Thursday, April 10, 2014

কোথায় আছে অমৃত?

আবুল মোমেন

রাষ্ট্রের গতিপথ কখনও মসৃণ নয়, উত্থানপতন ও বাঁকবদল এত বড় আকারে হয়ে থাকে যে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, প্রতি পঞ্চাশ বছরে একবার মহাদেশের মানচিত্রে পরিবর্তন ঘটে। ইউরোপের দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টা সহজে বোঝা যাবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পর ইউরোপের মানচিত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। তারপর ১৯৮৯-এর পরে জার্মেনি, চেকেশ্লোভাকিয়া (এখন বিলুপ্ত), যুগোশ্লাভিয়া (এখন পাঁচটি ভাগে বিভক্ত) এবং পূর্বেকার সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এই অস্থিরতা যে এখনও কাটেনি তা সাম্প্রতিক ক্রাইমিয়া ক্রাইসিসে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। এশিয়া ও আফ্রিকাতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক কাল শেষ হয়ে স্বাধীনতার পর্ব শুরু হওয়ায় তখনই রদবদল ঘটেছে। তাতে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর ও মধ্য আফ্রিকার মানচিত্র নির্মাণ ঠিক ছিল কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত এতে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বিষয়টিই অগ্রাধিকার পেয়েছে। তারই জের ধরে  প্যালেস্টাইন সমস্যা ষাট বছর ধরে চলছে বা ইরাক আকষ্মিকভাবে কুয়েত দখল করে নিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের আবির্ভাব প্রমাণ করে উপমহাদেশে ১৯৪৭-এর সাম্রাজ্যবাদী দেশভাগ সঠিক ছিল না। এসব দৃষ্টান্ত থেকে রাষ্ট্রের অস্থিরতা আমরা বুঝতে পারি।
এর ওপরে আছে রাষ্ট্রশাসনেও নানা উত্থানপতন। ভিন্ন মতাবলম্বী নিয়েই গণতন্ত্র, কিন্তু সেই গণতন্ত্রই অনেক সময় চরম ফ্যাসিবাদের উত্থানে সহায়ক হয়ে থাকে, যেমন হয়েছিল ১৯৩৬ সালে জার্মেনিতে নির্বাচনে হিটলারের বিজয়ের মাধ্যমে।
এখন প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের  দেশ ভারতবর্ষে সাধারণ নির্বাচন শুরু হয়েছে। সব জরিপ ও জল্পনায় বলা হচ্ছে এবারের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়ান্স (এনডিএ) বিজয়ী হবে এবং ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গার জন্যে অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদীই হবেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। সবার আশংকা বিজেপির অতীতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির তুলনায় মোদী শক্ত হাতে তাঁর নিজস্ব ও দলীয় এজেণ্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইবেন। তাতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সমাজজীবনে পরিবর্তনের হাওয়া লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি মুসলিম সমাজের তুলনায় বলা যায় হিন্দু সমাজের উপরিকাঠামোর পোশাকি সংস্কৃতি দৃশ্যত অনেক উদার হলেও তার হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সামাজিক এজেন্ডা বস্তুত অনেক রক্ষণশীল ও কট্টরভাবে অনুদার। ফলে এরকম শাসনামলে অহিন্দু সম্প্রদায়গুলো, বিশেষত বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিমসমাজ, বৈষম্যের শিকার হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়া উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান দেশেও যে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই।
এবারের নির্বাচনে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী দলের ভূমিকা নেওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সংযত ছিল। ইশতেহারের ঘোষণায় এমন ইঙ্গিত থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় তারা ভারতবর্ষের ঐক্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ওপর জোর দিচ্ছে। তাতে ভারতীয় শক্তিশালী বণিকসম্প্রদায় মোদীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া দারিদ্র, বৈষম্য, শোষণ-পীড়িত সমাজের সাধারণ মানুষ বরাবর স্থিতিশীল সরকার ও শক্তপোক্ত শাসকের পক্ষে। একারণেই ভারতের সাধারণ মানুষ আম আদমি পার্টির নীতি বাগিশ অবস্থানকে দুর্বলতা বলে গণ্য করেছে এবং ক্ষমতা প্রয়োগ না করে ত্যাগ করার নীতিকে সমর্থন জানায় নি। দলের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ঝাড়ার কারণ সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় যাকে পাঠিয়েছিল তার এভাবে নীতির দোহাই দিয়ে দুম করে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়াকে তারা দুর্বলের আচরণ ও প্রতারণার শামিল মনে করেছে। এর চেয়ে অল্পসল্প দুর্নীতি করে শক্ত হাতে ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তাকে নেতা মানতে তারা স্বস্তি বোধ করত। এই মনস্তত্ত্ব আমাদের সমাজেও প্রবল।
রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রশাসনে এরকম উত্থান পতন ও বাঁকবদল অবশ্যম্ভাবী বলেই সমাজকে পরিণত, স্থিতিশীল ও পোক্ত হতে হয়। তা না হলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রাজনীতি ও সংস্কৃতির অঙ্গনে নানা রকম ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকলে সমাজ তা নিজ শক্তি ও প্রজ্ঞায় সামলাতে পারবে না। সমাজ বকাটা ঘুড়ির মত দিগ্ভ্রান্ত হয়ে নানান স্রোতের মধ্যে যে ঢেউটি প্রবল হবে তাতেই সওয়ার হবে। অভীষ্ট পথে না গিয়ে ভুল পথেও চলে যেতে পারে। সে কারণে সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয় যেগুলো বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যেও পথ দেখাতে পারে। তেমনি থাকতে হয় অভিভাবকতুল্য জ্যেষ্ঠ নাগরিক, যাঁরা সংকটের সময় নির্দিষ্টভাবে পথের দিশা দিয়ে থাকেন।
আমরা যদি দেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব  গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনেক রকম ঢেউ উঠেছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা পথ হারাইনি। ভাষা-সাহিত্য-শিল্প নিয়ে চরম বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা হয়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যও চরম ছিল, ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ ও সামাজিক কুসংস্কারের দৌরাত্ম্য, রাজনীতিতে ভ্রান্ত পথের মোহও ছড়ানো হয়েছিল। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ জাতির অভিভাবক ও পথ প্রদর্শকের ভূমিকা এবং ছাত্ররা অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করেছিল। একেবারে আলাদাভাবে বলা যায় ভাষা আন্দোলনের সময় বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও পুথি গবেষক মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ একেবারে বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁরা যুগান্তকরী বক্তব্য রেখেছেন এ সময়ে। আর তাঁদের সাথে সে সময়ের প্রবীণ-নবীন অধিকাংশ লেখক ও শিক্ষাবিদ এককাতারে শামিল হয়েছিলেন। ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় কথাসাহিত্যিক শিক্ষাবিদ আবুল ফজল ও কবি ও নারীনেত্রী বেগম সুফিয়া কামাল বলিষ্ঠভাবে অভিভাবকত্ব দিয়েছেন। তখনকার অস্থির সময়ে লেখক-শিল্পীদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীসহ বুদ্ধিজীবীরা সরব ও সক্রিয়া ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতিবিদরা সেই সময়ে এদের  প্রদর্শিত পথেই হেঁটেছেন। তাতে জাতীয় ঐক্য যেমন হয়েছে, তেমিন সকল বাধা জয় করে সামনে এগুনোও সম্ভব হয়েছে। সেই সময় সংবাদপত্র, যেমন দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজার্ভার ও পূর্বদেশের ভূমিকা স্মরণ করুন। নিশ্চয় মনে পড়বে মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুস সালাম-এর মত সম্পাদক-সাংবাদিকদের কথা। আজকে এই সমাজে সাহসী প্রজ্ঞাবান নি:স্বার্থ অভিভাবকের অভাব প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ও অভিভাবকহীন। বিদ্যা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মূল্য এখানেও হতাশাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার পাদপীঠ থেকে ডিগ্রি ও সনদ বিক্রয়ের কারখানায় পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হল সেই প্রতিষ্ঠান যেখানে বিদ্যা উৎপন্ন হয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এখানে দেশবিদেশের জ্ঞানীগুণীরা নিজেদের কাজ করবেন আর ছাত্ররা তাঁদের সঙ্গে থেকে জ্ঞানচর্চার জোগালি হিসেবে কাজ করে পরিণতি লাভ করবে। অতীতের নালন্দা বা তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিদেশের জ্ঞানীগুণীদের আগমনের কথা আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি। একইভাবে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গা বিরোধী ভূমিকা, ছেষট্টির ছয়দফার আন্দোলন, আটষট্টির স্বাধিকার আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা ভাবুন। এখন কোথায় সংবাদপত্রের সেই ভূমিকা, কোথায়ইবা সেইসব মানবের সম্পাদক ও সাংবাদিক?
এখন বিশ্বায়নের এই কালে বাস করেও আমরা কূপমণ্ডুকতার চর্চা করছি। এর প্রভাব পড়ছে সর্বত্র, আমাদের জীবনের কোথাও মননশীলতার ছাপ নেই, এর প্রয়োজনও নেই। তাই চিন্তার দৈন্য, রুচির বিকার, অনুকরণসর্বস্বতা চলছে সর্বত্র। স্বার্থচিন্তা, ভোগের উদগ্র লালসার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ন্যায়-অন্যায় বোধ, জ্বলে যাচ্ছে সুশাসন ও আইনের শাসনের ধারণা, মিথ্যাচার, কপটতা, তোষামোদী, ক্ষমতার ও বিত্তের দম্ভ, ফাঁপা ও ফাঁকা গরিমায় প্রায় অসহ্য হয়ে উঠছে সমাজ জীবন। এ অবস্থার মধ্যেও পুরস্কার-স্বীকৃতি-সম্মাননার হিড়িক চলছে। তার কোনটা ঠিক কোনটা ছলনা বোঝা দায়। এভাবে মুড়ি-মুড়কি একদর হয়ে গেছে। খনার বচনে আছে যে দেশে ঘি ও তেলের দাম সমান সেই দেশে বাস করবে না। এদেশে অনেক আগেই মুজিব-জিয়াকে এক পাল্লায় তোলার কৌশল কাজ দিয়েছে। এবার কি তারেক জিয়া সেরকম একটা ভূমিকায় পৌঁছে যাবে? তাঁর সর্বশেষ কথার চালটা অনুসারীরা এদেশেও  চালু করে পাল তোলার মত বাতাস সৃষ্টির চেষ্টা চালাবেন সন্দেহ নেই। কথা হল তাতে কি উঠে পড়বেন তাঁদের সমর্থক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অধ্যাপকরাও? ভবী কি ভুলবে এসব কথায়? বিশ্বাস করা যায় না এমন তরল অস্থির সমাজের মনমানসিকতা।
কিন্তু এই বাস্তবতা এবং এর পরিণতি নিয়ে কেউ যেন মাথা ঘামাতে রাজি নন। সবাই গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। ফলে ক্ষমতা ও বিত্তই সমাজে প্রভাব ও প্রতিপত্তি নির্ধারণ করছে আর দুর্বল অংশ তোষামোদ ও কপটতার আশ্রয় নিয়ে গা ভাসাচ্ছে। এ যেন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সমাজ। সমাজে এ ধরনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠার সময়ে আজ থেকে শিকি শতাব্দী আগে কবিতায় লিখেছিলাম -
এখন উচু হওয়ার সময়/ কুঁজো হওয়ার/’
এবং ‘... প্রবল অনুরাগে/নিচু হয়ে সবাই
এ ওর/‘শিরদাঁড়া ভেঙে বেছে দেয় কাঁটা-/ যা কিনা
বিশ্রি/অপ্রয়োজনীয়/এবং/কাঁটার আপদ ঘুচিয়ে/
সরীসৃপ শৈথিল্যে মেতে ওঠে/তারপর।’
আমরা শিরদাঁড়াহীন প্রাণীতে পরিণত হচ্ছি, সরীসৃপ শৈথিল্যে
মেতে উঠছি। বিষ নিয়ে খেলছি-অমৃত কোথায় জানি না।


Tuesday, March 4, 2014

গ্রামপতনের শব্দ আর কত শুনব?

আবুল মোমেন


১৯৭১-এ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ১৯৯১ তে গণতন্ত্র। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এ দুটিই তো ছিল জাতির স্বপ্ন। দুটিই অর্জিত হয়েছে। প্রথমটির পরে ৪৩ বছর অতিবাহিত হল আর দ্বিতীয়টি অর্জনের পরে কেটে গেছে ২২টি বছর। মধ্যে দু’বছরের অনির্বাচিত সরকারকে হিসেব থেকে বাদ দিলেও দুই দশক তো পার হয়েছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে। কিন্তু মানুষ কি স্বাধীনতা পেয়েছে? গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, যেখানে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দায় থাকে? যেখানে বিরোধী দল সংসদে,গণমাধ্যমে ও সমাজে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়? যেখানে ধর্ম-জাতি-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ভোগ ও প্রয়োগ করতে পারে?
এসব প্রশ্নের জবাব শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত ধনী-নির্ধন নারী-পুরুষ সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বড়-ছোট সকল নাগরিক মনে মনে বা প্রকাশ্যে বারবার যে ভাষায় উচ্চারণ করে তা বেশির ভাগ সময় প্রশ্নমুখর - নানা কেনর সমাহারে সে প্রশ্নমালা তৈরি হয়। এবং শেষে উচ্চারিত হয় অসহায় কাতরধ্বনিতে পাল্টা প্রশ্ন - কেন আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি? নাগরিকদের অনেকে কোনো কোনো সময়, আর কেউ কেউ স্থায়ীভাবেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাঁরা দেশ, রাজনীতি, প্রশাসন, ভবিষ্যতসহ সবতাতেই আস্থা হারিয়েছেন।
কিন্তু আমাদের শিক্ষিত শহুরে মানুষ সরকারের মুখাপেক্ষী হলেও সাধারণ মানুষ আবহমান কাল ধরেই কারও ভরসায় বসে না থেকে নিজের চেষ্টায় জীবনধারণ করে চলেছে। তাদের চাহিদা সামান্য, তারা শেখে দ্রুত, প্রয়োগে সফল। দেখা যায় মানুষের যেগুলো ন্যূনতম বস্তুগত চাহিদা সেগুলো অর্জনে আমাদের দেশ সফল। প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জাতীয় টিকা কর্মসূচী সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্য, নারীর উপার্জন, দারিদ্র দূরীকরণ ইত্যাদিতে আমাদের সাফল্য প্রায়ই বিশেষজ্ঞদের চমকে দিয়ে থাকে। জনসংখ্যার গড় আয়ুও তারাই বাড়াতে পেরেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় উন্নতি করা দরকার ছিল, যেসব জায়গায় অবস্থার গুণগত পরিবর্তন না হলে কোনো উন্নতিরই চূড়ান্ত ফল লাভ ও তা টেকসই করা সম্ভব নয় তার দায়িত্ব পড়েছে শিক্ষিত শহুরেদের ওপর। সেখানেই আমরা বরাবর হোঁচট খাচ্ছি, আর তাতে তলায় যে অগ্রগতি হচ্ছে তার চূড়ান্ত টেকসই ফল অধরা থেকে যাচ্ছে। সে কাজগুলো হল, যেমনÑশিক্ষার মানোন্নয়ন, পুষ্টি ও রোগ পরিচর্যা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন, নারীর প্রকৃত সমানাধিকার ও ক্ষমতায়ন, কৃষিজাতপণ্যের বাজারজাতকরণ ও বিপণন, জীবন মানের উন্নয়ন, যোগাযোগে সড়ক ও গণ পরিবহনের উন্নয়ন ইত্যাদি। এসব কাজের দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের ওপর। এরাই অদক্ষতা, দুর্নীতি, হীনম্মন্যতা, কোন্দলপ্রবণতা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের নিচের তলার মানুষের কঠিন পরিশ্রম ও বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্যকে ব্যক্তিস্বার্থের ভোগে লাগায় ও নষ্ট করে।
তাহলে একথা কি স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে না যে এ দেশে একদল খেটে খুটে সমাজ ও অর্থনীতির চাকা চালু রেখেছে আর আরেক দল বসে বসে তা ধ্বংস করছে? হয়ত এরকম সরলভাবে জাতিকে বিভক্ত করা উচিত নয়, আমার উদ্দেশ্যও তা নয়। মূল গোলমালটা বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অসফলতা নামক রোগের মূল কারণ নির্ণয় করাই আমাদের লক্ষ্য। সবাই জানতে চান বারবার এগিয়ে আবার মুখ থুবড়ে পড়ার কারণটা কি? জাতি যদি একটি দেহ হয় তো মানবদেহের মতই তার মৌল উপাদান হাড়, কোষ, পেশি, রক্তনালী ইত্যাদি সবই সচল রয়েছে শ্রমজীবীদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে। কিন্তু এসব থেকে যথার্থ ফল লাভ ব্যাহত হচ্ছে। এসবই ঘটছে পরিচালনা ও রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত অংশের গাফিলতিতে। এরা শিক্ষিত সুবিধাভোগী শ্রেণি। কী কারণে এরা মাঠের মানুষদের শ্রমের উপার্জন ব্যর্থ করে দিচ্ছে? এদের এ অবস্থানে আসার পেছনে দায়ী যা তার নাম শিক্ষা। হ্যাঁ অপরাধীর নাম শিক্ষা। দেশে ও সমাজে গোলমালটা পাকাচ্ছে, ঘটাচ্ছে, জিইয়ে রাখছে শিক্ষিতরাই। শিক্ষার মূল ক্ষেত্র অবশ্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান - আপাতত আমরা স্কুল পর্যন্ত ধরেই  কথা বলব। কারণ এটুকুতেও যদি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যেত তাহলেই একটা যথার্থ শিক্ষিত জাতি আমরা পেতাম। তাহলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, নৈতিক বিবেচনা শক্তি এবং সৃজনশীল ক্ষমতা এমন পর্যায়ে অর্জিত হতে পারত যা তাকে দুটি সম্পদে যথার্থ মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হতে সাহায্য করত। সে দুটি সম্পদ হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদাবোধ। হ্যাঁ স্কুলের পাশাপাশি পরিবার, ধর্ম, রাজনীতি, গণমাধ্যমও জনশিক্ষার প্রসার ও জনমানস গঠনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবার ছাড়া উল্লিখিত সব প্রতিষ্ঠানই শিক্ষিত মানুষদের হাতেই রয়েছে। ফলে ভ্রান্ত ও অসম্পূর্ণ শিক্ষার দায় আমরা এড়াতে পারি না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক জরীপে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে অন্তর্ভুক্তির পরিমাণ ছেলেমেয়ে মিলেই প্রায় শতভাগ হলেও অর্জন-লক্ষ্য পূরণে সাফল্য কেবল হতাশাজনক নয়, রীতিমত চমকে দেওয়ার মত দু:খজনক। গণিতে নির্ধারিত মান অর্জন করে মাত্র ৩০ ভাগ ছাত্র আর মাতৃভাষা বাংলায় তা শোচনীয়ভাবে ২৬ শতাংশ! অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুর ৫/৬ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষ কোনো কাজে আসছে না। বর্তমান সরকার সংখ্যাগত সাফল্যের ওপর জোর দিতে গিয়ে পরীক্ষা বাড়িয়ে দেওয়ায় ফলাফল সর্বস্ব হয়ে পড়ছে শিক্ষা, বাড়ছে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা যার ফলে শিক্ষা গুটিকয়েক প্রশ্নের উত্তর শেখার    নামান্তর হয়ে পড়েছে। ধর্ম চর্চার বিষয়টি দখল করে নিয়েছে ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ম নিয়ে রাজনীতিবাজ এবং প্রাচীনপন্থী কট্টরপন্থীরা। এরা একটি মানবিক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের মত পরিবেশ বিঘিœত করেই ক্ষান্ত হয় না, পাশাপাশি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও মূল্যবোধ সঞ্চারে ব্যর্থ হয়ে ও মৌলবাদ-জঙ্গিবাদকে উস্কে দিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করছে। রাজনীতিবিদরা আপাতত গালভরা বুলির মুখোশ পরে ক্ষমতার মধু লুটে আখের গুছাতেই ব্যস্ত রয়েছেন। গণমাধ্যমে বৈদ্যুতিক চ্যানেলগুলো সঠিক চিন্তা, যোগ্য সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞার অভাবে বোকার বাক্সের অধিক কিছু হতে পারছে না। মুদ্রণ মাধ্যমে অস্বাভাবিক, অস্বাস্থ্যকর বিষ্ফোরণ ঘটে এখন বিকার ও বিভ্রান্তি চলছে, কেউবা বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়েই মরিয়া। পরিবার প্রধানরা ভোগবাদিতার বাজারে নানামুখী চাপের মধ্যে পড়ে প্রকৃত অভিভাবকত্ব দিতে অক্ষম। কোনো সূত্র থেকেই জনশিক্ষা ও জনরুচি তথা সুস্থ জনমানস গঠনের কোনো উপাদান, আহার্য মিলছে না। ফলে সমাজের নিচের তলার মানুষ দিনরাত খেটে কোনো মতে কায়ক্লেশে বেঁচে আছে। আমরা তাদের উৎপাদন ব্যয় না মিটিয়ে উৎপাদনের সাফল্যের ভাগ লুটে নিচ্ছি। শিক্ষার নামে তাদের সাথে পরিহাস করছি, ধর্মের নামে তার সুস্থ বিনোদনের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে নিক্ষেপ করছি অসুস্থ অন্ধকার জীবেনর দিকে। সাংবাদিক-শিক্ষক-চিকিৎসক-রাজনীতিবিদ, এমন কি জনসেবকের ভূমিকায় অভিনয় করে তাদের শ্রমের মূল্য না চুকিয়ে আখের গুছাচ্ছি।
এভাবে চলতে থাকলে দেশের সিংহভাগ মানুষের স্বাধীনতা আসবে কোত্থেকে? গণতন্ত্রে তাদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষিত হবে?
আমাদের গণতন্ত্রের মানসকন্যারা অস্ত্রধারীদের বেষ্টনিতে বন্দিত্বের নিরাপত্তায় বাস করেন। আমাদের সবধরনের নেতারা-রাজনীতিক সাংবাদিক শিক্ষক চিকিৎসক প্রকৌশলী আইনজীবী সকল ক্ষেত্রে নেতারাই বিত্ত-ক্ষমতার বা নেতৃত্ব-তোষামুদির বৃত্তে বাঁধা পড়েছেন। শিক্ষিত বিবেকবান উন্নত চরিত্রের মুক্ত মানুষ কোথায়?
যে সমাজে এ ধরনের মুক্ত মানুষ বেশি থাকবেন কেবলমাত্র সেই সমাজই এগিয়ে যেতে পারবে। আমরা দূর থেকে হতাশা, বেদনা ও আক্ষেপ নিয়ে তাকিয়ে দেখি কীভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের ভরসাস্থলগুলো উন্মত্ত ভয়ঙ্কর ঘোলাস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে। কবি জীবনানন্দের ভাষায় চারদিক থেকে প্রতিনিয়ত ‘গ্রামপতনের শব্দ শোনা যায়।’
আর কত জনপদ লোকালয় ভাঙলে বোধোদয় হবে আমাদের?

Monday, February 24, 2014

একুশের বিকাশ কোন্ পথে ঘটছে?

আবুল মোমেন

১.
একুশে উদযাপনের ধরণ ও তাৎপর্য উভয়ই যেন বদলে গেছে। গোড়ায় লক্ষ্যটা কেন্দ্রীভূত ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার আদায়ে। সেই সংগ্রামের চেতনার উৎস ছিল এই দিনটি যা তখনও শহীদ দিবস হিসেবেই অভিহিত হত। কিছুদিনের মধ্যে ভাষা থেকে সাহিত্য এবং সাহিত্য থেকে সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়ল এ চেতনার প্রভাব। কারণ সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের প্রশ্ন জরুরি হয়ে দেখা দিলে একুশেই হল সেই চেতনার প্রতীক। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সম্মিলনে জনমনে জোরদার হল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। বলাই বাহুল্য, এই চেতনারও অনুপ্রেরণা এলো একুশে ফেব্র“য়ারি থেকেই। ফলে কালক্রমে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সকল উদ্দীপনার উৎস হল একুশ যার প্রতীক ছিল শহীদ মিনার। এভাবে একুশে ফেব্র“য়ারি হয়ে উঠল আমাদের জাতীয় দিবস এবং জাতীয় জীবনে তাৎপর্যবাহী দিন আর শহীদ মিনার তারই প্রতীক।
গোড়া থেকেই একুশে পালনের মূল অনুষঙ্গ ছিল দেশপ্রেম ও উদ্দীপনার গান আর জাতীয় চেতনা লালন ও বিকাশের উপযোগী সাহিত্য। এক সময় একুশের স্মরণিকা প্রকাশ আর প্রভাতফেরী ও বৈকালিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন ছিল আবশ্যিক কাজ। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা একুশের চেতনারই সম্প্রসারণ। এ প্রতিষ্ঠান তাই বরাবর দিনটি সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে এসেছে। স্বাধীনতার পরে এর পরিসর ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। ক্রমে একুশের সাথে বইমেলা এবং বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার যোগ ঘটে গেল। এখন একুশের মাস জুড়ে বাংলা একাডেমীর বইমেলা, সেমিনার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রভাব দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। এটিই জাতীয়ভাবে একুশের মুখ্য অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব সারা দেশে পড়েছে, প্রায় সব জেলাশহরে আজ ছোট আঙ্গিকে হলেও বইমেলা আয়োজিত হচ্ছে, সর্বত্র কিছু কিছু প্রকাশনাও হয়ে চলেছে।
আজকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রকাশনা শিল্পের এতটাই বিস্তার ঘটেছে যে একে প্রকাশনা শিল্পের বিপ্লবও বলা যাবে। প্রতিদিন বাংলা একাডেমীর বই মেলায় ১০/১২টা নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়, সারা মাসে অন্তত হাজার তিনেক নতুন বই প্রকাশিত হয়। দেশে প্রকাশনার সংখ্যাও বেড়েছে, কেবল বাংলা একাডেমীর মেলাতেই পাঁচ শতাধিক সংস্থা তাদের বই নিয়ে অংশ নেয়, এর মধ্যে শ’খানেকের ব্যবসাও খারাপ নয়। প্রকাশকবৃন্দ প্রায় সারা বছরই এই মেলাকে কেন্দ্র করেই তাঁদের প্রকাশনার পরিকল্পনা করেন। আমাদের প্রকাশনা-শিল্প মূলত একুশে-কেন্দ্রিক।
বাংলা একাডেমীর পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমী, শিশু একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ জাতীয় ও আঞ্চলিক নানা সংগঠন ব্যাপক আয়োজনে একুশে উদযাপন করে থাকে। বিভিন্ন  নগরে কর্পোরেশন কিংবা নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সম্প্রদায়গুলো একুশে উদযাপনে সোৎসাহে অংশ নিচ্ছে, নিজেদের স্বতন্ত্র আয়োজনও করছে। এমনকি সাহেবিয়ানায় অভ্যস্ত ক্লাবগুলো কিংবা ইংরেজিমাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সাড়ম্বরে একুশে উদযাপনে মেতে উঠছে!
২.
ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী নানা আয়োজনে উদযাপনের মাধ্যমে একুশে আজ যেন জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। একুশেকে কেন্দ্র করে দেশের প্রকাশনা শিল্পের বিস্তার যেমন ঘটেছে তেমনি এর ব্যবসায়িক দিকটি মূলত একুশের  ওপর নির্ভরশীল। একুশে এখন মূলত উৎসব এবং বাণিজ্যের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হচ্ছে। প্রকাশকরা বলছেন এ বছর ব্যবসায় ভালো হয়েছে কিংবা বলেন ব্যবসায়ে মন্দা দেখা দিয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনও বাদ নেই, এখানেও ব্যবসায়ের প্রভাব বাড়ছে। এছাড়া বুটিক, তৈরি পোশাক, খাবারদাবারসহ আনুষঙ্গিক আরও ব্যবসায়ের আওতা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে।
নিশ্চিন্তে বলা যায়, যেহেতু বাণিজ্য প্রসারিত হচ্ছে, লক্ষ্মীর স্পর্শে ধন্য হয়েছে একুশে তাই এর বাড়বাড়ন্ত অব্যাহত থাকবে। আশার কথা, এই বাণিজ্যের মূল ভিত্তি এখনও সারস্বত সাধনা। লক্ষ্মী-সরস্বতীর যুগল সম্মিলনে একুশের অগ্রযাত্রা ভালোভাবে চলবে এ আশাবাদকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
হয়ত প্রশ্ন উঠতে পারে লক্ষ্মী না সরস্বতী কার প্রভাব বাড়ছে বেশি? তাছাড়া একুশে কেবল সরস্বতীর সাধনার বিষয়ও ছিল না, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সাথে এতে ধ্বংস ও সৃষ্টির ব্যাপারটা হয়ে উঠেছিল মুখ্য। সেই শৈবশক্তির ভূমিকা কি আজ বিনোদন ও বাণিজ্যের আগ্রাসনে একেবারেই বাদ চলে যাচ্ছে?
৩.
একুশে উদযাপনের ব্যাপ্তি এখন বিশ্বময়, অন্তত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটির স্বীকৃতি আসার পর থেকে। কিন্তু এ দেশে মাতৃভাষা বাংলা তো আজ কাক্সিক্ষত আদৃত ভাষা নয়। সবাই তো ছুটছেন ইংরেজির পেছনে, ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের রমরমা বাড়ছে, ব্যবসাসফল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাচর্চার বাহন ইংরেজি, সেদিকেই ঝুঁকছে বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী। কম্প্যুটার আর মোবাইলেও ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত ইংরেজির চর্চা হচ্ছে। একসময় রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল এ জাতি, আজ তাদের উত্তরসুরীরা স্বেচ্ছায় সাগ্রহে বাংলা লিখছে সেভাবে কিংবা তারই সাঁটভাষ্যে আলাপচারিতা চালাচ্ছে। রেস্তোঁরা, ক্যাম্পাস, মিলনায়তন, বাজার, পথঘাটে কান পাতলে তরুণ ও কিশোর, এমনকি শিশুদের কণ্ঠে ইংরেজি অথবা বাংলিশ কথোকথন কানে আসবে। যেটুকু বাংলা বলছে তাও আঞ্চলিক কিংবা আঞ্চলিকের খিচুড়ি ভাষা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মধ্যেই রয়েছে একুশের মেলায় প্রকাশিত বইয়ের গর্বিত লেখক, একুশে উপলক্ষে পুরস্কৃত কবি, টকশো মাতানো কথাকার, সেমিনারের চিন্তাশীল বক্তার সন্তান বা পৌত্র-দৌহিত্র, পৌত্রী-দোহিত্রীরাই যারা ইংরেজি-বাংলিশে বাৎচিৎ করে কান ঝালাপালা  করছে।
যদি প্রকাশিত বইগুলো ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে পড়ি বা পড়ার চেষ্টা করি তাহলে প্রথম ঘা খেতে হবে অধিকাংশ লেখকের ভাষাগত দুর্বলতায়, তারপর অতৃপ্তির কারণ হবে লেখায় চিন্তার মৌলিকত্বের অভাব। মাতৃভাষার ব্যবহারে এক ধরনের অরাজক অবস্থা চলছে, অপরিণত বুদ্ধির ছাপ যত্রতত্র।
এদেশে সাহিত্যচর্চার দিকে ঝোঁক বেড়েছে, বই প্রকাশের হিড়িক পড়েছে, কবিতা ও উপন্যাসের কমতি নেই। নব্য লেখকদের অনেকেরই প্রথম লেখাই বই আকারে বেরুচ্ছে, কোনো কোনো নব্য লেখক একসাথে এক ডজন বইও প্রকাশ করছেন। একুশে উপলক্ষে যত বই বেরুচ্ছে তার অর্ধেকের বেশি লেখক নিজের টাকায় বের করেন। এতে নৈরাজ্যের নদে কূলপ্লাবী জোয়ার বইছে। দুটি কারণে এই নৈরাজ্য ঘটে চলেছে-দেশে লেখক বাড়লেও প্রকৃত সম্পাদক ও সমালোচক তৈরি হচ্ছে না। কিংবা লেখকদের দাপটে সম্পাদক ও সমালোচকরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এঁরা তো হলেন ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবক ও পাহারাদার। এ সমাজ সবক্ষেত্রেই মুক্তকচ্ছ থাকতে চাইছে, নব্যধনী যেমন আইন-আদালতের তোয়াক্কা করে না, সবই নিজের কব্জায় রাখতে চায়, তেমনি নব্য লেখককূলও প্রশংসা-স্বীকৃতির দায় নিজেদেরই আওতায় রাখতে চান। এ প্রভাব ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার-স্বীকৃতি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে আজ বাংলা ভাষার  ও সাহিত্যের খাঁটি অভিভাবক এবং যোগ্য পাহারাদার নেই। ভাষার প্রতি সুবিচার করতে পারছি না আমরা, ভাষা চর্চায় কোনো নীতি মানছি না। যখন আমাদের পূর্বসুরীরা ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তখন কেবল বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব ছিল, কিন্তু কি শিক্ষা কি গণমাধ্যম কি সমাজজীবন সবখানে বাংলারই রাজ্যপাট ছিল রমরমা। আজ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আছে বাংলার, এমনকি একুশের কপালে বৈশ্বিকে স্বীকৃতিও জুটেছে, কিন্তু এ ভাষা শিক্ষাসহ সমাজ-জীবনের সবখানে দুয়োরানি হয়ে আছে।
ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়ে ওঠায় একুশে উদযাপন নিয়ে আর ভয় নেই, কোনো শক্তিই এই টাকার টঙকারের প্রতি বধির হবে না। কিন্তু সরস্বতীর কী হবে? সারস্বতসাধনাই যদি সংকটে থাকে তাহলে একুশের আর থাকে কি?

###

Monday, February 10, 2014

বিশ্ববিদ্যালয়: উচ্চশিক্ষার অভিমান ও আত্মপ্রতারণা

আবুল মোমেন

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা, খুব সাধারণ বিচারেও, বর্তমানে মানহীন ও উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছে। আমাদের চোখের সামনেই এই পতন ঘটে চলেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর অবক্ষয় চূড়ান্ত রূপ পেয়ে চলেছে। এ পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তাতে একথা স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল লক্ষ্য ডিগ্রি ও সনদপত্র বিক্রয়ের বাণিজ্য। এই খাতের সফল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্য এসেছে মূলত ব্যবসায়িকভাবেই, অ্যাকাডেমিক সাফল্য এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ এর নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে পারেনি আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এগুলোতেও আয়-উপার্জন বাড়ানোর প্রবণতা ক্রমেই মুখ্য হয়ে উঠছে-শিক্ষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উভয়ভাবেই। এ নিয়ে মাঝে মাঝে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করে থাকে, যার অনিবার্য পরিণতি দীর্ঘকালের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি হয়ে গেল।
একটু বলা দরকার, যদি সমাজে কোনো বিষয় নিয়ে সঠিক পথে মুক্ত আলোচনা, যথার্থ কিংবা সুস্থ বিতর্ক না হয় তাহলে নানা রকম উড়ো/উটকো ধারণা/সিদ্ধান্তের ফলে সে বিষয়ে করণীয় ও সমাজের প্রত্যাশায় ফারাক হয়ে যায়। আমার ধারণা উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের প্রত্যাশায় বিস্তর পার্থক্য তৈরি হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজ সত্যিই উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে ডিগ্রিধারী চাকুরের প্রত্যাশাই করে থাকে। এছাড়া ডিগ্রি, কাগুজে ভালো ফল ও সনদপত্রের প্রতি মোহগ্রস্ত  এ সমাজ। ফলে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সকলে মিলে নিষ্ঠার সাথে পরীক্ষা-ডিগ্রি-সনদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। কোর্সের পড়া, প্রয়োজনীয় টিউটরিয়াল, লাইব্রেরিসহ ছাত্রের প্রয়োজনীয় পঠনপাঠন মানসম্পন্নভাবে শেষ হয়েছে কিনা তা মোটেও বিবেচ্য বিষয় নয়। কয়েকটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে ক্লাস করার বিশেষ গুরুত্ব নেই, আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন পাওয়া ও তার উত্তর সংগ্রহ করে শেখার ওপরই ছাত্রের ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ভর করে। কিন্তু প্রশ্ন হল উচ্চশিক্ষায় করণীয় কি এবং উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্য কি?
২০০৯ সনের বহুল প্রশংসিত জাতীয় শিক্ষা নীতিতে এসব বিষয়ে কী বলা আছে তা দেখে নিতে পারি আমরা। এতে অন্যান্য বিষয়ের সাথে বলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল -
* কার্যকরভাবে বিশ্বমানের শিক্ষাদান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা জাগানো এবং মানবিক গুণাবলী অর্জনে সহায়তা দান।
* নিরলস জ্ঞানচর্চা ও নিত্য নতুন বহুমুখী মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার ভেতর দিয়ে জ্ঞানের দিগন্তের ক্রমপ্রসারণ।
* জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী হতে জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি।
* মেধার বিকাশ এবং সৃজনশীল নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতির উদ্ভাবন।
* জ্ঞান সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নাগরিক সৃষ্টি।
যে ল্যাটিন শব্দ থেকে ইউনিভার্সিটি শব্দটির উৎপত্তি তার সম্পূর্ণ অর্থ হল ‘শিক্ষা ও গবেষক সম্প্রদায়’। পরে শব্দটির আধুনিক ব্যবহার সম্পর্কে অভিধান বলছে: স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দানের ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রধানত ‘ non-vocational subjects’ এর চর্চা হয়।
এসব কথা বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে চাই চার ধরনের সম্পদের সমাহার -গবেষণায় আগ্রহী চিন্তাশীল জ্ঞানীর সমন্বয়ে শিক্ষকসমাজ, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় উৎসাহী ছাত্রসমাজ ইন্টারনেট সুবিধাসহ সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আধুনিক উন্নত সরঞ্জামসহ গবেষণাগার। এ কথা বলা বাহুল্য তরুণদের চাই শরীরে মনে সুস্থজীবন। তাই জিমনেশিয়াম ও খেলার মাঠ, সুইমিং পুলসহ শরীরচর্চার ব্যবস্থা, নিয়মিত অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া
অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল সৃজনশীল সুকুমার কলা চর্চার উপযোগী পরিবেশ, ব্যবস্থা, অবকাঠামো, সরঞ্জাম ইত্যাদির আয়োজন। আমার জানা মতে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কিছুই ঠিকভাবে নেই, আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ সবই আজ ধুলো-জমা স্মৃতির বিষয়।
এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুণগত পরিবর্তনের জন্যে দ্রুত সংস্কার কাজে হাত না দিলে বিশ্ববিদ্যালয় - সব বিশ্ববিদ্যালয় - পতনের শেষ সীমায় পৌঁছাবে, উচ্চশিক্ষা তলিয়ে যাবে চরম নৈরাজ্যে।
সংস্কার বলতে আয় বাড়ানোর কৌশল নয়, দরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থবহভাবে কার্যকর করা। উচ্চ শিক্ষার মূল লক্ষ্য তিনটি - কোনো বিষয়ে উচ্চতর ও বিশেষজ্ঞীয় জ্ঞান অর্জন, শিক্ষানীতি ও প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে বলা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা ও উচ্চতর ভাবনার ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন ও নতুনতর জ্ঞান সৃজন, এবং অর্জিত ও সঞ্চিত জ্ঞানের মাধ্যমে মানবসমাজের কল্যাণে অবদান রাখার যোগ্যতা অর্জন। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি স্মরণীয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাঁর মতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞা কি ? কবি ছোট্ট উত্তরে বলেছিলেন - যেখানে বিদ্যা উৎপন্ন হয়। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি চেয়েছেন নানা দেশের নানা বিষয়ের প-িতদের সমবেত করতে যাঁরা নিজনিজ গবেষণা চালিয়ে যাবেন আর ছাত্ররা সহযোগী হিসেবে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করবে। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিই এ ধরনের লক্ষ্য ও করণীয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়টি বিভাগে কত ছাত্র (এবং শিক্ষক) এই লক্ষ্য-করণীয় পূরণ করেন তা আনুবীক্ষণিক অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। তবে একদম হয় না একথা আমি বলব না। দেশে এখনও প-িত ব্যক্তি আছেন, ভালো গবেষকও আছেন, সত্যিকারের জ্ঞানী শিক্ষকও আছেন। ছাত্রদের মধ্যে গবেষণায় আগ্রহী, মৌলিক ভাবনায় পারদর্শী এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানবহিতৈষী মেধাবী তরুণ-তরুণীর দেখা পাই এখনও। দুর্ভাগ্যের বিষয় এরকম শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্যে আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ই কেবল একরাশ হতাশাই তৈরি করে থাকে।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং করণীয় যদি আমরা বুঝে থাকি তাহলে আমাদের বাস্তবতা ও প্রবণতাকে কী বলব? প্রথমেই আমাদের জানা এবং মানা দরকার শিক্ষা অধিকার বটে কিন্তু উচ্চশিক্ষা সংরক্ষিত থাকে শুধুমাত্র অধিকারীর জন্যে। অর্থাৎ যে উচ্চশিক্ষার অধিকার অর্জন করে তার জন্যে। এ কেবল মেধার বিষয় নয়, জীবনভর জ্ঞানার্জন, জ্ঞান অনুশীলনের এবং সেই সাথে ছাত্রদেরকে জ্ঞানচর্চার পথে উদ্বুদ্ধ করা ও পথনির্দেশ দানের মানসিকতা থাকা আবশ্যিক।
যে কোনো দেশের মত আমাদেরও উদীয়মান তরুণ জনগোষ্ঠীর ৯০ ভাগ চাকুরি-প্রত্যাশী। কিন্তু একে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে খুব ধীরে এবং তার ওপর কর্মবাজারের চাহিদার কোনো নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য কারও হাতে নেই, ফলে কোনো ভবিষ্যত চিন্তা ও কৌশল ছাড়াই সবাই গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে দেয়। এদিকে চাকুরির অনিশ্চয়তা আর এখনও বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির সামাজিক মূল্য থাকার ফলে যে কোনো তরুণ উচ্চ মাধ্যমিক বা ডিগ্রি শেষ করে ¯স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পর্যন্ত পড়াশুনা চালিয়ে যেতে চায়। লক্ষ্য করার বিষয় হল এভাবে অধিকাংশ ছাত্রের লক্ষ্যের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনের লক্ষ্যের কোনো সঙ্গতি থাকে না। অথচ তাদের জন্যে অন্য কোনো উপযুক্ত আকর্ষণীয় বিকল্প না থাকায় অনিশ্চিত বেকার জীবনের গ্লানি বহনের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বকে অন্তত একটি সম্মানজনক বিকল্প পরিচয় ভাবে ছাত্র ও তার অভিভাবকরা। এভাবে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত এমন ছাত্রের চাপ বেড়ে চলেছে যাদের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন ও চর্চার কোনো আগ্রহ থাকে না। তদুপরি বাজারের চাহিদা ও সামাজিক মূল্য বিবেচনায় নিয়ে যোগ্যতা-আগ্রহ-নির্বিশেষে ছাত্ররা নির্দিষ্ট কোনো কোনো বিষয়ে ভর্তি হতে চায়। স্বভাবতই সবার জন্যে সে সুযোগ থাকে না। ফলে সত্য হল, আজ পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র তার অপছন্দের বিষয়ে পড়াশুনা করে! এই বাস্তবতার কারণে যে কোনো বিশ্ববিদালয়ে অনিচ্ছুক ছাত্ররাই সংখ্যাগুরু হওয়ায় এদের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ক্ষুণœ হতে বাধ্য। আর শ্রেণিকক্ষে অনাগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি হওয়ায় ক্রমে শিক্ষকও আন্তরিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ, ভালোভাবে ক্লাস নেওয়ার প্রণোদনা হারিয়ে ফেলেন। এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় বা চলতে দেওয়ায় দেশের পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও অর্জনে মারাত্মক অবনতি ঘটে গেছে। আজ আমাদের দেশের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্বের মান-নির্ধারণী তালিকায় একশতের মধ্যেও নেই। এখানকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই আর বিশ্বের উচ্চ মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমমর্যাদায় স্বীকৃত নয়। এ পরিণতি কি আমরা চেয়েছিলাম?
যদি তা না চেয়ে থাকি তাহলে এ হযবরল অবস্থা চলতে দেওয়া কি উচিত? উচ্চশিক্ষার নামে কেবল ডিগ্রি ও সনদপত্রের বাণিজ্য বা এগুলো বিতরণ করার জন্যে কেন বিশ্ববিদ্যালয়?
আমরা লক্ষ্য করছি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের কর্ম বাজারের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে কেবলমাত্র বিবিএ, এমবিএ, আইন, কম্প্যুটার প্রকৌশল মূলত এই ক’টি বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। এর পাশাপাশি উন্নয়ন, পরিবেশের মত সম্ভাবনাময় কিছু বিষয়ও চালু করছে। কিন্তু কোথাও মৌলিক বিদ্যা অর্থাৎ দর্শন, গণিত, বিভিন্ন শাখার ভৌত বিজ্ঞান, বিভিন্ন শাখার প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর জ্ঞান চর্চা ও ডিগ্রির কোনো আয়োজন নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয় থাকলেও ভালো ছাত্রদের আগ্রহ এতে কম। ফলে কোথাও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা রবীন্দ্রনাথের  ভাষায় বিদ্যা উৎপাদনের কোনো পরিবেশ নেই। অনেক শিক্ষক এবং ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন যোগ দিয়ে আর অনেক শিক্ষক বিদেশ থেকে জ্ঞানে ও উদ্দীপনায় সমৃদ্ধ হয়ে ফিরে এলে সত্যিই কিছু করতে চেয়ে বিরূপ পরিবেশে শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন। এভাবে আজ একদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হল হাল ভাঙা জাহাজ আর অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেন বাণিজ্যপোত। পরিণতিতে দেশে মেধাবী তরুণ প্রচুর থাকলেও মেধা লালনের অভাবে, আর লক্ষ্যহীন গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে সকলেই চলেছে হতাশার শেষ প্রান্তে।
সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা ও রাজশাহীতে ছাত্রসংখ্যা ত্রিশ হাজার ছাড়িয়েছে, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগরে পনের হাজারের মত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা কুড়ি হাজারের বেশি। এমন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের কথাও শুনেছি যেখানে ছাত্র সংখ্যা অর্ধলক্ষের বেশি! আমাদের কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ব্যবস্থায় এত ছাত্রের (এবং শিক্ষক-কর্মচারীর) প্রশাসনিক সকল দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা কিছুতেই সম্ভব নয়। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসের যেসব কক্ষ একজন ছাত্রের জন্যে নির্ধারিত ছিল সেগুলোতে ৪/৫জন থাকছে, বারান্দায় বিছানা পেতে থাকছে, কমনরুমও ছাত্রদের দখলে চলে গেছে। যুদ্ধাবস্থায় সাময়িকভাবে গাদাগাদি করে দু:সময় পার করা যায়, কিন্তু সেটাই যদি স্থায়ী ব্যবস্থা হয় তাহলে এই অস্বাভাবিক জীবনের প্রভাব তো ছাত্রের শরীর-মনে পড়বেই। পড়ছেও। অধিকাংশের লক্ষ্য হয়ে পড়েছে কোনো মতে একটি ডিগ্রি ও সনদ জোগাড় করা। পড়াশুনার বাস্তব কোনো পরিবেশ না থাকায় এর জন্যে সহজ উপায় তাদের খুঁজতে হয়েছে, শিক্ষকদেরও এতে শরিক হতে হচ্ছে। ফলে অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত ‘তারুণ্যের অপচয়’ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কোনো খেলাধুলা নেই, লাইব্রেরির ব্যবহার নেই, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নেই, এমনকি ছাত্র-শিক্ষক মিলে সত্যিকারের শিক্ষা-সফরও হয় না (পিকনিক হয়)। কোনো একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে ঘাস গজিয়েছিল।
মানতে হবে রাতারাতি অবস্থা পাল্টানো যাবে না। তবে অদূর ভবিষ্যতে এই নৈরাজ্য ও অপচয় রোধ করে সঠিক অবস্থায় ফেরার কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে। তবে একটি সহজ কথা হল,গুণগত পরিবর্তনের কাজটি শীর্ষ থেকে শুরু করার নয়, নিচের থেকে ধাপে ধাপেই তা হতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সবার অধিকার এবং এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকার ভর্তির বিবেচনায় তা পূরণ করেছেন, এখন মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত অষ্টম শ্রেণি
পর্যন্ত ভর্তি হওয়া সব ছাত্রছাত্রীকে ধরে রাখা যাতে একসময় এটুকু শিক্ষিত একটি জাতি তৈরি হয়। নবম শ্রেণি থেকে বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে যায় ছাত্ররা। আমার মনে হয় বাংলা-ইংরেজি-সাধারণ বিজ্ঞানের  মত অবশ্য পাঠ্য বিষয়ের সাথে সব শাখার বিষয়গুলো উন্মুক্ত রেখে তা থেকে ৪/৫টি বিষয় বেছে নিয়ে ছাত্ররা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়লে ভালো হয়। ততদিনে তারা ভালোভাবে বুঝতে পারবে জীবিকা এবং আগ্রহের বিচারে কার জন্যে কোন ধারায় শিক্ষাগ্রহণ ঠিক হবে। এভাবে এক সময় সমমানের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত জাতি গঠন সম্ভব হবে। এরপরে বৃত্তিমূলক ও পেশাগত বিদ্যা এবং বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে ডিপ্লোমা ও স্নাতক ডিগ্রির জন্যে কলেজ, ইন্সটিটিউট থাকবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের অধীনে এ ধরনের ডিগ্রি প্রদানের  কলেজ, ইন্সটিটিউট চালু করতে পারে। ধীরে ধীরে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করতে হবে যেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শর্ত, চাহিদা পূরণ করবে। এই উচ্চতর জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানের  ছাত্র সংখ্যা হবে কম, শিক্ষকদের বেতন হবে দেশে সর্বোচ্চ মানের।
আশা করি একে কেউ উচ্চশিক্ষা সংকোচনের দূরভিষন্ধি মনে করবেন না। আমার বিনীত নিবেদন হল উচ্চ শিক্ষার নামে যা চলছে তা বাস্তবে কোনা শিক্ষাই নয়, শিক্ষার পরিহাস। একটি জাতি এভাবে উচ্চশিক্ষার অভিমান পুষে বছরের পর বছর আত্মপ্রতারণা চালিয়ে যেতে পারে না। জাতীয় স্বার্থেই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত।

Wednesday, November 27, 2013

পুঁজিবাদী এজেণ্ডা সম্পর্কে সাবধানতা চাই

আবুল মোমেন


আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই ভালো নয়। একদিকে অনিশ্চয়তা আর অন্যদিকে চরম সংঘাতের সম্ভাবনা। জনগণের উদ্বেগ ও আতঙ্কের পারদ কেবল চড়ছে। কিন্তু এর মধ্যেও দুটি কথা ভুললে চলবে না।
প্রথমত, বাংলাদেশে আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তন থেমে নেই - মানুষের প্রাপ্তির বিচারে সূচকগুলো এর মধ্যেও ঊর্ধগামী। একে উপেক্ষা বা নষ্ট করা ঠিক হবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের এই সংকটজনক অবস্থার মধ্যেও পশ্চিমের মুরুব্বিয়ানার নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার। ইদানীং ওদের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কমে এলেও আমাদের এবং ওদের মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাসের কারণে এই নির্ভরশীলতা বা মুখাপেক্ষিতা বেশ জোরদারভাবেই উপস্থিত।
এটি বারবার এবং দেশের বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে পশ্চিম অনুসৃত পুঁজিবাদী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হল সারা বিশ্ব থেকে যেকোনোভাবে মুনাফা অর্জন (আদতে লুণ্ঠন)। এই এজেণ্ডা বাস্তবায়নে তারা পথের সব বাধা দূর করবেই - প্রয়োজনে এর রক্ষক রাষ্ট্রগুলো একজোট হয়ে সর্বোচ্চ হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পথের আশ্রয় নিতে একটুও কার্পণ্য করে না। তারা অবলীলায় একই বিষয়ে ডবল স্ট্যাণ্ডার্ড চালিয়ে যায়। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের জন্যে যদি এক মানদণ্ড হয় তো সৌদি আরবের জন্যে অন্য মানদণ্ড। তারা এক মানদণ্ডে বিচার করে নি লিবিয়া ও কুয়েতকে। তার কারণ একটাই সাদ্দাম আরব বিশ্বে স্বাধীন অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যদিও ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানকে ঠেকানোর জন্যে তারাই এক সময় সাদ্দামকে তৈরি করেছিল। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে কীভাবে ব্যবহৃত তুচ্ছ আবর্জনার মত ফেলে দেয় তা বারবার তারা দেখিয়েছে। তারাই তালেবানদের অস্ত্রসজ্জিত করে জঙ্গিতে রূপান্তর করে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল। তাদের জন্যে ইসলামের আবরণ তৈরি করে যুদ্ধের সহযোগী হয়ে ধন্য হয়েছে সৌদি আরবের বশংবদ বাদশাহরা। তারাই আলকায়দা ও বিন লাদেনের স্রষ্টা। তারাই তাদের ভক্ষক হয়েছে পরে সর্বোচ্চ নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার মাধ্যমে।
পশ্চিমের রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি উদার মানবিক রূপও আছে, যদিও তা আসলে মূল রাষ্ট্রযন্ত্রেরই যন্ত্রাংশ মাত্র। এটি সারা বিশ্বে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের শান্তিজল ছিটানোর দায়িত্ব নিয়ে শান্তির অবতারের ভূমিকায় সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা নেয়। পুঁজিবাদের এই যন্ত্রাংশটি বস্তুত দ্বিমুখী ধারালো ছুরির মত কার্যকর - একদিকে রাজনীতিবিদ ও উচ্চাভিলাষী ধনিকদের মধ্যে যেমন কার্যকর তেমনি অন্যদিকে নাগরিকসমাজের সংবেদনশীল মানুষদের মধ্যেও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু খুব খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এভাবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ন্যায্য মানবিক ছাতাটি খুলে ধরে তারা আদতে আমাদের গ্রাম্য মেয়েদের মত আড়াল তৈরি করে নিজেদের স্বার্থের অনুকূল অর্থনৈতিক ও প্রভুত্ব রক্ষার এজেণ্ডাগুলো ঠিকই পালন ও পূরণ করে যাচ্ছে। সাদ্দাম-উত্তর ইরাকে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত তাদের মানবাধিকার ও আইনের শাসনের চেতনাকে বিচলিত করে না। এ পরিণতির দায় কার এ নিয়ে ভাববার কোনো প্রয়োজন তারা বোধ করে না। মনে করুন, ইরাকের দখল সম্পন্ন হওয়ার পরপর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন তাঁর দেশের মন্দা অর্থনীতিতে চিন্তিত ব্যবসায়ীদের বলেছিলেন ব্যাগ গুছিয়ে জলদি ইরাকে যাও, ওখানে এখন পুর্ননির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে। আর তার মানে প্রচুর ব্যবসা, প্রচুর মুনাফা।
পশ্চিম থেকেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসনের অনুকূলে নানা এজেণ্ডা বিশ্বময় প্রচার করা হয়। এমনকি প্রতি বছর তারাই শান্তির নোবেল লরিয়েট তৈরি করে বিশ্বশান্তির নতুন নতুন বার্তাবাহক প্রস্তুত করে থাকে। এর বিপরীতে দুটি ছোট্ট সরল প্রশ্ন কি তাদেরকে করার সময় আজও আসেনি? এ দুটি প্রশ্ন তোলা কি বিশ্বশান্তি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেই তোলা অত্যন্ত ন্যায্য নয়?
প্রথম প্রশ্ন : যদি এতই তারা বোঝেন যুদ্ধ, সংঘাত হানাহানি ওপরে বর্ণিত তাদেরই প্রদত্ত অত্যন্ত ইতিবাচক এজেণ্ডাগুলো বাস্তবায়নে পথের বাধা তবে তারা কেন এ পরিস্থিতি তৈরির রসদটা জোগান দিয়ে যাচ্ছে? আমরা বলছি পুঁজিবাদী অর্থনীতির আজকের মেরুদণ্ড অস্ত্র তৈরি ও অস্ত্র ব্যবসার কথা। আমরা জানি তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিরস্ত্রিকরণের জন্যে, পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ করার জন্যে চমৎকার সব সংগঠন ও সংলাপের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নিত্য যেসব সংঘাত-হানাহানিতে পৃথিবী ডুবে আছে, যেসব ‘ছোটখাট’ যুদ্ধ-সংঘাতে মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রাণহানি ও বেশি অঙ্গহানি ঘটেছ ও ঘটে চলেছে তাতে পারমাণবিক নয় মারাত্মক সব প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ব্যবসার সবটাই তাদের হাতে, তারাই সরবরাহকারী, তারাই প্রয়োজনে, অর্থাৎ ব্যবসার মন্দা দেখা দিলে, যুদ্ধবাজ নেতা তৈরি করে নেয় - তাদের কেউ ক্ষমতার গদি আঁকড়ে থাকতে কেউ তা দখল করার সংগ্রামে এসব ব্যবহার করে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মধ্যে এ মনোভাব তৈরি করার জন্যেও পুঁজিবাদের এজেন্টরা অনেক আগে থেকেই কাজ করে গেছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য হল রুয়াণ্ডার হুটু ও তুৎসিরা মিলেমিশে বসবাস করে এসেছে চিরকাল। শ্বেতাঙ্গ দখলদাররা এসে হুটুদের বলল তোমাদের নাক খাড়া তাই তোমরা উচ্চ জাতি, থ্যাবড়া নাকের তুৎসিরা তুলনায় তুচ্ছ। শক্তিমানের প্রশয় কে না গ্রহণ করে? ওদের মধ্যে উচ্চমন্যতা বোধ করার মানুষ তৈরি হল, বিরোধের বীজ রোপিত হল, চারা গজাল ও তাতে হাওয়া দেওয়া চলল, ধীরে ধীরে বিষবৃক্ষ হয়ে তা বড় হয়েছে। তারপর ওদের অস্ত্র সজ্জিতও করা হয়েছে। শক্তিক্ষয় হয়ে যাওয়ার পরে তারাই আবার পুনর্গঠনের কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। তাদের তৈরি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শোরগোল তুলতে কসুর করবে না।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও সরল। প্রশ্নটা পশ্চিমের পালের গোদা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম করতে হবে, যদিও তাতে পুরো ইউরোপ যুক্ত, কারণ তারাই তো এলডোরাডোর সন্ধানে দলে দলে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দেশটি ‘তৈরি’ করে নিয়েছে। প্রশ্নটা হল - আজ যে দেশটি তোমাদের বলছ, তার আদিবাসিন্দারা কোথায়? তাদের ঠাণ্ডামাথায় ঝাড়ে-বংশে খুন করে ‘নতুন দেশ’ পত্তন করেছ, তারপর এই বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে কৃষির বিস্তার ঘটাতে ফাঁদ-পাতলে আফ্রিকায়, বর্বরতম ও নিষ্ঠুরতম পথে তাদের ধরে এনে দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়েছে, আজও, হ্যাঁ আজও, তাদের গ্লানির জীবনের অবসান হয় নি। হতে দাও নি তোমাদের মানসিকতার কারণে। এসব প্রশ্ন কি ন্যায্য নয়?
বাংলা প্রবচন বলে - আপনি আচরি পরেরে শিখাও। যার নিজের ইতিহাস জঘন্য অমানবিকতায় ভরা, যাদের বর্তমান মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে শত প্রশ্নে বিদ্ধ করা যায় তাদের উপদেশ দেওয়া আমাদের সাজে, তাদের নয় আমাদের। কেননা আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ঢের পুরোনো, এর রয়েছে ধারাবাহিকতা, এবং মৌলিকভাবে এটি অনেক বেশি মানবিক। সমস্যা তৈরি করেছে ঔপনিবেশিক শক্তি - সেটা যেন না ভুলি।
আমি এর মধ্যেও কিন্তু ভুলে যাই নি কী আনন্দে আমি এখনও শেক্সপিয়র পড়ি, রাসেল পড়ে বরাবর চিন্তার খোরাক পাই, রেনেসাঁস ও আলোকনের ইতিহাসে প্রেরণা পাই, বিজ্ঞান আর আবিষ্কারের ঘটনাগুলোয় রোমাঞ্চিত শিহরিত হই। পশ্চিমাসভ্যতা আমার অনেক অনেক নায়কের আধার। এমনকি সেসব দেশে নাগরিকজীবনের সৌন্দর্য-সার্থকতায় আরাম বোধ করি, ঈর্ষা করি। তারপরেও আমাকে তো খুঁজে নিতে হবে আমার দেশের বিকাশের সঠিক পথটি। এই পথের যে কোন বাধাকেই সরাতে হবে। ভুললে কি চলবে দেশের স্বাধীনতা কীভাবে এসেছে? তার অন্তর্নিহিত আকাক্সক্ষাকে অস্বীকার করার অর্থ তো স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করা। এটি ধর্মভিত্তিক-জাতীয়তার বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তার ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছিল - এটি যেহেতু সম্প্রদায় নিরপেক্ষ (ক্ষুদ্র জাতিকেও নিতে সক্ষম) তাই অধিকতর গণতান্ত্রিক, তাই এরই পক্ষে সম্ভব একটি আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণ। এটিকে আমাদেরই এজেণ্ডা হিসেবে জানতে হবে।
আমরা জানি বেলায় বেলায় কেবল নদীখাতেই অনেক পানি ও পলি প্রবাহিত হয় নি, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। দেশের পশ্চাৎগামী রাজনীতির প্রবল জোয়ারে প্রগতির রাজনীতি স্তিমিত হয়েছে। এর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মধ্যপন্থী রাজনীতি সবচেয়ে বেশি পিছু হটে গেছে। আওয়ামী লীগ আগের অবস্থানে নেই, তার ওপর টেণ্ডারবাজী দখলদারিতে মেতেছে ক্যাডাররা, ক্ষমতার ভাগ কায়েম রাখতে কালোটাকার ব্যবসায়ীরা দলের দখল নিয়ে নিচ্ছে। আর বিএনপি? ধর্মান্ধ রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা কি ছেড়েছে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান অবস্থায়ও কি জামায়াতকে ছেড়েছে? তারা কি তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ সম্পর্কে অবস্থান পরিষ্কার করেছে?
আমাদের তো নিজেদের বাস্তবতার মধ্যেই পথ তৈরি করতে হবে। সে কাজে যদি রুচি না হয়, অনীহা তৈরি হয় তবে মনে রাখতে হবে পুঁজিবাদের কোনকিছুতেই অরুচি নেই, তারা যা পরে বমি করে বের করে দেবে তা প্রয়োজনে সময়মত হাসিমুখে গলাধকরণ করবে। বুশ ও বিন লাদেনের গলায় গলায় ভাবের ছবি পশ্চিমেরই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সাদ্দামের অস্ত্র ভাণ্ডার তাদেরই তৈরি, ফলে পরে যে অজুহাত খাড়া করে তারা ইরাকে আক্রমণ করছিল তা যে মিথ্যা সেটা তাদের চেয়ে আর কেউ ভালো জানত না। তারা প্রয়োজনে মিথ্যাকে সত্যের চমৎকার আবরণে সাজাতে জানে।
আমাদের বাস্তবতা হল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় আপাতত হাতে নেই। কী চমৎকার হত যদি এই দুটি দল কতকগুলো জাতীয় বিষয়ে সহমত থাকত, তাদের বিরোধ থাকত যদি উন্নয়নের নীতি-কৌশলে, পরিকল্পনা প্রণয়নে ও বাস্তবায়নে দক্ষতা নিয়ে। কিন্তু বিরোধ আরও মৌলিক  - মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, সংবিধান, গণতন্ত্র নিয়ে।
ফলে এই অবস্থায় নাগরিকসমাজ একটি অবস্থান নিতে পারেন। তাঁরা বিএনপির ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন যাতে তারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে, আইন ও ইতিহাস, স্বাধীনতা ও জাতির কাছে অপরাধী সেই দলের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন, ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী যে কোনো দলের আনুকূল্য লাভের চেষ্টায় বিরত হয়ে নিজেদের স্বাধীন অবস্থানেই জোট নিয়ে নির্বাচনে আসে। আওয়ামী লীগের ওপর চাপ সৃষ্টি  করা হোক যাতে তারা ক্ষমতার মোহে একক নির্বাচনের কৌশল বাদ দেয় এবং কালোটাকা ও অবৈধ ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের সংসদে না পাঠায়, টেণ্ডারবাজ-দখলদারদের খপ্পর থেকে দলকে মুক্ত করে। আর দুই জোটের বাইরে প্রগতিশীল দলগুলোকে বড় দুই দলের ওপর একইভাবে চাপ সৃষ্টির জন্যে অনুরোধ করব। তাঁদের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখা জরুরি, কিন্তু তাদের ভূমিকা আরও সক্রিয় ও কার্যকর করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধী, ধর্মান্ধ শক্তি, লুটেরা গোষ্ঠী এবং বেপরোয়া ক্ষমতার দাপটকারী শক্তি যাতে দুর্বল হয় সেই দায় নাগরিক সমাজকেও নিতে হবে।
জানি, হাতে সময় কম, নাগরিকসমাজও দুর্বল, ফলে দুই বড় দলের কৌশলি যুদ্ধ আসন্ন নির্বাচনের আগে থামিয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের গ্রন্থি মোচন করা কতটুকু সম্ভব তা বেশ অনিশ্চিত। পরিস্থিতি যদি সেই অনাকাক্সিক্ষত সংঘাতের দিকেই যায় তবে তুলনামূলক ভাবে কম মন্দকে বাছাই করা ছাড়া বিকল্প পথ কি থাকবে?

Thursday, October 10, 2013

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র : কাছ থেকে দেখা সালমান খুরশীদের সাথে সাক্ষাৎ


১৭ তারিখে দুপুরে হোটেল তাজমহলে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছিলেন বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্মসচিব। এতে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশে ভারতের তিনজন সাবেক হাই কমিশনার ও একজন ডেপুটি হাই কমিশনার। এঁরা হলেন দেব মুখার্জি, রজিত মিত্তির, পিনাক চক্রবর্তী এবং অমিতাভ ত্রিপাঠী। আর ছিলেন দিল্লিতে কর্মরত বেশ কয়েকজন সিনিয়র বাঙালি সাংবাদিক, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রমুখ।
যেমনটা হয় প্রথমে ছোট ছোট জটলায় পরিচয়, আলাপ, পুরোনো পরিচয়ের সূত্রে টুকটাক কথাবার্তা চলল। দেব মুখার্জি মনে রেখেছেন আমাকে, নতুন বই কী লিখেছি জিজ্ঞেস করলেন, ভুললেন না পারিবারিক কুশলাদি জানতে। সাংবাদিক সৃঞ্জয় চৌধুরীর সাথে আলাপ করে বুঝলাম তিনি অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর ছেলে। তাঁকে জানালাম একজন মুদ্রা সংগ্রাহক ও মুদ্রা বিশারদ হিসেবে একাধিকবার চট্টগ্রাম সফরকালে তাঁর বাবার সাথে আমাদের বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।
চারদিক ঘিরে টেবিল। প্রথমে আলোচনার সূত্রপাত করেন দেব মুখার্জী। এক্ষেত্রে যা হয় দু’ দেশের ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পর্কের কথা দিয়েই আলোচনা শুরু হয়। তবে তাঁর এবং ভারতীয় পক্ষের অন্যান্যদের আলোচনায় বোঝা গেল ভারত ইদানীং বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্বের সাথেই গ্রহণ করে। বিশেষত বর্তমান সরকার পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ও আইএসআইয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ করায় তাঁরা এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগ্রহী। প্রায় প্রত্যেকেই স্থল সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হয়েও কার্যকর না হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করতে শোনা যায়। ফেলানি হত্যাসহ সীমান্তের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার ব্যাপারে কার্যকর কিছু হওয়া উচিত বলেই সবাই মত দিয়েছেন। আমাদের দিক থেকে দলের বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ডেইলি স্টারের সহযোগী সম্পাদক শাহ হোসেইন ইমাম কথা শুরু করেছিলেন। সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা চুক্তি ও সীমান্তে বিএসএফের ভূমিকা নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কথা তো ছিলই, সেই সাথে সদ্য সমাপ্ত লোকসভা অধিবেশনে স্থল সীমান্ত চুক্তি না ওঠায় হতাশা ব্যক্ত করতেও তিনি ভোলেন নি।
আমাদের দলের যারা কথা বলেছেন সবাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয় যে প্রভাব ফেলেছে তা বলতে ভোলেন নি। কেউ কেউ আরেকটু অগ্রসর হয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের আভাস রয়েছে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব কি একই থাকবে? তার সাথে কেউ বলেছেন ভারতেও আগামী বছর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থানের সম্ভাবনা আছে, তাতে কী ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে পরিবর্তন ঘটবে?
বাংলাদেশের নির্বাচনকে কূটনীতিকরা অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখতে চান, এবং আশা করেন সরকারে পরিবর্তন ঘটলেও বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বোঝা যায় এটা একটা অফিসিয়াল প্রতিক্রিয়া এবং নিয়মরক্ষার আশাবাদ। আর সেদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসবেই এমনটা এখনই তাঁরা কেউ ভাবছেন না। তবে কেন্দ্রে যে সরকারই আসুক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি খুবই পাল্টাবে বলে মনে করেন না কেউ।
অমিতাভ ত্রিপাঠী আলোচনায় একটু ঝাঁঝ আনলেন এই বলে যে, তিস্তার পানি বাংলাদেশের কতটুকু অঞ্চলকে প্রভাবিত করে? তাছাড়া চুক্তি হোক বা না হোক নদী দিয়ে পানি তো প্রবাহিত হচ্ছে, এবং বাংলাদেশ পানি কম পাচ্ছে না। তাঁর সাথে আরও একটু যোগ করলেন সাবেক হাই কমিশনার ও বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সচিব পিনাক চক্রবর্তী। তিনি বলতে চাইলেন, সীমান্তে বিএসএফের তৎপরতা চলে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে, সেটা ঠেকানোর জন্যে বাংলাদেশ সরকার কী করছেন? দ্রুত মাইক নিয়ে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সোহরাব হাসান দু’দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেই বিষয়টিকে দেখতে বললেন। সীমান্ত পারাপার ও সীমান্ত হাটে যাতায়াত বহুকালের বিষয় ফলে এখানে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর আগে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সকলেই অবশ্য গুলি চালানোর মত পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পক্ষেই ছিলেন। সবার মত ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের ভালোভাবে ব্রিফিং হওয়া দরকার।
আমি বলেছিলাম, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক হয় বহুমাত্রিক এবং তার নানা স্তর থাকে। কখনও কখনও এতে টানাপোড়েন তৈরি হয়, কখনও অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এর ভিতর দিয়ে সম্পর্ক ফলপ্রসূভাবে এগুচ্ছে কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে আমাদের দলগত মূল্যায়ন মনে হয় এই যে, গত পাঁচ বছরে এ সম্পর্কে ফলপ্রসূ অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের যতটুকু অবদান ভারতের দিক থেকে, তিস্তা চুক্তি ও স্থলসীমান্ত চুক্তি লোকসভায় অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ায় তার প্রত্যাশিত প্রতিদান মিলছে না। ভারতের বন্ধুরা স্বভাবতই ২৫টি ব্যতীত সকল পণ্য শুল্ক বাধা উঠিয়ে দেওয়া, এক বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্যের প্রসঙ্গ তুলেছেন। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিক থেকে আমাদের মনে হয় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠা বিষয় দুটি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।
ফলে সেদিনই বিকেলে সাউথ ব্লকে আমরা যখন সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়েছি ভারতের বিদেশমন্ত্রী সালমান খুরশীদের সাথে তখন আবারও এই প্রসঙ্গগুলো তুলেছি আমরা। তার আগে একটু বলে নিই সালমান খুরশীদ হলেন ভারতের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জাকির হোসেনের দৌহিত্র। তাঁর বাবাও শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। আর তিনি নিজে আইনজীবী, লেখক, রাজনীতিবিদ। তাঁর একটি বই অ্যাট হোম ইন ইণ্ডিয়া আমার আগেই পড়া ছিল। সম্মেলন কক্ষে আমাদের অপেক্ষা যখন একটু দীর্ঘতর হচ্ছিল, আমরা একটু অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম, তখনই সুদর্শন মানুষটা ঘরে ঢুকে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানাতেই বেশ উষ্ণ আন্তরিক পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল।
চেয়ারে বসতে বসতে রবীন্দ্রনাথের যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে এবং নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা স্মরণ করে বেশ কাছের মানুষটি হয়ে কথা শুরু করেছিলেন। বললেন তাঁর নানার ছোট ভাই ড. মাহমুদ হোসেনের কথা, যিনি পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে একসময় (১৯৬০-৬৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বললেন, আমাদের মধ্যে মিল যত বেশি পার্থক্য তার চেয়ে অনেক কম। স্মরণ করলেন ছাত্রজীবনে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি ও তার স্বামীর সাথে পরিচয়ের কথা।
তা সত্ত্বেও ভারতের সাথে জ্বলন্ত ইস্যুগুলো উঠে এলো। সালমান খুরশীদ ফেলানির হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করলেন এবং বললেন সীমান্তে মৃত্যু বন্ধ করার উপায় বের করতেই হবে। এই প্রসঙ্গে বললেন, তাঁর স্বপ্ন হল, একদিন সীমান্ত থাকবে না, দু’দেশের মানুষ অনায়াসে চলাচল করতে পারবেন। তাঁর বিশ্বাস লোকসভার আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে স্থল সীমান্ত চুক্তি উত্থাপিত হবে। এটি পাশ করতে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন হয় যা বর্তমান ইউপিএ সরকারের নেই। তাই সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে, বিজেপির সমর্থনের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী বলে জানালেন।
তিনিও তিস্তা চুক্তি না হলেও পানি প্রবাহ ঠিক আছে বলে জানান। সাথে এ প্রতিশ্রুতি দেন যে, পানি যেন কোনভাবে প্রত্যাহৃত না হয় সেটা দেখা হবে। ভবিষ্যতে উজানে কোন বাঁধ বা প্রকল্প করতে হলে বাংলাদেশকে সাথে নিয়েই তা করা হবে।
সালমান খুরশীদ জোর দিলেন যৌথ উদ্যোগের আরও নানান ক্ষেত্র খুঁজে নেওয়ার উপর- তা সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতেই হতে পারে। বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা খাতের প্রসঙ্গ এসেছে এই সূত্রে।
তবে যৌথ উদ্যোগে যে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে রামপালে তা বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবনের বিপুল ক্ষতি করবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ কেন্দ্র থেকে ভারতে বিদ্যুৎ যাবে, ফলে এর মধ্যে ভারতের স্বার্থ এবং বাংলাদেশের সমস্যার দিকটি ফুটে উঠলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে অসমতা ও ক্ষেত্র বিশেষে অন্যায্যতার অভিযোগ প্রকট হয়ে ওঠে। বড় প্রতিবেশীকে এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এটাও আমরা বুঝছি না শেখ হাসিনা কেন তড়িঘড়ি করে বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে এটি বাস্তবায়নে এগিয়ে গেলেন যেখানে ভারত সব পক্ষকে সাথে না নিয়ে সীমান্ত চুক্তি বা তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রসর হচ্ছে না? সেদিনই সাউথ ব্লকে আরেকটু অপেক্ষা করে আমরা মিলিত হয়েছিলাম ভারতের বিদেশ সচিব শ্রীমতী সুজাতা সিংয়ের সাথে। সৌজন্য ও প্রীতি বিনিময় এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সুন্দর অভিব্যক্তিসহ দিনের কর্মসূচি শেষ হয়েছিল।

Sunday, September 29, 2013

শঙ্কা শুধু দানাই বাঁধছে, ভাঙবে কে

আবুল মোমেন


দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা এবং চাপা উদ্বেগ-উত্তেজনার পারদ বাড়ছে। এরকম পরিস্থিতি একেবারে নতুন নয় দেশবাসীর জন্য, এ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আগেও আমরা গেছি। তবে সবসময় পরিণতি ভালো হয়নি বলে সব মানুষই যেন ভেতরে-ভেতরে অস্থির হয়ে আছে। নাগরিক সমাজ এ নিয়ে ব্যাপকভাবে কথাবার্তা বললেও রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ বা উদেযাগ আসছে না। তাতে মানুষের হতাশা তো বাড়ছেই, একটু আতঙ্কগ্রস্তও হয়ে পড়ছে সবাই।  দেশে দুটি বড় পক্ষ তৈরি হয়েছে সক্রিয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে। সমস্যাটা বড় হয়ে উঠেছে এ কারণে যে-কোনও পক্ষই নিজ-নিজ অবস্থানের অনুকূলে জনগণকে টানতে পারছে না। এত দিনের ক্ষমতার রাজনীতির অভ্যস্ততায় দুই বড় দলেই নেতাকর্মীদের মধ্যে অর্থবিত্তের সঞ্চয় ও মোহ উভয়ই বেড়েছে। ফলে নিজ-নিজ দলীয় কর্মসূচি ও দাবি নিয়ে রাজপথে যথার্থ গণ-আন্দোলন তৈরি করার সামর্থ্য তাদের নেই বললেই চলে। বিকল্প হচ্ছে রাজপথে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক বাড়ানো। আপাতত বিরোধী দল সে কাজই করছে। সরকারি দল হিসেবে এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের এ ধরনের ভূমিকায় নামার প্রয়োজন পড়ছে না। কিন্তু বিরোধী পক্ষকে মোকাবিলা করার জন্যে তারাও কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি মাঠে আনতে পারছে না। রাজনীতির নামে প্রকাশ্যে যা ঘটতে দেখছে মানুষ তা হল ক্ষমতাপাগল কিছু ব্যক্তির দিশাহীন অপকর্মের নমুনা। তাতে মানুষ হতাশ এবং বিরক্ত। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল বা নেতাদের ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। অথচ শেখ হাসিনা এ মেয়াদের শুরুতেই একেবারে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা নিয়ে বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলেছেন। আবার মেয়াদের শেষে এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও তিনিই রাষ্ট্রনায়কসুলভ দৃঢ়তা দেখাচ্ছেন ও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। দুই ক্ষেত্রেই তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন, সাহসী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হয়নি, সবটা এ মেয়াদে শেষ হবে না। এটি আসলে একটি চলমান প্রক্রিয়া। মাত্র গত মাসে হাঙ্গেরিতে ধরা পড়েছে এক নািসদোসর, যার বয়স এখন ৯৬। কিন্তু তা বলে বিচার থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না তিনি। কাঠগড়ায় তোলা হবে তাকে অচিরেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের জন্যে ইতিহাসেরই একটি উপজাত কর্তব্য, যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ নািস যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায়িত্ব তৈরি করেছে। যুদ্ধ নানা মাত্রার অপরাধ সৃষ্টি করে এবং তা নিরসনের ধরনও নানান রকম হতে পারে। তবে ব্যক্তি-অপরাধীকে সাধারণত দায় নিয়ে বিচার ও শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কোন জাতি হয়তো সামষ্টিক অপরাধের জন্যে ক্ষমা চাইতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত জাতির কাছে। জাপানকে কোরিয়া ও চীনের কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে দেখছি আমরা। কিছুকাল আগে রুশ প্রেসিডেন্ট পোলিশদের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ সবই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জের। এ প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে। আমরাও এ জন্যে আশা করেছি পাকিস্তান সরকারিভাবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্যে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইবে।আমাদের দেশে একাত্তরে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম করলেও তারই ধারাবাহিকতায় ইতিহাসকে এগিয়ে নিতে পারেনি। যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন সরকারের সামনে প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল চারটি— ১. শত্রুর দখলমুক্ত সদ্যস্বাধীন দেশে প্রশাসনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ২. সংবিধান প্রণয়ন ও তার আওতায় সরকারের আইনগত বৈধতা প্রতিষ্ঠা ৩. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং ৪. এক কোটি শরণার্থীকে ফেরত আনা ও পুনর্বাসন। বঙ্গবন্ধু দ্রুত এ চারটি দায়িত্ব পালনে হাত দিয়েছিলেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু বিজয় বা স্বাধীনতা রাজনৈতিক কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যেও যে আরও অনেক বেশি দায়িত্ব নিয়ে আসে সেটা যেন তার সহকর্মীদের বোঝাতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধপরিস্থিতি এক ধরনের উচ্চাভিলাষী মানুষ তৈরি করে যাদের সামলানোর কৌশল প্রয়োগ করতে পারেননি তিনি। তৃতীয়ত, দল ও দলনিরপেক্ষভাবে তখন যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশ গঠনে কাজ করতে চেয়েছিলেন তাদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। চতুর্থত, যুদ্ধপরবর্তী ভাবাবেগপূর্ণ পরিস্থিতিতে চরমপন্থা ও চক্রান্তের পথও সুগম হয় যা তার নেতৃত্ব বা প্রশাসন যথাযথভাবে সামলাতে পারেনি। আর তার মৃত্যুতে এবং তার আগে থেকে দূরদর্শী নেতা তাজউদ্দিন নিষ্ক্রিয় ও পরে নিহত হওয়ায় চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ।তখন দেশে প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, সিপিবি ও অন্যান্য সমমনা দল বাকশালের অংশীদার হয়ে কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন, জাসদ গোলকধাঁধার ভ্রান্তি-চক্রান্তে পড়ে হীনবল। ফলে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করে এবং সরকারি দমনপীড়নের চাপে রেখেই জিয়াউর রহমান ভস্ম থেকে পাকিস্তানকে পুনরুদ্ধার করার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। তারই উপজাত এরশাদ, পুনরুজ্জীবিত জামায়াত আর বিভিন্ন ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল। জিয়া এরও চেয়ে ভয়ঙ্কর যে-কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন, তা হল মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাঙালির চিরায়ত মানবতার সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ইত্যাদি বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক উপদানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজে অনেক বুদ্ধিজীবী পেশাজীবীকে সংঘবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশ চলছে দুই রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে। দেশের বুদ্ধিজীবী ও নাগরিকসমাজ সঠিক ভূমিকা নিতে না-পারায় এই বিভাজন ঐতিহাসিক সত্যে পরিণত হয়েছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ ফাটল বন্ধ করার ঔষধ নয়। এ হল সন্তর্পণে ফাটল পেরুনোর নির্বাচনি বৈতরণী বিশেষ। কিন্তু ফাটল বাড়ছে। এবং তাতে কিছু নতুন বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে।যেভাবে জেনারেল জিয়া ভস্ম থেকে পাকিস্তানের বীজ তুলে এনেছিলেন তেমনি এবারে শেখ হাসিনা প্রায় নির্বাপিত ভস্ম থেকে বাংলাদেশের প্রাণবীজের স্ফুলিঙ্গ তুলে আনার চেষ্টা করছেন। তিনি কেবল বঙ্গবন্ধুর খুনি বা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেই নামেননি, আইএসআইয়ের ঘাঁটি বন্ধ করেছেন, পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস শুদ্ধির প্রয়াস নিয়েছেন, সমাজে অসাম্প্রদায়িক মানবতার বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা করছেন। এ কাজ দীর্ঘমেয়াদি, সময়সাপেক্ষ। কিন্তু এদিকে দেখতে দেখতে নির্বাচনের সময় এসে হাজির। শেখ হাসিনা এবং তার অনুসারীরা ত্রিশংকু অবস্থায় পড়েছেন।নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাতে বিদ্যমান বাস্তবতায় যুদ্ধাপরাধী বা একুশে আগস্টের হামলাকারীদের ঠেকানো গেলেও তার পেছনের রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া, এমনকী জনগণ চাইলে জয়ী হওয়া থেকেও, ঠেকানো যাবে না। বিকল্প পথ ছিল একাত্তরের চেতনায় জাতিকে, বিশেষত তরুণ সমাজকে, ঐক্যবদ্ধ করে গণজোয়ার, গণআন্দোলন সৃষ্টি করে তার পটভূমিতে নির্বাচনে যাওয়া— অনেকটা ১৯৭০ এর মতো। তবে ক্ষমতায় থেকে এবং দলীয় ক্যাডারবাহিনীকে লাগামছাড়া ভোগদখলের সুযোগ দিয়ে তা সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন ওঠা সঙ্গত।এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের যে-দুর্বলতাটি প্রকাশ পাচ্ছে তা হল, বাংলাদেশকে পুনরুদ্ধারের কঠিন সংগ্রামে তিনি নিজের দলকে সঙ্গে নিতে পারেননি। আওয়ামী লীগের শক্তি তার সাংগঠনিক ভিত, এই দফায় শেখ হাসিনা তার প্রশ্রয় ও প্রসাদ বিতরণে ব্যক্তিগত খেয়ালের ওপর এতটাই নির্ভর করেছেন যে তাতে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও শক্তি উভয়ই ক্ষয় পেয়েছে, দুর্বল হয়েছে। তার জন্যে এটুকু আশ্বাস হয়তো দেওয়া যায় যে, এতদ্সত্ত্বেও তুলনায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি এখনও দুর্বল।কিন্তু এত কথার পরে যে-কথাটা বলা দরকার তা হল, দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সমাজ তলে-তলে দুটি যুযুধান শিবিরে বিভক্ত, কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান। তার পক্ষে নানা উপদলে-কোন্দলে বিভক্ত সন্ত্রাস-সংহারে মত্তপ্রায় দুটি শিবিরের ক্ষমতার লড়াইকে  নেহায়েত নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে সীমিত রাখা সম্ভব হবে কি? মানুষ এসব নিয়েও ভাবিত, শঙ্কিত এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে হতাশ ও আতঙ্কিত।