Thursday, December 4, 2014

তাঁর রেনেসাঁস-সত্তা

আবুল মোমেন

সত্যিকারের বড় মানুষ সত্যিই দুর্লভ। কারণ বড় হওয়া মানেই খ্যাতিমান হওয়া, প্রতিষ্ঠিতজন হওয়া, পুরস্কার-স্বীকৃতি-সম্মাননায় অভিষিক্ত হওয়া। গণমাধ্যমের নজরে থাকা, তাতে প্রায়ই হাজিরা দেওয়া। এতে গৌরব বাড়ে, গর্বিত হওয়ার অধিকার জন্মায়। এই অধিকারবোধ প্রায় সবার অগোচরে সন্তর্পণে দূরত্ব আর আড়ালগুলো তৈরি করতে থাকে। বড় মানুষ কখন যে চূড়ার ছোট্ট পরিসরে আটকে যান হারিয়ে যান তা তিনিও টের পান না। ভাবি, এটা কি তাঁদের পরাজয়? কাইয়ুমভাই কিন্তু প্রাপ্তির আড়ম্বরে  হারিয়ে যান নি, তাতে আটকা পড়েন নি। না, খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে তাঁর পরাজয় ঘটে নি।
তিনি সবসময় সবারই থাকলেন। পরিবারের, শিল্পী ও ছাত্রদের, সমাজের, দেশের এবং ইতিহাসের একজন হয়েই থাকলেন। কেবল থাকা নয়, সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে থাকা। বড় কথা, সে ভূমিকা বৃহত্তর অর্থে কল্যাণকর, গঠনমূলক, যথাযথ।
বয়স, অভিজ্ঞতা, অর্জন তাঁকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে নি, মৌলিক মানুষটিকে বদলে দিতে পারে নি। তিনি থাকলেন বরাবরের কাইয়ুম চৌধুরী - স্বামী, পিতা, চাচা, ফুফা, খালু, ভাই, বন্ধু, শিক্ষক। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক বৃহৎ পরিবার ও ক্রমসম্প্রসারমান সমাজের অভিভাবক। এ তিনি বয়স বা সম্পর্কের জোরে কাকতলীয়ভাবে পান নি, যোগ্যতার সাথে দায়িত্বের ভারবহন করেই পেয়েছেন।
তাঁর কাছে সবাই চেয়েছেন, আর তাঁর মতো করেই তিনি দিয়ে গেছেন। পরিবারের বাইরে অধিকাংশের আবদার তো শিল্পীর কাছে - শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে। কিন্তু তাঁদের চাওয়া পেইন্টিং নয়, কেউ চান সংগঠনের লোগো, কারও দাবি সম্মেলনের পোস্টার, কেউ আর্জি জানান আমন্ত্রণপত্রের নক্সার, আর বেশিরভাগের প্রত্যাশা নিজের বইয়ের জন্যে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি প্রচ্ছদ-চিত্র। বেশির ভাগ দাবিই পূরণ করতেন তিনি। অচেনা ব্যক্তি কৌশলের আশ্রয় নেন কাইয়ুমভাইয়ের কোনো প্রিয়জনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে সবসময় চাপে থাকতে হয়েছে তাঁকে।
কাইয়ুমভাই জীবনের প্রায় সবটা সময় চারুকলায় শিক্ষকতার বাইরে কোনো-না-কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকেছেন। অনেক পত্রিকা ও সাময়িকীর অঙ্গসৌষ্ঠবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, শেষ দিন পর্যন্ত করে গেছেন। সংবাদ, চিত্রালী, ইংরেজি এক্সপ্রেস, সচিত্র সন্ধানী, টাপুরটুপুর, অন্তরঙ্গ এমনি আরও অনেক। সাম্প্রতিককালে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো আর বেঙ্গল ফাউণ্ডেশনের সাথে। ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখেছেন, ছোটদের জন্যে ছড়াও। চাপের মধ্যে থেকেও কখনও তাঁর প্রসন্নতা হারান নি, এমনকী প্রফুল্লতাও। কাজে চাপ কিংবা তাড়াহুড়ার ছাপ থাকত না তাঁর কোনো কাজে কিংবা আচরণে-ব্যবহারে। হয়ত সময় নিতেন তিনি, কিন্তু কাজের মানে আপস করতেন না, নিজের কাজটিই করতেন।
তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রও ছিল ছড়ানো  পেইন্টিং এবং গ্রাফিক্স, ড্রয়িং এবং স্কেচে সমান পারদর্শী; আগ্রহ ছিল সঙ্গীতে   উচ্চাঙ্গ, পুরোনো বাংলাগান, রবীন্দ্র-নজরুলসহ পঞ্চভাষ্কর, কি নয়; চলচ্চিত্রের প্রতি কেবল আগ্রহ নয় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে ছিলেন, ছিলেন আগ্রহী চলচ্চিত্র তৈরিতেও; সাহিত্য পাঠের অভ্যাস শৈশব থেকেই, এবং তা কখনও ছাড়েন নি; বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রতিও কৌতূহলী ছিলেন। পছন্দের বই কেনা কখনও ছাড়েন নি। রেখে গেছেন ঈর্ষণীয় গানের সংগ্রহ। বইয়ের সংগ্রহে আছে দুর্লভ অনেক বই। ভালো চলচ্চিত্রের সংগ্রহও গড়ে উঠেছিল তাঁর।
কাইয়ুমভাইয়ের পক্ষে নিজের আঁকা প্রচ্ছদের বইগুলোর হদিশ নেওয়া বা দেখে শেষ করা সম্ভব ছিল না - তা সংখ্যায় এত বেশি। আমন্ত্রণপত্র, পোস্টার, মোড়ক-নক্সা, লোগোর ক্ষেত্রেও একথা খাটে। এমন বিপুল কাজের মান বজায় রাখা কঠিন কাজ। কাইয়ুম চৌধুরী অনায়াসেই তা ধরে রেখেছিলেন।
এর মধ্যে পেইন্টিং, ড্রয়িং কম করেন নি। তাতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন, উচ্চমান ধরে রেখেছেন। অন্য পরিচয়ের আড়ালে সমকালে তাঁর চিত্রকর পরিচয় তেমনভাবে আলোচিত হয় নি। এবার দিন যত গড়াবে ততই তা বাড়বে, কারণ চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরীকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তাঁর কবিতা কাব্যগুণ এবং বিশিষ্টতার কারণে পাঠকপ্রিয় হয়েছে, শিশুতোষ ছড়াও চমৎকার লিখেছেন। আজও অলঙ্করণে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁর হাতের বর্ণবিন্যাসের অসাধারণত্ব হাতছাড়া হয়নি কখনও।
এতসব কেজো আর কালিক গণ্ডিতে বাঁধা শিল্পকর্মে ব্যস্ত থেকেও তিনি আশ্চর্যরকম দক্ষতায় কাজোত্তীর্ণ ও কালোত্তীর্ণ চিরকালের ছোঁয়া দিতে পেরেছেন তাঁর অধিকাংশ সৃষ্টিতে। তাই মানুষটার মধ্যে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, ক্ষণকাল-চিরকাল, কাজ-বিরাম, শ্রম-উপভোগ একাকার হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মধ্যে থেকেও তিনি একা, আবার খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার গণ্ডিতে থেকেও বিচ্ছিন্ন বা একা হন নি, থেকেছেন সবার।
বহুসত্তার এক রেনেসাঁসকালের মানুষ ছিলেন তিনি। জীবন কাটিয়েছেন জাতীয় ইতিহাসের নানা দুঃসময়ের ভাঙাগড়ার মধ্যে। কিন্তু তাতে তাঁর রেনেসাঁস-সত্তার বৈচিত্র ও বিশালতা ক্ষুণœ হয় নি। কাল কিংবা দুঃসময় তাঁকে হজম করতে পারে নি, পরাভূত করতে পারে নি। কাইয়ুম চৌধুরী খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার কাছে যেমন নিজেকে সঁপে দেন নি, তেমনি ক্ষয়িষ্ণু কালের কাছেও হার মানেন নি। এমন আলোকিত জীবনের যবনিকা তো আলোকিত মঞ্চে নায়কের ভূমিকায় সহস্র মানুষকে সাক্ষী রেখেই পড়বার কথা। তার অন্যথা হয় নি।

***




   

Tuesday, October 21, 2014

দুর্নীতির কী হবে?

আবুল মোমেন

রাজনীতির মাধ্যমে জননেতা হওয়ার অর্থ হল তাদের অভিভাবক হওয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে সাংসদ হওয়ার অর্থ হল জনগণের প্রতিনিধি হওয়া। আর এরপরে সরকারের মন্ত্রী হওয়ার অর্থ হল জনগণের সেবক হওয়া।
এই মানদণ্ডে যদি আমরা সদ্য-বিতাড়িত মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর ভূমিকা বিচার করি তাহলে তিন ক্ষেত্রের কোনোটিতেই তিনি পাশ মার্ক পান না।
তাঁর সম্পর্কে আগে থেকেই পত্রপত্রিকায় নানা বিরূপ খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তাঁর এক বেপরোয়া বদমেজাজী অশালীন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত চেহারাই ফুটে ওঠে। পত্রিকার এই সমালোচনা বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হত সবার। সাম্প্রতিক বিতর্কিত ভূমিকার পরে তাঁর বিরুদ্ধে খবরের জোয়ার বইছে এখন।
পত্রিকায় দেখলাম স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও সমালোচনায় কণ্ঠ মেলাচ্ছেন, এবং তিনি কেবল লতিফ সিদ্দিকীর নয় পুরো পরিবার সম্পর্কেই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, সিদ্দিকীরা পাগলের পরিবার। যে দু’জন সিদ্দিকী খ্যাতি (এবং কুখ্যাতি) লাভ করেছেন দু’জনের মতিভ্রম ঘটে মাঝে মাঝে, এলোমেলো কথাবার্তা বলতেও শোনা যায়। তবে আমরা সাধারণ মানুষ বিশেষজ্ঞীয় মতামত দিতে পারব না। যা হোক, প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুটি দক্ষতার সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এক্ষেত্রে দূরদর্শিতা এবং পরিণত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন তাঁরা।
এবার দেখার বিষয় হল এ ঘটনাটি থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো শিক্ষা নেন কিনা। আমরা এ বিষয়ে একটু আলোকপাত করব।
আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে রাজনীতিকে অনেকেই ব্যক্তিগত বিত্তবৈভব অর্জনের ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ক্ষমতাই দেবতা ক্ষমতাই মোক্ষ। ক্ষমতার আওতা এবং জৌলুস বাড়ানোর জন্যেই প্রয়োজন হয় নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিজয়ী হওয়া, এবং বিজয়ী হয়েই অফিসিয়ালি জননেতা হওয়ার সৌভাগ্য হয়। তারপর প্রতিযোগিতা শুরু হয় দলের মূল নেতার নেকনজরে আসার, অনুগ্রহভাজন হওয়ার। ভাগ্যে ভালো থাকলে মন্ত্রিত্বের শিকে ছিঁড়তে পারে।
এটি তাঁদের জন্য প্রথমত বিনিয়োগের ক্ষেত্র, দ্বিতীয়ত নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখা ও প্রভাব বাড়ানোর দূরূহ এক প্রতিযোগিতা যা তাঁরা জনসমর্থনের শক্তি ব্যবহার করে জিততে জানেন না, তাদের নির্ভর করতে হয় সশস্ত্র ক্যাডারদের ওপর। ফলে এ পর্যায়ে ক্যাডার পালন করতে হয়, তাদের অবৈধ, অনেক সময় অপরাধজনক কাজকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের অগ্রযাত্রা বজায় রাখার ধুরন্ধর কৌশলি লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। আর তৃতীয়ত, অপরাধ ও অবৈধ কাজের প্রতিষেধক হিসেবে নানান ‘সমাজসেবামূলক’ কাজে অর্থ সাহায্য দিয়ে নিজের জন্যে সভাপতি, প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ ক্রয় করে নিতে হয়। এভাবে এ ধরনের বিতর্কিত নেতাদের প্রভাব বলয়ের মধ্যেই রাজনৈতিক দল আটকে পড়েছে আজ। কোনো বড় নেতাও কোনো দলকে এই গণ্ডি থেকে বের করে আনতে পারছেন না।
শুনেছি লতিফ সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত পাঠাগার বেশ সমৃদ্ধ, তিনি পড়াশুনাও করেন, নিজে লেখালেখিও করেন, তাঁদের দু’ভাইয়ের লিখিত বইও আছে। সে বিচারে তিনি একজন সাহিত্যসেবী। তিনি ও তাঁর ভাই বড় মাপের মুক্তিযোদ্ধা, এ বিষয়ে কেউ বিতর্ক করে না। পঁচাত্তরের পরে একসময় লতিফ সিদ্দিকী দীর্ঘদিন কারাবন্দীও ছিলেন। অর্থাৎ সংগ্রাম এবং ত্যাগ  আদর্শবাদী রাজনীতির এই দুটি দীক্ষাই তাঁর রয়েছে। কিন্তু তারপরেও এ দশা কেন? কারণ, দেখা যাচ্ছে সত্যিই তিনি বেপরোয়া মানুষ, কাউকে মান্য করতে, সমীহ করতে, এমনকি সামান্য সৌজন্য ভদ্রতা রক্ষা করতেও অভ্যস্ত নন। এটি ব্যক্তিগত আচরণের একটি সমস্যা, সাংস্কৃতিক রুচির সংকটও বলা যায়। আর বর্তমান রাজনীতির ধারায় ধীরে ধীরে অতীতের অনেক রাজনীতিবিদ গা-ভাসিয়েছেন - দুর্নীতি তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন হল, তাঁর সম্পর্কে পত্রপত্রিকার খবর, কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত আচরণগত সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রী কি জানতেন না? কথাটা কি বিশ্বাসযোগ্য? অনেকসময় দেখা গেছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকীকে তিনি সঙ্গে রেখেছেন। গুটিকয়েক মন্ত্রীকে নিয়ে যেসব অনুষ্ঠান তাতেও লতিফ সিদ্দিকী থেকেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের মন্ত্রীর তালিকায় তিনি রয়েছেন।
এই আস্থার এমন প্রতিদান সিদ্দিকী দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রীকে এবারে ব্যবস্থা নিতেই হল। আবারও প্রশ্ন ওঠে - কেবল কি জনগণ ফুঁশে উঠলেই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবেন? আইন বা শৃঙ্খলার কোনো নিজস্ব গতিপথ থাকবে না?
কিন্তু গুরুতর প্রশ্ন হল লতিফ সিদ্দিকীকে প্রধানমন্ত্রী, সরকার বা আওয়ামী লীগ যে শাস্তি দিল তা তো দুর্নীতির জন্যে নয়, ধর্মদ্রোহী কথার জন্য। এই একটি বিষয়ে সরকারের হাতপা বাঁধা, কেননা ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে। অতএব ব্যবস্থা নিতেই হয়েছে। কিন্তু কেবল দুর্নীতি কিংবা অশালীন অভদ্র্র ও অগ্রহণযোগ্য আচরণের জন্যে শাস্তি আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
দেশে ব্যাপকহারে দুর্নীতি হয় তা সকলেই জানেন, এও জানা বিষয় যে বড় আকারের দুর্নীতি ক্ষমতা ও ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং অনেক সময়, ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। সরকারের মন্ত্রী, সাংসদদের মধ্যে বা সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির খবর পাওয়া যায়। অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো বেশ প্রকট। কারও কারও আচরণগত সমস্যা সরকার ও সরকারি দলের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করছে। সাংসদদের মধ্যে দুর্নীতি, মাস্তানপোষণ এবং ব্যক্তিগতভাবে আচরণগত সমস্যার  প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিপক্ষের লোকজনকে মারধরের ঘটনা বাড়ছে। সরকার নিশ্চেষ্ট থাকছেন, বা এত ধীরে এবং মৃদুভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি করছে, হালকা কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছে যে তাতে এ রোগ মহামারীতে রূপ নেওয়া ঠেকবে না। এ অবস্থায় অচিরেই সরকারকে পুলিশ ও মাস্তানের ওপর নির্ভর করেই দেশ চালাতে হবে। কারণ এভাবে চললে জনসমর্থন কমতেই থাকবে।
আমরা আশা করব লতিফ সিদ্দিকী উপকাহিনীটি থেকে সরকার ও সরকারি দলের জন্যে কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে।
প্রথমত, জনগণ বেপরোয়া প্রকৃতির মানুষদের পছন্দ করে না, দ্বিতীয়ত, এ ধরনের আত্মম্ভরি মানুষ কখনও নির্ভরযোগ্য হতে পারে না, তৃতীয়ত, তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত হবেনই এবং তাতে সরকারের জন্যে নেতিবাচক ভূমিকাই পালন করবেন। ক্ষমতার সব রকম অপব্যবহার বন্ধ হওয়া দরকার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ শুরু করা জরুরি। লতিফ সিদ্দিকী ইস্যু সম্পন্ন হওয়ার পর এ থেকেই শিক্ষা নিয়ে এ দুই কাজে সরকার বিশেষ জোর দিতে পারেন। এতে আখেরে তাঁরাই লাভবান হবেন।
তিনিই একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি, দূরদর্শী নেতা যিনি যে কোনো ঘটনা থেকে সঠিক শিক্ষাটি নিতে পারেন। সব ঘটনারই কার্যকরণ থাকে, এবং কোনো মানুষের ভূমিকা সীমা ছাড়ানোর পিছনে কারও না কারো প্রশ্রয়ও থাকে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে নিজকে নিজে প্রশ্ন করতে পারেন তাঁর মন্ত্রী হয়ে লতিফ সিদ্দিকী লাগামছাড়া কথাবার্তা বলার এবং বেপরোয়া গা-জোয়ারি ভূমিকার সাহস পেলেন কোত্থেকে? এ ব্যাপারে তাঁর কি কোনো ব্যর্থতা কিংবা উদাসীনতা ছিল? অর্থাৎ আশকারা পাওয়ার ঘটনা কি ঘটে নি?


Sunday, September 28, 2014

আরবদেশে মুক্তি কোন্ পথে?

আবুল মোমেন

কয়েকটি ছোট ছোট প্রশ্ন তোলা যাক।
সাদ্দাম হোসেনকে একনায়কত্বের পথে শক্তি জুগিয়েছে কে?
ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামকে অস্ত্রসজ্জিত করে যুদ্ধে ঠেলেছে কে?
আফগানিস্তানের তালিবানদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সংগঠিত করেছে কে?
ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়েদার পৃষ্ঠপোষক ছিল কে?
পিএলও-র বিপক্ষে হিজবুল্লাহর উত্থানে মদত দিয়েছিল কে?
ইজরায়েলকে আরবদের বিরুদ্ধে একতরফা পক্ষপাতমূলক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে কে?
এ ছ’টি প্রশ্নের উত্তর একটিই - যুক্তরাষ্ট্র।
আজ এটা পরিস্কার এই সব মানুষ ও সংগঠনের উত্থান সেসব অঞ্চলের জন্যে কল্যাণকর হয় নি।
আরও কয়েকটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক বলেই উত্থাপন করা দরকার।
ইরাকে আক্রমণ চালানোর জন্যে গণ-ধ্বংসাত্মক অস্ত্র মওজুদের অজুহাত কি সত্য ছিল?
প্যালেস্টাইনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া কি সঠিক ছিল?
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরে ইরাকে কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
একতরফা ব্যবস্থার মাধ্যমে আফগানিস্তান সমস্যার কি যথাযথ সমাধান করা গেছে?
চারটি প্রশ্নেরই উত্তর একই - না।
আমরা দেখছি এ সব অঞ্চলে ভোগান্তি আরও বেড়েছে, প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে, রক্তপাত ও ধ্বংস চলছেই। শত্র“তারও অবসান হচ্ছে না।
উপরের প্রশ্নোত্তর পর্বের পটভূমিতে যদি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বিভীষিকা আইএস বা ইসলামিক স্টেট দলের ভূমিকা বিচার করি তাহলে পশ্চিমা প্রচারণার ওপর-ভাষ্যে ভুলে গেলে বোধহয় চলবে না। তলিয়ে বিচার করা দরকার।
বহুকাল ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে অন্যান্য আরব দেশের মত সিরিয়াতেও বশংবদ সরকার কায়েম। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে শিখণ্ডি সরকার বসিয়ে বিপুল তেলসম্পদের বখরা ভালোভাবে আদায় হয়েছে। এ অঞ্চলে এখন একমাত্র হাতছাড়া রয়েছে সিরিয়া। দীর্ঘদিন নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও সার্থক হয় নি যুক্তরাষ্ট্র। পুরোনো সম্পর্কের জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শেষ সমর্থক-রাষ্ট্রকে রক্ষায় রাশিয়া এখনও আন্তরিক। ইরানও রয়েছে পাশে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক কোনো যুদ্ধে আর জড়াতে চায় না। বিশেষত ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের প্রাণহানি, পেশাগত নৈতিকতাচ্যুতি, এবং আহতদের মানসিক বৈকল্য ও বিপুল খরচের চাপ মার্কিন ভোটারদের একই ধরনের অভিজ্ঞতার প্রতি বিরূপ করে রেখেছে। কিন্তু সিরিয়াকে অমনি ছেড়ে দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র, হস্তক্ষেপের ফিকিরেই ছিল পরাশক্তিটি।
এমন সময়ে আকস্মিকভাবে ইরাক থেকে উত্থান ঘটল ভয়ঙ্কর মতাদর্শের আইএস। তারা একটি অঞ্চলে রাতারাতি ইসলামি খেলাফতই প্রতিষ্ঠা করে ফেলল! তারপর এমন জঙ্গি নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ শুরু করল যা কোনো ধরনের ইসলামি দল-উপদলের পক্ষেও সমর্থন করা সম্ভব নয়। লক্ষ্য করবার বিষয় আইএসকে সমর্থন করার মত কোনো স্বীকৃত মুসলিম সংগঠন নেই। আবার সকল বিরুদ্ধতাকে হেলায় অগ্রাহ্য করে আইএস তার মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়েও যাচ্ছে। কোনো রাষ্ট্রশক্তি এবং কোনো বড় সাংগঠনিক শক্তির সমর্থন ছাড়াই আইএসের অমানবিকতার অগ্রাভিযান অব্যাহত রয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।
এবার যদি আমরা প্রশ্নটা তুলি - আইএসের আকস্মিক উত্থান এবং এত বাধার মুখেও অগ্রাভিযানের পিছনে কে?
উত্তরটা কী হতে পারে বলে আপনারা ভাবছেন? উত্তর কিন্তু একটিই Ñ আগের অঘটনগুলোর ধারাবাহিকতা এখানেও ক্ষুণœ হয় নি। বলা যায়, কলকাঠি যুক্তরাষ্ট্রই নাড়াচ্ছে, সঙ্গে যথারীতি মিত্ররাও রয়েছে। ফ্রান্স ও অষ্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে আইএসের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমে যারা বসবাস করেন, তাদের মধ্যে যাদের চোখকান খোলা তারা পুঁজিবাদী বিশ্বের এসব চালাকি ভালোই ধরতে পারছে। তাদের মধ্যে যারা তরুণ, যাদের রক্ত গরম, তারা অনেক সময় এত অন্যায় দেখে নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। তারা প্রতিকারের জন্যে আরেকটি ভুলের ফাঁদে পা দেয়, যেমন করে অতীতে তালিবান ও আল কায়েদায় ভুলে এভাবে শিক্ষিত ছেলেরা জেহাদী যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু পুঁজিবাদের হাতে সৃষ্ট এসব জঙ্গি সংগঠনের প্রাণভোমরা কখনও তারা হাতছাড়া করে নি। তারা মূলত পুঁজিবাদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়ার জন্যেই সৃষ্ট। প্রয়োজনে ফুরানোর পর যথারীতি তাদের ধ্বংস করেও দেওয়া হয়েছে। এখন তালিবান আল কায়েদার যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাদের বাগাড়ম্বরের ক্ষমতাটুকই আছে, সমান তালে লড়ে পুঁজিবাদী বিশ্বকে পরাস্থ করার কোনো ক্ষমতাই নেই।
আইএস ব্যাপক হৈচৈ বাধিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ভালোভাবে জায়গা করে দেওয়ার উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছে। তারাও আসরে নেমে পড়তে দেরি করে নি। প্রথমে বারাক ওবামা তাঁর ভোটারদের আশ্বস্ত করে বললেন, আমরা এবার আর স্থলবাহিনী পাঠাব না, কেবল বিমান আক্রমণ চালিয়েই কাজ সারব। সেভাবেই শুরু হল। এবারে তাঁদের সামরিক কৌশলবিদ আসরে নেমেছেন। তাঁদের কণ্ঠে একটু একটু শোনা যাচ্ছে যে শুধু বিমান আক্রমণ চালিয়ে সম্ভবত কাজ হবে না, এক পর্যায়ে স্থলবাহিনী পাঠাতেই হবে। এদিকে বিমান আক্রমণ এবং তাতে বেশ ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও আইএস তার নিষ্ঠুর জঙ্গি কার্যক্রম জোরদার করে চলেছে। ফলে পুঁজিবাদী মিত্রশক্তির মধ্যপ্রাচ্যে ঢুকে পড়ার উপলক্ষটা আরও ভালভাবে তৈরি হয়ে গেল।
আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি, যথাসময়ে আইএসের পরিণতিও তালিবান ও আলকায়েদার মতই হবে। কেবল দেখতে হবে পুঁজিবাদের তাদের কতটুকু এবং কতদিন লাগবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে রয়েছে সৌদিআরব, মিশর, কুয়েত, জর্ডান, প্রভৃতি আরববিশ্বের প্রভাবশালী ধনী মুসলিম দেশ।
আরব দেশগুলোতে আধুনিক শিক্ষা এখনও সাধারণের মধ্যে ছড়ায় নি। ফলে প্রথা এবং সংস্কৃতির প্রাচীন ধারার ঘোর থেকে জনগণ মুক্ত হয় নি। এসব দেশের শাসকদলের কাছে - তা রাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্র বা ছদ্মগণতন্ত্র, যা-ই হোক Ñ জনগণের এই পরিণতিই কাম্য। রাজা-প্রজার সম্পর্কের বাইরে এসব দেশে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ এখনও সম্ভব নয়। নির্বাচনও এরকম সমাজে স্বৈরতন্ত্রী ও ধর্র্মান্ধদেরই ক্ষমতায় পাঠায়। গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নারীর সমানাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদির পক্ষে সমাজমানসকে তৈরি করার জন্যে কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এসব দেশে এখনও হয় নি। ফলে বেশিরভাগ দেশে শরিয়ার নামে এমন সব রীতি চালু রয়েছে যা সমাজের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করছে। এতে ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বের সাধারণ মানুষ শিক্ষা ও চেতনায় অগ্রসর হচ্ছে না। তাতে ইসলামের মূল শিক্ষা ও নবীর মূল চেতনার পরিপন্থী হয়ে পড়ছে সমাজগুলো। তাদের নেতৃত্বের পুঁজিবাদের তাঁবেদারির ফলে আজ ইসলাম ও মুসলিম জনগণ চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে গেছে। তাদের সাথে সরাসরি যোগ দিয়ে কিংবা এদের সৃষ্ট তথাকথিত ধর্মীয় সংগঠনে জুটে গিয়ে মুক্তির পথ মিলবে না। এর জন্যে প্রয়োজন সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কার, এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এটা জেহাদী জোশ দিয়ে অর্জিত হবে না, এটা সম্ভব হবে প্রত্যেক দেশে সচেতন মানুষ একাট্টা হয়ে নিজ নিজ দেশে সমাজ ও সরকার পরিবর্তনের কাজ করলে। তার ভিত্ তৈরি করে দেবে আধুনিক জনশিক্ষার প্রসার।
পশ্চিমের অস্ত্র কিনে, ভাড়াটে সৈন্য দিয়েও একাজ হবে না। নবীর দেখানো পথ জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা ও শক্তি বৃদ্ধি করে সমাজের নবায়নের মাধ্যমেই এটা অর্জন সম্ভব। পথটা সহজ বা সংক্ষিপ্ত নয়, দীর্ঘ ও বন্ধুর। সবাই জানি বড় কিছু অর্জন করতে হলে কঠিন পথে বিপুল ত্যাগেই তা মেলে। আর তার জন্যে যথাযথ হাতিয়ার প্রয়োজন। সেটি আপাতত একে ৪৭, রকেট লাঞ্চার, কামান-বাজুকা নয়। তার আগে দরকার জ্ঞানের আলোয় নির্মিত দূরদর্শী প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্ব ও আলোকিত অনুসারীর দল। এই নেতৃত্বই নিজ দেশের জনগণকে জাগিয়ে তুলে ঐক্যবদ্ধ করবে। অর্থাৎ দূরদর্শী জ্ঞানী গণনায়কের প্রয়োজন আজ আরব দেশগুলোতে। এটাই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ।

***

Tuesday, September 23, 2014

কী তৈরি করছি - শিক্ষার্থী নাকি পরীক্ষার্থী?

আবুল মোমেন

শিক্ষামন্ত্রীর নিরহঙ্কার নেতৃত্বে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রা আমাদের দেশে ব্যতিক্রমী ঘটনা। এর মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাত্রকে বত্রিশ কোটি বই শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই পৌঁছে দেওয়ার মত বিস্ময় যেমন আছে তেমনি আছে সর্বমহলের কাছে গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে রীতিমত বাস্তবায়ন শুরু করার মত ঐতিহাসিক অর্জন। শিক্ষামন্ত্রীর সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে ভরসায় শিক্ষা নিয়ে যাঁরা ভাবেন তাঁদের বিবেকের ওপর চেপে বসতে থাকা একটি দুর্ভাবনা ও উদ্বেগ তুলে ধরার কথা ভাবছি।
একেবারে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পুরো শিক্ষাকে যে আমরা পরীক্ষার মধ্যে -গণ্ডিবদ্ধ করে ফেললাম কাজটা কি ঠিক হল? প্রশ্নটা তোলা জরুরি কারণ এতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য - জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিক তৈরি - বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই ঘাটতি রেখে শিক্ষার অপর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কতটা হতে পারে তাও বিচার্য বিষয়। এ দুটি বিষয়ের পরিপূরকতা বাধাগ্রস্ত হলে কাজ হবে না, কারণ দক্ষকর্মী তৈরি হবে জ্ঞানবান বিবেচক নাগরিকের ভিত্তিভূমির ওপর।
পরীক্ষা হল শিক্ষার্থীর সিলেবাস ভিত্তিক অর্জিত শিক্ষার মান যাচাইয়ের একটি পদ্ধতি। আমাদের দেশে যে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষের পাঠ দেওয়া এবং তার ভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাতে বিভিন্ন স্তরের সম্পূর্ণ অর্জনলক্ষ্য পূরণ ও পরিমাপ কোনোটাই করা সম্ভব নয়। নিচের পর্যায় থেকে অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং তার আবার পরীক্ষাকেন্দ্রিকতার ফল কেমন তা আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিতসমাজের গড় আচরণ ও ভূমিকা থেকেই বোঝা উচিত। একটি অসম্পূর্ণ শিক্ষার প্রভাবে নানা অসম্পূর্ণতা নিয়েই সমাজ গড়ে উঠছে। বরং এই নব্যশিক্ষিতদের দাপটে আমাদের সনাতন ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ও নৈতিকতাও চ্যালেঞ্জের মুখে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সমাজ আজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতায় বিপথগামী হয়ে পড়েছে।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় শিক্ষার নগদ-লক্ষ্য হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল এবং তা এত উগ্রভাবে প্রধান হয়ে উঠেছে যে বাকি লক্ষ্যগুলো বাকিই থেকে যাচ্ছে, আর তাতে প্রত্যেক ছাত্রের জীবনে মানবিক শিক্ষার বকেয়ার পাহাড় জমছে। ছাত্র যেমন তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচারও হয় একমাত্র পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। পরীক্ষা সর্বগ্রাসী হয়ে রীতিমত স্কুল ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই অকেজো করে দিয়েছে। কারণ পরীক্ষায় ভালো করা আদতে এমন একটি দক্ষতা যার জন্যে স্কুলে ব্যয়িত সময়কে রীতিমত অপব্যয় বলে মনে হচ্ছে অনেকেরই, বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কোচিং সেন্টার ও টিউটরের পাঠ। লক্ষ্য যদি একমাত্র পরীক্ষাই হয় তবে সে বিচারে এটাই বেশি ফলপ্রসূ। ছাত্র-অভিভাবকদের চাহিদা এবং সরকারের চাপের মধ্যে পড়ে শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের কাজ করছেন এবং স্কুল নয় বস্তুত পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় খাটছেন (কোচিং সেন্টার সম্পর্কে একথা আরও বেশি খাটে)। তবে তারা খুশিমনেই খাটছেন কারণ এটি আর্থিকভাবে লাভজনক। শিক্ষার্থীকে নিছক পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরের এ অন্যায় দীর্ঘদিন চলতে থাকায় বর্তমানে শিক্ষক-অভিভাবক সকলেই পরীক্ষাকেই ধ্যানজ্ঞান এবং শিক্ষা বলে ভুল - না, অন্যায় - করছেন। ফলে শিক্ষা প্রশাসন-শিক্ষকসমাজ-অভিভাবক এবং এর ভিকটিম ছাত্র মিলে বিপথগামিতার ও অধোগতির রমরমা চলছে অবাধে। সোনালি পাঁচ-তারকা শিক্ষার্থীদের, থুড়ি পরীক্ষার্থীদের, সহাস্য ছবির আড়ালে এ অবক্ষয় ঢাকা যাচ্ছে না।
মুশকিল হল, এ আনন্দ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী। কারণ প্রাপ্ত শিক্ষা যে টেকসই নয় তা প্রথমে পরবর্তী ধাপের ভর্তি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়ে যায় তাতে অধিকাংশের ফলাফলের হাল দেখে। কিন্তু তার আরও স্থায়ী অর্থাৎ টেকসই কুফল দেখা যায় সমাজে - ‘শিক্ষিত’ মানুষদের দক্ষতার মান এবং  দুর্নীতি-অনৈতিকতার নৈরাজ্য দেখে। এছাড়া একজন শিক্ষিত মানুষের ন্যূনতম অর্জনের চিত্রও ভয়াবহ। দু’ একটি নমুনা দেওয়া যাক।
প্রাথমিকের মোদ্দা কয়েকটি অর্জনলক্ষ্য হল পড়া-লেখা-বলা-শোনা (শুনে বোঝা) এবং গণিতে নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন। গোটা ছাত্রজীবনেই এসব অর্জনের অগ্রগতি চলবে।
বাস্তবে কী ঘটছে? প্রাথমিক স্তর নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য জরীপে দেখা যাচ্ছে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ শিশু উপরোল্লিখিত দক্ষতাগুলো নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী অর্জনে ব্যর্থ থেকেই প্রাথমিক পর্যায় সমাপ্ত করে, যাদের অনেকেই জিপিএ ৫-ও পেয়ে থাকে। তাদের কথা ছেড়ে দিন, আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের  ছাত্র বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্তদের সামনে শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাতা খুলে পড়ে শোনাতে বলেন তাহলে অভিজ্ঞতাটা কেমন হবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, দু’চারজন ছাড়া কেউই ভাব ও অর্থ ফুটিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণে গড়গড় করে পড়তে পারে না। পদে পদে হোঁচট খায়, এবং পাঠ ও রস উভয়ই ব্যাহত হয়।
চার বছর (বা ৬ বছর) বয়স থেকে আঠার বছর (অনেক ক্ষেত্রে তা আরও প্রলম্বিত হচ্ছে) একটানা পড়াশুনার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবারই জ্ঞানভিত্তিক স্মৃতি অত্যন্ত দুর্বল। অর্থাৎ এত বছরে তারা যেসব বিষয় পড়েছে (বা তাদের পড়ার কথা) যেমন - বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের নানা শাখা, মানবিক ও অন্যান্য বিদ্যা - তার পুঞ্জিভূত যে সঞ্চয় তাদের থাকার কথা তা গড়ে উঠছে না। বেচারা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন কেবল সঞ্চয় থাকলেও হবে না, কারণ তা স্তূপাকার হয়ে জঞ্জালে পরিণত হবে যদি না এ দিয়ে ভাবনা, চিন্তা, দর্শনসহ মনন ও উপভোগের নানান রসদ তৈরির প্রক্রিয়া চালু থাকে। এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে কেবল নির্ধারিত কিছু পাঠ্যবই পড়িয়ে প্রকৃত শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যায় না। আর আমাদের দেশে পরীক্ষার্থীতে রূপান্তরিত ছাত্র অযথা পুরো পাঠ্যবই বা কেন পড়বে? শিক্ষক-টিউটরের সহযোগিতায় তারা আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরগুলোই শুধু শেখে, প্রায় ক্ষেত্রে মুখস্থ করে। এভাবে কোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে জানা হয় না, যেটুকু জানা হয় তার কোনো মননশীল চর্চার সুযোগ নেই। এই কাটছাঁট করা শিক্ষার উপমা হতে পারে পাখা ছেঁটে দেওয়া পাখি, যে আর উড়তে পারে না।
এভাবে শিক্ষাটা অর্থাৎ জানা বোঝা ইত্যাদি হয় ভাসা-ভাসা। যা সে পড়ে বা তার পড়ার কথা, সেসব কখনও তার ভাবনার বিষয় হয় না, বস্তুত এভাবে কারও সমৃদ্ধ চিন্তাজগত তৈরি হয় না। এ কারণে আমরা দেখি সংসদে সুস্থ তর্ক হয় না অশ্লীল ঝগড়া হয়। জাতীয় জীবনে কোনো ইস্যুতে সারগর্ভ আলোচনা হয় না একতরফা গোঁয়ার্তুমির প্রকাশ ঘটে।
পরীক্ষার এই দোর্দ--প্রতাপে জ্ঞানার্জন ও সাংস্কৃতিক মানসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠার রসদগুলো অধিকাংশের অনায়ত্ত থেকে যাচ্ছে। এর চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় বাংলা সম্মানের পাঠ শেষ করে  রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ভিন্ন কোনো বইয়ের নাম বলতে পারে না এমন তরুণ প্রচুর এবং মূল টেকস্ট না পড়ে ইংরেজিসাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন এদেশেই সম্ভব। একথাও বলা যায়, উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার পরও অধিকাংশের সাহিত্যবোধ, সমাজচিন্তা, বিজ্ঞানমনষ্কতা ইত্যাদি অবিকশিত থেকে যায়। পরীক্ষার রিলে রেসে আবদ্ধ ছাত্রজীবন কাটিয়ে অধূনা অধিকাংশ শিক্ষিতজনের স্কুলজীবনে নাটকে, অভিনয়ে, গানে, আবৃত্তিতে, বিতর্কে কি স্কাউটিং, ক্যাম্পিং, ক্রীড়ার অভিজ্ঞতা থাকছে না; স্কুল, সহপাঠী, শিক্ষককে নিয়ে এমন বৈভবময় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হচ্ছে না যা ভবিষ্যত জীবনে বারবার ফিরে ফিরে আসবে মধুর উদ্দীপক স্মৃতিচারণ হয়ে। সঞ্চয়হীন মানুষ জ্ঞানের দিক থেকে অবশ্যই দরিদ্র থাকবে, আর স্মৃতিহীন মানুষের মানবিক খুঁটিগুলো তৈরি হয় না। বেপরোয়া কাজে কি বখাটেপনায় লিপ্ত হতে তার অন্তর থেকে রুচির বাধা তৈরি হবে না। নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাদের পক্ষে সম্ভব। এই রিক্ততার বড় খেসারত হচ্ছে আমাদের শিক্ষিতজনদের প্রকৃত দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম গড়ে উঠছে না - পেশা বা জীবিকার সত্তার বাইরে মনুষ্যসত্তার মান খুবই খারাপ হচ্ছে।
পরীক্ষাই সব হয়ে ওঠায় একে ঘিরে শিক্ষার প্রতিকূল, অবাঞ্ছিত, এমনকি বেআইনি কাজ ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হওয়ার কথা। অন্ধবিশ্বাস যেমন ধর্মকে ঘিরে অসাধু ব্যক্তিদের ব্যবসার সুযোগ করে দেয় এ ‘শিক্ষাও’ তার উপজাত হিসেবে নোটবই, টেস্ট পেপার, মেডইজি, কোচিং সেন্টার, টিউশিন এবং অবশ্যই প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষাকে জড়িয়ে রাখছে। বত্রিশ সেট প্রশ্ন তৈরি করেও এটা বন্ধ করা যাবে না। কারণ শিক্ষার একমাত্র আরাধ্য দেবতা যদি হয় পরীক্ষা তো তাঁকে তুষ্ট করার জন্যে পুণ্যলোভী - এক্ষেত্রে A+ লোভী - শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবক, তেমন পুরোহিতই খুঁজবেন যিনি যে কোনো মূল্যে - অর্থাৎ অবৈধ পথে হলেও - মোক্ষ লাভে সহায় হবেন। শিক্ষকের মধ্যে তেমন যোগ্য সাহসী মানুষের অভাব ঘটাই স্বাভাবিক। তাতে কেউ দমবেন না। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা, কেরানি, প্রেসকর্মী, দপ্তরি, মায় দারোয়ান ইত্যাদি যেকোনো স্তর থেকে কাক্সিক্ষত ‘সাহসী যোগ্য’ পুরুষ এগিয়ে আসবেনই। হয়ত দর চড়বে, প্রণামী বাড়বে - এই যা।
২.
এটি আদতে শৈশবেই সশ্রম দ-প্রাপ্ত শিশুর বেড়ে ওঠার গল্প। ঘরের নামে ওদের খাঁচায় বন্দি রাখা হয়, শিক্ষা জীবন কাটে কারাগারে, পরীক্ষার দ- খাটতে খাটতে। আশ্চর্য ব্যাপার হল শিক্ষা নয় এই দ- ভোগেই সবাই যেন প্রলুব্ধ হয়, এমনকি এতে আনন্দ পেতে থাকে, তার জন্যে নানা প্রলোভনও মওজুদ থাকছে। ফলে মানবজীবনের প্রস্তুতিকাল, পুরো কৈশোর ও প্রথম তারুণ্য, পরীক্ষার শৃঙ্খলে বাঁধা থাকছে। তাদের মাঠের, মুক্ত হাওয়ার, আলোর, আকাশের, গাছের, মাটির, জলের, সমবয়সীর সঙ্গের, বড়দের  স্নেহমমতার এবং গল্পের, সুরের, রঙের, আঁকার, ভাঙার, গড়ার, চড়ার, লাফাবার, দৌড়োবার যে অপরিমেয় ক্ষুধা-চাহিদা তা কি পূরণ করেছি আমরা? তার প্রকৃত আনন্দ, তার মনের বিকাশ কিসে সেসব ভাবনা কি আমাদের শিক্ষার এজেণ্ডায় আর সমাজের ভাবনায় আছে?
কোন ব্যবস্থায় একজন নিউটন জীবনসায়াহ্নে বলতে পারেন ‘আমি মাত্র জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছি’ তা আমরা ভাবি না। আর ভাবি না বলেই জীবনপ্রভাতেই শিক্ষার্থীর গায়ে পরীক্ষার্থীর যুদ্ধ চড়িয়ে দিচ্ছি।
আমরা কেন এভাবে একটি - আসলে কোটি কোটি - বিয়োগান্তক গল্প রচনা করে চলেছি? এটা আফসোসের কথা, কারণ এ পরিণাম ঠেকানো সম্ভব - সহজেই এর পরিণতি মিলনাত্মক করা যেত।

***



Monday, September 8, 2014

কোন্ পথে চলবে বিএনপি

আবুল মোমেন

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত বিরোধী দলের মূল কাজ হল জনগণের পাশে থেকে দেশ ও জনস্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান গ্রহণ। বক্তব্য প্রকাশ এবং নানা মাত্রার আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে তা করাই রেওয়াজ। এছাড়া জনগণের কোনো ভোগান্তির সময়ও তাদের পাশে দাঁড়ানো রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গে বন্যা হচ্ছে। বন্যা বেশ ভালো মতই হচ্ছে এবং বহু মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। পত্রপত্রিকার খবরে বোঝা যাচ্ছে ত্রাণ কাজ এখনও অপ্রতুল। তাছাড়া এসব অঞ্চলে বিপুল দরিদ্র মানুষ এমনিতেই যে কষ্টে থাকে তা জানা থাকলে এ সুযোগে তাদের ঘরবসতি ও জীবনমানের উন্নতির জন্যে কিছু মানবিক কাজ করে রাজনৈতিক দল লাভবান হতে পারে। এছাড়া গার্মেন্টস কারখানাকে ঘিরেও মানবিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ রয়েছে।
সারাদেশে রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় যোগাযোগ খাতে জনদুর্ভোগ চরম পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি লঞ্চডুবি ও প্রচুর প্রাণহানিতে  এ খাতের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে। এভাবে তালিকা দীর্ঘ করা সম্ভব।
বিএনপি এরকম কোনো ইস্যু নিয়েই আন্দোলনে নামছে না। সব সময় সব ইস্যুতে তাদের সুচিন্তিত বক্তব্য থাকে না। ভুক্তভোগী মানুষের পাশে দলটিকে দেখাও যাচ্ছে না। বলা যায়, প্রত্যক্ষভাবে মাঠ-পর্যায়ে জনসেবার রেওয়াজ যেন এ দলটির মধ্যেই নেই।
বিএনপি নেতা-কর্মীরা জানেন কোনো মতে সাধারণ নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাদের জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি। হয়ত তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির জয় অবধারিত। ফলে দেখা যাচ্ছে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকা- মূলত সরকার পতন ও দ্রুত মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।  মনোভাবটা হয়ত এরকম, একবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ফিরে পেলে সব কাজই করা সম্ভব, করা হবে।
এই মনোভোবের কারণে দলের রাজনীতির জন্যেই কতকগুলো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, বিএনপি যে সরকারের বাইরে থাকলেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালনে অসচেতন ও অক্ষম এ সমালোচনা সমর্থিত হয়। দ্বিতীয়ত, বিএনপির রাজনীতি একমাত্র এই দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ায় একে অগ্রাহ্য করা কিংবা এটি আদায়ে সম্ভাব্য আন্দোলন ঠেকানোর জন্যে আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে মাঠে না নেমে সরকারি নানা ব্যবস্থা ও বাহিনীর সহায়তার মাধ্যমেই কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে দেশের নানা অঞ্চলে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন গড়ে ওঠা ও দানা বাঁধানোর কোনো সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তৃতীয়ত, সরকার পরিবর্তন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জনকল্যাণের জন্যে যদি করাও হয়ে থাকে তা মূলত একটি আইন ও সাংবিধানিক বা বলা যায় আদর্শিক বিষয় কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে জনদুর্ভোগ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় বলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। তারা বোঝে এটা দলের নীতি-নির্ধারকদের এজে-া, এতে যুক্তি বা বক্তব্য হাজির করা তাদের এক্তিয়ারের বিষয় নয়। চতুর্থত, এভাবে চলতে থাকায় জেলা পর্যায়ের নেতা ও সারাদেশের কর্মীদের মধ্যে যথার্থ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলন দাঁড় করাতে না পারার হতাশা ছড়াচ্ছে। ফলে দিনে দিনে দল ও দলীয় কাজকর্মে স্থবিরতা নামছে। সরকার শাসনদ- আরও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে রাখার ও চালানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।
নি:সন্দেহে এটি বিএনপির রাজনীতির জন্যে কঠিন সময়। এ সময় নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সৃজনশীলতা এবং অঙ্গীকার ও সাহসী ভূমিকা প্রয়োজন ছিল। মানতেই হবে নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সূত্রে বলা দরকার বর্তমান সময়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের পুরোনো ধরণ ও ভাবনা নিয়ে রাজনীতিতে এগুনো যাবে না। সময়োপযোগী পরিবর্তনের তাগিদ বোঝার জন্যে নেতৃত্বে দূরদর্শিতা প্রয়োজন, আর তা সম্পাদন করার জন্যে প্রয়োজন সৃজনশীল হওয়ার ক্ষমতা। তারপর চাই কর্মীদের নিয়ে সরকারি দল ও বাহিনীর প্রতিবন্ধকতা ভেঙে মাঠে নামার সাহস। এ তিন ক্ষেত্রেই এখনও পর্যন্ত খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান দলকে যথাযথ নেতৃত্ব দিতে পারেন নি।
বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির বিবেচনায় আওয়ামী লীগের একটি বড় সাফল্য হল জামায়াতে ইসলামির গায়ে ভালোভাবে যুদ্ধাপরাধীর ছাপ মেরে দিতে পারা। তার ওপর, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইসলামি জঙ্গিবাদ উত্থানের সমস্যার আলোকে ওয়াহাবিপন্থাসহ সুন্নিধারা থেকে উদ্ভূত নানান কট্টরপন্থা সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যেও সচেতনতা ও সতর্কতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামকে রাজনৈতিক সঙ্গী রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মকা-ে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে হয়  না।
একটি খাঁটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির উচিত ছিল ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা বর্তমান সরকারের ভূমিকায় ধীরে ধীরে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হতে থাকা নাগরিকসমাজের বিভিন্ন ফোরামের সাথে সংযোগ বাড়ানো। এটি ফলপ্রসূ করতে হলে অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াত সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পরিষ্কার করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। অতি সম্প্রতি দলে ক্রমেই সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও দলীয় অবস্থান ও ভূমিকায় তার প্রতিফলন দেখা না গেলে এ কেবল সাময়িক রাজনৈতিক চাল বলেই গণ্য হবে। জনমনে কোনো গুরুত্ব পাবে না।
মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক অঙ্গনে কঠিন সময় ও প্রতিকূল চ্যালেঞ্জ একটি রাজনৈতিক দলের সামনে দলীয় ভাবমূর্তি, দলের প্রভাব এবং দল ও নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর বিরাট সুযোগ তৈরি করে। বস্তুত এভাবেই ষাটের দশকে পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী শাসকের দমনপীড়নের মুখেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাঙালির জনপ্রিয় সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বিপরীতে ক্ষমতায় থেকে সামরিক এজেন্সির সহযোগিতায় বিভিন্ন দলমতের মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতা আজ প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে। এতকাল বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের এই সংকটের সাথে পরিচিত হন নি, কারণ তেমন বাস্তবতা তৈরি ছিল  না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আজ তা প্রকাশ হওয়ার পরে দলের নেতৃত্বকে পরিবর্তন-সংশোধনের বিষয় উপলব্ধি করতে দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারের চাপের মুখে তাদের আচরণ ও ভূমিকা দিশাহীন শিক্ষানবীশ রাজনীতিকের মত মনে হচ্ছে। ফলে কর্মসূচিগুলো যে নামকাওয়াস্তে দায়সারাগোছের কাজ তা বুঝতে কারও অসুবিধা হচ্ছে না। নিজেরাসহ কেউই এগুলোর ব্যাপারে এখনও সিরিয়াস নন। এভাবে চললে আগামী নির্বাচনে আপনা-আপনি বিজয় এসে ধরা দেবে বলে নিশ্চিত থাকার সুযোগ বিএনপির জন্যে আর থাকবে না। আর কর্মীদের ছাপিয়ে ততদিনে হতাশার ছোঁয়া জনমনেও পৌঁছাবে।
বিএনপির ভবিষ্যত বর্তমানে নিহিত রয়েছে। বলা যায় বর্তমান সময় বিএনপির জন্যে ক্রান্তিকাল হিসেবে এসেছে। দেখা যাক তারা কি আওয়ামী লীগের মত সকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে টিকে থাকতে পারবে নাকি মুসলিম লীগের মত বড় ধরনের পরাজয়ের ধাক্কায় ধীরে ধীরে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

Saturday, July 26, 2014

মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শিক্ষা দেয়

আবুল মোমেন

পশ্চিমের গণমাধ্যম মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করার ট্রাজেডি যে গুরুত্ব পেয়েছে তা গাজায় ইজরায়েলের নরমেধযজ্ঞকে ছাপিয়ে গেছে। একইভাবে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে ও অন্যান্য কূটনৈতিক তৎপরতাতেও এ ইস্যুটিাই এখন প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা অবশ্যই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। আর বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা একটি নিকৃষ্ট ধরনের অপরাধ। অবশ্যই এ ট্র্যাজেডির সুষ্ঠু স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করে শাস্তি দেওয়া সবারই দাবি।
গাজায় ইজরায়েলের সর্বাত্মক আক্রমণ বস্তুত ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে গণহত্যার ঘটনা। শুধু নিহত ও আহতের সংখ্যা এবং ও সম্পদ ধ্বংসের দিক থেকে এ বর্বর আক্রমণ বিমান দুর্ঘটনার চেয়ে আকারে অনেক বড়। মৃতের সংখ্যা পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে, আহত দুই হাজারের ওপরে। সবচেয়ে বড় কথা মারা যাচ্ছে বেসামরিক মানুষ, যার অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, হামাসের রকেট হামলা বা সামান্য প্রতিরোধ বানের জলে খড়কুটোমাত্র। এটি একতরফা গণহত্যার ঘটনা। এ শতাব্দীর এযাবৎ সবচেয় বড় ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে বিশ্ববাসীর সামনে। নিহতদের সকলেই মুসলমান, এখন রমজান মাস চলছে, সামনে ঈদ।
মালয়েশিয়ার যাত্রীবাহী বিমান ট্র্যাজেডি নিয়ে পশ্চিমের এত গরজের মূল কারণ এ ঘটনায় তারা প্রতিপক্ষ রাশিয়ার দিকে আঙুল তাক করতে পারছে। ক্রিমিয়া দখলের অজুহাতে তারা একজোট হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা চালাচ্ছে। তাতে অবশ্য পুতিনকে নরম করা যায় নি। এবারে ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে ইউক্রেনের বিদ্রোহী রুশপন্থীদের সমর্থন দানের অজুহাতে রাশিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘোলাটে নয়। একেবারে কাঁচের মত স্বচ্ছ। ইজরায়েল কোনো রকম রাখঢাক করছে না, তারা ঘোষণা দিয়েই হামাস-দমনের নামে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রে হানা দিয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। খুনী কে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চুপ।
তারা কেন চুপ সে ইতিহাস অবিদিত নয়। কেন কৃত্রিমভাবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হল, কারা করল তা সবার জানা আছে। ১৯২২ সনে বেলফুর ঘোষণার মাধ্যমে এই নবযাত্রা শুরু। ১৯৪৬ সনে প্যালেস্টাইন থেকে আরব মুসলমানদের উৎখাত করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিজয়ী ব্রিটেন-ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র যেন যুদ্ধে নাৎসি অনাচার-অবিচারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দিল। আদতে ইহুদিবাদীদের এ পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বহু পুরোনো। ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন হ্রাস পাচ্ছিল তখন তারা সর্বত্র কৌশলগত সুবিধা কায়েমের প্রয়াস চালিয়েছে। উপমহাদেশে পাকিস্তান সৃষ্টি ও কাশ্মীর সমস্যা তৈরি যেমন তেমনি প্রত্যক্ষভাবে শাসকের হাত গুটানোর আগে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি করল ইজরায়েল রাষ্ট্র। রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিরা এসে বসতি করেছে এই জবরদস্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে। ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ থেকে নিয়ে আজকের দিন পর্যন্ত ইতিহাস বিচার করলে দেখা যাবে প্রতিবারের যুদ্ধে ইজরায়েল তার ভূসীমানা বাড়িয়েছে। ইহুদি বসতি বাড়িয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। এবারে যুদ্ধ শেষ হলে হয়ত পশ্চিম তীরে কিছু জমি দখলে রাখবে তারা।
ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা যখন মানবাধিকার বা আইনের শাসনের কথা বলে, যখন আমাদের এ বিষয়ে নানা উপদেশ দিতে চায় তখন এর ভণ্ডামির দিকটাও যেন আমরা খেয়াল রাখি। এসব যে নিতান্ত ফাঁকা বুলি, তাদের দ্বৈতনীতি ও দ্বৈত মানদণ্ডের প্রমাণ তা-ও আমাদের বুঝতে হবে। আমরা নিশ্চয় দেশে সবার মানবাধিকারের সুরক্ষা চাইব, আমরা অবশ্যই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকুক এমনটাই চাই। কিন্তু তা নিজেদের তাগিদে, নিজেদের বিবেক বোধ থেকেই চাইব। কারও শেখানো বুলি হিসেবে নয়, তাদের মুখপাত্র হয়ে নয়। বিশেষ ভাবে আমরা অবশ্যই পশ্চিমা দেশ বা তাদের সংস্থাগুলোকে সাক্ষী মেনে নিজের দেশের সমস্যা সমাধান করতে যাব না। তাদের ভণ্ডামি, মিথ্যাচার, দ্বিবাচার আজ আর গোপন কিছু নয়।
কথা হল, মুসলিম দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা বিশ্ব এভাবে মুরুব্বিয়ানা করে চলেছে কীভাবে কেনই বা তারা বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ একাজ অপ্রতিহতভাবে করতে পারছে? না, এটা কোনো মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন নয়। এর উত্তরও সবার জানা।
মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে মুসলিম বিশ্বের মুরুব্বী দেশ সৌদি আরব। আর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সেখানকার সকল তেলসমৃদ্ধ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আত্মবিক্রিত হয়ে আছে। ওআইসি বা আরব লীগের শক্তিশালী সদস্য হচ্ছে সৌদি আরব। এসব আরবদেশের শাসক সম্প্রদায় তেলের সম্পদে অচিন্ত্যনীয় বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত। আর ওদের সকল তেলখনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক কোম্পানির অধীনে পরিচালিত। তাদের উপার্জিত অর্থ বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে লগ্নি খাটার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে তেলের উৎস দেশগুলোকে কমিশন দিয়ে বিপুল উপার্জন করছে তারা আর অন্যদিকে উৎস দেশসমূহের অর্জিত কমিশনের টাকার সিংহভাগ থাকছে তাদের মালিকানাধীন ব্যাংকে বা খাটছে তাদের দেশসমূহে অন্যান্য ব্যবসায়িক খাতে। এই মহালাভের স্বর্গসুখ কোনো বোকাও সহজে ছাড়তে যাবে না। আর এখনও পর্যন্ত গোত্রবিভক্ত অনাধুনিক আম আরব জনগণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলতে পারে নি। তাদের ওপর স্বৈরাচারী বাদশাহী শাসন চলছে, ইসলামের নামে সকল রকম গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে সেসব দেশে। শাসককুলকে বিভোর করে রাখা হয়েছে ভোগবিলাসের আনন্দে, যেমন একসময় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন চীনাদের বুঁদ করে রেখেছিল আফিমের নেশায়।
কেন পশ্চিমারা ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেনের ওপর এত খাপপা ছিল, এত খড়্গ হস্ত হল? তাও অবশ্য কারো অজানা থাকার কথা নয়। আরব অঞ্চলে সাদ্দাম ছিলেন অন্যান্য শাসকদের থেকে পৃথক। তিনিও স্বৈরাচারী ছিলেন, কিন্তু ছিলেন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তি, তিনি তাঁর দেশের তেলখনির ওপর অধিকার বাড়াচ্ছিলেন, তেল ব্যবসা স্বাধীনভাবে চালাচ্ছিলেন। ফলে তাঁকে নিয়ে মুরুব্বীদের সমস্যা। আরেক সমস্যা হল ভূতাত্ত্বিক জরীপে দেখা যাচ্ছে ইরাকে আরও প্রচুর তেল ও গ্যাস মওজুদ রয়েছে। এরকম একটি ‘সোনার’ খনি এরকম একজন ‘বেয়াড়া’ লোকের হাতে ছেড়ে দিতে চায় নি পশ্চিমের কার্পোরেট মুরুব্বীরা। তাদের হয়েই দেশ শাসন করেন ওবামা-বুশরা, ব্লেয়ার-ক্যামেরুনরা। ফলে তাদের চাপ এবং নিজেদের গরজ কাজ করেছে একযোগে। মনে করুন ১৯৫৩ সনে ইরানের ঘটনা। সেদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ড. মোসাদ্দেক সরকার যে-ই তেলখনি জাতীয়করণ করল অমনি একটা অজুহাত খাড়া করে আক্রমণ চালাল ব্রিটেন। সরকারের পতন ঘটাল এবং দ্রুত শাহের মাধ্যমে পশ্চিমের শিখণ্ডি সরকার বসানো হয়েছিল।
তাই মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদী বিশ্বের আলাদা কোনো রাজনীতি নেই। অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বারাই তাদের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়। এমনকী গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা মানবাধিকারের মত ইস্যুগুলো নিছক রাজনৈতিক ছলমাত্র। নতুবা তারা কেন গণতন্ত্রহীনতা, আইনের শাসনের অভাব বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরাকে আক্রমণ চালাল আর গণতন্ত্রের সামান্যতম নমুনাও যেসব দেশে নেই সেই সৌদি আরবের সরকারকে চাপে রাখে না, হুঁশিয়ার করে না? তারা যে অজুহাতে ইরাকে আক্রমণ চালিয়েছে, কার্যত ইরাক ধ্বংস করেছে, সেই সব অজুহাত অনেক বেশি খাটে সৌদি আরব, কুয়েত, আবুধাবির মত দেশের ক্ষেত্রে।
ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ইজরায়েলের ভূমিকা কেমন তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ধর্মের জঙ্গিরূপ ধারণ কীরকম আত্মঘাতী ফলাফল আনে তা-ও দেখছি হামাসের ভূমিকা ও তার পরিণাম দেখে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার কী ধরনের পরিণতি সৃষ্টি করে তাও দেখছি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কট্টর ইসলামি দেশগুলোর ভূমিকায়। আমাদের দেশেও ধর্মান্ধদের হাতে মানবতার লাঞ্ছনা যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি প্রকারান্তরে তা কীভাবে ধর্মের বাণী ও শিক্ষার পরিপন্থী ভূমিকা রাখে। আমরা দেখছি ধর্মীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্থা ওআইসি বা আরব লীগও চরম সংকটের সময়ও কেমন অকার্যকর হয়ে থাকে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন অতীতের জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের মত মূলত তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের মহাজোট। ষাট-সত্তরের দশকে এ জোট যখন সক্রিয় ছিল তখন বিশ্বের রাজনৈতিক হালচাল তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল, তখনই এশিয়া-আফ্রিকা থেকে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান হয়েছে, গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ হয়েছে। তখনই যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো এবং কার্যকর প্রতিবাদ হয়েছে - সে কিউবা সংকট হোক আর আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ হোক। সেদিন প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্ব নয় বিশ্ব রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের নায়ক ছিলেন নেহেরু-নাসের-নক্রুমা-টিটোর মত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা। আজ আবার সেই রকমের বিশ্ব ফোরাম দরকার। সেই ফোরাম তার নেতাও তৈরি করে নেবে। তবেই তথাকথিত মুক্তবিশ্বের অন্যদের অবরুদ্ধ করার অন্যায়ের, ছলনার, ধাপ্পাবাজির রাজনীতিকে অকার্যকর করা যাবে। ইজরায়েলের মত  ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ধৃষ্টতাও বন্ধ করা সম্ভব হবে।



Wednesday, July 9, 2014

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির সন্ধানে

আবুল মোমেন

ব্রিটিশ শাসকরা ১৮৬১ সনে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করেছিল। বিশেষ এলাকা দুটি কারণে -১. এর বৈচিত্রপূর্ণ প্রকৃতি যেখানে পাহাড় আর অরণ্য রয়েছে জীববৈচিত্রের ভাণ্ডার হিসেবে এবং ২. জনবৈচিত্র যা ১১টি উপজাতির স্ব-স্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র নিয়ে বিশিষ্ট। এই জনগণ মূলত অরণ্যচারী এবং মূলধারার নাগরিক সংস্কৃতির বাইরে নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে নিভৃত জীবনে অভ্যস্ত। এদের জীবনাচার ও সংস্কৃতি সমভূমির কৃষিসমাজের পূর্ববর্তী কালের। সে অর্থে তুলনামূলকভাবে প্রাচীন কিংবা আদিম। এর মধ্যে আকস্মিকভাবে এবং গুণগতভাবে যদি ভিন্ন জীবনাচারে অভ্যস্ত মানুষজনের ব্যাপক আনাগোনা ও বসবাস শুরু হয় তাহলে দুই কালিক সংস্কৃতি, যা প্রায় মৌলিকভাবেই বিপরীত, তার মধ্যে সংঘাত দেখা দেবে।
এই মৌলিক বৈপরীত্য সম্পর্কে দুটি কথা বলা যায়। সমভূমির মানুষের কৃষিসমাজ গড়ে উঠেছে বন কেটে আবাদ করার নীতির ভিত্তিতে। কেবল বন কাটা নয়, কৃষিসমাজের মানুষের লক্ষ্য থাকে যে কোনা জমিকে -তা বন হোক, নতুন জাগা চর হোক কি এবড়োথেবড়ো পতিত জমি হোক সেগুলোকে আবাদযোগ্য করে তোলা। বিপরীতে পাহাড়ী অরণ্যে বসবাসকারী ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রকৃতির সাথে সহবাসে অভ্যস্ত, একে মৌলিকভাবে পাল্টাতে তারা নারাজ। ফলে এদের হাতে বন-সম্পদ যুগ যুগ ধরে রক্ষা পেয়ে এসেছে। অনেকেই মনে করেন জুম চাষে পাহাড়ে যে আগুন দেওয়া হয় তাতে বনসম্পদ নষ্ট হয়। আসলে অরণ্যাচারী জনগোষ্ঠী বরাবরই প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় সংখ্যায় অল্প থাকে, ফলে তাদের এ ঐতিহ্যবাহী চাষপদ্ধতি প্রয়োজনীয় ফসল ফলানোর পাশাপাশি বনভূমিকে উর্বর করার পদ্ধতিও বটে। তাই শত বছরের ইতিহাস থেকে দেখা যায় এ অঞ্চলে কৃষিসমাজের বাঙালির ব্যাপক আবাসনের আগে বনভূমি বিনষ্ট হওয়ার রেকর্ড নেই। বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ বাঁচিয়ে জীবনধারনের এ তাদের সহজাত শিক্ষা। কিন্তু কৃষিজীবী মানুষ বনকে আপদ মনে করে আর সবধরনের পশুকেই হিং¯্র ও বিপজ্জনক ভাবে। ফলে দুটিরই বিনাস তার সহজাত অভ্যাস।
দ্বিতীয় বৈপরীত্যের বিষয়টিও মৌলিক। অরণ্যবাসীর জীবনে ও মননে প্রকৃতিই সবকিছুর আধার ও নিয়ন্তা। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি তার মনোভাব ভক্ত বিশ্বাসীর এবং এর পূজা করেই সে শান্তি পায়। তৌহিদি ধর্মের মানুষের মানস এর বিপরীত। ফলে বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক উভয় সংস্কারেই বৈপরীত্য বিদ্যমান।
এই বৈপরীত্যের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব বিবেচনায় নিলে কেবল পার্বত্য জেলা নয় অন্যান্য সমভূমির বনাঞ্চল বা স্বকীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে অভ্যস্ত সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ ঘটানোর মত যেকোনো কাজের আগে দশবার ভাবা দরকার। এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে ভাবতে হবে বিশেষভাবে।
২.
আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারব না যে বাংলাদেশ কেবল একটি জনবহুল দেশই নয়, এখানে ভূমির তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। সে কারণেই কৃষিভিত্তিক দেশ হিসেবে এদেশে খাদ্যাভাব ও দারিদ্র লেগেই ছিল। আধুনিক প্রযুক্তি ও  উপকরণের ব্যবহার বাড়িয়ে খাদ্যাভাব দূর করা গেছে, কিন্তু দারিদ্র্য এখনও আমাদের বড় সমস্যা। অর্থনীতি ও মানুষের পেশায় পরিবর্তন ঘটছে। শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে যাচ্ছে, প্রান্তিক নারীরা দলে দলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন। শিক্ষার হার বাড়ছে,স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুযোগসুবিধা বাড়ায় গড় আয়ু ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে, দারিদ্র কমছে। কিন্তু জমি বনাম জনসংখ্যার সংকট কমানোর উপায় নেই - কারণ জমি স্থিতিশীল আর জনসংখ্যা বর্ধিষ্ণু।  তিনটি মূল কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বাস্তচ্যুত হচ্ছে - ১. প্রাকৃতিক কারণ, যেমন নদী ভাঙন বা সিডরের মত দুর্যোগ, ২. দারিদ্র, যে কোনো পারিবারিক দুর্যোগ বা উৎসবে তাদের সহায় সম্বল বিক্রি করতে বাধ্য হয় প্রান্তিক মানুষ এবং ৩. আকস্মিকভাবে বিত্তবান হয়ে ওঠা মানুষ ও নতুন গজিয়ে ওঠা আবাসন শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রলোভন ও চাপে দরিদ্র মানুষ জমি হারাচ্ছে। ফলে মাথা গুঁজবার ঠাঁই খুঁজতে গ্রামের বাস্তচ্যুত এবং স্বল্পায়ী ও বেকার মানুষ বিপদ আপদ ভবিষ্যত কিছু নিয়েই ভাববার অবকাশ পায় না। তার কাছে বর্তমান এক নির্মম ও কঠিন বাস্তবতা। এর ফল হিসেবে আমরা দেখি যে-চর মাত্রই সমুদ্র থেকে জাগছে, যেখানে এখনও জোয়ার ভাটার খেলা চলে, যে জমি দিনে দু’বার জোয়ারে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায় সেখানেও মানুষ মাচাঘর তুলে বসবাস শুরু করে দিচ্ছে। সুন্দরবনের বাঘ-কুমীর-সাপের সঙ্গে লড়ে বসতি করছে, নোনা পানির মধ্যে ঘর তুলছে, চট্টগ্রাম শহরে পাহাড়ের পাদদেশে ধসের ঝুঁকির মধ্যে সংসার পাতছে। আর শহরের ফুটপাথে, রেললাইনের ধারে, যেকোনো পতিত জমিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে শোয়ার জায়গা করে সপরিবারে দিন গুজরান করছে। যেদেশে প্রায় চল্লিশ ভাগ মানুষ এরকম বসতি সঙ্কটে আছে তাদের জন্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ছয় হাজার বর্গমাইলের বিস্তীর্ণ তিনটি জেলা একটা আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। নতুন-জাগা চর, পাহাড়ের পাদদেশ বা বাঘ-কুমীর অধ্যুষিত অরণ্য বা মহানগরের ফুটপাত, রেললাইনের ধারের চেয়ে এ অঞ্চল তাদের বেশি পছন্দের জায়গা হওয়াই স্বাভাবিক।
মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদার মধ্যে বাসস্থানের অধিকার অন্যতম। সরকার এ অধিকার পূরণের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। তাদের মাথায় বিপন্ন মানুষের পুনর্বাসনের জন্যে নানা বিকল্পের মধ্যে নিশ্চয় পার্বত্য অঞ্চলের কথাও এসেছে এবং সেভাবে কাজ হয়েছে।
তবে পার্বত্য অঞ্চলে প্রথম ব্যাপক হারে সরকারি উদ্যোগে বাঙালি বসতিস্থাপনের পেছনে অন্য উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৭৯-৮০-৮১’র দিকে জেনারেল জিয়া এ কাজ শুরু করেছিলেন মূলত শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিকার হিসেবে। উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে ছাপিয়ে বাঙালি জনসংখ্যা বাড়ানো। তাঁর অনুসৃত নীতি পরবর্তী পনের বছর ধরে  জেনারেল এরশাদ ও বেগম জিয়ার সরকার পালন করে গেছে। এর ফলে সত্যি সত্যিই পাহাড়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য পাহাড়ীদের প্রতিকূলে চলে গেছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যা সম্ভবত পাহাড়ী-বাঙালি ৪৮:৫২ হয়ে গেছে, যা স্থানীয় অধিবাসী হিসেবে পাহাড়ীদের পক্ষে মানা কঠিন।
৩.
এবারে আমাদের বুঝতে হবে এর ফলাফলটা কী হল। মনে রাখতে হবে ১৯৭৯-৮০’র আগে দীর্ঘদিনে স্বাভাবিক নিয়মে পাহাড়ে সমভূমি বাঙালিদের যে বসতি গড়ে উঠছিল তাতে কোনো সংকট হয়নি। তারা পরস্পর মিলে মিশে বসবাস করেছে। কিন্তু এবারে দুটি কারণে সংকট তীব্র হল। প্রথমত, পাহাড়ে বাঙালি অভিবাসনের সরকারি নীতির পিছনে এমন একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল যাকে স্বাধিকারের জন্যে সংগ্রামরত জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারের একটি হীন চক্রান্ত বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। বাস্তবে তাই হয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকানো যায় নি। দ্বিতীয়ত, অল্পসময়ে যে ব্যাপক বাঙালিকে পরিকল্পিতভাবে সেখানে বসতির ব্যবস্থা করা হয়েছে তাদের অধিকাংশের পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র ছিল কৃষি। প্রথম অধ্যায়ে কৃষিসমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য-প্রবণতার কথা বলা হয়েছে তা এখানে ঘটেছে। পাশাপাশি কৃষি শিল্পের বিকাশের জন্যে সরকার বাঙালিদের নির্বিচারে জমি বরাদ্দ দিয়ে সংকট ঘনীভূত করেছে। এতে একেবারে এই বাস্তব ভূমি-সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ একটা গভীর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক সংঘাতের সম্মুখীন হল। প্রকৃতিভিত্তিক সরল এবং আদিম। জীবনসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠী প্রকৃতি-উদাসীন বা প্রকৃতি শাসনে অভ্যস্ত সাকার পূজা বিরোধী জটিল প্রবল সংস্কৃতির চাপের মধ্যে পড়ে যায়। তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনব্যবস্থা, খাদ্যোৎপাদন পদ্ধতি, নিভৃত জীবনযাপন, স্বাধীন মুক্ত জীবনের অভ্যাস আকস্মাৎ ভেঙে পড়েছে। তারা ভূমি হারিয়েছে, খাদ্য সংকটে পড়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা নিভৃতের মুক্ত জীবনের অধিকার খুইয়েছে। সবটা মিলে এটি তাদের জন্য বড় রকমের আঘাত।
৪.
আমাদের মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত সমভূমির ভূমিহীন মানুষের কিছু অভিবাসন হওয়া অযৌক্তিক নয়। কিন্তু তা হতে হবে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় অধিবাসীদের নেতৃবৃন্দের বা নির্ভরযোগ্য জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটির মতামত নিয়ে। এ ব্যবস্থাটি  সামগ্রিকভাবে দেশের জন্যে প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল সংরক্ষণের পাশাপাশি মূল্যবান জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে সমভূমির বাঙালি অভিবাসন হবে, কিন্তু তা হতে হবে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় মানুষের সম্মতিতে এবং প্রকৃতি, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের কৃষ্টি-ঐতিহ্য রক্ষার জন্যে কিছু শর্তের ভিত্তিতে। একমাত্র এভাবেই এ অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে হয়।