Thursday, February 19, 2015

এ কোন্ পথে চলেছে ওরা?

আবুল মোমেন

নিরীহ মানুষকে হাত বেঁধে চোখ বেঁধে ছুরি দিয়ে জবাই করা কি ইসলামের শিক্ষা হতে পারে? তারা অন্য ধর্মাবলম্বী হলেও? কোনো বন্দি মুসলমানকে পুড়িয়ে হত্যা করা কি ইসলাম? শিয়াপন্থী মুসলমানের মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে নির্বিচারে তাদের হত্যা করা কি ধর্মসম্মত কাজ হতে পারে?
ইসলামের শিক্ষা এটা নয়। নবীজীর শিক্ষাও এটা নয়। যে প্রাচীন গোত্রভিত্তিক হানাহানি বন্ধ করার জন্যে হযরত মোহাম্মদ (স:) ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেছেন এরা ঠিক সেই কাজই করছে। অর্থাৎ এক শ্রেণীর মুসলমানকে ফিরিয়ে নিচ্ছে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে। তারা বর্বর যুগ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। এবং তা চাইছে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। ওরা যে কাজ করছে তা জেহাদ নয়, ধর্মযুদ্ধ নয়, শ্রেফ বর্বরতা।
বরং এদের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব মুসলিম বিশ্বে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার অভাবে আজ সারা পৃথিবীর - একটি-দুটি ব্যতিক্রম ব্যতীত - মুসলিম দেশে দেশে অস্থিরতা, হানাহানি, দুর্যোগ চলছে।
এর মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ ছিল ব্যতিক্রম। এখানে বরাবর মানবিক ঔদার্য প্রাধান্য পেয়েছে। সুফী ও সাধকদের ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে আমাদের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। সে কারণে আরব বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশে শিক্ষা বিস্তার ঘটছে দ্রুত, স্বাস্থ্য খাতে চমকপ্রদ উন্নয়ন ঘটেছে, মানুষের গড় আয় এবং আয়ু উভয়ই বেড়েছে। আমাদের রয়েছে মুক্ত গণমাধ্যম, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। এদেশের ভূমিজ সন্তান যারা তাদের ধর্ম যা-ই হোক সকলে বরাবর শোষণ-বঞ্চনা-দু:শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। তারই ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ, এবং এ কারণেই আমাদের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এদেশেও কিছু মানুষ ধর্মান্ধতার পশ্চাৎপদ চিন্তা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা দু:শাসক পাকিস্তানের দোসর হিসেবে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। আর আজও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চায় বাংলাদেশের অগ্রগতি।
আমাদের মনে হয় বাংলাদেশের সচেতন মানুষের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। প্রথমত বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মে মুসলমান এবং সাধারণজন যে কোনো মানদণ্ডে ভালো মুসলমান। তারা দেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সাথে সহাবস্থানে     অভ্যস্ত। দ্বিতীয়ত, এদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চায়, তাতে একাধিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে, কোনো দলের আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা (তবে ধর্মহীনতা নয়) হলে কোনো দলের আদর্শে ধর্মীয় চেতনা (তবে ধর্মান্ধতা নয়) স্থান পেতে পারে। কিন্তু সবার লক্ষ্য হতে হবে দেশের উন্নয়ন, দেশের ভবিষ্যত। দেশের মানুষের ইচ্ছা এবং সে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে তারা যে ইতিহাস রচনা করেছে সেটাকেও মর্যাদা দিতে হবে সবার।
তৃতীয়ত, বর্তমান বিশ্বের মুক্তবাজার বা বিশ্বায়নের চাপ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একা থাকা যাবে না। তাহলে পিছিয়ে পড়তে হবে। আমাদের বহির্বিশ্বে বন্ধুরাষ্ট্র থাকবে, তবে লক্ষ্য রাখতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব যেন ক্ষুণœ না হয়। মর্যাদার হানী না হয় এবং দেশের স্বার্থও যেন বজায় থাকে। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সরকারকে যেমন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে তেমনি জনগণকেও একইভাবে পরিণত বুদ্ধির প্রমাণ দিতে হবে। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দেব, পশ্চিমের পুঁজিবাদী বিশ্ব সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাদের আর্থিক স্বার্থের ওপর। তারা ইরাক ও লিবিয়ায় আক্রমণ চালিয়েছে শুধুমাত্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। সেদেশের জনগণকে চারম ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিতে এতটুকু কার্পণ্য তারা করে নি। একই ঘটনা ঘটছে প্যালেস্টাইন নিয়ে, আফগানিস্তান নিয়ে।
বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। বস্তুত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যে এখন কঠিন একটি সময় যখন তাদের চরম ধৈর্য, গভীর প্রজ্ঞা এবং যথার্থ দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। মানুষ পুড়িয়ে, অবরোধ-হরতাল করে, র‌্যাব-পুলিশ ব্যবহার করে, জেল-জুলুম অত্যাচার চালিয়ে, বিবৃতি আর মানববন্ধন করে দায় সারার চেষ্টা করলে হবে না। সমস্যাটা বুঝতে হবে দেশের এবং বৈশ্বিক পটভূমিতে, দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে, দেশীয় সামাজিক পটভূমিতে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ভিত্তিতে। এই দু:সময়ে মাথা গরম করার সুযোগ নেই, ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক কৌশল ঠিক করেই সামনে এগুতে হবে।
আমার মনে হয় এ সময় প্রকৃত আলেম-ওলেমাদের এগিয়ে এসে ইসলামের সঠিক পথের কথা বলতে হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

Saturday, February 7, 2015

দূতিয়ালির উদ্যোগ নিতে হবে দ্রুত

আবুল মোমেন

বিবদমান দুই রাজনৈতিক দলের শীঘ্র সংলাপে বসার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। প্রধান বিরোধী জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও দীর্ঘ হরতালের কবলে পড়ে জনজীবনে স্বাভাবিকতা নেই। আজ ৩৪ দিন ধরে এই অবস্থা চলছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছে ৮৬ জন, আর আহত হয়ে মরণযন্ত্রণায় আছে তিনশতাধিক। রেল-বাস-টেম্পো-রিকসা পুড়ছে। একদিকে সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে অন্যদিকে এই অনাচার ও অচলাবস্থা তাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। এবং তা হওয়া প্রয়োজন শীঘ্র।
কিন্তু তা কীভাবে হবে? দুই প্রধান দল তো দুই বিপরীত প্রান্তে অনড় অবস্থান নিয়ে গোঁ ধরে আছে। আমি বলব এ অবস্থায় নাগরিকসমাজকে মাঠে নামতে হবে। এ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যে নতুন নয়। নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বৈরাশাসকের ক্ষমতা-ত্যাগ, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং অন্তর্বতী সরকার নিয়ে দুই প্রধান জোটের ঐকমত্য তৈরির কাজটি তো নাগরিকসমাজই করেছে। তাঁদের মধ্যে প্রবীণ কয়েকজন, যেমন সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ, ব্যারিষ্টার ইশতিয়াক আহমেদ এবং আরও কয়েকজন, দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে উত্তরণের রূপরেখা তৈরিতে দূতিয়ালি করেছিলেন। এভাবেই সেদিন তিনজোটের ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি হয়েছিল।
এ ধরনের কাজ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হয় না। যেসব বুদ্ধিজীবী টক-শো বা অন্যান্য মিডিয়ায় নিজেদের বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরেছেন তাঁরা আর একাজের জন্যে উপযুক্ত হবেন না। এ কথা ঠিক যে টক-শো ও মিডিয়ার মোহে এদেশের বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবীদের সিংহভাগ মজেছেন। তবুও মনে করি এখনও কিছু বর্ষীয়ান পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবী আছেন যাঁরা নিজেদের বিবেকের নির্দেশনায়ই পথ চলেন। বিশেষভাবে এমন মানুষ চাই যাঁদের নিয়ে বিতর্ক নেই, যাঁদের সততা-দক্ষতায় মানুষের আস্থা থাকবে। যাঁরা অন্ধ দলবাজ তাঁরা এমন মানুষকে অপছন্দ করেন আমরা জানি। কিন্তু এখন আম জনগণের আস্থাভাজন হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্ধ দলবাজরা বরাবরই সংখ্যায় অল্প। তাদের গলার আওয়াজ বড় হলেও জনসমর্থন খুবই কম।
আমাদের মনে আছে ষাটের দশকে আইয়ুব আমলে রাজনৈতিক সংকটকালে গণতন্ত্রের বাতাবরণ উন্মোচনের ক্ষেত্রে নয় নেতার বিবৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নব্বইয়ের অভিজ্ঞতার কথা তো আগেই বলেছি।
আমরা আশা করব এবং আহ্বান জানাব, বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবীদের কয়েকজন মিলে সমস্যা সমাধানের এক বা একাধিক ফর্মূলা নিয়ে এগিয়ে আসবেন। দেরি করা উচিত হবে না। প্রতিদিনই জনভোগান্তি বাড়ছে এবং হিংসা ও বিদ্বেষের আগুন বেড়ে চলেছে।


Sunday, January 4, 2015

জিহাদকাণ্ডের সূত্র ধরে

আবুল মোমেন

শিশু জিহাদ (প্রথম আলোয় ব্যবহৃত নাম) বিভিন্ন গণমাধ্যমে এর বাইরেও নানান নাম পেয়েছে - জেহাদ, জিয়াদ, জিয়া ইত্যাদি। ওয়াসার যে পাইপে সে পড়েছে সেটি কত গভীর ছিল তারও বিভ্রান্তিকর নানান পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে - তাতে ২০০ ফুট থেকে ৬০০ ফুটের মত বিস্তর ফারাক ছিল। গর্ত থেকে সে কথা বলেছিল কিনা এ নিয়ে মতভিন্নতা প্রকাশ পেয়েছে। তাতে পাঠানো খাবার সে খেয়েছিল কিনা সেটাও ভিন্ন ভিন্ন ধারণার জন্ম দিয়েছে। জিহাদ আদৌ সেই গর্তে পড়েছিল কিনা তা নিয়েও রহস্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের মূল কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষকে অপরাধীদের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া। জিহাদের দুর্ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয় নি, কূপ ঘিরে মানুষের জটলা হলেও মারামারির মত পরিস্থিতিও হয়নি। তবে পুলিশের জন্যে অন্য যে কাজটি থাকে তাহল দুর্ঘটনার জন্যে দায়ি অপরাধীকে শনাক্ত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়াসা, কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার কোম্পানি এবং ব্যক্তি হিসেবে ওয়াসার চেয়ারম্যান বা মুখ্য প্রকৌশলী কিংবা ঠিকাদারি কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই দায়ি করেছে। কিন্তু গোয়েন্দা ও পুলিশ আরও সহজ সমাধানের পথ খুঁজেছেন। তারা শিশু জিহাদের বাবাকে থানায় আটকে রেখে জেরায় জেরবার করে প্রমাণ করতে চেয়েছে দুর্ঘটনাটাই ঘটে নি। এটি জিহাদের বাবার সাজানো নাটক।
তবে ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা যে তাকে উদ্ধারের চেষ্টায় আন্তরিক ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা প্রায় বিশ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার মিনিট পনেরর মধ্যেই সাধারণ মানুষ বুদ্ধি খাটিয়ে শিশু জিহাদকে সেই গভীর খাদ থেকে উদ্ধার করে ফায়ার ব্রিগেড কর্মীদের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করলেও দক্ষতাকে তো করল। সেই সাথে প্রশ্নবিদ্ধ করল গোয়েন্দা ও পুলিশের আন্তরিকতা ও দক্ষতা উভয়টিকে। কারণ তারা যদি দক্ষ হতেন তাহলে বাবাকে তাঁর অজান্তে নজরদারিতে রেখে ঘটনার সমাপ্তির জন্যে অপেক্ষা করতেন। আর    আন্তরিক হলে বিপন্ন পরিবারকে সন্দেহের অপমানে বিদ্ধ না করে মানবিক সমবেদনার সাথে তাদের পাশে দাঁড়াতেন।
এই পুরো ঘটনার জন্যে পুলিশ এবং ফায়ার ব্রিগেডের উচিত হত তাদের ভুল ও ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে জিহাদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সমব্যথী জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করা। এতে এই দুই সংস্থার ভাবমূর্তি হেয় হত না, কারণ ভুল সবারই হতে পারে, এ উদ্ধার অভিযানে পদে পদেই তা হয়েছে। তবুও ভুল অপরাধ নয়, মানবজীবনের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মেলে। তাতে উভয়েরই মর্যাদা বজায় থাকে। এটা হল সভ্য সমাজের একটি মানবিক রীতি। কিন্তু আমরা যেন এতে গ্লানি ও অপমান বোধ করি। গায়ের জোরে অর্থাৎ ক্ষমতার জোরে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা চালিয়ে যাই। তাতে কাদা আরও মাখামাখি হয়, জনদৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
আমাদের সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো যারা চালান, এসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে সেবার চেয়ে কর্তৃত্বের মনোভাব প্রধান। আমলাসহ সরকারের সকল কর্মচারীরা কেতাবি ভাষায় হলেন জনসেবক, ইংরেজিতে পাব্লিক সার্ভেন্ট। সে কারণেই সচিব থেকে জেলা প্রশাসক হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকলের জন্যেই দৈনিক কিছু সময় বরাদ্দ থাকে জনগণের ভোগান্তির কথা শোনা ও তার প্রতিকারের জন্যে। তাঁরা যে তা করেন না, বা মানুষের হিতার্থে কিছু করতে চান না তা নয়। তবুও দুদিক থেকেই সমস্যা দেখতে পাই। জনগণের দিক থেকে তৈরি হয় দুটি সমস্যা। অধিকাংশ প্রতিকারপ্রার্থী ঠিক বুঝতে পারেন না বা চান না কোন বিষয়টি নিয়ে কার কাছে যাওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিকার পাওয়ার সরকারি পথগুলো পূরণ করে কাজটা আদায় করার ধৈর্য ও দক্ষতা তাঁদের সবসময় থাকে না। সবাই যেন চান একবারেই তাঁর জটিল ও পুরাতন সমস্যার আশু সমাধান হয়ে যাক। সেটা হয়ত বাস্তবে সম্ভব নয। কারণ প্রায়ই যেকোনো সমস্যাকে ঘিরেই একাধিক পক্ষ যুক্ত থাকেন এবং তাদের মতামত শোনা, তাদেরকে সম্মত করিয়ে সমাধান করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
ক্ষমতাবান জনসেবকরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, সরকারের ডানহাত-বাঁহাত। এদেশে সরকার মানেই হল সকল ক্ষমতার অধিকারী একটি প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক আমলে তার সাথে যুক্ত হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের প্রতাপ। সব মিলে জনসেবকরা তাঁদের জ্ঞাতসারে-অজ্ঞাতসারে হয়ে ওঠেন ক্ষমতার প্রতিভূ। তাছাড়া ঔপনিবেশিক আমলে যখন আমলাতন্ত্রের এই কাঠামোটি তৈরি হয়েছিল তখন উদ্দেশ্যটাও এরকমই ছিল। তখন থেকেই আমলারা জনসেবক হয়েও কার্যত জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন। আমরা এখনও, এত বছর পরেও, এই ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির মৌতাত কাটিয়ে উঠতে পারি নি। সত্যি বলতে কি ক্ষমতার এই একচ্ছত্র অধিকার ভুলে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন। তাঁরা নিজেরা ভুলে গিয়ে জনগণের পাশে সেবার মনোভাব নিয়ে দাঁড়াতে চাইলেও অনেক উচ্চাভিলাষী উঠতি নেতার প্রতাপের কারণে স্বার্থের দ্বন্দ্বে তাঁদের বিপক্ষে অবস্থান নিতেও পারেন না।
একে আমলাতন্ত্রের ওপর রয়েছে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রভাব তার ওপর পাকিস্তান আমল থেকে দীর্ঘকাল অগণতান্ত্রিক শাসন চালু থাকায়, এবং চলমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একদলীয় ক্ষমতাভোগের প্রক্রিয়া পাকা হয়ে পড়ায় বস্তুতপক্ষে সর্বস্তরের আমলাতন্ত্রকেই সরকারের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রতীক হয়ে উঠতে হয়। ফায়ার ব্রিগেড, এমনকি সরকারি হাসপাতালের মত যেসব প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষভাবে জনসেবার কাজই করে থাকে তারাও জনগণের একটু ওপরে থেকেই কাজ করতে অভ্যস্ত।
কীভাবে এই দূরত্ব ঘুচানো যায়, কর্তৃত্বের মনোভাবকে সমঝোতার সমতায় নিয়ে আসা যায়? আমার মনো হয় ব্যবসায়ে যেমন আজ পিপি বা পাব্লিক-প্রাইভেট অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার কথা উঠছে তেমনি এসব ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। প্রত্যেক থানায় পুলিশ-জনগণের একটি যৌথ কমিটি আইনশৃঙ্খলা এবং পুলিশের ভূমিকার মূল্যায়ন করবে। হাসপাতালকে নিয়ে কেবল রোগি কল্যাণ সমিতি নয়, জেলখানায় কেবল কারা পরিদর্শক সমিতি নয়, কমিটিগুলোর আওতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সেবার দক্ষতা-ভুলত্র“টি পর্যালোচনা করে তা পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখা পর্যন্ত হওয়া উচিত। তাদের ভূমিকা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক বা ঠুঁটো জগন্নাথ হলে এতে কোনো উপকার হবে না। আমি জানি জনগণকে এ ধরনের অধিকার দেওয়ার বিষয়ে জনসেবকদের মনে শংকা তৈরি হবে, কারণ অনেকেই এর অপব্যবহার করবেন, তাঁদের ভোগান্তিতে ফেলার চেষ্টা করবেন। কোনো একটি ব্যবস্থা চালু হলেই তার সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলো ক্রমে পরিষ্কার হয় এবং তখন সেগুলো সংশোধন করে দক্ষ ব্যবস্থাপনা চালু করা যায়। কিন্তু জনগণের অংশীদারিত্ব সম্পন্ন কোনো পদ্ধতি চালু না করে চলমান ঔপনিবেশিক ও অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনিক ব্যবস্থা থেকে আমরা কখনও বেরিয়ে আসতে পারব না। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন কিংবা সংসদ চালু রাখলেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি চালু হয় না। এর জন্যে প্রধানত চাই নীতি নির্ধারণ, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্ব, অংশগ্রহণ। অর্থাৎ বিপথগামিতা, সীমাবদ্ধতা, এমনকি ব্যর্থতা সত্ত্বেও পদ্ধতি সচল রাখতে হবে, সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে তা চালিয়ে যেতে হবে। পথ চলতে চলতেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব। তাহলেই বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাশ থেকে অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মেঘ কাটতে শুরু করবে। আমরাও হয়ত একদিন, হয়ত অচিরেই, গণতন্ত্রের পথে মুক্তি পাব।

***

Thursday, December 4, 2014

তাঁর রেনেসাঁস-সত্তা

আবুল মোমেন

সত্যিকারের বড় মানুষ সত্যিই দুর্লভ। কারণ বড় হওয়া মানেই খ্যাতিমান হওয়া, প্রতিষ্ঠিতজন হওয়া, পুরস্কার-স্বীকৃতি-সম্মাননায় অভিষিক্ত হওয়া। গণমাধ্যমের নজরে থাকা, তাতে প্রায়ই হাজিরা দেওয়া। এতে গৌরব বাড়ে, গর্বিত হওয়ার অধিকার জন্মায়। এই অধিকারবোধ প্রায় সবার অগোচরে সন্তর্পণে দূরত্ব আর আড়ালগুলো তৈরি করতে থাকে। বড় মানুষ কখন যে চূড়ার ছোট্ট পরিসরে আটকে যান হারিয়ে যান তা তিনিও টের পান না। ভাবি, এটা কি তাঁদের পরাজয়? কাইয়ুমভাই কিন্তু প্রাপ্তির আড়ম্বরে  হারিয়ে যান নি, তাতে আটকা পড়েন নি। না, খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে তাঁর পরাজয় ঘটে নি।
তিনি সবসময় সবারই থাকলেন। পরিবারের, শিল্পী ও ছাত্রদের, সমাজের, দেশের এবং ইতিহাসের একজন হয়েই থাকলেন। কেবল থাকা নয়, সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে থাকা। বড় কথা, সে ভূমিকা বৃহত্তর অর্থে কল্যাণকর, গঠনমূলক, যথাযথ।
বয়স, অভিজ্ঞতা, অর্জন তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে নি, মৌলিক মানুষটিকে বদলে দিতে পারে নি। তিনি থাকলেন বরাবরের কাইয়ুম চৌধুরী - স্বামী, পিতা, চাচা, ফুফা, খালু, ভাই, বন্ধু, শিক্ষক। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক বৃহৎ পরিবার ও ক্রমসম্প্রসারমান সমাজের অভিভাবক। এ তিনি বয়স বা সম্পর্কের জোরে কাকতলীয়ভাবে পান নি, যোগ্যতার সাথে দায়িত্বের ভারবহন করেই পেয়েছেন।
তাঁর কাছে সবাই চেয়েছেন, আর তাঁর মতো করেই তিনি দিয়ে গেছেন। পরিবারের বাইরে অধিকাংশের আবদার তো শিল্পীর কাছে - শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে। কিন্তু তাঁদের চাওয়া পেইন্টিং নয়, কেউ চান সংগঠনের লোগো, কারও দাবি সম্মেলনের পোস্টার, কেউ আর্জি জানান আমন্ত্রণপত্রের নক্সার, আর বেশিরভাগের প্রত্যাশা নিজের বইয়ের জন্যে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি প্রচ্ছদ-চিত্র। বেশির ভাগ দাবিই পূরণ করতেন তিনি। অচেনা ব্যক্তি কৌশলের আশ্রয় নেন কাইয়ুমভাইয়ের কোনো প্রিয়জনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে সবসময় চাপে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
কাইয়ুমভাই জীবনের প্রায় সবটা সময় চারুকলায় শিক্ষকতার বাইরে কোনো-না-কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকেছেন। অনেক পত্রিকা ও সাময়িকীর অঙ্গসৌষ্ঠবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, শেষ দিন পর্যন্ত করে গেছেন। সংবাদ, চিত্রালী, ইংরেজি এক্সপ্রেস, সচিত্র সন্ধানী, টাপুরটুপুর, অন্তরঙ্গ এমনি আরও অনেক। সাম্প্রতিককালে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো আর বেঙ্গল ফাউণ্ডেশনের সাথে। ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখেছেন, ছোটদের জন্যে ছড়াও। চাপের মধ্যে থেকেও কখনও তাঁর প্রসন্নতা হারান নি, এমনকী প্রফুল্লতাও। কাজে চাপ কিংবা তাড়াহুড়ার ছাপ থাকত না তাঁর কোনো কাজে কিংবা আচরণে-ব্যবহারে। হয়ত সময় নিতেন তিনি, কিন্তু কাজের মানে আপস করতেন না, নিজের কাজটিই করতেন।
তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রও ছিল ছড়ানো  পেইন্টিং এবং গ্রাফিক্স, ড্রয়িং এবং স্কেচে সমান পারদর্শী; আগ্রহ ছিল সঙ্গীতে   উচ্চাঙ্গ, পুরোনো বাংলাগান, রবীন্দ্র-নজরুলসহ পঞ্চভাষ্কর, কি নয়; চলচ্চিত্রের প্রতি কেবল আগ্রহ নয় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে ছিলেন, ছিলেন আগ্রহী চলচ্চিত্র তৈরিতেও; সাহিত্য পাঠের অভ্যাস শৈশব থেকেই, এবং তা কখনও ছাড়েন নি; বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রতিও কৌতূহলী ছিলেন। পছন্দের বই কেনা কখনও ছাড়েন নি। রেখে গেছেন ঈর্ষণীয় গানের সংগ্রহ। বইয়ের সংগ্রহে আছে দুর্লভ অনেক বই। ভালো চলচ্চিত্রের সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল তাঁর।
কাইয়ুমভাইয়ের পক্ষে নিজের আঁকা প্রচ্ছদের বইগুলোর হদিশ নেওয়া বা দেখে শেষ করা সম্ভব ছিল না - তা সংখ্যায় এত বেশি। আমন্ত্রণপত্র, পোস্টার, মোড়ক-নক্সা, লোগোর ক্ষেত্রেও একথা খাটে। এমন বিপুল কাজের মান বজায় রাখা কঠিন কাজ। কাইয়ুম চৌধুরী অনায়াসেই তা ধরে রেখেছিলেন।
এর মধ্যে পেইন্টিং, ড্রয়িং কম করেন নি। তাতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন, উচ্চমান ধরে রেখেছেন। অন্য পরিচয়ের আড়ালে সমকালে তাঁর চিত্রকর পরিচয় তেমনভাবে আলোচিত হয় নি। এবার দিন যত গড়াবে ততই তা বাড়বে, কারণ চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরীকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তাঁর কবিতা কাব্যগুণ এবং বিশিষ্টতার কারণে পাঠকপ্রিয় হয়েছে, শিশুতোষ ছড়াও চমৎকার লিখেছেন। আজও অলঙ্করণে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁর হাতের বর্ণবিন্যাসের অসাধারণত্ব হাতছাড়া হয়নি কখনও।
এতসব কেজো আর কালিক গণ্ডিতে বাঁধা শিল্পকর্মে ব্যস্ত থেকেও তিনি আশ্চর্যরকম দক্ষতায় কাজোত্তীর্ণ ও কালোত্তীর্ণ চিরকালের ছোঁয়া দিতে পেরেছেন তাঁর অধিকাংশ সৃষ্টিতে। তাই মানুষটার মধ্যে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, ক্ষণকাল-চিরকাল, কাজ-বিরাম, শ্রম-উপভোগ একাকার হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি একা, আবার খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার গণ্ডিতে থেকেও বিচ্ছিন্ন বা একা হন নি, থেকেছেন সবার।
বহুসত্তার এক রেনেসাঁসকালের মানুষ ছিলেন তিনি। জীবন কাটিয়েছেন জাতীয় ইতিহাসের নানা দুঃসময়ের ভাঙাগড়ার মধ্যে। কিন্তু তাতে তাঁর রেনেসাঁস-সত্তার বৈচিত্র ও বিশালতা ক্ষুণœ হয় নি। কাল কিংবা দুঃসময় তাঁকে হজম করতে পারে নি, পরাভূত করতে পারে নি। কাইয়ুম চৌধুরী খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে যেমন নিজেকে সঁপে দেন নি, তেমনি ক্ষয়িষ্ণু কালের কাছেও হার মানেন নি। এমন আলোকিত জীবনের যবনিকা তো আলোকিত মঞ্চে নায়কের ভূমিকায় সহস্র মানুষকে সাক্ষী রেখেই পড়বার কথা। তার অন্যথা হয় নি।

***




   

Tuesday, October 21, 2014

দুর্নীতির কী হবে?

আবুল মোমেন

রাজনীতির মাধ্যমে জননেতা হওয়ার অর্থ হল তাদের অভিভাবক হওয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে সাংসদ হওয়ার অর্থ হল জনগণের প্রতিনিধি হওয়া। আর এরপরে সরকারের মন্ত্রী হওয়ার অর্থ হল জনগণের সেবক হওয়া।
এই মানদণ্ডে যদি আমরা সদ্য-বিতাড়িত মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ভূমিকা বিচার করি তাহলে তিন ক্ষেত্রের কোনোটিতেই তিনি পাশ মার্ক পান না।
তাঁর সম্পর্কে আগে থেকেই পত্রপত্রিকায় নানা বিরূপ খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তাঁর এক বেপরোয়া বদমেজাজী অশালীন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত চেহারাই ফুটে ওঠে। পত্রিকার এই সমালোচনা বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হত সবার। সাম্প্রতিক বিতর্কিত ভূমিকার পরে তাঁর বিরুদ্ধে খবরের জোয়ার বইছে এখন।
পত্রিকায় দেখলাম স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও সমালোচনায় কণ্ঠ মেলাচ্ছেন, এবং তিনি কেবল লতিফ সিদ্দিকীর নয় পুরো পরিবার সম্পর্কেই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, সিদ্দিকীরা পাগলের পরিবার। যে দু’জন সিদ্দিকী খ্যাতি (এবং কুখ্যাতি) লাভ করেছেন দু’জনের মতিভ্রম ঘটে মাঝে মাঝে, এলোমেলো কথাবার্তা বলতেও শোনা যায়। তবে আমরা সাধারণ মানুষ বিশেষজ্ঞীয় মতামত দিতে পারব না। যা হোক, প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুটি দক্ষতার সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এক্ষেত্রে দূরদর্শিতা এবং পরিণত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তাঁরা।
এবার দেখার বিষয় হল এ ঘটনাটি থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো শিক্ষা নেন কিনা। আমরা এ বিষয়ে একটু আলোকপাত করব।
আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে রাজনীতিকে অনেকেই ব্যক্তিগত বিত্তবৈভব অর্জনের ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ক্ষমতাই দেবতা ক্ষমতাই মোক্ষ। ক্ষমতার আওতা এবং জৌলুস বাড়ানোর জন্যেই প্রয়োজন হয় নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিজয়ী হওয়া, এবং বিজয়ী হয়েই অফিসিয়ালি জননেতা হওয়ার সৌভাগ্য হয়। তারপর প্রতিযোগিতা শুরু হয় দলের মূল নেতার নেকনজরে আসার, অনুগ্রহভাজন হওয়ার। ভাগ্যে ভালো থাকলে মন্ত্রিত্বের শিকে ছিঁড়তে পারে।
এটি তাঁদের জন্য প্রথমত বিনিয়োগের ক্ষেত্র, দ্বিতীয়ত নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখা ও প্রভাব বাড়ানোর দূরূহ এক প্রতিযোগিতা যা তাঁরা জনসমর্থনের শক্তি ব্যবহার করে জিততে জানেন না, তাদের নির্ভর করতে হয় সশস্ত্র ক্যাডারদের ওপর। ফলে এ পর্যায়ে ক্যাডার পালন করতে হয়, তাদের অবৈধ, অনেক সময় অপরাধজনক কাজকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের অগ্রযাত্রা বজায় রাখার ধুরন্ধর কৌশলি লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। আর তৃতীয়ত, অপরাধ ও অবৈধ কাজের প্রতিষেধক হিসেবে নানান ‘সমাজসেবামূলক’ কাজে অর্থ সাহায্য দিয়ে নিজের জন্যে সভাপতি, প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ ক্রয় করে নিতে হয়। এভাবে এ ধরনের বিতর্কিত নেতাদের প্রভাব বলয়ের মধ্যেই রাজনৈতিক দল আটকে পড়েছে আজ। কোনো বড় নেতাও কোনো দলকে এই গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারছেন না।
শুনেছি লতিফ সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত পাঠাগার বেশ সমৃদ্ধ, তিনি পড়াশুনাও করেন, নিজে লেখালেখিও করেন, তাঁদের দু’ভাইয়ের লিখিত বইও আছে। সে বিচারে তিনি একজন সাহিত্যসেবী। তিনি ও তাঁর ভাই বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা, এ বিষয়ে কেউ বিতর্ক করে না। পঁচাত্তরের পরে একসময় লতিফ সিদ্দিকী দীর্ঘদিন কারাবন্দীও ছিলেন। অর্থাৎ সংগ্রাম এবং ত্যাগ  আদর্শবাদী রাজনীতির এই দুটি দীক্ষাই তাঁর রয়েছে। কিন্তু তারপরেও এ দশা কেন? কারণ, দেখা যাচ্ছে সত্যিই তিনি বেপরোয়া মানুষ, কাউকে মান্য করতে, সমীহ করতে, এমনকি সামান্য সৌজন্য ভদ্রতা রক্ষা করতেও অভ্যস্ত নন। এটি ব্যক্তিগত আচরণের একটি সমস্যা, সাংস্কৃতিক রুচির সংকটও বলা যায়। আর বর্তমান রাজনীতির ধারায় ধীরে ধীরে অতীতের অনেক রাজনীতিবিদ গা-ভাসিয়েছেন - দুর্নীতি তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হল, তাঁর সম্পর্কে পত্রপত্রিকার খবর, কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত আচরণগত সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রী কি জানতেন না? কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? অনেকসময় দেখা গেছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকীকে তিনি সঙ্গে রেখেছেন। গুটিকয়েক মন্ত্রীকে নিয়ে যেসব অনুষ্ঠান তাতেও লতিফ সিদ্দিকী থেকেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের মন্ত্রীর তালিকায় তিনি রয়েছেন।
এই আস্থার এমন প্রতিদান সিদ্দিকী দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রীকে এবারে ব্যবস্থা নিতেই হল। আবারও প্রশ্ন ওঠে - কেবল কি জনগণ ফুঁশে উঠলেই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবেন? আইন বা শৃঙ্খলার কোনো নিজস্ব গতিপথ থাকবে না?
কিন্তু গুরুতর প্রশ্ন হল লতিফ সিদ্দিকীকে প্রধানমন্ত্রী, সরকার বা আওয়ামী লীগ যে শাস্তি দিল তা তো দুর্নীতির জন্যে নয়, ধর্মদ্রোহী কথার জন্য। এই একটি বিষয়ে সরকারের হাতপা বাঁধা, কেননা ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে। অতএব ব্যবস্থা নিতেই হয়েছে। কিন্তু কেবল দুর্নীতি কিংবা অশালীন অভদ্র্র ও অগ্রহণযোগ্য আচরণের জন্যে শাস্তি আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
দেশে ব্যাপকহারে দুর্নীতি হয় তা সকলেই জানেন, এও জানা বিষয় যে বড় আকারের দুর্নীতি ক্ষমতা ও ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং অনেক সময়, ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। সরকারের মন্ত্রী, সাংসদদের মধ্যে বা সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির খবর পাওয়া যায়। অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো বেশ প্রকট। কারও কারও আচরণগত সমস্যা সরকার ও সরকারি দলের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করছে। সাংসদদের মধ্যে দুর্নীতি, মাস্তানপোষণ এবং ব্যক্তিগতভাবে আচরণগত সমস্যার  প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিপক্ষের লোকজনকে মারধরের ঘটনা বাড়ছে। সরকার নিশ্চেষ্ট থাকছেন, বা এত ধীরে এবং মৃদুভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি করছে, হালকা কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছে যে তাতে এ রোগ মহামারীতে রূপ নেওয়া ঠেকবে না। এ অবস্থায় অচিরেই সরকারকে পুলিশ ও মাস্তানের ওপর নির্ভর করেই দেশ চালাতে হবে। কারণ এভাবে চললে জনসমর্থন কমতেই থাকবে।
আমরা আশা করব লতিফ সিদ্দিকী উপকাহিনীটি থেকে সরকার ও সরকারি দলের জন্যে কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে।
প্রথমত, জনগণ বেপরোয়া প্রকৃতির মানুষদের পছন্দ করে না, দ্বিতীয়ত, এ ধরনের আত্মম্ভরি মানুষ কখনও নির্ভরযোগ্য হতে পারে না, তৃতীয়ত, তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত হবেনই এবং তাতে সরকারের জন্যে নেতিবাচক ভূমিকাই পালন করবেন। ক্ষমতার সব রকম অপব্যবহার বন্ধ হওয়া দরকার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ শুরু করা জরুরি। লতিফ সিদ্দিকী ইস্যু সম্পন্ন হওয়ার পর এ থেকেই শিক্ষা নিয়ে এ দুই কাজে সরকার বিশেষ জোর দিতে পারেন। এতে আখেরে তাঁরাই লাভবান হবেন।
তিনিই একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি, দূরদর্শী নেতা যিনি যে কোনো ঘটনা থেকে সঠিক শিক্ষাটি নিতে পারেন। সব ঘটনারই কার্যকরণ থাকে, এবং কোনো মানুষের ভূমিকা সীমা ছাড়ানোর পিছনে কারও না কারো প্রশ্রয়ও থাকে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নিজকে নিজে প্রশ্ন করতে পারেন তাঁর মন্ত্রী হয়ে লতিফ সিদ্দিকী লাগামছাড়া কথাবার্তা বলার এবং বেপরোয়া গা-জোয়ারি ভূমিকার সাহস পেলেন কোত্থেকে? এ ব্যাপারে তাঁর কি কোনো ব্যর্থতা কিংবা উদাসীনতা ছিল? অর্থাৎ আশকারা পাওয়ার ঘটনা কি ঘটে নি?


Sunday, September 28, 2014

আরবদেশে মুক্তি কোন্ পথে?

আবুল মোমেন

কয়েকটি ছোট ছোট প্রশ্ন তোলা যাক।
সাদ্দাম হোসেনকে একনায়কত্বের পথে শক্তি জুগিয়েছে কে?
ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামকে অস্ত্রসজ্জিত করে যুদ্ধে ঠেলেছে কে?
আফগানিস্তানের তালিবানদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সংগঠিত করেছে কে?
ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার পৃষ্ঠপোষক ছিল কে?
পিএলও-র বিপক্ষে হিজবুল্লাহর উত্থানে মদত দিয়েছিল কে?
ইজরায়েলকে আরবদের বিরুদ্ধে একতরফা পক্ষপাতমূলক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে কে?
এ ছ’টি প্রশ্নের উত্তর একটিই - যুক্তরাষ্ট্র।
আজ এটা পরিস্কার এই সব মানুষ ও সংগঠনের উত্থান সেসব অঞ্চলের জন্যে কল্যাণকর হয় নি।
আরও কয়েকটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক বলেই উত্থাপন করা দরকার।
ইরাকে আক্রমণ চালানোর জন্যে গণ-ধ্বংসাত্মক অস্ত্র মওজুদের অজুহাত কি সত্য ছিল?
প্যালেস্টাইনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া কি সঠিক ছিল?
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরে ইরাকে কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
একতরফা ব্যবস্থার মাধ্যমে আফগানিস্তান সমস্যার কি যথাযথ সমাধান করা গেছে?
চারটি প্রশ্নেরই উত্তর একই - না।
আমরা দেখছি এ সব অঞ্চলে ভোগান্তি আরও বেড়েছে, প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে, রক্তপাত ও ধ্বংস চলছেই। শত্র“তারও অবসান হচ্ছে না।
উপরের প্রশ্নোত্তর পর্বের পটভূমিতে যদি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বিভীষিকা আইএস বা ইসলামিক স্টেট দলের ভূমিকা বিচার করি তাহলে পশ্চিমা প্রচারণার ওপর-ভাষ্যে ভুলে গেলে বোধহয় চলবে না। তলিয়ে বিচার করা দরকার।
বহুকাল ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য আরব দেশের মত সিরিয়াতেও বশংবদ সরকার কায়েম। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে শিখণ্ডি সরকার বসিয়ে বিপুল তেলসম্পদের বখরা ভালোভাবে আদায় হয়েছে। এ অঞ্চলে এখন একমাত্র হাতছাড়া রয়েছে সিরিয়া। দীর্ঘদিন নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও সার্থক হয় নি যুক্তরাষ্ট্র। পুরোনো সম্পর্কের জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শেষ সমর্থক-রাষ্ট্রকে রক্ষায় রাশিয়া এখনও আন্তরিক। ইরানও রয়েছে পাশে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক কোনো যুদ্ধে আর জড়াতে চায় না। বিশেষত ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের প্রাণহানি, পেশাগত নৈতিকতাচ্যুতি, এবং আহতদের মানসিক বৈকল্য ও বিপুল খরচের চাপ মার্কিন ভোটারদের একই ধরনের অভিজ্ঞতার প্রতি বিরূপ করে রেখেছে। কিন্তু সিরিয়াকে অমনি ছেড়ে দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র, হস্তক্ষেপের ফিকিরেই ছিল পরাশক্তিটি।
এমন সময়ে আকস্মিকভাবে ইরাক থেকে উত্থান ঘটল ভয়ঙ্কর মতাদর্শের আইএস। তারা একটি অঞ্চলে রাতারাতি ইসলামি খেলাফতই প্রতিষ্ঠা করে ফেলল! তারপর এমন জঙ্গি নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ শুরু করল যা কোনো ধরনের ইসলামি দল-উপদলের পক্ষেও সমর্থন করা সম্ভব নয়। লক্ষ্য করবার বিষয় আইএসকে সমর্থন করার মত কোনো স্বীকৃত মুসলিম সংগঠন নেই। আবার সকল বিরুদ্ধতাকে হেলায় অগ্রাহ্য করে আইএস তার মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়েও যাচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রশক্তি এবং কোনো বড় সাংগঠনিক শক্তির সমর্থন ছাড়াই আইএসের অমানবিকতার অগ্রাভিযান অব্যাহত রয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
এবার যদি আমরা প্রশ্নটা তুলি - আইএসের আকস্মিক উত্থান এবং এত বাধার মুখেও অগ্রাভিযানের পিছনে কে?
উত্তরটা কী হতে পারে বলে আপনারা ভাবছেন? উত্তর কিন্তু একটিই Ñ আগের অঘটনগুলোর ধারাবাহিকতা এখানেও ক্ষুণœ হয় নি। বলা যায়, কলকাঠি যুক্তরাষ্ট্রই নাড়াচ্ছে, সঙ্গে যথারীতি মিত্ররাও রয়েছে। ফ্রান্স ও অষ্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে আইএসের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমে যারা বসবাস করেন, তাদের মধ্যে যাদের চোখকান খোলা তারা পুঁজিবাদী বিশ্বের এসব চালাকি ভালোই ধরতে পারছে। তাদের মধ্যে যারা তরুণ, যাদের রক্ত গরম, তারা অনেক সময় এত অন্যায় দেখে নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। তারা প্রতিকারের জন্যে আরেকটি ভুলের ফাঁদে পা দেয়, যেমন করে অতীতে তালিবান ও আল কায়েদায় ভুলে এভাবে শিক্ষিত ছেলেরা জেহাদী যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু পুঁজিবাদের হাতে সৃষ্ট এসব জঙ্গি সংগঠনের প্রাণভোমরা কখনও তারা হাতছাড়া করে নি। তারা মূলত পুঁজিবাদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়ার জন্যেই সৃষ্ট। প্রয়োজনে ফুরানোর পর যথারীতি তাদের ধ্বংস করেও দেওয়া হয়েছে। এখন তালিবান আল কায়েদার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাদের বাগাড়ম্বরের ক্ষমতাটুকই আছে, সমান তালে লড়ে পুঁজিবাদী বিশ্বকে পরাস্থ করার কোনো ক্ষমতাই নেই।
আইএস ব্যাপক হৈচৈ বাধিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ভালোভাবে জায়গা করে দেওয়ার উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে। তারাও আসরে নেমে পড়তে দেরি করে নি। প্রথমে বারাক ওবামা তাঁর ভোটারদের আশ্বস্ত করে বললেন, আমরা এবার আর স্থলবাহিনী পাঠাব না, কেবল বিমান আক্রমণ চালিয়েই কাজ সারব। সেভাবেই শুরু হল। এবারে তাঁদের সামরিক কৌশলবিদ আসরে নেমেছেন। তাঁদের কণ্ঠে একটু একটু শোনা যাচ্ছে যে শুধু বিমান আক্রমণ চালিয়ে সম্ভবত কাজ হবে না, এক পর্যায়ে স্থলবাহিনী পাঠাতেই হবে। এদিকে বিমান আক্রমণ এবং তাতে বেশ ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আইএস তার নিষ্ঠুর জঙ্গি কার্যক্রম জোরদার করে চলেছে। ফলে পুঁজিবাদী মিত্রশক্তির মধ্যপ্রাচ্যে ঢুকে পড়ার উপলক্ষটা আরও ভালভাবে তৈরি হয়ে গেল।
আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি, যথাসময়ে আইএসের পরিণতিও তালিবান ও আলকায়েদার মতই হবে। কেবল দেখতে হবে পুঁজিবাদের তাদের কতটুকু এবং কতদিন লাগবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে রয়েছে সৌদিআরব, মিশর, কুয়েত, জর্ডান, প্রভৃতি আরববিশ্বের প্রভাবশালী ধনী মুসলিম দেশ।
আরব দেশগুলোতে আধুনিক শিক্ষা এখনও সাধারণের মধ্যে ছড়ায় নি। ফলে প্রথা এবং সংস্কৃতির প্রাচীন ধারার ঘোর থেকে জনগণ মুক্ত হয় নি। এসব দেশের শাসকদলের কাছে - তা রাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্র বা ছদ্মগণতন্ত্র, যা-ই হোক Ñ জনগণের এই পরিণতিই কাম্য। রাজা-প্রজার সম্পর্কের বাইরে এসব দেশে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ এখনও সম্ভব নয়। নির্বাচনও এরকম সমাজে স্বৈরতন্ত্রী ও ধর্র্মান্ধদেরই ক্ষমতায় পাঠায়। গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারীর সমানাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদির পক্ষে সমাজমানসকে তৈরি করার জন্যে কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এসব দেশে এখনও হয় নি। ফলে বেশিরভাগ দেশে শরিয়ার নামে এমন সব রীতি চালু রয়েছে যা সমাজের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করছে। এতে ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বের সাধারণ মানুষ শিক্ষা ও চেতনায় অগ্রসর হচ্ছে না। তাতে ইসলামের মূল শিক্ষা ও নবীর মূল চেতনার পরিপন্থী হয়ে পড়ছে সমাজগুলো। তাদের নেতৃত্বের পুঁজিবাদের তাঁবেদারির ফলে আজ ইসলাম ও মুসলিম জনগণ চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে গেছে। তাদের সাথে সরাসরি যোগ দিয়ে কিংবা এদের সৃষ্ট তথাকথিত ধর্মীয় সংগঠনে জুটে গিয়ে মুক্তির পথ মিলবে না। এর জন্যে প্রয়োজন সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কার, এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এটা জেহাদী জোশ দিয়ে অর্জিত হবে না, এটা সম্ভব হবে প্রত্যেক দেশে সচেতন মানুষ একাট্টা হয়ে নিজ নিজ দেশে সমাজ ও সরকার পরিবর্তনের কাজ করলে। তার ভিত্ তৈরি করে দেবে আধুনিক জনশিক্ষার প্রসার।
পশ্চিমের অস্ত্র কিনে, ভাড়াটে সৈন্য দিয়েও একাজ হবে না। নবীর দেখানো পথ জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা ও শক্তি বৃদ্ধি করে সমাজের নবায়নের মাধ্যমেই এটা অর্জন সম্ভব। পথটা সহজ বা সংক্ষিপ্ত নয়, দীর্ঘ ও বন্ধুর। সবাই জানি বড় কিছু অর্জন করতে হলে কঠিন পথে বিপুল ত্যাগেই তা মেলে। আর তার জন্যে যথাযথ হাতিয়ার প্রয়োজন। সেটি আপাতত একে ৪৭, রকেট লাঞ্চার, কামান-বাজুকা নয়। তার আগে দরকার জ্ঞানের আলোয় নির্মিত দূরদর্শী প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্ব ও আলোকিত অনুসারীর দল। এই নেতৃত্বই নিজ দেশের জনগণকে জাগিয়ে তুলে ঐক্যবদ্ধ করবে। অর্থাৎ দূরদর্শী জ্ঞানী গণনায়কের প্রয়োজন আজ আরব দেশগুলোতে। এটাই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ।

***

Tuesday, September 23, 2014

কী তৈরি করছি - শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী?

আবুল মোমেন

শিক্ষামন্ত্রীর নিরহঙ্কার নেতৃত্বে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রা আমাদের দেশে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাত্রকে বত্রিশ কোটি বই শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পৌঁছে দেওয়ার মত বিস্ময় যেমন আছে তেমনি আছে সর্বমহলের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে রীতিমত বাস্তবায়ন শুরু করার মত ঐতিহাসিক অর্জন। শিক্ষামন্ত্রীর সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে ভরসায় শিক্ষা নিয়ে যাঁরা ভাবেন তাঁদের বিবেকের ওপর চেপে বসতে থাকা একটি দুর্ভাবনা ও উদ্বেগ তুলে ধরার কথা ভাবছি।
একেবারে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পুরো শিক্ষাকে যে আমরা পরীক্ষার মধ্যে -গণ্ডিবদ্ধ করে ফেললাম কাজটা কি ঠিক হল? প্রশ্নটা তোলা জরুরি কারণ এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য - জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিক তৈরি - বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘাটতি রেখে শিক্ষার অপর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কতটা হতে পারে তাও বিচার্য বিষয়। এ দুটি বিষয়ের পরিপূরকতা বাধাগ্রস্ত হলে কাজ হবে না, কারণ দক্ষকর্মী তৈরি হবে জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিকের ভিত্তিভূমির ওপর।
পরীক্ষা হল শিক্ষার্থীর সিলেবাস ভিত্তিক অর্জিত শিক্ষার মান যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। আমাদের দেশে যে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ দেওয়া এবং তার ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাতে বিভিন্ন স্তরের সম্পূর্ণ অর্জনলক্ষ্য পূরণ ও পরিমাপ কোনোটাই করা সম্ভব নয়। নিচের পর্যায় থেকে অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং তার আবার পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ফল কেমন তা আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিতসমাজের গড় আচরণ ও ভূমিকা থেকেই বোঝা উচিত। একটি অসম্পূর্ণ শিক্ষার প্রভাবে নানা অসম্পূর্ণতা নিয়েই সমাজ গড়ে উঠছে। বরং এই নব্যশিক্ষিতদের দাপটে আমাদের সনাতন ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ও নৈতিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সমাজ আজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতায় বিপথগামী হয়ে পড়েছে।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার নগদ-লক্ষ্য হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তা এত উগ্রভাবে প্রধান হয়ে উঠেছে যে বাকি লক্ষ্যগুলো বাকিই থেকে যাচ্ছে, আর তাতে প্রত্যেক ছাত্রের জীবনে মানবিক শিক্ষার বকেয়ার পাহাড় জমছে। ছাত্র যেমন তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচারও হয় একমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। পরীক্ষা সর্বগ্রাসী হয়ে রীতিমত স্কুল ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই অকেজো করে দিয়েছে। কারণ পরীক্ষায় ভালো করা আদতে এমন একটি দক্ষতা যার জন্যে স্কুলে ব্যয়িত সময়কে রীতিমত অপব্যয় বলে মনে হচ্ছে অনেকেরই, বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার ও টিউটরের পাঠ। লক্ষ্য যদি একমাত্র পরীক্ষাই হয় তবে সে বিচারে এটাই বেশি ফলপ্রসূ। ছাত্র-অভিভাবকদের চাহিদা এবং সরকারের চাপের মধ্যে পড়ে শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের কাজ করছেন এবং স্কুল নয় বস্তুত পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় খাটছেন (কোচিং সেন্টার সম্পর্কে একথা আরও বেশি খাটে)। তবে তারা খুশিমনেই খাটছেন কারণ এটি আর্থিকভাবে লাভজনক। শিক্ষার্থীকে নিছক পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের এ অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে থাকায় বর্তমানে শিক্ষক-অভিভাবক সকলেই পরীক্ষাকেই ধ্যানজ্ঞান এবং শিক্ষা বলে ভুল - না, অন্যায় - করছেন। ফলে শিক্ষা প্রশাসন-শিক্ষকসমাজ-অভিভাবক এবং এর ভিকটিম ছাত্র মিলে বিপথগামিতার ও অধোগতির রমরমা চলছে অবাধে। সোনালি পাঁচ-তারকা শিক্ষার্থীদের, থুড়ি পরীক্ষার্থীদের, সহাস্য ছবির আড়ালে এ অবক্ষয় ঢাকা যাচ্ছে না।
মুশকিল হল, এ আনন্দ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী। কারণ প্রাপ্ত শিক্ষা যে টেকসই নয় তা প্রথমে পরবর্তী ধাপের ভর্তি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়ে যায় তাতে অধিকাংশের ফলাফলের হাল দেখে। কিন্তু তার আরও স্থায়ী অর্থাৎ টেকসই কুফল দেখা যায় সমাজে - ‘শিক্ষিত’ মানুষদের দক্ষতার মান এবং  দুর্নীতি-অনৈতিকতার নৈরাজ্য দেখে। এছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষের ন্যূনতম অর্জনের চিত্রও ভয়াবহ। দু’ একটি নমুনা দেওয়া যাক।
প্রাথমিকের মোদ্দা কয়েকটি অর্জনলক্ষ্য হল পড়া-লেখা-বলা-শোনা (শুনে বোঝা) এবং গণিতে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন। গোটা ছাত্রজীবনেই এসব অর্জনের অগ্রগতি চলবে।
বাস্তবে কী ঘটছে? প্রাথমিক স্তর নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য জরীপে দেখা যাচ্ছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ শিশু উপরোল্লিখিত দক্ষতাগুলো নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী অর্জনে ব্যর্থ থেকেই প্রাথমিক পর্যায় সমাপ্ত করে, যাদের অনেকেই জিপিএ ৫-ও পেয়ে থাকে। তাদের কথা ছেড়ে দিন, আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের  ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্তদের সামনে শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাতা খুলে পড়ে শোনাতে বলেন তাহলে অভিজ্ঞতাটা কেমন হবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, দু’চারজন ছাড়া কেউই ভাব ও অর্থ ফুটিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে গড়গড় করে পড়তে পারে না। পদে পদে হোঁচট খায়, এবং পাঠ ও রস উভয়ই ব্যাহত হয়।
চার বছর (বা ৬ বছর) বয়স থেকে আঠার বছর (অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রলম্বিত হচ্ছে) একটানা পড়াশুনার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবারই জ্ঞানভিত্তিক স্মৃতি অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ এত বছরে তারা যেসব বিষয় পড়েছে (বা তাদের পড়ার কথা) যেমন - বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা শাখা, মানবিক ও অন্যান্য বিদ্যা - তার পুঞ্জিভূত যে সঞ্চয় তাদের থাকার কথা তা গড়ে উঠছে না। বেচারা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন কেবল সঞ্চয় থাকলেও হবে না, কারণ তা স্তূপাকার হয়ে জঞ্জালে পরিণত হবে যদি না এ দিয়ে ভাবনা, চিন্তা, দর্শনসহ মনন ও উপভোগের নানান রসদ তৈরির প্রক্রিয়া চালু থাকে। এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কেবল নির্ধারিত কিছু পাঠ্যবই পড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যায় না। আর আমাদের দেশে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত ছাত্র অযথা পুরো পাঠ্যবই বা কেন পড়বে? শিক্ষক-টিউটরের সহযোগিতায় তারা আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরগুলোই শুধু শেখে, প্রায় ক্ষেত্রে মুখস্থ করে। এভাবে কোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে জানা হয় না, যেটুকু জানা হয় তার কোনো মননশীল চর্চার সুযোগ নেই। এই কাটছাঁট করা শিক্ষার উপমা হতে পারে পাখা ছেঁটে দেওয়া পাখি, যে আর উড়তে পারে না।
এভাবে শিক্ষাটা অর্থাৎ জানা বোঝা ইত্যাদি হয় ভাসা-ভাসা। যা সে পড়ে বা তার পড়ার কথা, সেসব কখনও তার ভাবনার বিষয় হয় না, বস্তুত এভাবে কারও সমৃদ্ধ চিন্তাজগত তৈরি হয় না। এ কারণে আমরা দেখি সংসদে সুস্থ তর্ক হয় না অশ্লীল ঝগড়া হয়। জাতীয় জীবনে কোনো ইস্যুতে সারগর্ভ আলোচনা হয় না একতরফা গোঁয়ার্তুমির প্রকাশ ঘটে।
পরীক্ষার এই দোর্দ--প্রতাপে জ্ঞানার্জন ও সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠার রসদগুলো অধিকাংশের অনায়ত্ত থেকে যাচ্ছে। এর চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় বাংলা সম্মানের পাঠ শেষ করে  রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ভিন্ন কোনো বইয়ের নাম বলতে পারে না এমন তরুণ প্রচুর এবং মূল টেকস্ট না পড়ে ইংরেজিসাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন এদেশেই সম্ভব। একথাও বলা যায়, উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার পরও অধিকাংশের সাহিত্যবোধ, সমাজচিন্তা, বিজ্ঞানমনষ্কতা ইত্যাদি অবিকশিত থেকে যায়। পরীক্ষার রিলে রেসে আবদ্ধ ছাত্রজীবন কাটিয়ে অধূনা অধিকাংশ শিক্ষিতজনের স্কুলজীবনে নাটকে, অভিনয়ে, গানে, আবৃত্তিতে, বিতর্কে কি স্কাউটিং, ক্যাম্পিং, ক্রীড়ার অভিজ্ঞতা থাকছে না; স্কুল, সহপাঠী, শিক্ষককে নিয়ে এমন বৈভবময় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছে না যা ভবিষ্যত জীবনে বারবার ফিরে ফিরে আসবে মধুর উদ্দীপক স্মৃতিচারণ হয়ে। সঞ্চয়হীন মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে অবশ্যই দরিদ্র থাকবে, আর স্মৃতিহীন মানুষের মানবিক খুঁটিগুলো তৈরি হয় না। বেপরোয়া কাজে কি বখাটেপনায় লিপ্ত হতে তার অন্তর থেকে রুচির বাধা তৈরি হবে না। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাদের পক্ষে সম্ভব। এই রিক্ততার বড় খেসারত হচ্ছে আমাদের শিক্ষিতজনদের প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম গড়ে উঠছে না - পেশা বা জীবিকার সত্তার বাইরে মনুষ্যসত্তার মান খুবই খারাপ হচ্ছে।
পরীক্ষাই সব হয়ে ওঠায় একে ঘিরে শিক্ষার প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, এমনকি বেআইনি কাজ ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা। অন্ধবিশ্বাস যেমন ধর্মকে ঘিরে অসাধু ব্যক্তিদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয় এ ‘শিক্ষাও’ তার উপজাত হিসেবে নোটবই, টেস্ট পেপার, মেডইজি, কোচিং সেন্টার, টিউশিন এবং অবশ্যই প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষাকে জড়িয়ে রাখছে। বত্রিশ সেট প্রশ্ন তৈরি করেও এটা বন্ধ করা যাবে না। কারণ শিক্ষার একমাত্র আরাধ্য দেবতা যদি হয় পরীক্ষা তো তাঁকে তুষ্ট করার জন্যে পুণ্যলোভী - এক্ষেত্রে A+ লোভী - শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবক, তেমন পুরোহিতই খুঁজবেন যিনি যে কোনো মূল্যে - অর্থাৎ অবৈধ পথে হলেও - মোক্ষ লাভে সহায় হবেন। শিক্ষকের মধ্যে তেমন যোগ্য সাহসী মানুষের অভাব ঘটাই স্বাভাবিক। তাতে কেউ দমবেন না। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা, কেরানি, প্রেসকর্মী, দপ্তরি, মায় দারোয়ান ইত্যাদি যেকোনো স্তর থেকে কাক্সিক্ষত ‘সাহসী যোগ্য’ পুরুষ এগিয়ে আসবেনই। হয়ত দর চড়বে, প্রণামী বাড়বে - এই যা।
২.
এটি আদতে শৈশবেই সশ্রম দ-প্রাপ্ত শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প। ঘরের নামে ওদের খাঁচায় বন্দি রাখা হয়, শিক্ষা জীবন কাটে কারাগারে, পরীক্ষার দ- খাটতে খাটতে। আশ্চর্য ব্যাপার হল শিক্ষা নয় এই দ- ভোগেই সবাই যেন প্রলুব্ধ হয়, এমনকি এতে আনন্দ পেতে থাকে, তার জন্যে নানা প্রলোভনও মওজুদ থাকছে। ফলে মানবজীবনের প্রস্তুতিকাল, পুরো কৈশোর ও প্রথম তারুণ্য, পরীক্ষার শৃঙ্খলে বাঁধা থাকছে। তাদের মাঠের, মুক্ত হাওয়ার, আলোর, আকাশের, গাছের, মাটির, জলের, সমবয়সীর সঙ্গের, বড়দের  স্নেহমমতার এবং গল্পের, সুরের, রঙের, আঁকার, ভাঙার, গড়ার, চড়ার, লাফাবার, দৌড়োবার যে অপরিমেয় ক্ষুধা-চাহিদা তা কি পূরণ করেছি আমরা? তার প্রকৃত আনন্দ, তার মনের বিকাশ কিসে সেসব ভাবনা কি আমাদের শিক্ষার এজেণ্ডায় আর সমাজের ভাবনায় আছে?
কোন ব্যবস্থায় একজন নিউটন জীবনসায়াহ্নে বলতে পারেন ‘আমি মাত্র জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি’ তা আমরা ভাবি না। আর ভাবি না বলেই জীবনপ্রভাতেই শিক্ষার্থীর গায়ে পরীক্ষার্থীর যুদ্ধ চড়িয়ে দিচ্ছি।
আমরা কেন এভাবে একটি - আসলে কোটি কোটি - বিয়োগান্তক গল্প রচনা করে চলেছি? এটা আফসোসের কথা, কারণ এ পরিণাম ঠেকানো সম্ভব - সহজেই এর পরিণতি মিলনাত্মক করা যেত।

***