Wednesday, March 18, 2015

সৃজনশীলতার পক্ষে আরেক ধাপ

আবুল মোমেন

গতকালের পত্রিকায় বলেছিলাম রাজনীতিতে সৃজনশীলতা প্রয়োজন। দেশের আন্দোলনরত প্রধান বিরোধী দলের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেছিলাম। কারণ দেশ অচল না হলেও এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে জনগণ তাদের আন্দোলনের ফলে।  আর আন্দোলনের ডাক দিয়ে খোদ বিএনপি নিজেই জটিল আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না অল্প কয়েকজনের জেদের প্রতিফলন ঘটছে এই কাগুজে আন্দোলনে।
আমরা বিরোধী মতামতের প্রতি সরকারের অনুদার কর্তৃত্ববাদী ও দমনমূলক ভূমিকা সমর্থন করি না, সমালোচনা করি। কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের আন্দোলনের সাথে দেশব্যাপী যেভাবে পুড়িয়ে মানুষ মারা ও অন্যান্য নাশকতা চালানো হচ্ছে তাকে কিছুতেই সমর্থন জানানো যায় না। তদুপরি এর ফলে সরকার বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এতে নেতা-কর্মীরা এবং দল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। আন্দোলনের অনুষঙ্গ এই ভয়ঙ্কর তৎপরতা চলতে দিয়ে সরকারকে আলোচনায় বসতে বলা যায় হয়ত, কিন্তু সরকারের পক্ষে তা শোনা কি সম্ভব?
পরিস্থিতি যা তাতে বিএনপিকেই কর্মী-নেতাসহ দলকে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার ধাপে ধাপে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিতে পেরেছে বিএনপি নির্বাচনের পর থেকে একের পর এক সরকারকে ওয়াক ওভার দেওয়ার ফলে। এখনও নেপথ্যে থেকে যেভাবে কাগুজে আন্দোলন চালাচ্ছে তাও এক ধরনের ওয়াক ওভার।  সরকার ও বাহিনীগুলো তৎপরতা চালানোর যথেষ্ট জায়গা পাচ্ছে। আর যদি বিএনপি-জামায়াত এ পর্যায়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় নামে তাহলে তার তাপ লাগছে এবং ভোগান্তি পোহাচ্ছে জনগণ। অর্থাৎ সে আন্দোলন যতটা না সরকারের বিরুদ্ধে তারচেয়ে বেশি কার্যকর হবে জনগণের বিরুদ্ধে। তাতে জনগণ নিশ্চয় বিএনপির ওপর অসন্তুষ্ট হবে, ক্ষুব্ধ হবে।
এখন বিএনপির জন্যে বাংলা প্রবাদ ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ই খাটবে। তবে তাদের নিশ্চেষ্ট বসে থেকে অপেক্ষা করলে চলবে না। দল গুছানো এবং সঠিক কার্যক্রম নির্ণয়ই প্রথম কাজ। তারেক রহমান নেতৃত্বে দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন না। আপাতত ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে সংগঠন এবং এদেশের রাজনীতি বোঝেন এমন নেতাদের ওপর ভরসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাঁরাই বসে করণীয় সম্পর্কে দলের নেত্রীকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ হওয়া এবং তাঁদের মতামতকে দলে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। তারপর সর্বস্তরে দলকে গুছিয়ে তুলতে হবে মূলত এলাকার গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে। এরপর জনগণকে সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে হবে। সরকারের সঙ্গে বৈঠকে যেতে পারলে বিএনপি লাভবান হবে। বৈঠক সফল হলে লাভ তো হবেই, আর তখন ব্যর্থ হলে তার দায় সরকারের ওপর পড়বে। ফলে বৈঠকে বিএনপির হারানোর কিছু নেই।
একঘেয়ে কাগুজে আন্দোলনের কারণে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে, দেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং এর দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপছে। এ ধরনের ভ্রান্ত এবং নেতিবাচক কাজ দলের স্বার্থেই বিএনপির বন্ধ করা উচিত।


***

শিক্ষা কিংবা রাজনীতি ছেলেখেলা নয়

আবুল মোমেন

আমরা নিশ্চিত জানি কোনো রাজনৈতিক দলই শিশুদের প্রতি বিরূপ নয়। শিশুদের ক্ষতি হোক এমনটা কেউ চাইতে পারে না।
কিন্তু বিরোধী দলের ডাকে যে হরতাল-অবরোধ চলছে তাতে একতরফাভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। কারণ হরতাল মোটামুটি কাগুজে আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত বাকি সবই চলছে। স্বাভাবিকভাবে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের কল-কারখানা এবং বাণিজ্যিক অফিসও রয়েছে। শুধু হতে পারছে না পড়াশুনা।
এটা বলে বোঝানোর দরকার নেই শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা আজ বিরোধী দলে আছেন তারা একদিন সরকারে যাবেন, যেমন অতীতে ছিলেন ক্ষমতায়। তাঁদেরই দেশ চালাতে প্রয়োজন হবে শিক্ষিত দক্ষ কর্মীদল। আজকের শিশু ও শিক্ষার্থীরাই তো দেশের ভবিষ্যত। দেশের ভবিষ্যত নষ্ট করে দেশের মানুষের উপকার করা তো সম্ভব নয়। শিশুদের জন্যে এটি একটি অরাজক পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতই পড়া দেওয়া হোক, বাড়িতে পড়তে বসুক, সেটা ঠিক নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার মত সুফল দেবে না। ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্রে জানতে পারি যে শিশুরা স্কুলের নিয়মের বাইরে চলতে চলতে পড়তেই চায় না। এ বয়সে এভাবে পড়ায় মন বসে না, খেলার দিকে মন পড়ে থাকে। এ খেলাও কোনো কাজের খেলা হবে না। তাদের তো মাঠে গিয়ে ঠিক মতো খেলার উপায় নেই। ঘরের মধ্যে ডানপিটেমি হয়, খেলা হয় না। কারণ খেলাও একটা নিয়মবদ্ধ শৃঙ্খলার বিষয়।
রাজনীতিও একটা ডিসিপ্লিন। রাজনীতি করেই রাজনীতিবিদ দেশ শাসন করবেন, দেশকে আইনের মাধ্যমে শৃঙ্খলায় চালাবেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের নিয়মনীতি আছে। এ কোনো ছেলেখেলা নয়। মানুষের প্রাণহানি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে না। ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাঞ্জাবের চৌরিচৌরাতে কয়েকটি প্রাণহানি ও নাশকতার ঘটনা ঘটলে এর নেতা মহাত্মা গান্ধি সারা ভারতবর্ষের অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
আজ এদেশে শুধু পেট্রোল বোমায় পুড়ে মারা গেছে শ’খানেক মানুষ। এ বীভৎস কাণ্ড চলছে দু’মাসের ওপর। কিন্তু সাধারণের প্রাণঘাতি এ ‘আন্দোলন’ চলছেই। রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে এবং মানুষের প্রাণ নিয়ে ছেলেখেলা কিছুতেই চলতে দেওয়া উচিত নয়।
একইভাবে সরকারি বাহিনীর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে ছেলেখেলা এবং মানুষের প্রাণ নিয়ে ছেলেখেলাও অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বন্দুকযুদ্ধেও কম প্রাণহানি হয় নি।
এভাবে দিনে দিনে আমরা আইনের বাইরে বলে যাচ্ছি। রাজনীতিকদের টানাপোড়েনে দেশটাই কি আউটল হয়ে যাবে নাকি!
আমাদের আইনের কাছে নিয়মের কাছে ফিরতে হবে। সর্বত্র শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নয়ত শাসক থাকবেন, তাঁদের শক্ত শাসনদণ্ডও চলবে, কিন্তু তার তলে তলে ও ফাঁকে ফাঁকে সমাজে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে, অপরাধ বাড়বে। মানুষের জীবনে শান্তি স্বস্তি চলে যাবে।

***

Thursday, February 19, 2015

চট্টগ্রাম মাতৃভাষা সংগ্রামেও পিছিয়ে ছিল না

আবুল মোমেন

ভাষা আন্দোলনের মাসে ভাষার কথায় আসা যাক। এ প্রজন্মের তরুণদের জানা প্রয়োজন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে চট্টগ্রামের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ঢাকার পাশাপাশি একই সময়ে চট্টগ্রামেও গঠিত হয়েছিল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। এ পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তখনকার তরুণ বামপন্থী কবি ও সংস্কৃতিকর্মী মাহবুবউল আলম চৌধুরী। যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন যুবলীগের সংগঠক ও পরবর্তীকালে বিখ্যাত শ্রমিক নেতা  চৌধুরী হারুনর রশিদ। এ সময় এ আন্দোলনে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন যুবলীগের তরুণ কর্মীরা।
এই সাথে মনে রাখতে হবে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি নিয়ে ভাষা আন্দোলনে শরিক হয়েছিল তমদ্দুন মজলিশও। এর দুই শীর্ষনেতা, পরবর্তীকালে বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবুল কাশেম এবং তরুণছাত্র ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ১৯৬৬ সনে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াত ড. মাহফুজুল হকও ছিলেন চট্টগ্রামের মানুষ।
বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারি ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ ও অসংখ্য ছাত্র হতাহত হওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রাম বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পরের দিন বাইশে ফেব্র“য়ারি লালদিঘির মাঠে সভা ডাকে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন রাতেই কবি মাহবুবউল আলম চৌধুরী প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরের মধ্যে রচনা করেন একুশের প্রথম কবিতা - ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। জ্বরের প্রচণ্ডতায় তিনি নিজের হাতে লিখতে পারেন নি। মুখে মুখে বলে গেছেন আর সঙ্গী চৌধুরী হারুন তা লিখে নিয়েছিলেন। কবিতাটি দীর্ঘ, বক্তব্যপ্রধান, আবেগপ্রবণ, আবার সেই সাথে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় লক্ষ্যপূরণের দৃঢ়সংকল্পে মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম। মুসলিম লীগ সরকার প্রেস থেকেই এটির মুদ্রিত কপি বাজেয়াপ্ত করে, কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং মুদ্রাকর ও প্রকাশককে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তখন তো ভাষা আন্দোলনের আবেগ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কবিতাটি যেন ছাইচাপা আগুন। আজ এটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ আমাদের।
চট্টগ্রামে ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষ ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। কেবল শহরে নয় বিভিন্ন মহকুমা ও থানা শহরে স্কুল-কলেজকে কেন্দ্র করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল আন্দোলন। সাহিত্যিক আবুল ফজল, কবিয়াল রমেশ শীল, তরুণ লেখক সুচরিত চৌধুরীসহ সর্বস্তরে এ আন্দোলনের পক্ষে মানুষ অবস্থান নিয়েছিল। অন্তত আমার জানা মতে আজও চট্টগ্রাম শহরে দু’জন ভাষা সৈনিক জীবনসায়াহ্নে উপনীত হয়ে দিনযাপন করছেন - এঁদের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এ কে এম এমদাদুল ইসলাম এবং অন্যজন বিশিষ্ট সমাজসেবক কৃষ্ণগোপাল সেন।
বাংলাভাষার চর্চা ও প্রসার নিয়ে চট্টগ্রামের গর্ব করার মত আরও বিষয় রয়েছে। মধ্যযুগে যখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা স্তিমিত তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ আরাকান রাজসভায় রীতিমত বাংলাসাহিত্যের রাজসিক দরবার চলছে। আলাওল, সৈয়দ সুলতান, মাগন ঠাকুর প্রমুখ তাঁদের সাহিত্য রচনা করে যাচ্ছিলেন যেগুলো আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে পড়া হয়।
শুধু সাহিত্যচর্চা নয়, ভাষার অধিকার রক্ষার জন্যে সুদূর সপ্তদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের অন্তর্গত সন্দ্বীপ থেকে এক কবি বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদী আওয়াজ তুলেছিলেন। সন্দ্বীপের সেই কবি আবদুল হাকিম রীতিমত তিরস্কার করে লিখেছিলেন - ‘ যেসব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি/ দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/ নিজ দেশ ত্যাগী কেন বিদেশ ন যায়।’
তাঁর কবিতায় মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কী তীব্র, আর এর অবহেলাকারীদের প্রতি কী কঠোর ধিক্কার না প্রকাশ পেয়েছে।
এই উত্তরাধিকার মনে রেখে আমরা যেন বর্তমানকে একবার দেখি এবং ভবিষ্যতে মাতৃভাষা সুরক্ষার জন্যে নিজেদের করণীয় ঠিক করি।

এ কোন্ পথে চলেছে ওরা?

আবুল মোমেন

নিরীহ মানুষকে হাত বেঁধে চোখ বেঁধে ছুরি দিয়ে জবাই করা কি ইসলামের শিক্ষা হতে পারে? তারা অন্য ধর্মাবলম্বী হলেও? কোনো বন্দি মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করা কি ইসলাম? শিয়াপন্থী মুসলমানের মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে নির্বিচারে তাদের হত্যা করা কি ধর্মসম্মত কাজ হতে পারে?
ইসলামের শিক্ষা এটা নয়। নবীজীর শিক্ষাও এটা নয়। যে প্রাচীন গোত্রভিত্তিক হানাহানি বন্ধ করার জন্যে হযরত মোহাম্মদ (স:) ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেছেন এরা ঠিক সেই কাজই করছে। অর্থাৎ এক শ্রেণীর মুসলমানকে ফিরিয়ে নিচ্ছে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে। তারা বর্বর যুগ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। এবং তা চাইছে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। ওরা যে কাজ করছে তা জেহাদ নয়, ধর্মযুদ্ধ নয়, শ্রেফ বর্বরতা।
বরং এদের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব মুসলিম বিশ্বে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার অভাবে আজ সারা পৃথিবীর - একটি-দুটি ব্যতিক্রম ব্যতীত - মুসলিম দেশে দেশে অস্থিরতা, হানাহানি, দুর্যোগ চলছে।
এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ ছিল ব্যতিক্রম। এখানে বরাবর মানবিক ঔদার্য প্রাধান্য পেয়েছে। সুফী ও সাধকদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে আমাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। সে কারণে আরব বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে শিক্ষা বিস্তার ঘটছে দ্রুত, স্বাস্থ্য খাতে চমকপ্রদ উন্নয়ন ঘটেছে, মানুষের গড় আয় এবং আয়ু উভয়ই বেড়েছে। আমাদের রয়েছে মুক্ত গণমাধ্যম, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। এদেশের ভূমিজ সন্তান যারা তাদের ধর্ম যা-ই হোক সকলে বরাবর শোষণ-বঞ্চনা-দু:শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। তারই ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ, এবং এ কারণেই আমাদের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এদেশেও কিছু মানুষ ধর্মান্ধতার পশ্চাৎপদ চিন্তা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা দু:শাসক পাকিস্তানের দোসর হিসেবে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। আর আজও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চায় বাংলাদেশের অগ্রগতি।
আমাদের মনে হয় বাংলাদেশের সচেতন মানুষের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। প্রথমত বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মে মুসলমান এবং সাধারণজন যে কোনো মানদণ্ডে ভালো মুসলমান। তারা দেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে সহাবস্থানে     অভ্যস্ত। দ্বিতীয়ত, এদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চায়, তাতে একাধিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে, কোনো দলের আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা (তবে ধর্মহীনতা নয়) হলে কোনো দলের আদর্শে ধর্মীয় চেতনা (তবে ধর্মান্ধতা নয়) স্থান পেতে পারে। কিন্তু সবার লক্ষ্য হতে হবে দেশের উন্নয়ন, দেশের ভবিষ্যত। দেশের মানুষের ইচ্ছা এবং সে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে তারা যে ইতিহাস রচনা করেছে সেটাকেও মর্যাদা দিতে হবে সবার।
তৃতীয়ত, বর্তমান বিশ্বের মুক্তবাজার বা বিশ্বায়নের চাপ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একা থাকা যাবে না। তাহলে পিছিয়ে পড়তে হবে। আমাদের বহির্বিশ্বে বন্ধুরাষ্ট্র থাকবে, তবে লক্ষ্য রাখতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব যেন ক্ষুণœ না হয়। মর্যাদার হানী না হয় এবং দেশের স্বার্থও যেন বজায় থাকে। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সরকারকে যেমন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে তেমনি জনগণকেও একইভাবে পরিণত বুদ্ধির প্রমাণ দিতে হবে। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দেব, পশ্চিমের পুঁজিবাদী বিশ্ব সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাদের আর্থিক স্বার্থের ওপর। তারা ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। সেদেশের জনগণকে চারম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে এতটুকু কার্পণ্য তারা করে নি। একই ঘটনা ঘটছে প্যালেস্টাইন নিয়ে, আফগানিস্তান নিয়ে।
বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। বস্তুত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যে এখন কঠিন একটি সময় যখন তাদের চরম ধৈর্য, গভীর প্রজ্ঞা এবং যথার্থ দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। মানুষ পুড়িয়ে, অবরোধ-হরতাল করে, র‌্যাব-পুলিশ ব্যবহার করে, জেল-জুলুম অত্যাচার চালিয়ে, বিবৃতি আর মানববন্ধন করে দায় সারার চেষ্টা করলে হবে না। সমস্যাটা বুঝতে হবে দেশের এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে, দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে, দেশীয় সামাজিক পটভূমিতে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ভিত্তিতে। এই দু:সময়ে মাথা গরম করার সুযোগ নেই, ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক কৌশল ঠিক করেই সামনে এগুতে হবে।
আমার মনে হয় এ সময় প্রকৃত আলেম-ওলেমাদের এগিয়ে এসে ইসলামের সঠিক পথের কথা বলতে হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

Saturday, February 7, 2015

দূতিয়ালির উদ্যোগ নিতে হবে দ্রুত

আবুল মোমেন

বিবদমান দুই রাজনৈতিক দলের শীঘ্র সংলাপে বসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। প্রধান বিরোধী জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও দীর্ঘ হরতালের কবলে পড়ে জনজীবনে স্বাভাবিকতা নেই। আজ ৩৪ দিন ধরে এই অবস্থা চলছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছে ৮৬ জন, আর আহত হয়ে মরণযন্ত্রণায় আছে তিনশতাধিক। রেল-বাস-টেম্পো-রিকসা পুড়ছে। একদিকে সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে অন্যদিকে এই অনাচার ও অচলাবস্থা তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। এবং তা হওয়া প্রয়োজন শীঘ্র।
কিন্তু তা কীভাবে হবে? দুই প্রধান দল তো দুই বিপরীত প্রান্তে অনড় অবস্থান নিয়ে গোঁ ধরে আছে। আমি বলব এ অবস্থায় নাগরিকসমাজকে মাঠে নামতে হবে। এ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যে নতুন নয়। নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বৈরাশাসকের ক্ষমতা-ত্যাগ, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং অন্তর্বতী সরকার নিয়ে দুই প্রধান জোটের ঐকমত্য তৈরির কাজটি তো নাগরিকসমাজই করেছে। তাঁদের মধ্যে প্রবীণ কয়েকজন, যেমন সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, ব্যারিষ্টার ইশতিয়াক আহমেদ এবং আরও কয়েকজন, দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে উত্তরণের রূপরেখা তৈরিতে দূতিয়ালি করেছিলেন। এভাবেই সেদিন তিনজোটের ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি হয়েছিল।
এ ধরনের কাজ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হয় না। যেসব বুদ্ধিজীবী টক-শো বা অন্যান্য মিডিয়ায় নিজেদের বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরেছেন তাঁরা আর একাজের জন্যে উপযুক্ত হবেন না। এ কথা ঠিক যে টক-শো ও মিডিয়ার মোহে এদেশের বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবীদের সিংহভাগ মজেছেন। তবুও মনে করি এখনও কিছু বর্ষীয়ান পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী আছেন যাঁরা নিজেদের বিবেকের নির্দেশনায়ই পথ চলেন। বিশেষভাবে এমন মানুষ চাই যাঁদের নিয়ে বিতর্ক নেই, যাঁদের সততা-দক্ষতায় মানুষের আস্থা থাকবে। যাঁরা অন্ধ দলবাজ তাঁরা এমন মানুষকে অপছন্দ করেন আমরা জানি। কিন্তু এখন আম জনগণের আস্থাভাজন হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্ধ দলবাজরা বরাবরই সংখ্যায় অল্প। তাদের গলার আওয়াজ বড় হলেও জনসমর্থন খুবই কম।
আমাদের মনে আছে ষাটের দশকে আইয়ুব আমলে রাজনৈতিক সংকটকালে গণতন্ত্রের বাতাবরণ উন্মোচনের ক্ষেত্রে নয় নেতার বিবৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নব্বইয়ের অভিজ্ঞতার কথা তো আগেই বলেছি।
আমরা আশা করব এবং আহ্বান জানাব, বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবীদের কয়েকজন মিলে সমস্যা সমাধানের এক বা একাধিক ফর্মূলা নিয়ে এগিয়ে আসবেন। দেরি করা উচিত হবে না। প্রতিদিনই জনভোগান্তি বাড়ছে এবং হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন বেড়ে চলেছে।


Sunday, January 4, 2015

জিহাদকাণ্ডের সূত্র ধরে

আবুল মোমেন

শিশু জিহাদ (প্রথম আলোয় ব্যবহৃত নাম) বিভিন্ন গণমাধ্যমে এর বাইরেও নানান নাম পেয়েছে - জেহাদ, জিয়াদ, জিয়া ইত্যাদি। ওয়াসার যে পাইপে সে পড়েছে সেটি কত গভীর ছিল তারও বিভ্রান্তিকর নানান পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে - তাতে ২০০ ফুট থেকে ৬০০ ফুটের মত বিস্তর ফারাক ছিল। গর্ত থেকে সে কথা বলেছিল কিনা এ নিয়ে মতভিন্নতা প্রকাশ পেয়েছে। তাতে পাঠানো খাবার সে খেয়েছিল কিনা সেটাও ভিন্ন ভিন্ন ধারণার জন্ম দিয়েছে। জিহাদ আদৌ সেই গর্তে পড়েছিল কিনা তা নিয়েও রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের মূল কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষকে অপরাধীদের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া। জিহাদের দুর্ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয় নি, কূপ ঘিরে মানুষের জটলা হলেও মারামারির মত পরিস্থিতিও হয়নি। তবে পুলিশের জন্যে অন্য যে কাজটি থাকে তাহল দুর্ঘটনার জন্যে দায়ি অপরাধীকে শনাক্ত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়াসা, কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার কোম্পানি এবং ব্যক্তি হিসেবে ওয়াসার চেয়ারম্যান বা মুখ্য প্রকৌশলী কিংবা ঠিকাদারি কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই দায়ি করেছে। কিন্তু গোয়েন্দা ও পুলিশ আরও সহজ সমাধানের পথ খুঁজেছেন। তারা শিশু জিহাদের বাবাকে থানায় আটকে রেখে জেরায় জেরবার করে প্রমাণ করতে চেয়েছে দুর্ঘটনাটাই ঘটে নি। এটি জিহাদের বাবার সাজানো নাটক।
তবে ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা যে তাকে উদ্ধারের চেষ্টায় আন্তরিক ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা প্রায় বিশ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার মিনিট পনেরর মধ্যেই সাধারণ মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে শিশু জিহাদকে সেই গভীর খাদ থেকে উদ্ধার করে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করলেও দক্ষতাকে তো করল। সেই সাথে প্রশ্নবিদ্ধ করল গোয়েন্দা ও পুলিশের আন্তরিকতা ও দক্ষতা উভয়টিকে। কারণ তারা যদি দক্ষ হতেন তাহলে বাবাকে তাঁর অজান্তে নজরদারিতে রেখে ঘটনার সমাপ্তির জন্যে অপেক্ষা করতেন। আর    আন্তরিক হলে বিপন্ন পরিবারকে সন্দেহের অপমানে বিদ্ধ না করে মানবিক সমবেদনার সাথে তাদের পাশে দাঁড়াতেন।
এই পুরো ঘটনার জন্যে পুলিশ এবং ফায়ার ব্রিগেডের উচিত হত তাদের ভুল ও ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে জিহাদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সমব্যথী জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করা। এতে এই দুই সংস্থার ভাবমূর্তি হেয় হত না, কারণ ভুল সবারই হতে পারে, এ উদ্ধার অভিযানে পদে পদেই তা হয়েছে। তবুও ভুল অপরাধ নয়, মানবজীবনের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মেলে। তাতে উভয়েরই মর্যাদা বজায় থাকে। এটা হল সভ্য সমাজের একটি মানবিক রীতি। কিন্তু আমরা যেন এতে গ্লানি ও অপমান বোধ করি। গায়ের জোরে অর্থাৎ ক্ষমতার জোরে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা চালিয়ে যাই। তাতে কাদা আরও মাখামাখি হয়, জনদৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
আমাদের সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো যারা চালান, এসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে সেবার চেয়ে কর্তৃত্বের মনোভাব প্রধান। আমলাসহ সরকারের সকল কর্মচারীরা কেতাবি ভাষায় হলেন জনসেবক, ইংরেজিতে পাব্লিক সার্ভেন্ট। সে কারণেই সচিব থেকে জেলা প্রশাসক হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকলের জন্যেই দৈনিক কিছু সময় বরাদ্দ থাকে জনগণের ভোগান্তির কথা শোনা ও তার প্রতিকারের জন্যে। তাঁরা যে তা করেন না, বা মানুষের হিতার্থে কিছু করতে চান না তা নয়। তবুও দুদিক থেকেই সমস্যা দেখতে পাই। জনগণের দিক থেকে তৈরি হয় দুটি সমস্যা। অধিকাংশ প্রতিকারপ্রার্থী ঠিক বুঝতে পারেন না বা চান না কোন বিষয়টি নিয়ে কার কাছে যাওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিকার পাওয়ার সরকারি পথগুলো পূরণ করে কাজটা আদায় করার ধৈর্য ও দক্ষতা তাঁদের সবসময় থাকে না। সবাই যেন চান একবারেই তাঁর জটিল ও পুরাতন সমস্যার আশু সমাধান হয়ে যাক। সেটা হয়ত বাস্তবে সম্ভব নয। কারণ প্রায়ই যেকোনো সমস্যাকে ঘিরেই একাধিক পক্ষ যুক্ত থাকেন এবং তাদের মতামত শোনা, তাদেরকে সম্মত করিয়ে সমাধান করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
ক্ষমতাবান জনসেবকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, সরকারের ডানহাত-বাঁহাত। এদেশে সরকার মানেই হল সকল ক্ষমতার অধিকারী একটি প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক আমলে তার সাথে যুক্ত হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রতাপ। সব মিলে জনসেবকরা তাঁদের জ্ঞাতসারে-অজ্ঞাতসারে হয়ে ওঠেন ক্ষমতার প্রতিভূ। তাছাড়া ঔপনিবেশিক আমলে যখন আমলাতন্ত্রের এই কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল তখন উদ্দেশ্যটাও এরকমই ছিল। তখন থেকেই আমলারা জনসেবক হয়েও কার্যত জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন। আমরা এখনও, এত বছর পরেও, এই ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির মৌতাত কাটিয়ে উঠতে পারি নি। সত্যি বলতে কি ক্ষমতার এই একচ্ছত্র অধিকার ভুলে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন। তাঁরা নিজেরা ভুলে গিয়ে জনগণের পাশে সেবার মনোভাব নিয়ে দাঁড়াতে চাইলেও অনেক উচ্চাভিলাষী উঠতি নেতার প্রতাপের কারণে স্বার্থের দ্বন্দ্বে তাঁদের বিপক্ষে অবস্থান নিতেও পারেন না।
একে আমলাতন্ত্রের ওপর রয়েছে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রভাব তার ওপর পাকিস্তান আমল থেকে দীর্ঘকাল অগণতান্ত্রিক শাসন চালু থাকায়, এবং চলমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একদলীয় ক্ষমতাভোগের প্রক্রিয়া পাকা হয়ে পড়ায় বস্তুতপক্ষে সর্বস্তরের আমলাতন্ত্রকেই সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রতীক হয়ে উঠতে হয়। ফায়ার ব্রিগেড, এমনকি সরকারি হাসপাতালের মত যেসব প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে জনসেবার কাজই করে থাকে তারাও জনগণের একটু ওপরে থেকেই কাজ করতে অভ্যস্ত।
কীভাবে এই দূরত্ব ঘুচানো যায়, কর্তৃত্বের মনোভাবকে সমঝোতার সমতায় নিয়ে আসা যায়? আমার মনো হয় ব্যবসায়ে যেমন আজ পিপি বা পাব্লিক-প্রাইভেট অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার কথা উঠছে তেমনি এসব ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। প্রত্যেক থানায় পুলিশ-জনগণের একটি যৌথ কমিটি আইনশৃঙ্খলা এবং পুলিশের ভূমিকার মূল্যায়ন করবে। হাসপাতালকে নিয়ে কেবল রোগি কল্যাণ সমিতি নয়, জেলখানায় কেবল কারা পরিদর্শক সমিতি নয়, কমিটিগুলোর আওতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সেবার দক্ষতা-ভুলত্র“টি পর্যালোচনা করে তা পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখা পর্যন্ত হওয়া উচিত। তাদের ভূমিকা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক বা ঠুঁটো জগন্নাথ হলে এতে কোনো উপকার হবে না। আমি জানি জনগণকে এ ধরনের অধিকার দেওয়ার বিষয়ে জনসেবকদের মনে শংকা তৈরি হবে, কারণ অনেকেই এর অপব্যবহার করবেন, তাঁদের ভোগান্তিতে ফেলার চেষ্টা করবেন। কোনো একটি ব্যবস্থা চালু হলেই তার সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো ক্রমে পরিষ্কার হয় এবং তখন সেগুলো সংশোধন করে দক্ষ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায়। কিন্তু জনগণের অংশীদারিত্ব সম্পন্ন কোনো পদ্ধতি চালু না করে চলমান ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে আমরা কখনও বেরিয়ে আসতে পারব না। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন কিংবা সংসদ চালু রাখলেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি চালু হয় না। এর জন্যে প্রধানত চাই নীতি নির্ধারণ, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্ব, অংশগ্রহণ। অর্থাৎ বিপথগামিতা, সীমাবদ্ধতা, এমনকি ব্যর্থতা সত্ত্বেও পদ্ধতি সচল রাখতে হবে, সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে তা চালিয়ে যেতে হবে। পথ চলতে চলতেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব। তাহলেই বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাশ থেকে অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মেঘ কাটতে শুরু করবে। আমরাও হয়ত একদিন, হয়ত অচিরেই, গণতন্ত্রের পথে মুক্তি পাব।

***

Thursday, December 4, 2014

তাঁর রেনেসাঁস-সত্তা

আবুল মোমেন

সত্যিকারের বড় মানুষ সত্যিই দুর্লভ। কারণ বড় হওয়া মানেই খ্যাতিমান হওয়া, প্রতিষ্ঠিতজন হওয়া, পুরস্কার-স্বীকৃতি-সম্মাননায় অভিষিক্ত হওয়া। গণমাধ্যমের নজরে থাকা, তাতে প্রায়ই হাজিরা দেওয়া। এতে গৌরব বাড়ে, গর্বিত হওয়ার অধিকার জন্মায়। এই অধিকারবোধ প্রায় সবার অগোচরে সন্তর্পণে দূরত্ব আর আড়ালগুলো তৈরি করতে থাকে। বড় মানুষ কখন যে চূড়ার ছোট্ট পরিসরে আটকে যান হারিয়ে যান তা তিনিও টের পান না। ভাবি, এটা কি তাঁদের পরাজয়? কাইয়ুমভাই কিন্তু প্রাপ্তির আড়ম্বরে  হারিয়ে যান নি, তাতে আটকা পড়েন নি। না, খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে তাঁর পরাজয় ঘটে নি।
তিনি সবসময় সবারই থাকলেন। পরিবারের, শিল্পী ও ছাত্রদের, সমাজের, দেশের এবং ইতিহাসের একজন হয়েই থাকলেন। কেবল থাকা নয়, সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে থাকা। বড় কথা, সে ভূমিকা বৃহত্তর অর্থে কল্যাণকর, গঠনমূলক, যথাযথ।
বয়স, অভিজ্ঞতা, অর্জন তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে নি, মৌলিক মানুষটিকে বদলে দিতে পারে নি। তিনি থাকলেন বরাবরের কাইয়ুম চৌধুরী - স্বামী, পিতা, চাচা, ফুফা, খালু, ভাই, বন্ধু, শিক্ষক। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক বৃহৎ পরিবার ও ক্রমসম্প্রসারমান সমাজের অভিভাবক। এ তিনি বয়স বা সম্পর্কের জোরে কাকতলীয়ভাবে পান নি, যোগ্যতার সাথে দায়িত্বের ভারবহন করেই পেয়েছেন।
তাঁর কাছে সবাই চেয়েছেন, আর তাঁর মতো করেই তিনি দিয়ে গেছেন। পরিবারের বাইরে অধিকাংশের আবদার তো শিল্পীর কাছে - শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে। কিন্তু তাঁদের চাওয়া পেইন্টিং নয়, কেউ চান সংগঠনের লোগো, কারও দাবি সম্মেলনের পোস্টার, কেউ আর্জি জানান আমন্ত্রণপত্রের নক্সার, আর বেশিরভাগের প্রত্যাশা নিজের বইয়ের জন্যে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি প্রচ্ছদ-চিত্র। বেশির ভাগ দাবিই পূরণ করতেন তিনি। অচেনা ব্যক্তি কৌশলের আশ্রয় নেন কাইয়ুমভাইয়ের কোনো প্রিয়জনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে সবসময় চাপে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
কাইয়ুমভাই জীবনের প্রায় সবটা সময় চারুকলায় শিক্ষকতার বাইরে কোনো-না-কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকেছেন। অনেক পত্রিকা ও সাময়িকীর অঙ্গসৌষ্ঠবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, শেষ দিন পর্যন্ত করে গেছেন। সংবাদ, চিত্রালী, ইংরেজি এক্সপ্রেস, সচিত্র সন্ধানী, টাপুরটুপুর, অন্তরঙ্গ এমনি আরও অনেক। সাম্প্রতিককালে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো আর বেঙ্গল ফাউণ্ডেশনের সাথে। ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখেছেন, ছোটদের জন্যে ছড়াও। চাপের মধ্যে থেকেও কখনও তাঁর প্রসন্নতা হারান নি, এমনকী প্রফুল্লতাও। কাজে চাপ কিংবা তাড়াহুড়ার ছাপ থাকত না তাঁর কোনো কাজে কিংবা আচরণে-ব্যবহারে। হয়ত সময় নিতেন তিনি, কিন্তু কাজের মানে আপস করতেন না, নিজের কাজটিই করতেন।
তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রও ছিল ছড়ানো  পেইন্টিং এবং গ্রাফিক্স, ড্রয়িং এবং স্কেচে সমান পারদর্শী; আগ্রহ ছিল সঙ্গীতে   উচ্চাঙ্গ, পুরোনো বাংলাগান, রবীন্দ্র-নজরুলসহ পঞ্চভাষ্কর, কি নয়; চলচ্চিত্রের প্রতি কেবল আগ্রহ নয় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে ছিলেন, ছিলেন আগ্রহী চলচ্চিত্র তৈরিতেও; সাহিত্য পাঠের অভ্যাস শৈশব থেকেই, এবং তা কখনও ছাড়েন নি; বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রতিও কৌতূহলী ছিলেন। পছন্দের বই কেনা কখনও ছাড়েন নি। রেখে গেছেন ঈর্ষণীয় গানের সংগ্রহ। বইয়ের সংগ্রহে আছে দুর্লভ অনেক বই। ভালো চলচ্চিত্রের সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল তাঁর।
কাইয়ুমভাইয়ের পক্ষে নিজের আঁকা প্রচ্ছদের বইগুলোর হদিশ নেওয়া বা দেখে শেষ করা সম্ভব ছিল না - তা সংখ্যায় এত বেশি। আমন্ত্রণপত্র, পোস্টার, মোড়ক-নক্সা, লোগোর ক্ষেত্রেও একথা খাটে। এমন বিপুল কাজের মান বজায় রাখা কঠিন কাজ। কাইয়ুম চৌধুরী অনায়াসেই তা ধরে রেখেছিলেন।
এর মধ্যে পেইন্টিং, ড্রয়িং কম করেন নি। তাতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন, উচ্চমান ধরে রেখেছেন। অন্য পরিচয়ের আড়ালে সমকালে তাঁর চিত্রকর পরিচয় তেমনভাবে আলোচিত হয় নি। এবার দিন যত গড়াবে ততই তা বাড়বে, কারণ চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরীকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তাঁর কবিতা কাব্যগুণ এবং বিশিষ্টতার কারণে পাঠকপ্রিয় হয়েছে, শিশুতোষ ছড়াও চমৎকার লিখেছেন। আজও অলঙ্করণে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁর হাতের বর্ণবিন্যাসের অসাধারণত্ব হাতছাড়া হয়নি কখনও।
এতসব কেজো আর কালিক গণ্ডিতে বাঁধা শিল্পকর্মে ব্যস্ত থেকেও তিনি আশ্চর্যরকম দক্ষতায় কাজোত্তীর্ণ ও কালোত্তীর্ণ চিরকালের ছোঁয়া দিতে পেরেছেন তাঁর অধিকাংশ সৃষ্টিতে। তাই মানুষটার মধ্যে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, ক্ষণকাল-চিরকাল, কাজ-বিরাম, শ্রম-উপভোগ একাকার হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি একা, আবার খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার গণ্ডিতে থেকেও বিচ্ছিন্ন বা একা হন নি, থেকেছেন সবার।
বহুসত্তার এক রেনেসাঁসকালের মানুষ ছিলেন তিনি। জীবন কাটিয়েছেন জাতীয় ইতিহাসের নানা দুঃসময়ের ভাঙাগড়ার মধ্যে। কিন্তু তাতে তাঁর রেনেসাঁস-সত্তার বৈচিত্র ও বিশালতা ক্ষুণœ হয় নি। কাল কিংবা দুঃসময় তাঁকে হজম করতে পারে নি, পরাভূত করতে পারে নি। কাইয়ুম চৌধুরী খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে যেমন নিজেকে সঁপে দেন নি, তেমনি ক্ষয়িষ্ণু কালের কাছেও হার মানেন নি। এমন আলোকিত জীবনের যবনিকা তো আলোকিত মঞ্চে নায়কের ভূমিকায় সহস্র মানুষকে সাক্ষী রেখেই পড়বার কথা। তার অন্যথা হয় নি।

***