রিক বাতাবরণ উপহার দেওয়া জরুরি অগ্রাধিকার কর্ম বলে মনে করি। আর তা শুরু হতে পারত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রসংসদের নির্বাচন দিয়ে। কেবল একটি বিধান জারি করা দরকার যে, কোনো ছাত্রসংগঠন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার নীতি ও কর্যক্রম নিয়ে বৈধতা পাবে না। ফৌজদারি অপরাধে আদালতে শাস্তিপ্রাপ্তদের জন্যে নিষেধাজ্ঞা তো এখনও রয়েছে। সঙ্গে যুক্ত করতে হবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্যে সর্বস্তরে নিয়মিত ছাত্র হতে হবে এবং তাই প্রার্থীর বয়স কখনও ২৫ এর বেশি হতে পারবে না।
ছাত্রলীগকে মাত্র দুটি বিষয় শিখতে হবে - প্রয়োজনে সমমনা দলগুলোর সাথে আধিপত্য নয়, সমতার ভিত্তিতে জোট গঠন করে নির্বাচন করা এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে পরাজয় মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা।
সেই সাথে ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য সকল দলকে দুটি বিষয় ভুলতে হবে - কোনো পর্যায়ে কোনো অবস্থাতে দখলদারির মানসিকতা দেখানো এবং দখল বা কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্যে কোনো রকম অবৈধ পন্থা - জবরদস্তি বা সন্ত্রাসে জড়ানো - বন্ধ করতে হবে। তাহলে এ পর্যায়ে অন্তত গণতন্ত্রের পথ সুগম হবে। স্বভাবতই এর প্রভাব বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটেও শুভই হবে।
আমার মনে হয় কাজটা কঠিন নয়। কেবল ধারা পাল্টানোর ব্যাপার। বুঝি, শেখ হাসিনাকেই এটা চাইতে হবে, সূচনা করতে হবে।

***

Sunday, July 12, 2015

ঈদ-রোজার বিবর্তন ও বাজার অর্থনীতি

আবুল মোমেন

টিভি প্রতিবেদক যখন জিজ্ঞেস করল - কেমন ছিল ছোটবেলার ঈদ, আর এখনই বা কেমন দেখছেন উৎসব?
ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই ওর সামনে বসেছিলাম। কিন্তু ওর প্রশ্নটা ধাক্কা দিল মনের জানালায় - খুলে গেল স্মৃতির ঝাঁপি। আর সেসব তুলে আনতে গিয়ে একালের পরিবর্তন আর তার কার্যকারণ, ধরণ ইত্যাদি চিন্তার জটিল গ্রন্থিও খুলতে থাকল। সেসবই পাঠকের সাথে ভাগ করে নেওয়া যায়।
সেকালে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধশতকেরও বেশি আগেকার কথা, রোজা ছিল ঘরোয়া পরিসরে পালনের বিষয়। তাই ইফতার হত বাড়িতে বাড়িতে। ইফতার পার্টির কোনো স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। বাবা তো শহরের গণমান্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সূত্রে অন্তত জানতে পারতাম। না, তেমন কিছু ছিল না। কালেভদ্রে সরকারি কোনো আয়োজন হয়ত হত, তার সাথে সংসারের মানুষের কোনো যোগ ছিল না।
সেকালেও ইফতারে ছোলা-পেঁয়াজি-বেগুনি ছিল, কোনো দোকানের জিলাপির সুনাম থাকলে সেটি হয়ত আসত। তবে বয়েসি খানদানি রোজদারদের পছন্দ ছিল চিড়া-কলা-দই মাখা। একটু ঠাণ্ড হলে ভালো। সেহেরিতে একটা মূল পদ আর সাথে ডালের বেশি নয়। মূল পদটি প্রায়ই কখনও মাংস কখনও ডিম। কেউ কেউ অবশ্য দুধভাত খেতেন, তাতে প্রায়ই কলা থাকত, তবে আমের দিনে আমই কলার জায়গা নিত।
প্রতিবেশী আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সাথে ইফতারের আদানপ্রদানটুকু ছিল ঘরের বাইরে রোজার সংযোগ। মাঝে মধ্যে আত্মীয়-বন্ধু দু’চারজনকে ইফতারের আমন্ত্রণ জানানো হত। তাদেরই ডাকা হত যারা এলে ঘরোয়া আমেজ ক্ষুণ্ন হয় না। সবাই জানত রোজায় আড়ম্বর মানায় না। প্রায়ই পরিচিত গরীব আর ভিখিরিদের ডেকে ইফতার দেওয়া হত। এসব ও যাকাত দেয়া হত নীরবে, নিবৃত্তে। বিবাহিত কন্যা ও বৈবাহিকদের বাড়িতে ইফতারের তত্ত্ব পাঠানো হত।
ঈদ ছিল সামাজিক উৎসব। ছোটদের মধ্যে নতুন জামা নিয়ে চাঞ্চল্য ছিল, বেড়ানোর উৎসাহ আর পরিকল্পনা তাতে উত্তেজনা ছড়াত। কিন্তু তা কখনও ঘরের বা বৃহত্তর স্বজনের পরিধি ছাপিয়ে যেত না। সচরাচর একজনের একটার বেশি জামা হত না, ছোটদের আর মেয়েদেরগুলো বাড়ির সেলাইয়ে-পাকা বুবু-খালা-চাচিরাই তৈরি করে দিতেন। ছোটদের কাজ ছিল তাদের কাছে ঘুরঘুর করা, হাবভাবে তাগাদার আর্জি ফুটিয়ে তোলা। ছেলেরা আর বড়রা যেত পাড়ার দর্জির কাছে। ঈদের সকালে প্রতিবেশীদের সাথে সেমাই বিনিময় হত, আমরা প্রতিবেশী ও আত্মীয়বাড়ি বেড়াতাম, আর দুপুরে নিজের বাসায় ভালো খেতাম। পোলাও-মুরগিই হত মূল পদ। তখন খাবারে বা পোশাকে বাড়াবাড়ি মানুষ তেমন জানতই না। পোশাক বা খাবারের জলুসে নয়, বিচার যদি হত তা হত আতিথ্যের, আন্তরিকতার। কাজীবাড়ির চাচি কেমন মায়া করে খাওয়াতেন সে গল্প বাড়ি এসে মাকে বলতাম। স্বাদু খাবারের স্বাদ বাড়ত ছোটনানির স্বতস্ফূর্ত স্নেহের ফল্গুতে।
আমি গৎ বাঁধা ভাবনার মানুষ নই। সেকাল ভালো আর একাল খারাপ - এমন ভাবতে এবং ফতোয়া দিতে অভ্যস্ত নই। জানি যার যার শৈশব-স্মৃতি তার কাছে মধু-মাখা, ভোলার নয়, সেইসব স্মৃতি সততই সুখের। এও আমরা জানি কালে-কালে মানবজীবনে পরিবর্তন ঘটবেই। কথা হল তার কতটা ভালো হচ্ছে, কতটা কীভাবে আমরা নিজেদের মত করে সংস্কার করে নিতে পারতাম। সেদিক থেকে একটু তুলনা এবং ভাবনা চলতে পারে বলেই মনে হয়।
এখন বাজার অর্থনীতির রমরমা, বাজার মানুষের ব্যক্তিগত, এমনকি পবিত্রতম জায়গাতেও ঢুকে পড়ছে। বাজারের সহযোগীর বা উপজাতের ভূমিকা নিচ্ছে গণমাধ্যম। রোজা এলে এখন উপবাসের গুরুত্ব ছাপিয়ে ইফতারের প্রলোভনের পসরা সবটা জাঁকিয়ে বসে। এমনিতেই গণমাধ্যমে ইদানীং জনপ্রিয়তায় শীর্ষ অনুষ্ঠানের একটি হল রান্না অর্থাৎ মুখরোচক খাবার। রসনা ও ভোজনবিলাস মানুষের আদিম রিপু। তবে রোজার নৈতিক অবস্থান হল মানুষের অসংযত রিপুকে সংযত করা। কিন্তু বাজার ও গণমাধ্যমের যোগসাজশে রমজানের সারাটা মাস জুড়ে চেষ্টা চলে মানুষের ভোগের রিপুকে অসংযত করে তোলার - পত্রিকায় প্রতিদিন আর ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বিপুল আয়োজনে প্রায় সারাক্ষণ এই চেষ্টাই চলতে থাকে।
একজন মানুষ কত খেতে পারে, আর তার কতটা খাওয়া উচিত তার একটা সীমা নিশ্চয় আছে, থাকা উচিত। সারাদিনের উপবাসের পরে কোন ধরনের খাবার খাওয়া উচিত এসব যদি বিবেচনায় আসেও তা আসে কিন্তু প্রলোভনের ফাঁদটা ঢাকার জন্যে, কারণ মূল বিবেচ্য বিষয় কী করে মানুষকে বেশি বেশি খেতে প্রলুব্ধ করা যায়। কাউকে প্রলোভন দেখানো - বিশেষত সংযম শিক্ষা ও পালনের মাসে - উচিত কিনা তা একবার ভেবে দেখা যায় না?
দেখা যাচ্ছে মানুষ নিজের মান রক্ষার মানদ- হিসেবে ধরে নেয় ইফতার আইটেমের সংখ্যা এবং দামের ওপর, ফলে প্রায়ই দেখতে পাই - মাসটা উপবাস ও সংযমের হলেও এটি কাটাতে বাড়তি বাজেট লাগে। ইদানীং ঢাকায় রোস্তোরায় সেহেরি খাওয়ারও ফ্যাশান চালু হয়েছে। মাঝরাতে বা শেষরাতে অভিজাত পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেহেরি অভিযানে বেরুচ্ছে। বৈচিত্রের সাথে একটু বাড়তি রোমাঞ্চও যোগ হল, অবশ্যই উচ্চ মূল্যে এবং মাত্রাতিরিক্ত ক্যালরি অর্জনের বিনিময়ে - খারাপ কী!
আজকাল ঈদের কেনাকাটা রোজার অনেক আগে থেকেই শুরু করে মানুষ। বাজারই রুচি, ফ্যাশন তথা কেনাকাটার নির্ধারক। বাড়িতে আবার কেউ জামা সেলাই করে নাকি? সেসবে পারদর্শী বুবু-খালা-চাচিরা বর্তমানে বিলুপ্ত প্রজাতি। অথবা তাঁরাই হয়ত এখন একালের বুটিক মালিক-কাম-ডিজাইনার। এখনকার নীতিকথাও গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনই নির্ধারণ করে দিয়েছে - আগে ছিলাম বোকা এখন হইছি বুদ্ধিমান। বৈষয়িক উন্নতির পিছনে নিরন্তর বুদ্ধি খাটাতে থাকলে তাতে নিশ্চয় শান পড়ে, এবং বাজারের আঁটঘাঁট বোঝা হয়ে যায়। বুদ্ধির প্যাঁচ এবং চালাকির মারে কেউই পিছিয়ে থাকে না আর। কিন্তু এভাবে চললে বুদ্ধিরই বাড়বাড়ন্ত হবে, আর তার জের ধরে মানুষটার চাতুর্য, শঠতাও বাড়বেই। বিপরীতে কোন জিনিসটা পিছিয়ে যাবে? পিছিয়ে পড়বে বিবেচনা, প্রকৃত বুদ্ধি, যা শুধু ব্যবসাকে নয়, তার পেছনের মানুষটাকেও সমৃদ্ধ করে। কিন্তু বাজারের খপ্পরে পড়ে মূলধন তথা বিনিয়োগের সর্বোচ্চ মুনাফা আদায়ের মন্ত্রে মশগুল মানুষ চালাক-চতুর হওয়ার দৌড়েই এগুতে চায়। সেদিন কোনো চ্যানেলের ঈদ-বাজার পরিক্রমার বিশেষ অনুষ্ঠানে একজন সবাইকে টেক্কা দিলেন দামে, তাঁর দোকানের শাড়ির সর্বনিম্ন মূল্য দেড়লক্ষ টাকা, আর পাঞ্জাবির তিন কি চার হাজার টাকা!
ফলে টিভি প্রতিবেদক যখন আমাকে প্রশ্ন করল আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য কিছু দেখেন কিনা ঈদের আয়োজনে, তখন প্রথমে একটু তাত্ত্বিক কথা বলে পরে আসল কথাটা পাড়লাম। তাত্ত্বিক কথাটা সামান্য। একালে যোগাযোগে সত্যিই একটা বিপ্লব ঘটেছে - তা সড়কে-উড়ালে যেমন তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণেও, মানুষের চলাচলও অনেক বেড়ে গেছে। বললাম শিল্প বিপ্লবোত্তর আধুনিকতার একটি বৈশিষ্ট্য হল সর্বজনীনতা (universality) এবং সামান্যিকরণ (generalisation)- অর্থাৎ সবকিছু সবার কাছে পৌঁছায় আর সবার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাযুজ্য তৈরি হওয়ার প্রবণতা জোরদার হতে থাকে। এটা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং বৈশিষ্ট্য রক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি স্বরূপ। কিন্তু এটাই ট্রেণ্ড বা চলতি-হাওয়া। ব্যক্তিগত  অভিজ্ঞতা আর গণমাধ্যমের প্রচারণায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বিশেষত্বেও পরিবর্তন ঘটছে। ফলে ঈদের আয়োজনে বা ইফতারের আয়োজনে সবাই কাছাকাছি চলে আসছে, ব্যক্তির বিশেষত্ব কমছে। মূল কারণ বাজারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। আদতে বাজারই বলে দিচ্ছে এ বছরের ঈদের আয়োজনে কোন কোন আইটেমের কদর বাড়বে। একই কথা খাটে ইফতারের ক্ষেত্রেও। তাই প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে জানাতে হল - এখন পার্থক্য ঘটে ট্যাঁকের শক্তির ওপর। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের অধিকাংশ মানুষের ঈদ শপিং-এর ঠিকানা ঢাকায় গাউছিয়া আর চট্টগ্রামে টেরিবাজার, রেয়াজুদ্দিন বাজার। যেগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ও মিডিয়া ব্যক্তিরা চেঁচিয়ে মরেন সেখানে হাত দেওয়ার সাধ্যি নেই তাদের। আর দেশে এখনও সংখ্যায় কম নয় দরিদ্র মানুষ - জনসংখ্যার ৩০ ভাগ - যারা নিজের উপার্জনে রোজা বা ঈদের বিশেষ সংস্থান করতে পারে না। তাদেরই ২৭ জন এবারে প্রাণ দিলেন জর্দা-খেকোদের কল্যাণে হঠাৎ-নবাবের বাড়ির দরজায় তাঁরই বড়লোকি অবিমৃষ্যকারিতায়।
শেষ কথা : উপলক্ষের মূল শিক্ষা আর মৌলিক মানবিক নীতিবোধ বাদ দিয়ে কোনো উৎসব, ব্যবসা, উপলক্ষকে মানবিক রাখা মুশকিল। মনে মনে জানি, মুশকিল বললে কম বলা হয়, আদতে অসম্ভব।

***




Saturday, July 11, 2015

দুই প্রজন্মের আওয়ামী লীগ

আবুল মোমেন
১.
আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সনে। মাত্র দু’বছর আগে জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগ সব স্তরের বাঙালি মুসলিমকে পরাধীনতা আর সামাজিক পশ্চাৎপদতার গ্লানি থেকে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর করেই ধর্মীয় জাতীয়তার রাজনীতিতে টেনে পাকিস্তান এনেছিলেন। তরুণ শেখ মুজিবও ছিলেন মুসলিম লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তান বাঙালির জন্যে নতুন পরাধীনতা ও নতুনতর পশ্চাৎপদতা সৃষ্টি করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই উত্তর-পশ্চিমের দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণের জাতগুলো অপেক্ষাকৃত কৃশকায় শ্যামবর্ণের বাঙালিকে - কি মুসলমান, কি হিন্দু-হীন জাতি হিসেবে অবজ্ঞা করে এসেছে। তাছাড়া উপমহাদেশে ইসলামের অ্যাকাডেমিক চর্চা হয়েছে উর্দুতে এবং ব্রিটিশ শাসকেরা উত্তর-পূর্বের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলের শিক্ষার মাধ্যম করে দিয়েছিল উর্দুভাষা। ফলে মুসলমানদের জন্যে সৃষ্ট দেশের শ্রেয়তর নাগরিকের দাবিতে মুসলিম লীগের অবাঙালি প্রভাবাধীন নেতৃত্ব বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গকে উপনিবেশের দৃষ্টিতেই দেখেছে। তাদের জন্যে কাজটা সহজ হয়েছে বাঙালি অভিজাতদের মজ্জাগত হীনম্মন্যতা ও পরশ্রীকাতরতার কল্যাণে। হীনম্মন্য অভিজাতরা ক্ষমতাধরদের তোষামোদ ও চাটুকারিতায় ভোলাতে চেয়েছেন, এবং আত্মসম্মানের বিনিময়ে নিজেদের জন্যে ক্ষমতার কিছু প্রসাদ জুটিয়ে নিয়েছেন। আবার মজ্জাগত পরশ্রীকাতরতার কারণে তারা পরস্পর কলহে লিপ্ত থেকেছেন, ফলে এই ক্ষয়িষ্ণু বাঙালি নেতারা কেন্দ্রে কখনও ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন নি।
আমরা জানি ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলার নিম্নবর্গের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে, রাজা ও রাজন্যদের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির দু’বছরের মাথায় গঠিত দল আওয়ামী লীগকে বলা যায় সর্বসাধারণের রাজনৈতিক মঞ্চ। মওলানা ভাসানী এ দলের সভপতি হিসেবে যথার্থই ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ-ত্যাগী অভিজাতদের নিয়ে দল প্রায়ই সমস্যায় পড়েছে। দলে সাধারণদের মুখপাত্র ছিলেন তরুণ সংগঠক মুজিব। পালযুগে কৈবর্ত বিদ্রোহে যেমন বিদ্রোহী জেলেদের নেতা ছিলেন দিব্যক, ব্রিটিশ যুগে বিদ্রোহী চাষীদের নেতা ছিলেন নূর আল দীন বা তিতুমীর তেমনি এ সময়ে মুুজিব যেন বাংলার বঞ্চিত নিপীড়িত সাধারণের নেতা হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করলেন। সাধারণের এই নেতা এক পর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছেন দলের অভিজাত নেতাদের নিয়ে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে ক্ষুব্ধ নেতা লিখেছেন, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়। (পৃ. ২৭৩)
২.
দুটি কারণে আওয়ামী লীগ এদেশের উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে এই শ্রেণি পাকিস্তানের শাসকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন প্রত্যাশা করছিল এবং সব শ্রেণির অন্তর্ভুক্তিমূলক বঞ্চনামুক্ত সমাজের স্বপ্ন তাঁদের অধিকাংশকে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত করেছিল। এই সচেতন দেশপ্রেমিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি জাতীয়তাবাদী জাগরণের জন্যে উন্মুখ ছিল। ততদিনে পরিণত দূরদর্শী শেখ মুজিব এদেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল প্রবক্তা এবং প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। জননায়ক শেখ মুবিজকে ঘিরে গণজোয়ার এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একসময় বামপন্থী দলগুলোর জন্য হয় তাঁর সহযাত্রী হওয়া নয়ত বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য গতির উপায় থাকল না।
সেদিনে পরিস্থিতিই গণতান্ত্রিক দলে এবং গণতন্ত্র-প্রত্যাশী সমাজে একক নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারই অনুষঙ্গ হয়ে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। চুয়ান্নর নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে এখানে মুসলিম লীগের সংগঠন ভেঙে পড়েছিল, তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতার প্রসাদ দিয়ে টিকিয়ে রাখছিল মাত্র। ফলে বিরোধী দল হলেও তখন থেকেই আওয়ামী লীগ এদেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের সবটা জুড়েই তৎপর ছিল। এটা রাষ্ট্রীয় না হলেও দলের সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। আর পূর্ববঙ্গে পুরো ষাটের দশক জুড়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংকুচিত ও সমাজের ক্ষমতা প্রসারিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ তখন থেকেই এদেশের বড় দল, ক্ষমতাধর দল। দীর্ঘদিন এই অবস্থানে অভ্যস্ত দলের নেতা-কর্মীরা স্বভাবতই ক্ষমতাধরের মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছে। যার যার পরিসরে কর্তৃত্ব, মুরুব্বিয়ানা এবং সেই সূত্রে সাঙ্গপাঙ্গসহ নিজস্ব কায়েমি স্বার্থের ক্ষমতাবলয় তৈরির প্রবণতা দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। এ প্রবণতাকে ঠেকানোর অস্ত্র যে-রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো তাকে অকার্যকর করে রাখার বিষয়ে এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগসাজশ ঘটবেই। এর বিষময় ফল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর থেকেই ভোগ করছে। হয়ত এখন তা আরও বেড়ে গেছে। আমরা সরাসরি আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে হয়ত বলতে পারি, দেশকে এই অগণতান্ত্রিকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত কারার দায়িত্ব আপনাদেরকেই নিতে হবে। মনে হয় না এতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব অখুশিও হবেন। কারণ এতে তো মান্যতাই প্রকাশ পায়, যাচ্ঞা করার মত আর কোনো বিকল্প আজও তৈরি না হওয়া তো তাদের জন্যে শ্লাঘারই বিষয়।
৩.
গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের জন্যে যারা প্রাণপাত করছি তারা কেন এই ক্ষমতাধর দলের বিকল্পের - যদি শূন্যতা নাও বলি - সংকট নিয়ে কথা বলছি না ? ১৯৪৮ এর জানুয়ারি থেকে - অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসের মাথায় - রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে নতুন জাতির ভ্রুণ তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের ভিতর দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার কাক্সিক্ষত পরিণতি কি বিএনপি নিশ্চিত করতে পারে? বিএনপি আন্দোলনের প্রশ্নে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। কিন্তু কেবল যুদ্ধাপরাধ নয় এ দল তো আদতে গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না, ধর্ম ও লিঙ্গ-সমতাও তো মানে না যা গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত? সে দলকে সঙ্গে রেখে কী করে বায়ান্ন থেকে একাত্তরের লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ হবে? যদি বিএনপির শক্তিশালী সক্রিয় সংগঠন থাকত তাহলে জামায়াতকে ক্ষমতার অংশীদার করা নিয়ে ততটা আশংকা থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হল বিপুল সমর্থক আছে বিএনপির, আর সংগঠন রয়েছে জামায়াতের। ফলে ক্ষমতার ফায়দা তারাই অনেক বেশি উশুল করবে। আর আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে যেসব জঙ্গি গোষ্ঠী আজ মানবতাবিরোধী মারাত্মক সন্ত্রাস চালাচ্ছে তার শাখা-প্রশাখা এই মুসলিমপ্রধান দেশেও তো ছড়াচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তারা প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হবে, কারণ জোটের অগ্রাধিকার পাবে আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার পাল্টা প্রতিশোধ।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত করতে অবশ্যই আওয়ামী লীগের বিকল্প দল চাই। সে দল আওয়ামী লীগের চেয়েও এগিয়ে রাজনীতি করতে পারে যদি তারা একদিকে রাজনীতিতে সমাজের নিম্নবর্গের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্যদিকে ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়ার বিপর্যয়কে মাথায় রেখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তার আদর্শকে ধারণ করে। বলে রাখা দরকার, বিগত ৬৬ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে দলটি অত্যন্ত সজীব, এবং বাস্তবতা অনুধাবনে দক্ষ, এমনকি প্রয়োজনে সৃজনশীল হতেও সক্ষম। এভাবে দলটি ষাটের দশকেই বামপন্থীদের প্রায় অকেজো করে ফেলেছিল, এখন ইসলামপন্থী রাজনীতির ঘরে হানা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর এই দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্যাদার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। আওয়ামী লীগ তার চেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক দলের জায়গা প্রায় পুরোপুরি দখল করে এখন তার চেয়ে পশ্চাৎপদ দলের জায়গায়ও দখল বাড়াচ্ছে। তা তাকে করতেই হচ্ছে কারণ সেদিকে সমর্থক-ভোটারের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়। পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি আর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোরতার মাধ্যমে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও ধরে রেখেছে। এটাই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অকৃতকার্য হয়েও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নিশ্চিত থাকার কারণ।
ফল হল এই, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্রয়ে-আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতা ভোগ করে যাওয়ার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। মধ্যপন্থী দল হওয়ার সামর্থ্য রেখেও নিজের শক্তিতে নিজের স্বতন্ত্র জায়গাটি ধরে একা দাঁড়ানোর সাহস নেই বিএনপির। ফলে আপাতত পাল্টা প্রশ্ন হল একা হাসিনা কি দলে ভিড়ে থাকা উচ্চাভিলাষী, ভাগ্যান্বেষী তরুণ বা পাতিনেতাদের সামলাতে পারবেন? মনে হয় না এটা সম্ভব। এদের হাতে দিনে দিনে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং তাতে তিনি তো ভুগবেনই, ডুববে দেশ। এতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী ক্ষমতা, অধিকতর ক্ষমতার নিশ্ছিদ্র সুরক্ষায় বন্দী হয়ে যাবেন, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যদের স্বাধীনতাও হ্রাস পাবে, গণতন্ত্র আরও সংকুচিত  হবে। তাছাড়া তলে তলে রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকবে।
তাহলে বাংলাদেশ কি আপাতত আওয়ামী লীগপন্থী ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনীতিতে বিভক্ত হয়েই থাকবে? মনে হয় নাগরিক সমাজ এক্ষেত্রে কিছু করতে পারে। এক. আওয়ামী লীগের ওপর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও দল-পরিচালনার প্রক্রিয়া প্রবর্তনের জন্যে চাপ তৈরি করতে পারে। দুই. রাজনীতিকে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্ত্র ও কালোটাকা থেকে মুক্ত রাখার জন্যেও চাপ তৈরি করা যায়। তিন. ইসলামের প্রকৃত মানবিক সহনশীল রূপটি তুলে ধরে মুসলিমসমাজেও যে বহুমতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যুগপৎ ইসলাম ও সুশাসন ভালোভাবেই বিকশিত হতে পারে তার পক্ষে জনমত তৈরি করতে পারে। চার. পুরোনো সমাজব্যবস্থা ও ধ্যানধারণার অচলায়তন ভেঙে সমাজের নবায়ন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানবিক বিকাশমান সমাজ কায়েমে কাজ করতে পারে। ইতিহাসের আলোকে গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের ধারা এবং ধর্মান্ধ রক্ষণশীল সমাজের সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা করে দেখা উচিত।
কোনো সমাজ যথার্থভাবে গণতন্ত্রের উপযোগী হয়ে উঠলেই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। এমনকি সে কাজ শেখ হাসিনাও করতে পারেন যদি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বেড়াজাল তিনি ভাঙতে চান।
***


Saturday, July 4, 2015

৬৬ বছরের আওয়ামী লীগ

আবুল মোমেন

দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সম্প্রতি দলের ৬৬ বছর পূর্তি উদযাপন করল। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠনে শেখ হাসিনা বলেছেন দেশে দুটি রাজনৈতিক ধারাই আছে - আওয়ামী লীগ ও এন্টি আওয়ামী লীগ। এ কথা তিনি আগেও বলেছেন, নাগরিকসমাজেরও কেউ কেউ একই কথা বলে থাকেন। কথাটা ভুল বা মিথ্যা নয় বলেই মনে হয়।
মুসলিম লীগের বিকল্প হিসেবেই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের চিন্তা মাথায় এসেছিল মওলানা ভাসানি, শামসুল হক, শেখ মুজিবের। সেজন্যেই তাঁরা মুসলিম লীগ নামটির আগে বিশেষণ হিসেবে আওয়াম বা সাধারণ জনের কথাটা যুক্ত করেছিলেন। মুসলিম লীগে ভীড় করেছিলেন ভারতবর্ষের মুসলমান অভিজাতরা। বাঙালি মুসলিম সমাজে তখন বংশগত অভিজাত পরিবার কম। এখানে কৃষক পরিবারের শিক্ষিত সন্তানরাই মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে অভিজাত্য গৌরব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলে জনবিচ্ছিন্ন ছিল মুসলিম লীগ। তাই অবিভক্ত ভারতে বাংলা-ভিন্ন পাকিস্তানে যুক্ত হওয়া অন্য কোনো প্রদেশে মুসলিম লীগ বিজয়ী হতে পারে নি।
মুসলিম লীগ সমাজ থেকে উঠে আসা দল নয়। মুসলমানদের সেরকম সংগঠনও ছিল, যেমন জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ, তরিকায়ে মোহাম্মদিয়া, মুসলিম সাহিত্য সমাজ, রেনেসাঁ সোসাইটি ইত্যাদি। কিন্তু এদের শেষের দুটি অরাজনৈতিক সংগঠন, অন্য দুটির রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রধান এজেণ্ড ছিল ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম। ফলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার হিন্দু মুসলিম উভয় স্বাধীনতাকামীর বিপক্ষে দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই সৃষ্টি করেছিল মুসলিম লীগ। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট দল ক্ষমতা বা ক্ষমতার প্রসাদ ভিন্ন টিকে থাকতে পারে না। তদুপরি পড়ে পাওয়া ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে কামড়া-কামড়ি হওয়াই স্বাভাবিক। এ হল অভিজাতদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব। তাতে রাজনীতিতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, স্বার্থের চক্রান্ত, আপোসকামিতা, লেজুড়বৃত্তি, রাজনীতিকদের ডিগবাজি খাওয়া ইত্যাদি নিত্যকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই এসব খেলা শুরু হয়ে যায়। তাতে অন্তত তরুণ শেখ মুজিব বুঝেছিলেন এসব নেতাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার রাজনীতি হবে না। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে খেদের সাথে এই উপলব্ধির কথা তিনি লিখেছেন - ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ (পৃ. ২৭৩) তাঁর এ উপলব্ধি অবশ্য আরও পরের, চুয়ান্ন সনে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে কেন্দ্রীয় সরকার এদেশে ৯২/ক ধারা জারি করার পর নেতাদের ভীরুতা, আপোসকামিতার পরিপ্রেক্ষিতে।
কিন্তু সংবেদনশীল, সাহসী, জনদরদী এই রাজনৈতিক কর্মী গোড়া থেকেই নেতৃত্বের এই দোদল্যমানতা ও স্বার্থকামিতা খেয়াল করেছেন। ফলে মুসলিম লীগের বিকল্প দল গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্যে। সেভাবে দলটি আওয়াম মুসলমান বা আমমুসলমান অর্থাৎ মুসলিম জনগণের দল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরে ভাষা আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্টের অভিজ্ঞতায় তিনি উপলব্ধি করেন পূর্ব বাংলাকে ঘিরেই তাঁর রাজনীতি আবর্তিত হবে। ফলে তার রাজনীতির জন্য মুসলমান পরিচয় নয় বাঙালি পরিচয়ই হল প্রধান বিষয়। এভাবে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ পড়ল। এ দলটি হয়ে উঠল ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে আম বাঙালির দল। রাজনীতির হাল ধরেই শেখ মুজিব একজন রাজনৈতিক কর্মী থেকে জাতির নায়ক ও পিতা হয়েছেন। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ মুসলিম লীগের বিকল্প দল থেকে বাঙালিমাত্রের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছিল।
তবে ইতিহাসের পথ অনেক দূর পাড়ি দিয়েও বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয়ের সংকট আজও কাটাতে পারে নি। এই মুসলিম আইডেন্টিটি আর তার সাথে ক্ষমতার ষড়যন্ত্র বরাবর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকিয়েছে। নানা নামে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ বা এই মুসলিম আইডেন্টিটির রাজনীতি পাকিস্তান আমল জুড়ে এ কাজ করেছে।
বাংলাদেশেও এর পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় নি। ১৯৭৫ এর পরে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের মত ঠিক এই কাজটি করেছেন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের গর্ভেই যেমন  আইউবের কনভেনশন লীগের জন্ম তেমনিভাবে জন্ম জিয়ার বিএনপির। আইউব যেমন দল গঠনের আগে রাজনীতিবিদদের জন্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে এবডো (ইলেকশন বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার) জারি করেছিলেন জিয়াও তাঁর দল গুছানোর সময় নেওয়ার জন্যে সরাসরি রাজনীতিই নিষিদ্ধ করেছিলেন। উভয় সরকার-প্রধানই প্রগতিশীল শক্তির জন্যে জেলজুলুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, উভয় জেনারেলেরই মূল টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগকে শায়েস্তা করা। একজন বিশেষভাবে জীবিত শেখ মুজিবকে নানাভাবে বিনাশের চেষ্টা করেছেন। আরেকজন নিহত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন থেকে গেলেন, আর অনুপস্থিত নেতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রতিবারই আওয়ামী লীগ সকল বাধা ডিঙিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়েছে, পরিস্থিতি সামলেছে।
বর্তমান বাস্তবতায়ও আমরা দেখছি ক্ষমতায় বসে জেনারেলরা যে দুটি দল তৈরি করেছেন তাদের পক্ষে কোনো কালে নিজস্ব রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংগঠন দাঁড় করানো সম্ভব হয় নি। মুসলিম লীগ যেমন ১৯৫৪ সনে প্রদেশে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জায়মান বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সামনে দাঁড়াতে পারেনি কখনও, বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত বিএনপিও সরকারি চাপে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েছে। এ বিপর্যয় দলটি কাটাতে পারবে কিনা বলা মুশকিল। আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে সরকারের লেজুড় হয়েই টিকে থাকতে হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে এটি একদিকে একটি প্রতারক ফাঁদ আর অন্যদিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। প্রতারক এ জন্যে যে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার এ দলগুলো দুর্বল হওয়ার অর্থ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পথ নিরঙ্কুশ হওয়া নয়। কারণ রাজনীতির এত চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এবং সর্বস্তরে বিশ্বায়ন-আধুনিকায়নের প্রভাব পড়া সত্ত্বেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এখনও আত্মপরিচয়ের বিভ্রান্তি কাটাতে পারে নি এবং তাই এদেশের রাজনীতিতে ইসলাম ও ধর্মান্ধতার ভূমিকা থেকে যাচ্ছে। ফলে এর মধ্যে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থেকে যায়। আর এর বিপজ্জনক দিক হল, যদি প্রতিপক্ষ-শক্তি দুর্বল ও অকেজো হয়ে পড়ে, তবে ক্ষমতাসীন দলের হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা পুঞ্জিভূত হয় এবং তাতে তাদের ফ্যাসিবাদী রূপ ধারনের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। বলা বাহুল্য, এতে গণতন্ত্র সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, দেশের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে যায়। তাই যেকোনো অবস্থাতেই দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে আজ অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তাঁদেরই গণতন্ত্র রক্ষা ও এর বিকাশে সক্রিয় এবং সোচ্চার হতে হবে।

***